হরিসংকট

হামিম কামাল

পলাশীর চৌরাস্তা থেকে নীলক্ষেত। পিচকালো চওড়া রাস্তা চলে গেছে সোজা উত্তর দক্ষিণ। দুপাশে সার বেঁধে দাঁড়ানো মেহগনি আর কড়ই গাছ। গাছের নিচে ফুটপাতে অনিয়মিত বিরতিতে যে বেশ কটি রিকশা সারাইয়ের দোকান সেগুলোও বেশ পরিপাটি। সেখানে ছোট বড় রুপালি যন্ত্রাংশ হাতে সারাইকাররা হাত চালায়। ফুটপাথে এক বৃদ্ধার খাবারের দোকান আছে সারাইকারদের প্রিয়। দোকান বলতে সিমেন্টের কাটা থলে বিছানো ফুটপাথের একাংশ, সেখানে এক সার ভাত সবজির হাড়ি। দুপুর হলে সারাইকাররা ওখানে খেয়ে নেয়। হাসিঠাট্টা গালগল্পে সরব হয় ফুটপাথ।
বন্ধু সিপাহীকে বকশীবাজার পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে পলাশী থেকে নীলক্ষেতের ওই রাস্তা ধরে ফিরছিল হরি। এমন সময় ফুটপাথের ওই বৃদ্ধার ওপর তার চোখ আটকে গেল। ঝুলে পড়া ত্বক, ভেঙে পড়া শরীর। কিন্তু কোথাও কোনো রকম আড়ষ্টতা নেই। চিরল লালচে দাঁতের ফাঁকে পানপাতার চিহ্ন। দাঁতের খাঁজে কালচে দাঁতকড়া তো আছেই। বয়স ষাটের ওপর। পরেছে রুপালি পাড় দেওয়া গাঢ় নীল এক শাড়ি। পুরোনো ও পরিচ্ছন্ন। আঁচলের একাংশ গড়াচ্ছে ফুটপাথে বিছানো নকশি ইটের ওপর। সেদিকে চোখ নেই। চোখ দুটো বরং দূরে কাদের যেন দেখছে। হাঁটার ঢঙে চিনতে পেরেই বুঝি মাথা দোলাল? মুখ নামিয়ে একটা করে ঢাকনা তুলে আরো একবার দেখে নিলো খাবারের হাঁড়িগুলোর ভেতরটা। তার একপাশে তেলে জ্বলা তেপায়া চুলা, নেভানো। তার পাশে তিন বন্ধুর মতো বসে ওই তিনটি হাঁড়ি। মাপমতো ঢাকনায় ঢাকা।
সিমেন্টের ব্যাগ সেলাই কেটে পাশাপাশি বিছিয়ে বৃদ্ধার সামনে রাখা পাটির মতন। কোণগুলো চাপা দেওয়া হয়েছে ভাঙা ইটে, যেন হাওয়ায় আবার না উড়ে যায়। হাতের কাছে পর পর কিছু রুপালি হাঁড়ি। পিচকালো তলা, এখানে ওখানে টেপ গলা। কাছাগুলো আঁকাবাঁকা, নদীর ঢেউয়ের মতো।
তিন মূর্তি দেখতে দেখতে কাছে চলে এলো। কারো সঙ্গে কারো কোনো কথা নেই, কিন্তু হাসছে ওরা। যেন খুব মজার একটা কিছু ঘটতে চলেছে। বিছানো পাটির ওপর তিনজনই আসন পেতে বসলো।
তাদের মুখ দেখল হরি। একজন বৃদ্ধ, বাকিরা তরুণ। সবার পোশাকে মালিন্য। শরীরে অপুষ্টি। তিনজনের মধ্যে বয়স্ক লোকটি আসন পেতে বসেই তার কালিমাখানো শার্টের বুকপকেট থেকে একটা আধময়লা হাতে বোনা টুপি বের করে মাথায় দিলো। টান টান হয়ে ঠিক চাঁদির আকার নিয়ে সেঁটে রইল টুপি। বৃদ্ধার হাসি মরে কেবল তখনই, যখন সে আনমনা থাকে। তরুণদের চোখ হাঁড়ির দিকে। দেখে আর হাওয়া শুঁকে ওদের হাসি উঁচু গ্রামে উঠল। হাতে ঘষল হাত, ছেলেমানুষী উচ্ছ্বাস চোখেমুখে।
