ছুঁয়েছিলে বলেই...

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

ছাতের পাখি ছিল ছাতে

বেশ কতগুলো ছাত ছিল। কোনওটা একতলা, কোনটা দোতলা, মাঝে মাঝে এক একটা তিনতলাও হয়ে যেত। গজিয়ে ওঠা অশ্বত্থ গাছ, শ্যাওলা, তুলসীর টব, কিংবা আরও কিছু সূর্যমুখী, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকার রঙ নিয়ে তাদের এক এক রকম মাপ – ছোট, বড়, মাঝারি। তারা নিজেদের মাপত না, মাপ নিয়ে ভাবতও না হয়ত। তবে ছাতের নিচে নড়াচড়া করা মানুষগুলো কেউ কেউ মাপত। মানুষ, মেপে দেখতে বড় ভালবাসে। সব কিছু মেপে দেখতে চায়... নিজের সাধ আর সাধ্যকেও। এমনই একটা দোতলার ছাতের সঙ্গে একটা একতলার ছাতের দূরত্ব মাপা চলত। দূরত্বের মান কত, তা জানা নেই। যারা মাপত তারাও বোধহয় ঠিকঠাক জানত না। তবে অনেক কিছু বলত... সে বলে বলুক। দেখা যেত ঘুড়ির মাঞ্জা আর সুতো দিয়ে ছাতের মাপ নেওয়া হচ্ছে। কখনও কাগজের প্লেন অথবা সুতোয় বাঁধা ঢিল। আবার কখনও স্রেফ দু’জোড়া চোখ দিয়ে। অ্যান্টেনা, কাক, পায়েরা, আচারের বয়াম, কাপড় টাঙানো লোহার তার, আকাশ-প্রদীপ... এই সব কিছু নিয়ে ছাতেরা গল্প করত। আর সেই গল্প আড়ি পেতে শুনত চিলেকোঠার ঘর। ছাতেরই একজন হয়েও সেই চিলেকোঠা এক অন্য জগৎ।
সারা পৃথিবী জুড়েই চিলেকোঠারা হয়ত একটা আলদা জগৎ হয়ে থাকে। নিজস্ব কিছু দ্বীপপুঞ্জ, প্রণালী অথবা হিমবাহ ধরে রাখে। ঠিক যেমন ওই দোতলা বাড়ির ছাতে চিলেকোঠার ঘরটা। সেখানে হঠাৎই একটা অন্য দেশ নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করল। দুজন নাগরিক নিয়ে দুচোখের ব্যারিকেড, আর দুপুর রঙের সংবিধান। ভাগ্যিস অমন একটা ছাত ছিল। নাহ’লে এই চিলেকোঠা দেশের জন্ম হ’ত কেমন করে? কেমন করে বিতর্ক হ’ত ঠোঁট আর জিভের মধ্যে কে বেশি উষ্ণ? খালি পা, লাইব্রেরীর বই, প্রায় শুকিয়ে আসা ডোরা কাটা শাড়ী... এ'সবের মাঝের সাঁকোটা ওই ছাতেই থেকে যায়। চিলেকোঠার স্বাধীনতায় রাষ্ট্রের আক্রমণ নেমে আসুক, দরজা ভাঙুক কিংবা গোটা ছাতেরই মালিকানা চলে যাক অন্য দখলে... সেই সব মুহূর্ত, কথা আর নিঃশ্বাস - ফড়ফড় করে উড়ে যায় নাগালের অনেক বাইরে। ঠিক ঝাঁক বেঁধে উড়ে যাওয়া গোলা পায়রাগুলোর মত, যারা ছাতগুলোকে আমাদের থেকে অনেক ভাল চিনেছে চিরকাল। তারা দেখেছিল, ছাতের দেওয়ালে কেমন ইটের টুকরো দিয়ে ঘষে ঘষে পর পর লেখা- দেখা, একা, ছ্যাঁকা। অনেক বৃষ্টি, শ্যাওলার বংশ বিস্তারের পরেও ‘দেখা’ শব্দটা বহুদিন পর্যন্ত থেকে গেছিল... কিন্তু কেউই দেখত না।

