নৃতত্ত্বের প্রথম পাঠ

অনিন্দ্য রায়

অতীশ : বয়স ৬৪ বছর, বিপত্নীক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরে
তুহিনশুভ্র: বয়স ২৯ বছর, অতীশের একমাত্র পুত্র,অবিবাহিত
তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী
দীপা : বয়স ৬৪ বছর, অতীশের সহপাঠিনী, বিবাহিতা
মালা : বয়স ৩৬ বছর, অতীশদের গৃহ-সহায়িকা

যে কোনো উইকডেজের সকাল, ঘড়িতে ৮:২০, ড্রয়িং কাম ডাইনিং রুম, মঞ্চের ডানপাশে সেন্টার টেবিল ঘিরে সোফাসেট, আরেক পাশে খাবার টেবিল, ঘিরে চারটি চেয়ার,অফিস যাওয়ার পোষাকে খেতে বসেছে তুহিনশুভ্র। ডানহাতে স্যান্ডউইচ, বাঁহাতে চায়ের কাপ, স্যান্ডউইচে খুব তাড়াতাড়ি
কামড় দিচ্ছে। চায়ে চুমুকও দ্রুত।
অতীশ এসে টেবিলের অন্যপ্রান্তে দাঁড়ায়। তুহিন সেদিকে তাকায় না, খাবারে মনোযোগী।

অতীশ : একটা কথা ... একটা কথা ...একটা... যেন শুনলাম, বাথরুমে
গিয়ে যেই ট্যাপটা খুলেছি, জল পড়ছে, হঠাৎ, যেরকম ঘুমে
কারো কন্ঠ শোনা যায়, পুরোটা বোঝা যায় কি যায় না
মনে হল জলের শব্দে কথা বেরোচ্ছে; বেসিনের আয়না
সামনে, ওখানে তো আমি, হ্যাঁ, আমারই তো ছবি, আর
কেউ নেই, তবু মনে হল কে যেন ... চাটুজ্জে ? সমাদ্দার ?
না কি স্কুলে সেই নিশীথ পড়ত না? তোকে বলেছি, দীঘায়
সমুদ্রে নেমে ওঠেনি সে, সাঁতার জানত,নামার আগে ‘বিদায়’
বলেছিল চেঁচিয়ে, আমি শুনিনি, হবে হয়ত সমরেশ সেন

তুহিন খাবার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, দাঁড়িয়েই চায়ে শেষ চুমুক দেয়।
তুহিন কথাটা কী? তোমাকে ডাকল না কি? বুকে পেন টেন
নেই তো? চলো, বিকেলে ডক্টর অধিকারীকেই একবার
অতীশ: তোর তাড়া আছে, পরে বলব, এখন এসব কথা ছাড়

তুহিনের ফোনে একটি ম্যাসেজ আসে, শব্দ হয়, সে ফোন দেখে। তারপর কল করে। ফোন কানে নেয়।

তুহিন: ক্যানসেল? কী বলছেন? অপগন্ড! যদি কিছু একটাও
আচ্ছা, তালে একটু দেরিতে পৌছচ্ছি ...বাবা, দাঁড়াও
কী হয়েছে বলো তো, কী কথা শুনলে? মাঝেমধ্যে এরম
কি হয়? সারাদিন একা থাকো, চিন্তা হয়, তুমি তো বৃদ্ধাশ্রম
চলে যাব, বলবে এখুনি, বোসো, ব্যাপারটা কী বলো তো

দুজনে টেবিলের দুপাশে দুটি চেয়ারে বসে,মুখোমুখি
অতীশ : না, না, কিছু না তেমন, তোর দেরি হচ্ছে, যা,কাজে যা
আমাকে নিয়ে ভাবিস না তো, আরে! তোর চোখ ভেজা
ভেজা লাগছে! কী হল কী? আমি তো এখনো তোর চে
ইয়াং বেশি