ওদের মাথার অনেক ওপরে শীলকড়ইয়ের ছায়া, পাতার ফাঁকে বিন্দু বিন্দু আলো। গাছটার গুঁড়ি ফুটপাথের প্রায় কিনারে পড়ে গেছে, প্রায় রাস্তা ঘেঁষে। হরির সুবিধা হলো। ব্যাপার দেখে কৌতুহল হওয়ায় গুঁড়ির একপাশে আড়াল নিয়ে ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে খুলে ধরে থাকল, আর কান পাতল। থেকে থেকে, খুব বুঝি কিছু ভাবছে, বা খুঁজছে কাউকে এমন ভান করে এদিক ওদিক তাকিয়ে এরপর ঝুঁকে মুখ ঘুরিয়ে দেখতে থাকল ওদের।
বৃদ্ধা সবার সামনে একটা করে পুরনো মেলামাইনের প্লেট রেখে খাবার বেড়ে দিতে লাগল। প্লেটে এলিয়ে পড়ল আতপ চালের নরম সাদা ভাত। লোভনীয় সুবাস ছড়াল হাওয়ায়। এরপর স্তূপ করা ভাতের ওপর পড়ল মুরগির গিলা কলিজা, টকটকে ঝোল। তার ওপর তেলভাসা ডাল। প্রৌঢ় শীলকড়ই বাতাসে একটা দুটো পাতা ঝরালো। কথোপকথন শুনতে থাকল হরি।
তরুণদের একজন বৃদ্ধ লোকটিকে বলল, চাচাজি, এতো ভালো খানা আজকে। সাথে আপনার একটা গল্প না হলে তো আর জমে না।
কথায় চাঁদপুর অঞ্চলের বাচিক সুর ছেলেটার। আমুদে কণ্ঠে আরো বলে গেল, ও চাচী, আপনি ভাত রান্নার সময়ই যে সাথে নুন দেন, আমার খুব ভালো লাগে। আর আজকে আতপ চালে নুন, কী ঘ্রাণ! এমনিও খাওয়া থামাতে পারি না। আজ কী হবে কে জানে। ও চাচী, কতবার নিতে দেবেন?
নিয়ো বাপ, যতো পারো নিও। ভাত আছে আরো অনেক। বৃদ্ধার ভাঙা স্বরে ফেনী ধরা পড়ে।
হুম কথা সত্য! বলল বৃদ্ধ। আজ আমিরি খাবার। গল্প না হলে চলে না। কিন্তু বল তোরা, গল্প আমি বলি না কোনদিন। আমিরি খাই কি ফকিরি, আমার গল্প না শুনলে একদিনও কি তোদের পেটের ভাত হজম হয়?
তরুণদের দ্বিতীয়জন বলল, না, হয় না। আর আমাদেরকে না বলতে পারলে তোমারও যে ভাত হজম হয় না সেও আমরা জানি। ঠিক কিনা। কথাটা বলে প্রথম তরুণের দিকে তাকিয়ে সে চোখ টিপল। কিন্তু মন মতো সাড়া পেল না।
বৃদ্ধ ততক্ষণে খেতে শুরু করেছে। সদ্য পড়া মাংসের ঝোলে প্লেট লাল। মুখে পুরে একটু আধটু চিবোনোই সার। এরপর গিলে ফেলছে। এরইমধ্যে প্রত্যেকের প্লেটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে সবুজাভ কাচের গ্লাস ভরা জল। কাচের ভেতর বায়ুর বুদবুদ। গ্লাস থেকে অর্ধেকটা জল পেটে চালান করে দিয়ে বুড়ো বলল, ভাত হজম হওয়া তো আরো পরের কথা ভাতিজা। পেটে ভাতই পড়তই না আমার! বুড়িকে জিজ্ঞেস করে দেখ ঠিক বলেছি কিনা?
