বয়ঃসন্ধির ভাষা

যশোধরা রায়চৌধুরী


মা তুই রাগ করলি?
কেমন থমথমে মুখে বলল সোনালি। মায়ের দিকে হাত বাড়াল। শুয়ে থাকা মা, মানসী, তখন খুব মন দিয়ে সোনালির একটা এস এম এস পড়ে ভাবছিল, এরা কোন ভাষায় কথা বলে, মঙ্গলগ্রহের?
ROFL LOL OMG…

মুখ একটু ভার, গম্ভীর। সেটা দেখে সোনালি ভয় পেল। মা বুঝি ওর উপরেই চটেছে... মনে হল কেন জানি না।
কী এগুলো?
রোলিং অন দ্য ফ্লোর লাফিং... রফল
লাফ আউট লাউড ... লল
ও মাই গড! ও এম জি...
এর মধ্যে কী স্পেশালিটি আছে মা?
কী জানি , বুঝি না বাপু। এগুলো লিখে কী যে আনন্দ পাস। এরপর ত কারুর জন্মদিনে এইচ বি ডি লিখবি বাপু।
গত একটা বছর ধরে সোনালির পৃথিবীটা একটু একটু করে পাল্টে যাচ্ছে। ডায়েরি লিখতে শুরু করেছিল সোনালি ২০১১-র মাঝামাঝিই। সে ডায়েরিটা গোলাপি, বার্বিপুতুলের ছবি আঁকা। কী সুন্দর ডায়েরি, মাসি ওকে উপহার দিয়েছে। তালাচাবি লাগানো। তাতে ও মনের প্রাণের কথা লিখত, যেমন বইতে পড়েছে, আন ফ্রাংক –এর ডায়েরি।
ডিয়ার ডায়েরি...
সেই সময় থেকেই বাবা মার মধ্যে ঝগড়া ঝাটি শুরু হয়ে গেল কেন যেন, মায়ের অফিসের পলিটিক্স বেড়ে গেছে, অশান্তি, অশান্তি... বাবা সবসময়ে মা-কে ঝাঁঝিয়ে কথা বলত।
সোনালির খুব খারাপ লাগত। নতুন টিউশন শুরু হল, টিউশন পড়তে ওকে যেতে হত পামেলার বাড়িতে। পামেলার মা খুব ভাল। বাড়িতেই থাকে। সোনালির মায়ের মত সারাদিন অফিসে না। অনেক রান্না করে দেয়। সোনালিকেও খুব ভালবাসে, মনা , সোনা, বাবুটা করে কথা বলে। পামেলার সঙ্গে সোনালির বেস্ট ফ্রেন্ডের সম্পর্ক। তাও অনেকদিন। প্রায় ক্লাস সেভেনের শুরু থেকেই।
ডায়েরিকে লিখত সোনালি, ইংরিজিতেই লিখত... বাবা মায়ের সঙ্গে কথা বলছে না দুদিন। ডিয়ার ডায়েরি, আমার মন খারাপ। বাবার পেটে স্টোন ধরা পড়েছে, খুব বাজে লাগছে। অপারেশন করতে হবে। আমার খুব চিন্তা, ডিয়ার ডায়েরি। বাবার হসপিটাল থেকে আসার পর সবাই বলছে বাবা ভাল হয়ে গেছে, দু সপ্তাহ রেস্ট নিলেই হবে। ডিয়ার ডায়েরি, মা এখন বাবাকে খুব আদরযত্ন করছে আমার ভাল লাগছে। বাবা সিগারেট খাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে। কী মজা।
পামেলার সঙ্গে আজকে ওর ক্রাশ নিয়ে কথা হল। আমি তুনীরের কথা বললাম। তুনীর আমার ক্রাশ। স্কুলে রোজ ওকে দেখি, খুব ভাল লাগে ওকে আমার। ডিয়ার ডায়েরি, আজ তুনীরের সঙ্গে একটা সেনটেন্স কথা হয়েছে।
পামেলাকে আমার ক্রাশের কথা বলে খুব আরাম পেলাম। পামেলা আমাকে বলল, ওর সপ্তাশ্বকে ভাল লাগে। কী পাগল মেয়ে দেখো, এতদিন ও সপ্তাশ্বকে নিয়ে আমাকে খেপাত, আসলে ওর নিজেরই ওকে ভাল লাগে সেটা লুকোবার জন্যই!!! এ মা।