ড্রয়িংরুমে সেন্টার টেবিলে রাখা একটি ফোন বেজে ওঠে, অতীশ উঠে দাঁড়ায়

অতীশ : দেখি, আবার কে এখন ফোন করছে

অতীশ গিয়ে ফোনটি তোলে, দেখে কার ফোন, কল রিসিভ করে, ফোনটি কানে নেয়
অতীশ : হ্যালো... দী... হ্যাঁ...তুমি কোথায়?... হ্যাঁ... এসো...না, বেরোয়নি
এখনো...তুমি এসো, কী বলছ?...খুঁজে পেয়েছ? কী?...আচ্ছা,বনি-
এমের সেই ক্যাসেটটা খুঁজে পেয়েছ?... নিয়ে আসছ?...কিন্তু কী সে
শুনব ?... প্লেয়ার তো নেই, মনে আছে, লাভ ফর সেল, বালিশের
নীচে নিয়ে ঘুমাতাম এককালে...আচ্ছা, আচ্ছা...এসো, তুহিনকে
আমি আটকচ্ছি

অতীশ ফোন কাটে, টেবিলে নামায়।
বেল বাজে,অতীশ মঞ্চের ডানদিকে এগিয়ে, উইংসে দরজা খোলার অ্যাকশন করে।
ঘরে ঢোকে মালা।