প্রথম তরুণ জবাব দেয়, জানি জানি, খুব জানি।
বৃদ্ধার কপট রাগের দিকে তাকিয়ে খো খো করে হাসে বৃদ্ধ। তরুণদের দিকে ফিরে বলে, তা বাছারা মাঠা খেতে তোদের কেমন লাগে?
ভালোই তো, দ্বিতীয় তরুণের উত্তর।
ভালো আমারও লাগে, বৃদ্ধ বলল। তাই তো কোথাও বিক্রি হলে আমি হাজির। আমাকে মনে কর খেতেই হবে, ছাড়াছাড়ি নাই। এই মাঠা খেতে গিয়েই এক অদ্ভুত লোকের পাল্লায় পড়েছিরলাম। অদ্ভুত এক মারেফাতি কথা আমাকে শোনালো। কিছুই উত্তর করতে পারলাম না।
বৃদ্ধের মুখ এ পর্যন্ত বেশ হাসি হাসি ছিল। হঠাৎ কী যেন হলো, হয়ে পড়ল বেড়ালের মতো গম্ভীর। ফেনীর উত্তর জোয়ারের টানে তারও মুখের বাক্য এঁকেবেঁকে যাচ্ছে। কথা বুঝতে চাঁদপুরের তরুণদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না বলেই মনে হলো। ওরা কষে ভাত মেখে এরপর মুখে তুলছিল। কিন্তু বুড়ো অমন হঠাৎ থেমে যাওয়ায় ভাত আর তুলল না। মেখেই চলল কেবল। আঙুলের কালচে নখের নিচে নরম আতপ চালের ভাত তাতে জাউ হয়ে গেল।
এই কয়দিন আগের কথা; বুড়ো শুরু করলো আবার।
সেদিন বকশীবাজার যেতে বের হয়েছি। আমার শালাটার সঙ্গে দেখা করা দরকার ছিল। ওর আবার ভাঙারির দোকান। সেদিন মিরপুর থেকে চালান এসেছিল। আমারও খোঁজ পড়েছিল।
জলের সঙ্গে ভূমিকাটাও এক ঢোকে পেটে চালান করে দিয়ে অবশেষে এলো আসল কথায়।
তো পলাশীর মোড়ের কাছে এসে দেখি, এক বুড়ো কাঁধ থেকে মাঠার পাল্লা নামিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে। হয়ত জিরোবে। তা জিরোক। মাঠা দেখে আমি কিন্তু গিয়ে হাজির; মাথা নেড়ে শুকনো হাতটা অভয়মুদ্রার মতো ধরে বলল বুড়ো। খালি মুখে ওপরের পাটির পেষণ দাঁতে দু’বার চালিয়ে নিলো জিভ। আবার জলের গ্লাসের দিকে হাত বাড়াতেই তামাটে হাতের ওপর বৃদ্ধার শীর্ণ হাতের চাপড়। জল খেতে দেবে না ঘনঘন। ব্যর্থ হাতটা হাসিমুখে ফিরিয়ে নিয়ে বৃদ্ধ ধরল আগের কথার খেই।
তা, আমি কাছে যেতেই মাঠা বুড়ো আমাকে কীসব যেন বলতে থাকল। প্রথমে ভাবলাম গালাগাল করে কিনা আবার। আরো ভাবলাম, ব্যাটা পাগল নাকি। হলে ভেগে যাই। পাগলের তো কিছুর ঠিক নেই। প্রথমে তো মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না। বললাম, কী বলেন বাবা, বুঝিনা কিছু! তখন সে আবার বলল সব। মাঠাবুড়োর কণ্ঠে কোনো তাপ নাই, কিন্তু শুনে আমার বুক শুকিয়ে গেল; গলার স্বর বদলে গেল বৃদ্ধের। সব যে বুঝলাম তাও তো নয়। কিছু বুঝলাম, কিছু মাথার ওপর দিয়ে গেল। কিন্তু যেটুকু গেল, ভড়কাতে ওর বেশি লাগে না।
কী বললো? জিজ্ঞেস করল প্রথম তরুণ। কৌতুহলী তার মুখচোখ। বৃদ্ধ তার ওপর চোখ ফেলল বটে, উত্তর দিলো না। কথাকে নিজের গতিতে এগোতে দিলো বরং।
তা, মাঠাবুড়োর চোখের দিকে তাকানো হলো তো সারলো। চোখ ফিরিয়ে আনা যায় না। এরকম মানুষ আমি আর কোনোদিন দেখ নি। এক গ্লাস মাঠা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে ঝুঁকে কাছে এসে বলল, ও মনু, আমি যদি ভগবানে বিশ্বাস করি, তাইলে ভগবানই আমায় পাপ দেবে, তা জানো?