সোণালি বলেছে , ১৬ হবার আগেই ওর বি এফ হয়ে যাবে। যেতেই হবে। আরুনি ফেসবুকে চ্যাটে জিগেস করেছে ওকে, পামেলার বি এফ আছে কিনা। তৃষিত জিগ্যেস করেছে ওকে, সুমি-র বি এফ যে আরুণি সেটা সত্যি কিনা। সোনালি বলেছে আমি জানি না। তুই কেন জানতে চাইছিস বল?
ওরা সবাই সবাইকে জিগ্যেস করে। তোর বি এফ আছে? তোর জি এফ আছে? অমুকের জি এফ আছে? অমুকের বি এফ আছে?
কিন্তু আরুণি যখন সোনালির সঙ্গে আড্ডা দেয়, তখন এটা জেনেই দেয় যে সোনালি ওর জি এফ না। সোনালি ওর ‘ সিস ‘ ... সিস মানে সিস্টার। ব্রো মানে ব্রাদার। এই ভাষাগুলো মা জানে না। মা বোঝে না বিএফ কী জি এফ কী। বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড কীকরে হয় এত ছোট ছেলেমেয়েদের। মায়েদের তো কলেজে উঠে ছেলেবন্ধু হয়েছিল। সোনালিরা তো একেবারে ১২-১৩ তেই শুরু করে দিচ্ছে রে বাবা!
আরুণির সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা চ্যাট করছে সোনালি। মা ভীষণ চিন্তিত। মা চেষটা করে ওদের কথাবার্তার ওপর টিকটিকিগিরি করতে। স্নুপিং করতে। সেই কাজটা করার সময় কিন্তু মা কিছুতেই বুঝতে পারে না আরুণির সঙ্গে কী সম্পর্ক সোনালির।
আরুণির নাম , মোবাইল ফোনে লিখে রেখেছে সোনালি , আরুণি মাই ব্রো।
ও তো আমার ভাই, মা, ব্রো। ব্রাদার। তাই , ওর সঙ্গে এক ঘন্টা চ্যাট করলেই বা কী অসুবিধে হচ্ছে তোমার।
টুকুনদিদি, সেই টুকুনদিদি, সোনালির কাজিন দিদি, ওর ব্যাপারটা নিয়ে মা এত ভেবেছে, যে মায়ের চিন্তাগুলো ভুলভাল হয়ে গেছে।
টুকুনদিদির ক্লাস টেন থেকে বয়ফ্রেন্ড ছিল মিকাদাদা। মিকাদাদার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল টুকুনদিদির সোনালির ১০ বছরের জন্মদিনেই। গত তিন চার বছরের টুকুনদিদি ফেসবুকে মিকাদাদার সঙ্গে ইন এ রিলেশনশিপ ছিল কিন্তু হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে মিকাদাদা যেই বিটস পিলানিতে পড়তে গেল, টুকুনদিদিকে বলে দিল, পাবলিক প্রোফাইলে ওভাবে তোর সঙ্গে ইন এ রিলেশনশিপ থাকলে মুশকিল আছে। আমার নতুন নতুন অনেক বন্ধু হয়েছে। একটা মেয়েও বন্ধু হতে চাইবে না, যদি দেখে আমার একটা জি এফ অলরেডি আছে। এটা আমাদের মধ্যে থাক শুধু, যে আমরা বি এফ জি এফ। কিন্তু বাইরের সবার জন্য আমার স্ট্যাটাস থাক সিঙ্গল।
টুকুনদিদি রেগে লিখে দিয়েছে ইটস কমপ্লিকেটেড।
কেউ যদি কাউকে ভালবাসে তাহলে ইন এ রিলেশনশিপ লিখতে ক্ষতিটা কী? এক একরকম অডিয়েন্সের কাছে এক একরকম হলে ত খুব মুশকিল। মিকাদাদা ভাবে, রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দেখলে সবাই সরে যাবে। নতুন বন্ধু হবে ।