অতীশ : ও, মালা, রাতের বাসন সব রাখা আছে সিঙ্কে
মালা ঘর পের হয়ে অন্যদিকে চলে যায়
তুহিন : কার ফোন? দীপাপিসি? তুমি তো সত্যিই ইয়াং, গার্লফ্রেন্ড দেখা
করতে আসছে, চালিয়ে যাও, আমি ভাবি সারাদিন একা একা
থাকো আর এদিকে তুমি... ভালো, বিয়ে যদি করতে চাও আপত্তি
নেই আমার, একটা কথা জিগ্যেস করব, আগে প্রমিস করো, সত্যি
বলবে, বাবা, তোমার কি একলা লাগে? বন্ধু মনে হয় না আমাকে?
অতীশ এসে আবার খাবার টেবিলে বসে, আগের চেয়ারে।
অতীশ : বাজে বকিস না, বুকে হাত দিয়ে বল তো, কে কার খবর রাখে !
এই সকালে বেরোস, ফিরিস রাত্রি এগারোটা বারোটা পের করে
আমার খেয়াল নিজেই রাখব, জ্বালাব না, দেখে নিস অক্ষরে অক্ষরে
কী আর বলব তোকে, জানিস তো সব, সুমিতা যখন হাসপাতালে
কেমো চলছে, তোর ফাইনাল ইয়ার, দীপা ওইভাবে না সামলালে
কী অবস্থা হত, বল; ওরও তো সংসার আছে, ছেলেপুলে, নাতিও
হয়েছে, সে তো ওর কোল থেকে নামতেই চায় না, কত যে অপ্রিয়
কথা শুনেছে, তবুও
তুহিন : মা কিন্তু তোমাদের সন্দেহ করত, আমি জানি
অতীশ : হ্যাঁ, এনিয়ে ঝামেলাও কম হয়নি, একটা এপিসোড দারুণ ফানি
সুমিতা রাগ করে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিল, নাইনটি সেভেন কি
এইট, তোকে নিয়ে, মনে আছে ? তোর বড়মামাকে তো আমি ভেঙ্কি
ব’লে ডাকি, ও-ই খবর দিল, আমি গিয়ে হাতে পায়ে ধরি, ভেউভেউ
ক’রে কাঁদছিস তুই, এত ছিঁচকাদুনে ছিলি, এত কাঁদতে পারে কেউ!
শেষে দীপার সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখব না, ফিরে এল এই শর্তে
তুহিন : তুমিও তো কেঁদেছিলে আর মা-ও, মাঝেমধ্যে এমন ঝগড়া করতে
অবাক হয়ে যেতাম, তোমাদের নাকি লাভম্যারেজ
অতীশ : আবার তো ও-ই
যখন অসুখ হল, বায়োপসি রিপোর্ট আসার পর, হঠাৎ একদিন হই-
হই ক’রে দীপার ওখানে গিয়ে হাজির, হাত ধরে বাড়ি নিয়ে এলো
যেন দুইবোন এইভাবে কত হাসাহাসি, একসাথে তোর হস্টেলও
গিয়েছিল একবার
তুহিন : দীপাপিসি না থাকলে হত ওই দিনগুলো কী যে
মালার প্রবেশ, মঞ্চের বাঁদিক দিয়ে
মালা : আপনাদের জন্য কি চা করব ? ডাল ভাত চাপিয়ে দিয়েছি, ফ্রিজে
যে তরকারি ছিল গরম করে দিয়েছি, দেখলাম মাছ আছে দু পিস
কাকাবাবু, আপনি আজকাল কিছুই খান না
অতীশ : করো, তোমার সুদ্ধ
চার কাপ করো, আর ভাত আরেকটু বাড়াও আর শোন্‌, বিশুদ্ধ
পঞ্জিকা মতে আজ অফিস যাওয়া নিষেধ,থেকে যা, তোর পিসিও
আসছে, তিনজন গল্প করি, একসাথে খাই
মালা ডানদিকে বের হয়ে যায়
তুহিন : ওদিকে সিইও
ক্ষেপে গেলে
অতীশ : ছাড়, ভারি চাকরি, ওই তো ল্যাপটপে খুচুরখুচ
(একটু জোর গলায়)
মালা, চা-টা হয়ে গেলে ঘরগুলো ঝাঁট দিয়ে দাও, আজ আর মুছ-
তে হবে না
তুহিন : সে দেখা যাবে, রাঠোর ফোন করবে, তারপর বেরবো না হয়
অতীশ : তুই এবার বিয়ে কর, শ্রীতমার মাকে ফোন করে বলি, আশ্রয়
দরকার হয় রে জীবনে, আপনজন, কমরেড, কদিন আর আমি
বিয়ে কর, মনে হবে, পৃথিবীটা জেলখানা, তুই ঝাপসা আসামী