--- --- --- ---

এখন দেখা হয়?
ছাতগুলো আর আগের মত নেই। উঁচু উঁচু বাড়ি উঠেছে, শরিকী ঝামেলা মিটিয়ে পুরনো ছাত পিটিয়ে ভেঙে ফেলা হচ্ছে একের পর এক। এই উঁচু বাড়িগুলোরও ছাত আছে, বড় ছাত। কিন্তু চিলেকোঠা নেই, আছে জলের ট্যাঙ্ক। ডিশ অ্যান্টেনা, আর কখনও টবে রাখা বাহারী ঝোপ সম্বল, মরুভুমির মত... মাটিতে থেকে দূরে, ছাতগুলো ভাল নেই। দুরমুশের ঘায় শেষ হয়ে যাওয়া ছাতগুলো খুন হওয়ার আগে এদের কিছুই বলে যেতে পারে নি। এরা জেনেছে – অনেক উঁচুতে পৌঁছতে হয়, আরও ওপরে। যে যতটা ওপরে যেতে পারে, সে অন্যদের বলতে পারে তার ওপরে থাকার কথা। লোকে তার কথা মনে রাখে, তার মত আকাশের দিকে হাত বাড়াতে চায়। ছবিতে ধরতে চায়, সে কতটা কাছাকাছি এসেছে শূন্যের। উচ্চতা মাপতে মাপতে ছাতেরা একে অপরকে দেখে মিষ্টি হাসি। আর সেই পেশাদারী হাসির বিস্তৃতির নীচে একে একে খাঁচা বন্দী বারান্দাগুলো আসে, প্রায় একইরকম সব... কেউ কেউ একটা আলাদা, অথবা আলাদা হওয়ার চেষ্টা। কিন্তু, আসলে একই। একটা দোলনা, কিংবা ইজি চেয়ার, বা ল্যাব্রাডর... এসব আর কতটা আলাদা করে? কতটা পৃথক জায়গা করে নেয় হঠাৎ কোনও বারান্দায় দেখা ক্রীস্যান্থেমামের ফুল? ছাত থেকে ক্রমে দূরে, ধাপে ধাপে নিচে নামতে নামতে এক একটা বারান্দা... যে বেশ কয়েক বছর আগে, হয়ত নিজেই একটা ছাত হ’তে পারত। অথবা, দুরমুশ করে শেষ করে দেওয়া একটা ছাত এখন বারান্দা হয়ে বেঁচে আছে, গ্রীলের ফাঁক দিয়ে অন্য কোনও জলের ট্যাঙ্কে চিলেকোঠার ঘর খুঁজতে খুঁজতে। তবুও, এই বারান্দাটুকুই এখন নিজের বলে থেকে গেছে। একটা নেমপ্লেট দেওয়া দরজার এপারে... ঘর পার হয়ে নিজের বারান্দা। কখনও বাইকের পেছনে বসে যেতে যেতে দু’দিক থেকে আসা দু’টো হাত শক্ত করে ধরে, থুতনি ঠেকে কাঁধে। কখনও মোবাইল কানে হাসতে হাসতে রাস্তা পার হওয়া। কখনও হাতটা আলগা ভাবে হাতে নিয়ে কাঁধে মাথা রেখে এগিয়ে যাওয়া। সবকিছুই দেখে বারান্দা। দেখতে দেখতে একটা হাত বারান্দার কোনও গ্রীল একটু বেশি শক্ত করে ধরে। সেই ছোঁয়া কোনও মানুষের শরীর পেলে, ঠিক কালসিটে পড়ে যেতো।
গ্রীলের ভেতর থেকেই চোখ দু’টো ভাবে – যদি দেখা হয়, চিনতে পারবে? যদি চিনতে পারো, সারা দেবে ডাকলে? যদি সারাও পাই... আর কী বলব আমি?
ছাত পরিষ্কার করতে গিয়ে এখান ওখান থেকে পোড়া-আধপোড়া সিগারেট, চকলেটএর রাংতা কিংবা বিয়ারের বোতল... সব জড় করে তুলে নিয়ে যেতে হয়। মালিকানাহীন ছড়ানো ছিটনো সব। বারোয়ারী ছাতের কোনও নেমপ্লেট নেই।
--- --- --- ---