শুনে আমার মাথা নষ্ট। বলে কী। কথা শেষ হয় নাই। বলে, আল্লা নিজেই তারে বিশ্বাস করার জন্য গোনা দেয়, খবর রাখো?
বৃদ্ধ এরপর বৃদ্ধা আর দুই তরুণের দিকে তাকিয়ে মাথা দুলিয়ে বলল, কী বুঝলে? মারফতি কথা!
তরুণ দুজন বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের চোখ হংসডিম্ব। কিন্তু চোয়াল সচল, কী চিবোনোয় কী কথায়। প্রায় একসঙ্গে বলে উঠল ওরা, মানে কী! এরপর প্রথম তরুণ সরব। ও চাচাজি, এর মানে কি বোঝাও। এইসব মারেফাতি, বাতেনি বুঝি না গো। শুনে তো ভয় লাগল। মনে হলো কল্লাটা থাকবে না ঘাড়ের ওপরে।
মানে বোঝে না; তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে বৃদ্ধ। আরে মানে তো মানের ভেতর!
হ্যাঁ? বল কী! আমুদে কণ্ঠ তরুণের। প্যাঁচ তো খুলল না চাচাজি, আরো এসে লাগলো। খোলো, প্যাঁচ খোলো। প্যাঁচ দিয়েছ, খোলো এবার। আমার তো মাথায় ঘোরায়। কী শুনলাম। ও ফজলা, কী শুনলাম। কনুই দিয়ে দ্বিতীয় জনের হাত নড়িয়ে বলল প্রথম তরুণ।
সজ্লা, খালি বেশি কথা! মন দিয়ে শোন, মানে পাবি। আরো শোন, বলল বৃদ্ধ হাত নেড়ে। তো আমি এবার নিশ্চিত, বাবা পাগল। তবে বাঁচার কথা, ভাবের পাগল। মাথার পাগল না। আবার হতে পারে, গরমে মগজ নড়ে গেছে। হয় না এমন? তো এরপর বলে, কী বাবা? কথা কেমন? আরো শোনো, আরো শোনো। আল্লা বলেছেন সত্যের পথে থাকো। বলো তো বাবা, সত্য কি জিনিস? এই বলে থেমে কী ভাষায় যেন কী বলল, বুঝলাম না।
আরবি ফার্সি নাকি? প্রশ্ন বৃদ্ধার।
না না আরবি ফার্সি না। হলে তো কথা না বুঝি, ভাষা তো বুঝলাম। তবে, পরের কথাগুলো বুঝলাম। বলে, যা ঘটে তাই কি সত্য? মানুষের চোখের সামনেও ঘটনা ঘটে, পেছনেও ঘটে। কী, ঘটে না? মানুষ যা নিজ চোখে দেখে, আবার না দেখলেও আভাসে বোঝে, ওটাকে ওরা বলে সত্য। কিন্তু আসলেই কি তা? মানুষ যা দেখে তার নাম বাস্তব। যে জায়গায় বস্তুর যা খেল, তা হলো বাস্তব। বাস্তব আর সত্য এক না। সত্য দেখা সোজা না। বোঝা তো আরো জটিল!