নতুন একটা ভাষা শেখার মত মা তার মেয়ের ফোন পড়ছে, তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পড়ছে, তার ফোনের ভেতরের মেসেজ পড়ছে। আরো দু বছর কেটেছে, মা পড়াশুনো করে চেষ্টা করছে ১৬-১৭ বছরের মেয়েকে বোঝার জানার।
স্মার্টফোন বুঝত না মা। মেয়ে ও তার বয়ফ্রেন্ডের ওপর গোয়েন্দাগিরির জন্য সেটাও বুঝতে হল।
এভাবেই শিক্ষিত হচ্ছে। মেয়ের ফোনে সব সময়ই লাগানো থাকে পাসওয়ার্ড । তালাচাবি। হাতের ছাপ, চোখের মণি সব এবার থেকে চাবির কাজ করবে নাকি। আপাতত একটা আকৃতি... কয়েকটা ফুটকির ওপর দিয়ে হাত বোলাতে হবে।
ফোনে এমন একটা বিটকেল পাসওয়ার্ড দিয়ে রেখেছে সোনালি, যে খুলতেই পারবে না মা। প্রথমবার খুলল, তখন দেখল হাইক হ্যাং আউট ইত্যাদি নানা খ্যাচাকল করে রেখেছে। ওগুলোতে ঢুকতে যাবে, দেখল, পাসওয়ার্ড চাইছে!!!
পরীক্ষা চলছে, পড়া চলছে। টিউশনে যায় মেয়ে নিজে। কত আর খবর রাখবে মা। এর মধ্যে একদিন সোনালি বাবা মাকে বলল, আজ ছুটি, শিবাঙ্গীরা, বর্ষারা সবাই মিলে সিটিসেন্টার যাবে। আমিও যাব। ওরা আমাকে বিগ বাজারের সামনে থেকে তুলে নেবে। শুনে মা ভাবল, আচ্ছা বেশ। মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে যাবে।
তারপর মা ওকে ড্রপ করতে চাইল শিবাঙ্গীর বাড়ি। ও রাজি হল না।
ও বেরিয়ে যেতে মা ওর ল্যাপটপ খুলল। দেখল সেদিন একটুর ভুলে সোনালি সাইন আউট না করেই ফেসবুক থেকে বেরিয়েছে। ফলত, ওর ফেসবুক মেসেঞ্জার এর সব মেসেজ পড়া যাচ্ছে।
দেখল , পড়ল কিছু মেসেজ। পড়তে গিয়ে বুক কাঁপল। চোখ বুজে আসছিল। লজ্জায়, ঘেন্নায়, চমকে। তার মেয়ে এইসব চ্যাট করেছে? এই ভাষা ওদের? কী সাংঘাতিক।
মা কাজে বেরিয়ে গেল, জেনে গেল, সোনালি আজ শিবাঙ্গীর বাড়ি যাচ্ছে না। ও বিশালের সঙ্গে মিট করবে।
এখন বিশালই সোনালির লেটেস্ট ক্রাশ। অথবা বি এফ। কোনটা, জানে না মা। ক্রাশ মানে এক তরফা ভাল লাগা। বি এফ মানে সম্পর্ক দ্বিপাক্ষিক।
দুপুরে ওকে ফোন করল মা। বলল সরাসরি, অ্যাই, তুই আজ বিশালর সঙ্গে আছিস?
ও থমকে গেল, তারপর বলল, হ্যাঁ।
মা হেসে হেসে বলল। তাই সোনালি মেনে নিল। বকল না। বলল তুই কি সিটি সেন্টারে আছিস, তাহলে ফেরার পথে তোকে তুলে নেব।
মা-র মন বলছিল, হারগিস ও সারাদিন সিটি সেন্টারে বসে থাকবে না। ও নিশ্চয় চলে যাবে বিশালের বাড়িতে। বিশালের মা সারাদিন নিজের ঘরে ঘুমায়। ওরা বন্ধুর ঘরে ছিটকিনি তুলে দিয়ে যা যা করণীয় সব করবে।
ঠিক যা ভেবেছে মা, তাই... সোনালি চাপা গলায় বলল, মা, আমি সিটি সেন্টারে নেই, আমি লেক টাউনে বিশালের বাড়িতে আছি।
মা চমকাল না আর। চমকেছে যে দেখালও না মেয়েকে। ক্যাজুয়ালি বলল, ওকে, আমি ওখান থেকেই তোকে তুলে নিচ্ছি।
লেক টাউন গিয়ে দেখল, বিশাল সোনালি দুইজন জয়া সিনেমার সামনে দাঁড়ানো দুই চোর ধরা-পড়েছে-হেন মুখ করে দাঁড়িয়ে!!!
তারপর গাড়িতে উঠে সোনালি মাকে বলল, তুমি কি করে সব বুঝে ফেললে?
মা বলল, আমিও তো একদিন টিনেজার ছিলাম। তবে তোরা আমাদের থেকে পাঁচ বছর এগিয়ে চলছিস। এই যা।
একটা পরীক্ষায় পাশ করে বেশ একটা সাফল্যের বোধ হল মা-র।
পরদিনই আবার সেই অনুভূতি চলে গিয়ে ফিরে আসবে অস্থিরতা। অনিরাপত্তা। অনিশ্চিতি।