বারোয়ারী

দেওয়ালের ওপর অনেকবার চুনকাম পড়েছে। মাঝে মাঝে, চুনকাম পাতলা হ’লে তলা থেকে ছবি, লেখা... পুরনো কথা উঁকি দিতে শুরু করে। লম্বা দেওয়াল, চুনকামের আড়াল থেকে আবছা লাল আর নীলের গল্পগুলো খুঁচিয়ে বোঝার দরকার নেই। ওপরে সার্বজনীন পুজোর আহ্বান, ওটাই আসল। পুজো মানে দুর্গাপুজো, পাড়ার পুজো, রাস্তার খানিকটা আটকে প্যান্ডেলের খাঁচা। বারান্দা থেকে ঝোলা আলোর চেন, ছাতের কাছাকাছি বেরিয়ে আসা মাইকের মুখ। একটা পুজো, তার আয়োজন, উদ্যোগ, আনন্দ... সবটাই অনেকে মিলে ভাগ করে নিচ্ছে। আর... একটা মানুষ? সে যদি বলে - ভিড় ভাল লাগে না, পুজো ভাল লাগে না, মাইকের আওয়াজ ভাল লাগে না। ভাল না লাগা নিয়ে অস্বাভাবিক হয়ে যেতে হবে?
শ্বশুরবাড়ি শুনলে ছোটবেলা থেকেই কেমন লাগে। প্রতিবেশী, আত্মীয়... তাদের বাড়ির কোনও না কোনও মেয়ে ঢলাঢলি, গলাগলি করতে করতে হঠাৎ একদিন কান্নাকাটি করে অন্য কারও সাথে গাড়ি করে চলে গেল। ফুল দিয়ে সাজানো গাড়ি, কি সুন্দর দেখতে! ছোটবেলা থেকে এই ভাবেই ‘শ্বশুরবাড়ি’ শব্দটা ছুঁয়ে যায়। একসময় বোঝা যায় – আমার বাড়ি, মায়ের শ্বশুরবাড়ি। ঠাকুমারও তাই। ‘তাহলে আমার শ্বশুরবাড়ি?’ এই জিজ্ঞাসায় হাসির রোল ওঠে। উত্তরটা আসে বিশ-পঁচিশ বছর পর। ঠিক কী ভাবে কার সামনে এই কাল্পনিক 'ওয়াণ্ডারল্যাণ্ড' এসে হাজির হয়... সে কথা এমন ফাঁকিতে সেরে ফেলা যায় না। প্রতিষ্ঠিত প্রতিমাশিল্পীও মৃণ্ময়ী মূর্তির পেছন দিকটা নিয়ে বেশি কিছু করতে পারে না, চায়ও না। ওটা লোকচক্ষুর আড়ালেই এক অন্য বাস্তব। সেরকম অন্য বাস্তবে যে কালশিটে, ফোলা কবজি, ঠোঁটের কাটা দাগ, পোড়া কেরোশিনের গন্ধ আর 'মেয়েমানুষের কপাল' গুলো রয়েছে... তাদের সবাইকে ঝলমলে চালচিত্রের দোহাই দিয়ে কিছুতেই এই ওয়াণ্ডারল্যাণ্ডের ম্যুর্যাল আঁকা যাবে না।
রূপাঞ্জনা শ্বশুরবাড়িতে থাকে না। বরের সঙ্গে নয়ডায়ে প্রায় ছ-সাত বছর কাটিয়ে দিয়েছে। পাসপোর্টে দু-তিনটে দেশের শীলমোহরও পড়ে গেছে। মূর্তির পেছনে ও কতটা খড়কুটো, মাটি ফেটে বেরিয়ে আসা বিবর্ণতা দেখেছে তা এপাড়ার কোনও দেওয়াল বা মাইক খুব একটা জানে না। রূপাঞ্জনা দেখে মনেও হয় না, কখনও আঁচল দিয়ে হাতের ছ্যাঁকা কিংবা মেকআপ দিয়ে চোখের কোণের কালসিটে ঢাকার দরকার পড়েছে বলে। ডাঁটের মাথায় বাপের বাড়ি আসে, তাও ফ্লাইটে আসা যাওয়া।
- একি রে, তোর সিঁথিতে সিঁদুর কই? বোঝাই যায় না!
- সেকি! শাঁখা-টাখা কিচ্ছু পরিস না... বর কিছু বলে না?
- তোর শাশুড়ী যায়নি এবার? খুব মজা না?... শ্বশুরবাড়ির হেঁসেল ঠেলতে হয় না!
এই বিরক্তিগুলো পরিচিত। কেউ বেশি ঘ্যানঘ্যান করলে তিন বছরের টিটোকে হাত ধরে হিরহির করে সেখান থেকে নিয়ে চলে যায়। আড়ালে দু তিন রঙের কথা বললেও, সামনা সামনি কেউই চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না... একটু বেশি মোটা করে কাজল লাগায় বলে কি রূপাঞ্জনার চোখ দুটো একটু বেশিই বড় মনে? হয় কে জানে!
এইভাবেই প্রথমে হালকা কাজল টেনে ও জিজ্ঞেস করত - দেখো তো, এটা সুন্দর?
সে বলত হ্যাঁ
তারপর আর একটু মোটা করে কাজল টেনে জিজ্ঞেস করত - আর এবার?
সে আবার ঘাড় কাত করে বলত হ্যাঁ।
পছন্দের মানুষের কাছে পুরুষরা কখন যে শিশু হয়ে যায়... নিজেরাই বোঝে না।
রূপাঞ্জনা হাসত, খুব হাসত... ভালবাসার ভাগ কমে স্নেহ তার জায়গা নিয়ে নিত হঠাৎ।