বেল বাজে আবার। অতীশ উঠে গিয়ে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে উইংসে দরজা খোলার অ্যাকশন করে।
দীপা ঢোকে। ড্রয়িং-এ একটি সিঙ্গল-সিটিং সোফায় বসে।
দীপা : তুহিন, অফিস যাওনি আজ
তুহিন চেয়ার ছেড়ে উঠে দীপার দিকে এগিয়ে আসে।
তুহিন : বাবা ছাড়ছে না, বলছে যে
আমি গেলে নাকি ভয় করে, এদিকে তো প্রায় ন’টা বেজে
গেল, ও, বাবা আজ বাথরুমে ভূতের গলা শুনেছে, সে যদি
দেখতে
তুহিন আরেকটি সিঙ্গল-সিটিং সোফায় বসে। দীপার মুখোমুখি।
দীপা অতীশের দিকে তাকিয়ে বলে
দীপা : পারিসও, তুই সেই ভিতুর ডিম রয়ে গেলি, মেজদি
সাধে তোর নাম দিয়েছিল ‘ পালোয়ান’
অতীশ বসে একটি ডাবলসিটিং-এ-এ, তুহিনের কাছাকাছি, যেন আরেকজনের বসার মতো জায়গা ফাঁকা থাকে অন্যপাশে।
তুহিন : পালোয়ান সিং
অতীশ : তুই এত রোগা ছিলি, তোকে আমরা ডাকতাম, ‘ফড়িং’
দীপা : মার খাবি, তুহিম ,জানো, সুমিতার পেছনে কীরম অতীশ
জোঁকের মতো লেগেছিল, এখন লজ্জা লাগছে, যা করেছিস
তখন মনে ছিল না? তোমার মা আমাদের থেকে বছর পাঁচেক
ছোট হবে, এক পাড়ায় থাকতাম, এবার তো জন্মদিনে কেক
তোমার বাবা ওদের বাডিতে হাজির, মানে সুমিতার জন্মদিন
ওর দাদারা সব অতীশের বন্ধু আর তোমার মামারবাড়ি প্রাচীন-
পন্থী, সুমিতা পাত্তা দিত না, শেষে রাজি হল, কম ঝামেলা তো
হয়নি দুজনকে নিয়ে, প্রতিদিন বাবা তোমার গলির মুখে দাঁড়াত
দাঁড়িয়েই থাকত, যতক্ষণ না সুমি একবার বের হয়, একবার
ওদিকে তাকায়, এখন মুখটি দেখো, আহা, যেন ভেজা মার্জার
ওদের জন্য দুবাড়ির মুখ দেখাদেখি বন্ধ, যেন সিনেমার কাহিনী
তোমাদের এখানে আসলে মনে হয়, সাত আট জন্ম ধরে চিনি
তবু
অতীশ : তবু আমাকে সে ছেড়ে চলে গেল, গেল এত এত দূরে
আমারা এখানে বসে গল্প করছি, তার কথা বলছি, বেসুরে
সবই... তোর একটা হিল্লে করি, তুহিন, আমিও তারপর
বেরিয়ে পড়ব, কিচ্ছু ভালো লাগে না রে, ধুর,শূন্য পরিসর
শূন্যতার বিরাট হাঁমুখ, আর বাঁচতে ইচ্ছে হয়না, মাঝরাতে
মনে হয় ডাকছে কেঊ, ট্যাপ থেকে যেন বা জলের সাথে
কারু কথা বেরিয়ে আসছে
তুহিন : আমি তো রয়েছি, তোমার রক্ত
তোমাদের সন্তান, এতদিন হয়ে গেল, এবার এই শক তো
কাটিয়ে উঠতে হবে
অতীশ : এতদিন, এতদিন, একসাথে পঁচিশ
বছর, একে বলে ভালবাসা, একসাথে থাকা, বুঝেছিস
তুহিন : বাবা
তুহিন উঠে দাঁড়ায়
তুহিন : বাবা
( একটু জোরে)
তুহিন তোমাকে আমি আগেও জিগ্যেস করেছি, বলোনি
তোমাদের বিয়ে যদি পঁচিশ বছর হয়, দ্যাখো, পিসিমনি
বাবা-মার বিয়ে যদি পঁচিশ বছর হয়, তবে টুয়েনটি নাইন
আমি হই কী করে ? সাত দুই অষ্টআশি, আমার জন্মদিন
তোমাদের ম্যারেজ সার্টিফিকেটে ডেট আছে নাইনটি টু-র
ম্যাথসে আমি হান্ড্রেড পেয়েছিলাম, কেন চুপ থাকব ভিতুর
মতো
অতীশ : ছাড় না এসব, তোর ম্যাথেমেটিক্স
তুহিন কেন ? রহস্যটা
কী?
তুহিনের ফোন আসে, ও না দেখেই কেটে দেয়
তুহিন : হোয়াটস দ্য মিস্ট্রি ? ভেবও না আমি তত মাথামোটা
আবার তুহিনের ফোন আসে, আবার ও না দেখেই কেটে দেয়।