প্রতি যুগে, টিনেজার বা বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েদের নিজেদের ভাষা থাকে। কিছুটা নিজেদের বৃত্তে বোঝার জন্য, কিছুটা থাকে অন্য বয়সী্দের কাছে, বিশেষত শিক্ষক শিক্ষিকা এবং বাবামায়ের কাছে বিষয়টাকে নিষিদ্ধ, দুর্বোধ্য করে রাখার দায়ে। কিছুতেই অন্যদের বুঝতে দেওয়া যাবে না কী বলছে ছেলেমেয়েরা।
এই ভাষার সবটাই কিন্তু স্ল্যাং নয়। কিন্তু এই মুখের ভাষা প্রতি দশ বারো বছরে আমূল পালটে যেতে দেখা যায়। ফলে প্রতি প্রজন্মের বাবা মার সঙ্গে সন্তানদের এক দুর্লংঘ্য দূরত্ব মাথা তুলে দাঁড়ায়।
কী কী বৈশিষ্ট্য আছে এসব ভাষায়?
এক, যৌনতার সর্বত্রগামিতা। প্রচুর চাহিদা যৌনতাগন্ধী ভাষার, যেমন চাহিদা স্মার্ট পোশাক ও বিপরীত লিঙ্গের মনোযোগ আকর্ষণের। বাধ্যতাই যা একরকমের, বি এফ জি এফ থাকা বাধ্যতামূলক। লোক দেখানো যৌনতা উদ্‌যাপনের জন্য চেষ্টা তাই । সর্বাতিশায়ী এক যৌনতাবলয়ে আছে টিনেজাররা। আমার টিনেজ বয়সে ছিল চোরা চাউনি, চিরকুট, হাত চিঠি, ফোনে দীর্ঘনিশ্বাস। তার সঙ্গে “অ্যাব” , “ট্যান”, হেব্বি, মাকু, টুম্পা, বং, ট্যাঁশ... এসব শব্দের জাল। ছিল, ট দিয়ে বা ন দিয়ে কথা। “টামার টপকেটে টদশ টটাকা টাছে”। “তোনর মানমার হেনভি সেনকসি চেনহারা”। এই রকম উদ্ভাবন। নতুন নতুন কোড ল্যাংগুয়েজ।
এখন অনেকটাই ছবিধর্মী। কিছুটা মার্কিন শব্দের আশ্রয়। বি এফ জি এফ সিস ব্রো। আর ডিজিটাল ছবি... সেলফি, গ্রুপফি। চ্যাট, সেক্স চ্যাট। সেক্সটিং, যা এসেছে টেক্সটিং এর থেকে।
ছেলে মেয়েরা ছবিতে ছবিতে, ডিজিটালে ডিজিটালে, ছয়লাপ করে ফেলেছে।
এদের সন্ধি ভাষা বা সিক্রেট ভাষার উদ্ভাবনগুলোও তো আসলেই প্রাইভেসির প্রবল প্রয়োজন থেকে সঞ্জাত। সাঙ্ঘাতিক দাবি নির্জনতার, যেরকম ছেলেরা, মেয়েরা, বন্ধুবান্ধবীকে পাঠাচ্ছে বাথরুমের ভেতরে তোলা নগ্ন সেলফি । শোবার ঘরে আয়নার সামনে অন্তর্বাস পরা অবস্থায় সেলফি তুলে ওয়াটস্যাপে পাঠাচ্ছে।