--- --- --- ---

এই মন, রাখো দর্পনে

"দেখো তো, এটা সুন্দর?"
কাকার মেয়েটা কখন ঘরে ঢুকে পড়েছে খেয়াল করেনি রূপাঞ্জনা। হঠাৎ ওর গলার আওয়াজ পেয়ে ওর দিকে ফিরে তাকাল। চোখের কোণে চিকচিকটা বোধহয় দেখে ফেলেছে হতচ্ছারি!
"একি রুপুদি? তুমি কাঁদছ কেন?"
"আরে দেখ না! এখানে এলেই রাস্তায় এত ডাস্ট! উফ ঘরের মধ্যে পর্যন্ত... অ্যালার্জী শুরু হ'ল, ডিজগাস্টিং!" বলে চটপট আয়নার সামনে থেকে সরে গেল রূপাঞ্জনা। আঁচলের পাট ঠিক করতে করতে বলল 'কী সুন্দরের কথা বলছিলি?" "আরে এই কানের টা... দেখো না! মানিয়েছে?" বলে কানের পাশ থেকে খানিকটা চুল সরিয়ে মুখটা এগিয়ে দিলো তোয়া। কানের লতিতে আঙুল ছুঁয়ে পান্নার মত দেখতে সবুজ পাথর বসানো দুলটা দেখতে দেখতে রূপাঞ্জনা ভুরু কুঁচকে বলল "সিটিগোল্ডের?" "কেমন হয়েছে বলো না!... মানাচ্ছে না, না?", তোয়া ঠোঁট উলটে আয়নার দিকে চলে গেল।
- "না না, মানাবে না কেন! বেশ দেখতে! সালোয়ার, শাড়ী... সব কিছুর সঙ্গে চলবে।"
- "সিটিগোল্ড না ছাই। দিচ্ছে আমাকে গোল্ড, সিটিগোল্ড। সেদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল, কিনে নিলাম। পাতি ইমিটেশন! ভাল লাগছে... বলো?"
- "হ্যাঁ হ্যাঁ, ইমিটেশন এর থেকে ভাল কী হবে?"
- "মানে ইমিটেশন বোঝো নি তো? বোঝাই যাচ্ছে না তার মানে... ইয়েস! আর কী করব বল? কখন কী করব? এদিকে যা লেগে আছে সব, একের পর এক..."
এরই মধ্যে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রূপাঞ্জনার চিড়ুনি দিয়ে খানিক চুলটা ঠিক করা, একটা টিপ কপালে লাগিয়ে নেওয়া, আর লিপস্টিকটা ঠোঁটে বুলিয়ে নেওয়া হয়ে গেছে তোয়ার। রূপাঞ্জনা কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গিয়ে, বলল "কী লেগে আছে এখানে?" হাতে লিপস্টিক নিয়ে ঘুড়ে দাঁড়ালো তোয়া, "সেকি তুমি জানো না? গত দু সপ্তাহ ধরে তো পর পর চলছে!... বরুণদাদের বাড়ির ডিস অ্যাণ্টেনা কারা খুলে নিয়ে চলে গেছে! তপন জেঠুর হঠাৎ রাত্তির বেলা বুকে ব্যথা, সঙ্গে সঙ্গে নার্সিংহোম... হার্ট অ্যাটাক, আর একটু দেরি হলেই ব্যস! তারপর প্রতিমাদির মা... আরে প্রতিমাদি গো, যে আমাদের বাড়ি কাজ করত! তার মা ভাতের ফ্যানে পা পিছলে... সেই তাকে নিয়ে ছুটোছুটি। আর এই ক'দিন আগে কি প্যাথেটিক কেস্‌, ডাকুদি হঠাৎ গলায় দড়ি দিলো জানো?! "
- "ডাকু দি?"
- "সেকি! ডাকুদি কে মনে নেই? ভাস্করদার কাকার মেয়ে টা গো... আর ওই যে, যার বর বোম্বেতে চাকরি করতে গিয়ে আর ফিরল না... তারপর..."
- "ও হ্যাঁ হ্যাঁ... সে এখানে কোথায় থাকত?"
- "কেন? নিজের বাপের বাড়িতেই থাকত! দু বছর আগেই তো চলে এসেছে শ্বশুর বাড়ির পাট চুকিয়ে। তা ছিলি ছিলি, হঠাৎ যে ঘাড়ে কী ভূত চাপে মানুষের!"
- "ও"
এইটুকু বলেই চুপ করে গেল রূপাঞ্জনা। গম্ভীর হয়ে খাটে পড়ে থাকা কাপড়গুলো পাট করতে শুর করে দিলো।
- "কী হ'ল রূপু দি? ভাস্করদা'র কথা বললাম বলে..."
- "তোর মেপ আপ শেষ হয়েছে? শেষ হয়ে থাকলে এবার কেটে পড়... আমার অনেক কাজ বাকি, রেডি হয়ে বেরোতে হবে! পুজোর সময় আসা হয় নি, ও বাড়ি গিয়ে ডিউটি করে উদ্ধার করতে হবে!"
- "যাচ্ছি যাচ্ছি... নিজেদের সব প্রবলেম! আর আমার ওপর তেজ দেখানো!"
চিরুনিটা ড্রেসিং টেবিলের ওপরে ছুঁড়ে দিয়ে চলে গেল তোয়া। রূপাঞ্জনারও ইচ্ছে করছিল কিছু একটা ছুঁড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিতে। কিন্তু পারল না। দরাম করে বন্ধ করে দিলো ঘরের দরজাটা।
ডাকুদিকে শেষ দেখেছে বছর পাঁচেক আগে, তার কথা কি ভুলতে চাইলেও ভোল যায়? জোর করে ভুলতে চাইলে আরও বেশি করে মনে থেকে যায়। অহংকারী আর হিংসুটে হাসির ডাকুদি। কাটা কাটা কথা শোনাতে ওস্তাদ! ছোটবেলা থেকেই ভাস্করদার বাড়ির মেয়েদের দেখেছে খুব অহংকারী, হিংসুটে। অন্ততঃ রূপাঞ্জনার হিংসুটে বলেই মনে হ'ত ওদের সবাইকে। ভাস্করদাও পেয়েছে ষোলো আনা অহংকার, তবে হিংসুটে নয় - অবশ্য এটাও রূপাঞ্জনারই মনে হওয়া।
ডাকুদি'র সেই বিদ্রুপের হাসিটা মনে পড়ে গেল - ভাস্কর আর রূপাঞ্জনাকে কথা বলতে দেখলে যে ভাবে হাসত। একটা ভাঁজ করা কাপড় বুকের কাছে চেপে ধরে রূপাঞ্জনা বুঝতেই পারল না, যে তার পাট-টা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে... ঠোঁটটা কামড়ে নিজের মনে বার বার বলতে লাগল 'এই ভাবে শেষ হ'তে হল? এই ভাবে?..."
বাইরে তখন ঢাকের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বেশ কয়েকটা বারান্দায় ভিড়। আগের বছর পুজোয় আসতে পারেনি বলেই এবছর এই সময় আসতে হ'ল। পুজোর সময় এই পাড়ায় থাকলে কষ্ট হয়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্যাণ্ডেলের সামনেটা দেখলে কষ্ট হয়। উলটো দিকের বাড়িটার ঠিক পেছন দিকে যে ছাতটা দেখা যেত, তার বদলে গজিয়ে ওঠা সবুজ রঙের ফ্ল্যাট বাড়িটা দেখলে কষ্ট হয়। গত বছর এই কষ্টগুলো মিস্‌ হয়ে গেছে। এ’বছর আর হবে না। এই কষ্টগুলো পেতে ভাল লাগে, খেতে ভাল লাগে চেটেপুটে। পানসে সুখী জীবনে ফ্রীজে রাখা ছিবড়ে মুর্গীর মাংস খেতে খেতে জিভ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে... তখন এই কষ্টগুলো স্ট্রলের মত জড়িয়ে নিয়ে পাশ ফিরে শুতে ভাল লাগে রূপাঞ্জনার। তাতে কেউ ওকে ম্যাসোকিস্ট বললেও ওর কিচ্ছু যায় আসে না।
ডাকুদি ঢাকের তালে তালে নাচত, কে কী ভাবল, কী বলল... এসবের পরোয়া না করে নাচত। কাউকে পাত্তাই দিতো না! তারপর বিয়ের দু’বছর কাটতেই কেমন পালটে গেল মানুষটা! চোখের কোণে চলে আসা জলের ফোঁটা দুটো খুব সাবধানে তর্জনীর নখে তুলে নিয়ে নিজের মুখটা একবার আয়নায় দেখে নিলো রূপাঞ্জনা। তারপর ফোঁশ করে একবার নাক টেনে দরজাটা খুলে ছুটে চলে গেল বারান্দার দিকে। পাড়ার মণ্ডপে প্রতিমা আসছে, লড়ি ঢুকছে... ঢাক বাজছে রাস্তার ওপর।