বলে বাবা থামল। শুনে তো আমি চুপ করে আছি। মাঠায় চুমুক দেয় কে! ভাবে ডুবুডুবু। বাবা হঠাৎ চোখ গরম করে। বলে, আল্লা নামটা আমার কাছে পরের মুখের ঝাল! হরি নাম আমার কাছে পরের মুখের ঝাল। পরের মুখ থেকে শোনা, নিজে দেখি নাই। আভাসে যা বুঝি তা তো অন্য কথা বলে। কী মনু। তুমি কী কও? অন্যের কথায় ঈমান দেখাই, জোরে বলি জি আচ্ছা। মনে ভাবি, তাই তো তাই তো! সেটা কি বাবা মনের সত্য? ও মনু। কথা কও? ধ্যান করতে চোখ বুঝেছি। মনের মধ্যে কী পেয়েছি? কাকে পেয়েছি? দেখি মানুষ যা বলে তাই পেয়েছি, ওমা কী কা-। মানুষ যাকে বলে তাকেই পেলাম। বাইরে যেতে পারলাম না। এবে পরের মুখের ঝাল খেয়েছি। মনের সত্যে চোখ ঠেরেছি, আল্লা বলে দাঁড়া। সত্য পথে থাকতে বললাম, থাকলি কই? কথার খেলাপ হলো? হাসল বাবা। মুহূর্তে আবার চোখ গরম। প্রকৃতি দেখো! মানুষ দেখো, পশু দেখো! সবাই অন্য কথা বলে। আবার দেখো আমিও মানুষ, এসব কথা তোমাকে শোনাই। তুমিও মানুষ। শোনাবে অন্যকে। হলো কিনা। এবার দেখো মনের ভাব বদলায় কিনা। কথায় কথায় ভাব বদলায়। সত্য তো ভাই বদলায় না! কথা হলো বাস্তবতা। সত্যরে তো পেলাম না! ও মনু। তাই তো বলি ও কথা, আল্লায় বিশ্বাসে আল্লার গোনাহ। হরি বলে নরক দেবো আমার কথা বিশ্বাসিলে।
বাবা এবার শান্ত। দেখি চারদিকে তার ভক্ত জুটেছে। কী বুঝলে?
তরুণ দুজন কোনো কথা না বলে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে অপলক তাকিয়ে চোয়াল নাড়াতে থাকল। ওদিকে বুড়ির গালে হাত। বুড়ো থামার পরও টনক নড়ে নি। গল্প শুরুর আভাস কিছুটা পেয়েছিল, সমাপ্তির হওয়ার কোনো আভাস তো পেল না। অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে উঠল, শেষে?
শেষে! বৃদ্ধ আকাশ থেকে পড়ে। শেষে আর কী! শেষই তো। ও, ও, আরো খানিকটা আছে। বৃদ্ধ এবার হাত বাড়াল জলের দিকে। বৃদ্ধা আর মানা করল না।
বুঝলে, লোকটা বকশীবাজারের দিকে দিলো হাঁটা। সাদা লুঙ্গি, সাদা পাঞ্জাবি, কাঁধ ছোয়া সাদা চুলের ঢেউ। দাড়ি গোঁফে সন্ন্যাস প্রমাণ। আমিও পিছু নিলাম। মাঠার টাকা দিই নি। ফিরে বলল, মুসলমান দেখো। বলে এই কেতাবে আমার প্রাণ! দেখি এই কেতাবই তারে মারলো। হিন্দু তো নিজ কেতাবই চিনলো না। আর আমি? নিজে যাকে দেখলাম, তার সঙ্গে কারোর কথা মিললো না! সে কথা বলি কারে? এই বলে একবার মোড় নিলো, আমিও নিলাম। হাঁটছি তার পিছু পিছু। এরপর আরেকবার মোড় নিলো, আমিও নিলাম। এবার আর দেখলাম না! আর তো মনে করো মাথা খারাপ! ভাবলাম, উধাও হয়ে গেলো নাকি! পরে দেখি, না। রাস্তা থেকে সরে গিয়েছিল তাই দেখি নাই। একটা মাদ্রাসা আছে না ওদিকে? তামিরুল মিল্লাত না কী? ওই মাদ্রাসার সামনে সাদা উঠান, মাঠার পাল্লা নিয়ে সেখানে বান্দা হাজির। ছোট ছোট তালেবুল এলেমরা তাকে তখন ঘিরেছে। বলে, মাঠা খাবো মাঠা খাবো! বাবাও খুব হাসে। কাছে যাই। বাবা বলে, এই মাঠা তোমার রেজেক। এই বলে পশুর পরে অত্যাচার, পশুর রেজেকে বাধা। লাগাও ধুন্ধুমার কিছু বোঝো বাবারা?
আমাকে দেন।
আমাকে, আমাকে!