বয়ঃসন্ধি আসলে সমস্যার সময়।

যৌনতা বিষয়ে কৌতূহলের সময়।
আবার নানারকম ভুল ধারণা, ভুল অভ্যাস, বিভ্রান্তির সময়ও।
বিষয়টাকে আরো অনেকটা জটিল করে দেয় বাবা মায়ের মধ্যে যৌনতা সম্বন্ধে নিষিদ্ধাচরণ। আর সেই সঙ্গে শাসনের ঘনঘটা। এটা কোর না ওটা কোর না। ফলত ছেলেমেয়েরা বাবা মাকে আর বিশ্বাস করেনা। শরীরী ও বাচিক ভাষা, দুয়েই তারা ক্রমশ সরে যেতে থাকে অনেকটা দূরে, আগের প্রজন্মের থেকে।
এসব ক্ষেত্রে, আমরা থিওরি দিয়ে বলি, এই সময়ে জীবনপাঠ দিতে হয়। এনিয়ে আমার পড়া একটি চমৎকার জোক বা চুটকি বলতেই হবে। জনৈক
বাবা তার টিনেজার ছেলেকে একদিন কাছে ডেকে বললেন, শোন তোমার সঙ্গে আমার কিছু জরুরি কথা আছে। ছেলে একটু ঘাবড়ে যায়। খাবার টেবিলে নির্জনে বসে বাবা ছেলের কথা শুরু হয়।
বেশ খানিকটা গলা ঝেড়ে নিয়ে বাবা বলেন, আমি তোমার সঙ্গে যৌনতা নিয়ে কথা বলতে চাই। সেক্স নিয়ে।
ছেলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে, ও তুমি সেক্স নিয়ে জানতে চাও ? বল বল কী কী প্রশ্ন আছে তোমার। আমি সবকিছুর উত্তর দিয়ে দিচ্ছি।

আমাদের দেশে কার্টুন তৈরি হয়েছে , মিম (meme) চালু হয়েছে , মজার ভিডিও ভাইরাল হয়ে গিয়েছে এই বিষয়ে। শিক্ষক ইস্কুলে এসে ছেলেমেয়েদের গুরু গম্ভীর ভাষায় যে পাঠ দেবেন, তা তারা ইতিমধ্যেই জেনে বসে আছে নাকি? নাকাল হতে কোন শিক্ষক আর চায়। মনে পড়ে বয়ঃসন্ধি নিয়ে চমৎকার ছায়াছবি “ফড়িং” যা এক ১২-১৩ বছরের ছাত্রের সঙ্গে তার অত্যন্ত এগিয়ে থাকা তরুণী শিক্ষিকার সম্পর্কের গল্প। শুনেছি, তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের আয়োজনে গ্রাম মফস্বলে এই ছবি নাকি দেখানোও হচ্ছিল কিছুদিন আগে। এও একরকমের জনসংযোগের ভাষা, যার মূল অভিমুখ বয়ঃসন্ধির সঙ্গে কম্যুনিকেশন।