--- --- --- ---
নবপত্রিকা

টিটোর এই প্রথম এখানে দুর্গাপুজো দেখা। প্রথম বছরে কী দেখেছে ওটা ধর্তব্যে পড়ে না। দ্বিতীয় বছর নয়ডাতেই ছিল, দুদিন চিত্তরঞ্জন পার্কের এক পুজোয় গেছিল ওদের অ্যাপার্টমেণ্টের অন্য এক বাঙালী প্রতিবেশীদের সঙ্গে। যদিও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতিবেশী মানে কমিউনিটির পরিচিতই বলা ভাল, পড়শী নয়। তবে সে কথা আলদা। আসল কথা হ’ল টিটো বড় হচ্ছে। আধো আধো ভাষায় একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে যাকে পাচ্ছে তার দিকে। একটা মোটা মত লালচে লোকের হাতির মত মাথা... তার পাশে একটা গাছের মত কিছুকে কাপড়ের ঘোমটা দিয়ে ঢাকা - এইসব দেখে প্রশ্ন তো করবেই?!
রূপাঞ্জনারও কৌতূহল জিনিসটা ছোটবেলায় খুব বেশি ছিল। এখন উদাসীনতা এসেছে। জীবনে অনেক সময় পূর্ণতা আর স্থিতিশীলতার তৃপ্তি এলে তার সঙ্গে এমন উদাসীনতা আসে। তখন আর দরকারের বাইরের কিছু জানতে, শুনতে বা চিনতে ইচ্ছে হয় না। দরকার নেই, ব্যাস্‌! তবে এটা, সেই সময়ের কথা যখন পাড়ায় অনেকগুলো ছাত, চিলেকোঠার ঘর আর রূপাঞ্জনার ছেলেমানুষী কৌতূহল... সব ছিল!
- এই আঁচিলগুলো কী করে হয় বল তো?
- অনেক ভাবে হয়।
- মানে?!
- ও তুই বুঝবি না।
- বোঝালেই বুঝব। বোঝাতে পারবে না সেটা বলো... নিজেই জানো না!
তারপর পিঠে কিল মাড়ার জন্য উদ্যত একটা হাত, আর বুকের ওপর আঁচিলটা খুঁটে দেওয়ার জন্য হিংস্র একটা নখ!
তারপর আসন্ন যুদ্ধের মাঝে আত্মসম্বরণ।
তারপর দুটো হাতই অন্য কিছু খুঁজে নেয় দখল করা জন্য। দু'জনেই চায়, তাদের কেউ দখল করে নিক।