অতীশ শোন, তেমন কিছুই না
তুহিন : বানিয়ে বোলো না, মা মারা যাবার
পর ব্যাঙ্কের কাজ সারতে গিয়ে, নিশ্চয়ই মনে আছে বাবার
অ্যকাউন্ট ক্লোজ না কী করতে গিয়ে ব্যাপারটা আমার চোখে
আসে, তোমাদের বিয়ে
অতীশ : আমি তো আগেই বলেছি তোকে
আবার তুহিনের ফোন আসে, আবার ও না দেখেই কেটে দেয়। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।
তুহিন : বলেছ মিথ্যেকথা, তোমরা নাকি বিয়ের অনেক পরে
রেজেস্ট্রি করেছ, মিথ্যে একদম, খুঁজে দেখেছি ঘরে
আমার বার্থ সার্টিফিকেট নেই কোনোখানে, ডেট অফ
বার্থ প্রুফ আমি মাধ্যমিকের অ্যাডমিট জমা দিই, ঢপ
আমাকে দিও না, বলো, হোয়াটস দ্য ট্রুথ ? বাবা মা
কে আমার ?
অতীশ : চেঁচাস না, গলা নামা
তুই কি বিলিভ করিস না আমাকে
তুহিন : (স্বগতোক্তি)
বিশ্বাসের ভেতরে অনেক ফাঁক থাকে
আবার তুহিনের ফোন আসে, এবার সে রিসিভ করে।
তুহিন ( ফোনে, চেঁচিয়ে)
কেন বারবার বিরক্ত করছেন... আমি অফিস
যাব না...যা পারেন করুন, পারলে ডিসমিস
কী?... বললাম তো যাব না... আমি চাকরি
ছেড়ে দিয়েছি... হ্যাঁ, বললাম তো, হ্যাঁ... স্যরি
আমি আপনার সোনার চাকরিতে রিজাইন
করলাম, যা করার ক্ষমতা আছে, করে নিন
অতীশ উঠে দাঁড়ায়
অতীশ : চুপ কর, বোস চুপ করে
তুহিন : কেন ? কেন? সত্যি কি
জানবার অধিকার আমারও তো আছে, ধিকিধিকি
এই প্রশ্ন মনে নিয়ে বেঁচে আছি
অতীশ আবার তার আগের জায়গায় বসে পড়ে। সেণ্টার টেবিলে দুটি হাত। দীপা উঠে অতীশের পাশে বসে। একটি হাতে হাত রাখে।
দীপা : বল, সব খুলে বল ওকে
অতীশ মাথা নাড়ে।
অতীশ : যেভাবে পাখিরা ডিম আগলে রাখে, ডানায় পালকে
আগলে রেখেছি তোকে, মাথায় সমস্ত ঝড় বাদল
সমস্ত বজ্রাঘাত আটকেছি, কোনো একফোঁটা জল
ভেজাতে পারেনি তোকে, কোনোদিনও গায়ে তোর
লাগতে দিইনি কিছু, দুর্যোগের দাগ, সামান্য আঁচড়
আজ তুই এভাবে বলছিস
দীপা : আজ তুই সবকথা,অতীশ
তুহিনকে বল, ওরই জীবন
জানতে তো হবেই, সমর্পন
সত্যের কাছে কখনো না
কখনো করতেই হয়, শোনা
দরকার ওর, নাহলে তো
অন্যের মুখে যদি পেতো
শুনতে, কী হত যে
ও কিছু কিছু বোঝে
মালা ট্রেতে তিনটি চায়ের কাপ নিয়ে ঢোকে, সেন্টার টেবিলে একটি একটি ক’রে কাপগুলি নামায়। দাঁড়িয়ে থাকে।
দীপা : ( মালার দিকে তাকিয়ে )
তোমার কি কাজ শেষ ?
অতীশ : এসো তাহলে বিকেলে
মালা কিছু না বলে হাত শাড়িতে মুছতে মুছতে বেরিয়ে যায়।
তুহিন : বাবা, এবারে বলবে ? আমি কার ছেলে?
অতীশ : দীপা, তুই বল, আমি পারব না
এইসব কথা মনে পড়লে ফণা
তুলে যেন ছোবল মারতে আসে
মনে হয় আগুন জ্বলছে চারপাশে
তুহিন সোফায় বসে, দুহাতে ঢাকা মুখ
দীপা : তুহিন, মুখ তোল, তাকা, এদিকে তাকা, সব বলছি আস্তে আস্তে
আমরা এক পাড়ায় থাকতাম, আমি, তোর বাবা মা, পথে আসতে
যেতে দেখা হত, আমরা এক ব্যাচ, সুমিতা ছোট, রিলেশন ওর
অতীশের সাথে, সে তো সবাই জানত, কেবল বাড়িতে, কঠোর
সময় ছিল সেসব, বাড়িতে মানল না, বিয়ে হয়ে গেল সুমিতার
অতীশও বিবাগী, মুখে দাঁড়ি, শুনি নেশাটেশা করে, একটা গিটার