বাংলাদেশের একটি ব্লগ সাইট থেকে জানতে পারি, সিরাজগঞ্জ জেলার ফুলকুচা এলাকার ঘোড়াচড়া উচ্চ বিদ্যালয়৷ এই বিদ্যালয়ে ঘটে গেছে এক অভূতপূর্ব ঘটনা৷ প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলটি স্বাস্থ্য বিশেষ করে যৌন শিক্ষার ক্ষেত্রে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে৷ কথায় বলে না, ‘শূন্য থেকে শুরু'? আসলে স্কুলটিতে যৌন শিক্ষা আজ আর কোনো লজ্জার বিষয় নয়৷ প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা সহজেই তাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন কখন, কী করতে হবে৷ কোন ধরণের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে৷ আর শিক্ষার্থীরা বুঝে গেছে বয়ঃসন্ধিকাল কাকে বলে৷ বুঝে গেছে এর লক্ষণ৷ এটা যে স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক নিয়ম – তা আর তাদের এখন বুঝতে বাকি নেই৷ স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী রুবিনা ইয়াসমিন বললেন, ‘‘আমার মা-বাবাও এখন বয়ঃসন্ধিকাল নিয়ে কথা বলেন স্বাভাবিকভাবেই৷ আমিও আমার মাকে জানাই, কথা বলি৷''
স্কুলটির প্রধান শিক্ষক সাইদুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘শুরুতে অবশ্য বিষয়টি এত সহজ ছিল না৷ শিক্ষকরাও প্রথমে যৌন শিক্ষা বা প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়টিকে সহজেভাবে নিতে পারেননি৷ তাই তাদের আগে বোঝাতে হয়েছে৷ শুধু তাই নয়, উপজেলা প্রশাসনকেও বোঝাতে হয়েছে৷ আর তাদের মাধ্যমেই স্কুলের টয়লেট এবং পানির সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ এমনকি স্যানিটারি ন্যাপকিনের জন্যও ফান্ড দিচ্ছে উপজেলা প্রশাসন৷''তবে বাংলাদেশের সব এলাকাতেই যে একইরকম চিত্র, তা কিন্তু নয়৷ বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার মিরুখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পাঠ্যপুস্তকে স্বাস্থ্য এবং যৌন স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখন অন্তর্ভুক্ত হলেও, স্থানীয়ভাবে পাঠদানের ক্ষেত্রে নানা সমস্যায় পড়তে হয়৷ প্রথমত শিক্ষকরা এখনো অভ্যস্ত হয়ে ওঠেননি৷ ছাত্র-ছাত্রীরাও বিষয়টিকে সহজভাবে নিচ্ছে না৷ তাছাড়া কখনো কখনো অভিভাবকরাও আপত্তি করেন৷ তাই অনেক শিক্ষক ক্লাসে এই বিষয়গুলো শেষ পর্যন্ত আর পড়ান না৷''
বাংলাদেশে ২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুয়ায়ী, ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে পাঠ্যপুস্তকে স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভূক্ত হয়েছে৷ শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নামের বইয়ে একটি অধ্যায় বরাদ্দও করা হয়েছে৷
সপ্তম শ্রেণির বইয়ে বিষয়গুলো এভাবে রাখা হয়েছে – আমাদের জীবনে বয়ঃসন্ধিকাল, শারীরিক ও মানসিকপরিবর্তন, ভ্রান্ত ভাবনা, নিরাপদ থাকার উপায়, ঝুঁকি ও নিরাপত্তা প্রভৃতি৷ এছাড়া এইডস ও এইচআইভি নিয়েও আলাদা অধ্যায় আছে৷
মনে পড়বে সাম্প্রতিক কালে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর কলমে ‘হলদে গোলাপ’ উপন্যাস। শুরুতেই আকাশবাণীর আয়োজনে বয়ঃসন্ধিকালীন প্রশ্নাবলী নিয়ে অনুষ্ঠানের কথাগুলি। ১৯৯৫ সালে। একটি “বৈপ্লবিক” কার্যক্রম । আকাশবাণীতে কাজ করার সূত্রে কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র অনিকেত শুরু করেন এক রেডিও প্রোগ্রাম “সন্ধিক্ষণ”। যেখানে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করা হবে শ্রোতাবন্ধুদের নানা সমস্যার, যে সব সমস্যার উত্তর অন্যান্য বিজ্ঞানভিত্তিক অনুষ্ঠানের কথিকা শ্রবণে তাঁরা পাননা। কেননা বিষয়গুলো আপাত নিষিদ্ধ। কেননা বিষয়গুলো উচ্চারণ করার অদৃশ্য বন্ধনী আছে আমাদের মুখে। বিষয়গুলি যৌনতা সম্পর্কিত।
যেভাবে, গত শতাব্দীর ষাটের দশকে যৌনতা সংক্রান্ত মনোবৃত্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে৷ জার্মানিতে ‘ব্রাভো’-র মতো টিনেজার ম্যাগাজিনগুলিতে খোলাখুলি সেক্স সংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরুর মাধ্যমে।

আসলে, আমাদের মানসিকতার খোপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অন্ধকার, ঝুলপড়া, সবচেয়ে অগম্য স্থান, যৌনতার খুপরি ঘরটা। একদিকে যুগসঞ্চিত নিরিমিষ, ডেটল ধোয়া পবিত্রতার ধারণা । মধ্যবিত্তের তথাকথিত ‘ভদ্র’ মানসকে যা পরিচ্ছন্ন, স্যানিটাইজড করে রেখেছে এতটাই, যে ইংরিজিতে ছাড়া তাঁরা প্রস্রাব –পায়খানা-ঋতুস্রাব-গর্ পাতের কথা এমনকি ডাক্তারদেরও বলতে পারেন না। এইসব বিষয়ে লেখালেখি দেখলেও স্কুল বালকবালিকার ভয়ারিজম বা বালখিল্যসুলভ আকর্ষণের সঙ্গে একটা মানসিক বিকর্ষণ কাজ করে। অন্যদিকে বাঁধভাঙা উল্লাসে ততটা-ভদ্র-হবার-দায়-নেই এমন সমাজে চলে যৌন অভীপ্সার টানাপোড়েন, যার মধ্যে, অর্থনৈতিক কারণেই অবৈজ্ঞানিক হাতুড়েপনা বিপদ ডেকে আনে স্বাস্থ্য-শরীরে।