মুশকিল হ’ল ওই খুড়তুতো দিদি ডাকুকে নিয়ে। এমনিতে হইহুল্লোড় করে যা খুশি তাই করত; কিন্তু রূপাঞ্জনা কখনও ওদের বাড়ি গেলেও একটু অন্যরকম হয়ে যেত। প্রথম প্রথম ভাস্করের সঙ্গে কথা বলতে দেখলে মুখটা থমথমে হয়ে যেতো। সেসব রূপাঞ্জনা লক্ষ্য করেনি। আলাদা করে ভাবেও নি। তারপর হঠাৎই একসময় শুরু হ’ল বাঁকা হাসি আর কাটাকাটা কথা শোনানো। তখন রূপাঞ্জনাদের বাড়ির অবস্থা খুব একটা ভাল না, বাবার অফিসে টালমাটাল অবস্থা। চাকরিটা গেলে অন্য কী করা যায় সেই সব ভাবছেন। ইচ্ছে করে সেই সব নিয়ে সকলের সামনে কিছু না কিছু জিজ্ঞেস করত ডাকুদি, ‘তোর বাবা, তোর কলেজের পড়া’ এইসব নিয়ে। ভাস্করের সামনেও অনেক সময় অনেক কিছু বলেছে, ভাস্কর কিন্তু কিছুই বলত না। কোনও দিনও রূপাঞ্জনার পক্ষও নেয়নি। ভাস্করের মা কাকি-মা’রা কেউ কাছাকাছি থাকলে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কথা ঘুরিয়ে দিতো। কিন্তু ডাকুদি আর অন্য মেয়েগুলো বুঝিয়ে দিতো আকারে ইঙ্গিতে ‘তুই এ বাড়ির যোগ্য নস।’ হয়ত, ওদের ভাই ভাস্করকে নিয়ে কিছু আন্দাজ করেছিল বলেই...
অথচ, হঠাৎ করেই একসময়ে ডাকুদির হাবভাব অনেকটা পালটে গেছিল। এত ঠুকে ঠুকে কথা শোনাত না। তবে এই এক সময়ের আগেও সামান্য কিছু আছে। রূপাঞ্জনার পিসির বাড়ি (মানে পিসির শ্বশুরবাড়ি) দশ মিনিটের হাঁটা পথ। সেই পিসির মেয়ে রুমকির বিয়েতে রূপাঞ্জনা চার-পাঁচ দিন ওই পিসির বাড়িতেই পড়েছিল। ভাস্করদের বাড়ি থেকেও মা-কাকিমা’র যাওয়া আসা লেগেছিল। ওর দিদিরাও বিয়ের তিন দিন ওখানেই ছিল রুমকিকে জড়িয়ে। সব ছোটবেলার বন্ধু। রূপাঞ্জনাও ওই ডাকুদিদের সঙ্গে হাতে হাতে অনেক কিছু করেছিল, বিয়ের সময় মেয়েরা যে সব কাজ নিয়ে মেতে থাকে আর কি! রুমকি চলে যাওয়ার পর, ভাঙা বিয়ে বাড়ির রাতে ডাকুদির পাশে শুতে হয়েছিল রূপাঞ্জনাকে। গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে টের পেল, ডাকুদির হাত কিছু খুঁজছে... অনেক কিছু খুঁজছে... রূপাঞ্জনার শরীরে। রূপাঞ্জনার ম্যাক্সির ভেতরে ডাকুদির আঙুলগুলো জেগে আছে, ডাকুদিও জেগেই আছে অনেকক্ষণ। কিন্তু কী হয়েছিল কে জানে... রূপাঞ্জনা কিছুতেই আঙুলগুলোকে থামাতে পারেনি। বুক তলপেটে অবধি সেই আলতো নরম ছোঁয়ার মধ্যে রোমাঞ্চের থেকেও বেশি ছিল শান্ত ভাল লাগা... একটা প্রিয় আরামের ভাল লাগা। আবছা অন্ধকারেও বুঝতে পারছিল ডাকুদির চোখ দুটো বন্ধই আছে, অথচ ঠোঁটের কোণে হাসি। চোখ বন্ধ রেখেই কী সাবলীল ভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মৌমাছির মত উড়ে বেড়াচ্ছে ডাকুদির আঙুল। তারপর একসময় রূপাঞ্জনার আরও কাছে ঘেঁষে এলো ডাকুদি, তার গরম নিঃস্বাসে ডুবে ঘুমিয়ে পড়ল রূপাঞ্জনা।