নিয়ে সারাদিন ঘরে বসে টুংটাং করে, কী বলি আর ? পুরো দেবদাস
শেষমেশ চাকরি পেল, দেখি, বাবু স্যুটবুট, বদলে গেছেন, ঝক্কাস
একটা গাড়ি কিনল, সে কি কেতা, আমারও বিয়ে হল, বছর দুই
পর একবার বাড়ি ফিরে শুনি কী? সুমি নাকি ফিরে এসেছে, তুই
কোলে, তোর বাবা, মানে ওর বর, কী এক মিস্টার ঘোষ, মদ
খায় প্রতিদিন, মারধোর করে, তার ওপর বাড়ল আরেক বিপদ
তিনি নাকি আরেকটি বিয়ে করবেন, অশান্তি বিস্তর হল, অবশেষে
আদালত, ডিভোর্স, সুমি ভেঙে তো পড়েইনি, মেনে নিল হেসে
পরীক্ষা দিয়ে একটা স্কুলে পড়াতে ঢুকল, এদিকে তো দেবদাসের
বিয়ে হয়নি তখনো, তাই একদিন তোমাকে কোলে নিয়ে সাতফের
স্যরি, রেজেস্ট্রি হল, তারপর, জানিস তো তুই, অতীশই বাবা তোর
তুহিন : বাবা! খবরদার, আমাকে তুমি ছেলে বলবে না, সবাই জোচ্চোর
তোমরা, প্রকৃত পিতৃপরিচয় লুকিয়েছ আমার কাছে, একটা শিশুর
কাছে, তোমাদের লজ্জা করে না? আমি তোমাদের ঘৃণা করি, ঘৃণা
সারনেম এবার থেকে আমি, ঘোষ নাকি, দুচ্ছাই, ভাবতে পারি না
যা খুশি লিখব, এনি প্রবলেম? বাড়ি ছেড়ে চলে যাব, নো, এনি মোর
থাকতে পারব না, মানে থাকার তো অধিকার নেই, ব্যবস্থাপত্তর
ঠিক করে, ইউ, এভরি ওয়ান, গেট লস্ট... এত ভয়ানক মিথ্যে
নিয়ে বাঁচতে পারব না... চাই না তোমরা কেউ থেকো আমার বৃত্তে
অতীশ : যা ইচ্ছে করো, আমি কী বলব! নিজেকে তো মনে হচ্ছে পাপী, অপরাধী
কোনোদিন কারো কোনো অনিষ্ট করিনি; আজ কাকে বলি? কার কাছে কাঁদি
আমারই কোথাও কোনো ফাঁক ছিল, ফাঁকি ছিল প্রেমে বা যাপনে, এ ব্যর্থতা
আমার একার, ব্যর্থ, আর কোনো বিশেষণ, কোনো সম্পর্কের সমঝোতা
বাকি নেই আর; যদি ক্ষমা, যদি ক্ষমা চাইতে দাও, হে আমার পরম সন্তান
তোমার দুপায়ে পড়ি, লাথি মারো, একবার বলতে দাও শুধু, অপমান
আমার একার থাক, কোনোদিন কোনোদিন কোনোদিনও আমি ভাবিনি তো
নিজের রক্তের চেয়ে অন্যকিছু, কোনোদিন একটি চুম্বনও অভিনীত
হয়নি তোমার সঙ্গে, তোমার জ্বরের রাত্রে ওষুধের ভেতরে আপন
শ্বাস মিশিয়ে দিতাম, জলপটি শুকনো হলে অশ্রুতে ভিজিয়ে সারাক্ষণ
তাকিয়ে থেকেছি সেই উজ্জ্বল, অপাপবিদ্ধ মুখটির দিকে, সেই চোখে
মেঘ হলে আমি নিজে বৃষ্টি হয়ে অন্যত্র ঝরেছি, কখনো বকিনি তোকে
কখনো তোর মা তোর মা না হয়ে আমার স্ত্রী হয়ে উঠতে পেরেছিল কিনা
নিজেও জানত না, তবু, তবু আজ কেবল আমার জন্য থাক সবটুকু ঘৃণা
দীপা : কী হচ্ছে কী ? সম্পর্ক জলের দাগ বুঝি ? হাওয়া দিলে, হাওয়া দিলে জোরে
মুছে যায়! কেবল রক্তই সব ? কোনো সত্যি নেই বাবা আর ছেলের ভেতরে?
অতীশ : না, নেই, কেবল দূরত্ব আছে, অলঙ্ঘ্যনীয়
যদি পারো...যদি পারো... ক্ষমা করে দিও
দীপা : ছিঃ... এমন করে না
অতীশ : এতো জীবনের দেনা
শোধ করব কীভাবে
আমার এ কৃপণ স্বভাবে
তুহিন সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, পায়চারি করে, তারপর মঞ্চের মাঝামাঝি স্থির হয়।
আলো নিভে যায়। শুধু একটি স্পট লাইট, তুহিনের ওপরে।