সোনালি এখন ২০ । বেঙ্গালুরুতে পড়ে।
মায়ের সঙ্গে স্কাইপে কথা বলে নেয় । মা ওকে টাকা পাঠায় নেটের মাধ্যমে। আর টি জি এস করে।
মেয়ের লড়াই মেয়ের মত। ওরা ফোকাসড, আপাত দৃষ্টিতে ক্যাজুয়াল হলেও, আসলে নিজের জীবনকে নিজের হাতে নিয়েছে।
সেইদিন, ইউটিউবে একটা ভিডিও পাঠাল সোনালি ওকে। মা তাতে দেখল একটি তরুণী মেয়ে কমেডিয়ান, যাকে বলে স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান, কী স্মার্ট একটা মেয়ে, জড়তাহীন, সকলের সামনে বলে যাচ্ছে, পিরিয়ডস নিয়ে, স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে রসিকতা... কিন্তু সাধারণ রসিকতার মত সেটা কিন্তু নারীবিরোধী রসিকতা না। বরং, তা মেয়েদের রোজকার জীবনের অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা নিয়ে। ব্রা কিনতে গিয়ে দোকানদার কীভাবে বুকের দিকে তাকিয়ে মাপ বলে দিচ্ছে তা করে দেখাচ্ছে মেয়েটি... আর হেসে কুটিপাটি খাচ্ছে জনগণ।
এভাবেই, সোনালি ওকে কত নতুন জিনিস দেখাল, শেখাল। নিজের মোবাইল ফোন, যা এখন স্মার্ট ফোন, সেটাতেই “ফ্লো” নামের অ্যাপ পর্যন্ত ডাউনলোড করে ফেলেছে মেয়ে। সবটা জানবে ওরা, জেনে ছাড়বে।
কবে পিরিয়ড শুরু, কবে ওভ্যুলেশন । তার মানে এটাও জানবে, কবে সেফ পিরিওড। পুরুষ সংসর্গ করার দিনক্ষণ নিজেরাই বিচার বিবেচনা করে ঠিক করবে তাহলে?
ওরা এগিয়ে যাচ্ছে তার মানে?
কিন্তু অবাধ যৌন সংসর্গ ব্যাপারটার পথ প্রশস্ত হওয়াটাকে এখনও মা ভাল ভাবতে পারে না কেন, নিজের শ্রেণীচরিত্র, নিজের বড় হয়ে ওঠার ডেটলে ধোওয়া-সাবানে কাচা ভিক্টোরিয় মূল্যবোধ থেকেই বোধ হয় পারেনা। এটা তো মিলবে না পরের প্রজন্মের সঙ্গে।

নিজের মেয়ে কে দেখে চমকে যায় শুধু। ভাবে, এই তো ওরা নিজের হাতে টেনে নিয়েছে রাশ । জীবনের রাশ। তাহলে আর চাওয়ার রইল টা কী? তথ্য, ওয়েল ইনফর্মড হওয়া, এই দিয়েই তো হতে পারে উত্তরণ। সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ এক প্রজন্মে হয়ে গেল তবে গুগল আর ইউটিউব দিয়ে?
স্পষ্ট করে কথা ভাবা, কাজ করা, হৃদয় শুকানো। এই তো, এভাবেই মানুষের ক্রমমুক্তি হবে।
মানুষীর হবে না? মান্যবর শ্রী জীবনানন্দ? স্যার? হবে হবে। সব হবে।
আর কিছু না হোক, ফ্লো অ্যাপ দিয়ে নিজের জরায়ুকে ভাল করে জানা বোঝা নিয়ন্ত্রণ... এভাবেই মানুষীর ক্রমমুক্তি হবে?
পুরুষের সঙ্গে ভাল হবে, স্বাভাবিক হবে সম্পর্ক? নাকি সেই যৌন পুতুল, মাটির ঢেলা হয়ে থেকে যাবে।

আর পুরুষ মানুষ হয়ে উঠতে উঠতে, একটি কিশোর কি খুঁজে পাবে তার নিজস্ব জগত? নাকি হয়ে উঠবে আর এক বদ্ধজীব? কুয়োর ব্যাং?