নাহ্‌, কালরাত্রির রাতে সেই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা কাউকেই বলতে পারেনি রূপাঞ্জনা। ভাস্করদাকেও না। বলতে ইচ্ছেও হয়নি... মাঝে মাঝে আশ্চর্য লাগলেও অস্বাভাবিক বা বিরক্তিকর কিছু মনে হচ্ছিল না রূপাঞ্জনার। কেন মনে হচ্ছিল না? রূপাঞ্জনা এর পরে দেখেছে... ডাকুদি তার হাত ছুঁয়ে কথা বলতে চাইত। পাশে বসলে থাইয়ের ওপর হাতটা রাখত আলতো করে। নতুন কোনও সালোয়ার কামিজ বা শাড়ী কিনলে ছুটে আসত ওদের বাড়িতে, রূপাঞ্জনাকে দেখাবে বলে। না... কখনও রূপাঞ্জনাকে জোর করে ছুঁতে চায়নি। নিভৃতে পেতেও চায়নি। কিন্তু রূপাঞ্জনা বুঝতে পারত... ও চান করে ভেজা চুলে বেরোলে কিংবা চেঞ্জ করার সময় ডাকুদি দুচোখ ভরে দেখত, একটা অদ্ভুত হাসি নিয়ে। ডাকুদি একবার বলেছিল ‘হ্যাঁ রে... তোকে নিয়ে কেউ কখনও কবিতা লিখেছে? আমি নেহাৎই পারি না... নাহ’লে...’
রূপাঞ্জনা বুঝতে পারত, কোথাও একটা... কোনও ভাবে - যতটা অভিমান ভাস্করদার জন্য জমা হ’তে পারে, তার কিছুটা এই ডাকুদির জন্যেও জমছে মনের কোণে। খুব বেশি সই পাতানো ব্যাপার নেই, গায়ে পড়া নেই... দূরে থেকেও কেমন একটা মন কেমন। অথচ ভাস্করদার জন্য চিন্তা, তাকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছেটা একই রকম আছে। মাঝে মাঝে নিজের গোপন ইচ্ছেগুলো নিয়ে একটা দোলাচল আসত মনে। দু নৌকায় একসাথে পা দেওয়া কি যায় এভাবে? জটিল ভাবে ভাবতে পারত না। ভাস্করদা অন্য রকম মানুষ, একে বারে অন্য রকম! আর ডাকুদি তো কখনও কিছু দাবী করে নি!... করেছে কি?

কোনও জটিলতাই থাকত না। যদি ডাকুদিও না হঠাৎ ছাতে আসা শুরু করত।
ডাকুদির গা থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াত... কোনও সাবান, কিংবা পারফিউমের নয়; ডাকুদিরই গায়ের গন্ধ! ডাকুদির পিঠে মাথা রেখে শুলে চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে ঘুমে, রোদের আলো মাখা ঘাম মধুর মত গড়িয়ে পড়ে খোলা পিঠ থেকে । ডাকুদি চুলে বিলি কেটে দিলে পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ার চিন্তা হারিয়ে যায়। ডাকুদি জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিলে তার বুকের ওঠা নামা দেখে সরস্বতী ঠাকুরের মূর্তির কতা মনে পড়ে। পাপের ভয় থাকে না। ডাকুদির গভীর নাভি আর কোমরের ভাঁজ দেখবে যে পুরুষ তাকে হিংসে হ’ত রূপাঞ্জনার। এই সব কিছুই একটু একটু করে রূপাঞ্জনাকে ছুঁয়েছিল, ঐ চিলেকোঠার দেশেই। বন্ধ দরজার এপারে এক অন্য দেশ, যেখানে কেবল দু’জন নাগরিক।
- ‘আর তো ক’টা দিন, বলো... তারপর, তোমার দিকে তোমার বর হ্যাংলার মত চেয়ে থাকবে!’
রূপাঞ্জনার এই প্রশ্নে ডাকুদি শুধু হেসেছিল, তারপর চুলে বিলি কাটতে কাটতে জিজ্ঞেস করেছিল - “ আচ্ছা রঞ্জা, ভাস্করের ঠোঁটে ঠোঁট রেখেছিস কখনও?’
রূপাঞ্জনার কান দুটো হঠাৎই লাল হয়ে গেছিল এই প্রশ্নটা শুনে। ঠিক যেমন দ্বিচারী পুরুষের হয়; প্রনয়িনী অন্তরঙ্গ অবস্থায় অন্য কারও কথা জিজ্ঞেস করলে। নিজে পারেনি, তবে তার মনটা এক ছুটে সব কিছু ছেড়ে বেরিয়ে এসে ঘরের দরজা বন্ধ করে বালিসের ওপর মুখ গুঁজে কেঁদেছিল অনেকক্ষণ।
ডাকুদি কী যে করে দিলো এই একটা কথা জিজ্ঞেস করে... তারপর সব কিছু চোখের সামনে থাকলেও মনে হ’ত কিছু নেই। ডাকুদি চলে যাবে বিয়ে করে, যাবেই, কারণ ডাকুদি নিজেই তা চায়। একটা অহংকারী এবং হিংসুটে মানুষ যে এইভাবে কেবল একটা মানুষের কাছে হেরে যাতে পারে, আর তাকেও হারিয়ে দিতে পারে... তা রূপাঞ্জনার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল।
আর ভাস্কর দা? এখন মানুষটার দিকে থাকালেই মনে হয়... ‘তোমাকে অনেকটা ঠকানো হয়ে গেছে, আর না।’
ডাকুদির বিবাহিত জীবনে একটা কালো মেঘ দেখতে পাচ্ছিল, রূপাঞ্জনা। ভয় হ’ত, ভাস্করদার মত মানুষের জীবন যেন এমন পাকাপাকি ভাবে বিষাদ ঘন না হয়ে যায়।