তুহিন : নিজের ওপরে আজ ঘেন্না হচ্ছে, ওফ্‌, পারছি না, কী
যে করলাম, আমি এত স্বার্থপর! হে জীবন, এ কোন্‌ মজাকি!
এ তো ক্রাইম আমার, আমাকে যে পর জেনে, অপর
জেনেও, যে কপালে রেখেছে হাত, পিঠে নিরন্তর
সাহসের স্পর্শ দিয়েছে, আজ তাকে... ক্ষমার তো
আমি যোগ্যই নই, যদিও বা মা কোনোদিন আমাকে মারত
একবারের জন্যেও যে স্নেহ আমাকে ছেড়ে যায় নি, যে চোখ
সর্বদা বলেছে, আমি আছি, আজ তাকে বলছি অন্য লোক!
আমি জানি পৃথিবীর দ্য বেস্ট ফাদার, দ্য বেস্ট...আমার বাবার
নাম অতীশ গুপ্ত, মাই হিরো, ফ্রেন্ড, ফিলোসফার
মঞ্চে আলো ফেরে। তুহিন ডাবল সোফার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়, তারপর মাথা নামিয়ে অতীশ ও দীপার মুখের মাঝে মুখ রাখে, দু হাতে দুজনের গলা জড়িয়ে ধরে।
তুহিন : নক্ষত্রের চোখ, যদি দেখা পাও, যদি শীর্ণা একজন, মাথার সমস্ত চুল
উঠে গেছে, নাক একটু উঁচু, বাঁ ভুরুতে কাটা দাগ,যদি একটি বকুল
গাছে দেখো ফুটে আছে এরকম কেউ
অতীশ : বোলো তাকে, আমাদের পৃথিবীতে
একটি বিষাদঘর আছে,তাদের বাগানে যদি সে আসে বেড়াতে আচম্বিতে
কোনোদিন যদি পড়ে জানালার গ্রিলে কোনো কাঠবেড়ালির চোখে চোখ
তার কথা মনে পড়ে কারো
তুহিন : মনে হয়, সারা ঘর ভরে আছে তারই স্মারক
ভাতের প্রতিটি গ্রাস, রুটির সমস্ত টুকরো তার হাতের স্বাদের মায়াময়
সকালে সে প্রতিদিন ঠেলেঠুলে ঘুম থেকে ওঠায়
অতীশ : যে কোনো অভ্যুদয়
পতনে সে হাত ধরে
তুহিন : নক্ষত্র, তোমার দেশে আটকে রেখো না আর তাকে
তার ছায়া না পেয়ে যে আমাদের দিনগুলি হেঁটে যায় শোকের পোষাকে
অতীশঃ তার দুই প্রান্ত ধরে খণ্ড মানুষ দুই, জোড়া লেগে আছে, আছে লীন
তুহিন উঠে দাঁড়ায়
তুহিন : বাবা, চলো, কোথাও বেড়িয়ে আসি সাত-আট দিন

পর্দা নামে।