আর গেলাস নাই, বাবা বলে। তার কথায় কি আর ছেলেদের কান আছে? মাঠার দিকে চোখ। হুড়োহুড়িতে টুপি পড়ে যায়, মাড়ায়, আবার তাই নিয়ে ধাক্কাধাক্কি।
থালাটা ঝকঝকে হয়ে উঠেছে বৃদ্ধের। বৃদ্ধা আরেক চামচ ভাত দিতে চাইলে ইশারায় নিষেধ করল। মুখে ফের অসমাপ্ত গল্পের খেই। বলল, এরপর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। মনে হলো কিছু বলি। পরে ভাবলাম থাক, কী দরকার।
খালি প্লেটটা প্রবীণার এগিয়ে দিয়ে বৃদ্ধ এবার বলল, একটু হাতা ভরে ভরে ডাল দাও দেখি।
বৃদ্ধা একটা বড় নারকেলমালার হাতা নিয়ে একটা হাড়ি গুলিয়ে ডাল তুলে আনলো। পোড়া মরিচের টুকরো ভাসা ডাল হাতা কাত করে ঢেলে দিলো মেলামাইনের পাত্রে। লোকটা আগ্রহ ভরে দুই ঠোঁটের কাছে তুলে ধরল প্লেট। চুবচুব করে খেতে থাকল। একটা দুটো করে ফোঁটা পড়তে থাকল ফুটপাতে।
তরুণদের প্রথমজন প্লেট বাড়িয়ে বলল, চাচি, ঝোল দাও। বৃদ্ধা একই হাতা নিয়ে একটা হাঁড়ি কাত করে মুরগির গিলা কলিজার তেলের বৃত্ত ভাসা ঝোল তুলে আনলো। ঝোলের ভেতর ডুবে থেকে মুঠো তুলে রেখেছে মুরগির হলুদ পা, নখবিহীন। ছেলেটা প্রথমেই পা-টা হাতে নিয়ে চুষতে শুরু করল। থেকে থেকে খেল ঝোল।
দ্বিতীয়জন কখন হাত ধুয়ে উঠে লুঙ্গিতে মুছতে শুরু করেছে। বৃদ্ধা যে গামছা এগিয়ে দিলো তা দেখতেই পেল না। হাত মোছা হতেই লুঙ্গির গিঁট থেকে টাকার চারকোণা ভাঁজ খুলে গুনতে শুরু করল।
বহুক্ষণ হলো হরির চোখ বইয়ের পাতায় নেই। রাস্তা ধরে টিংটিং চলে যাচ্ছে রিকশা, হুশহাশ গাড়ি, আর টকাটক কেজো সব মানুষ।
বৃদ্ধা ডান হাতে ভাতের রুপালি চামচটা ধরে বাম হাতে বিবর্ণ মেলামাইনের এঁটো প্লেটগুলো একটার ওপর আরেকটা তুলে পেছনে সরিয়ে রাখল। বেঁচে যাওয়া একটা কাটা লেবুর টুকরো নিয়ে পড়ল এরপর। প্রথমে নিংড়ে খানিকটা রস বের করে বিবর্ণ জিভটায় ফেলে পরখ করল স্বাদ। এরপর বাকি রসটুকুও নিলো নিংড়ে। খানিকটা লবণ মাখিয়ে নিংড়ানো লেবুর সাদা রোঁয়া নিচের পাটির দাঁতে চাঁছল কিছুক্ষণ। এরপর টপ করে মুখে ফেলে কিছুক্ষণ চিবিয়ে গিলে ফেলল।
অভ্যর্থনা আর বিদায় দুই পর্বেই বুড়ির কালো দাঁতকড়ার নিরহমিয়া মধুর হাসি। প্রত্যুত্তরে হাসল ওরাও। মনে হলো, ওদের কর্মী মন আবার চঞ্চল হয়ে উঠেছে। লেনাদেনা শেষে বিদায় নিয়ে যেদিক থেকে এসেছিল বাতাসকাটা আড়পায়ে ছন্দ তুলে সেদিকের পথ ধরল।
হরিও বই বন্ধ করে উঠল। যেন কোমরটা খুব ধরেছে।

-