রূপাঞ্জনার কৌতূহলকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ও কোনওদিনও চায়নি চিলেকোঠার নাগরীকত্ব। অন্য বন্ধুদের দেখে ওরও ইচ্ছে করত ভাস্করদার হাত ধরে পার্কে বসে ছোলা ভাজা খেতে। হাত ধরে সিনেমা হলে বসে থাকতে অন্ধকারে। কিংবা বেশ কিছুদিন পর লজ্জা নিয়ে বাড়িতে কাউকে একটা বলতে ভাস্করদার কথা। অপেক্ষা করতে, যে কবে ভাস্করদার মা একটু আভাস দেয় যে তার চোখে অনেক কিছুই পড়ছে। কিন্তু সব হিসেব বদলে গেল। এক অদ্ভুত বাঁধনে জড়িয়ে নিলো ডাকুদি... তারপর জাহাজীর মত একটা জায়গায় নোঙর ফেলে দিয়ে বলল, “আমাকে এইখানেই নেমে যেতে হবে। এবার তুই কোথায় যাবি নিজে ঠিক কর। একসাথে থাকার জন্য নয়... একসাথে কিছু দূর ভাসার জন্যে আমাদের দেখা হয়েছিল।”

---০---
ঢাক বাজছে, কাঁসর বাজছে, ছেলেদের সঙ্গে পাড়ার অল্পবয়সী মেয়েগুলোও নাচছে। ... কিন্তু ডাকুদি নেই। ভেজা চোখে ঝাপসা দেখা যায় - ‘টিটো চেয়ারের ওপর দু’হাত দিয়ে থাবড়ে যাচ্ছে ঢাকের তালে তালে। তোয়া ওর হাত ছেড়ে কোথায় চলে গেছে, দেখা যাচ্ছে না। ভাস্করদা’র মতই দেখতে একটা ছেলে টিটোর কাণ্ড দেখে হাসছে।

--- --- --- ---

অপরাজিতা

- ঠিক কী হয়েছিল ভাস্করদা? কেন এমন করল ডাকুদি?
- ডিপ্রেশন... কিছুতেই বেরোতে পারছিল না।
- কাউন্সেলিং করাতে পারতে...
- সব হয়েছিল। অ্যাণ্টিডিপ্রেস্যান্ ট, সেডাটিভ, নার্ভের ওষুধ... রেগুলার ব্যাপার হয়ে গেছিল। কেমন যেন একটা হয়ে গেছিল শেষ ছ’সাত মাসে। দেখলে চিনতে পারতি না।
- সহ্যও করতে পারতাম না। ডাকুদিকে যে এভাবে দেখতে হবে...
- সেই !
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাস্কর রূপাঞ্জনার দিকে তাকালো। চার-পাঁচ দিন দাড়ি কামায়নি বলে কাঁচা পাকা দাড়ি বোঝা যাচ্ছে। ঝুলপিটাও সাদা হচ্ছে।
- এই ক’বছরে কত কিছু বদলে গেছে... না?
- হুম, তা তো গেছেই। তুই চলে গেলি, তার দু বছর পর বাবা মারা গেল। বাড়িটা ভেঙে ফ্ল্যাট হয়ে গেল। গত তিন বছরে পাড়ায় অন্ততঃ ছ’টা বাড়ি ভেঙে নতুন অ্যাপার্টমেণ্ট হয়েছে। রাস্তায় ত্রিফলা আলো বসেছে। চেহারাটাই বদলে যাচ্ছে। তোর মতন।
- আমার মত?
- হ্যাঁ! এই যে তোর ওজন বাড়ছে, একটা অন্য রকম গ্ল্যামার এসেছে... অন্য রকম টানে কথা বলিস, সব সময় ভুরু কুঁচকে থাকিস, ভারী ভারী দুল পরিস কানে...
- পরস্ত্রীর ওপর নজর দিচ্ছো?
মজা করা জন্যেই বলেছিল কথাটা, কিন্তু হাসির বদলে দীর্ঘশ্বাস বেরলো রূপাঞ্জনারই বুক থেকে। হাসিটা ভাস্করকেই হাসতে হ'ল। হা হা করে হাসল ছাতের রেলিং ধরে। পৈতৃক বাড়িকে স্মৃতি আর কিছু ফটোগ্রাফে রেখে দিয়ে তার জায়গায় উঠে এসেছে চার তলা ফ্ল্যাট। তারই একটাতে মাকে নিয়ে থাকে ভাস্কর। আর অন্য একটাতে কাকার পরিবার। কিছু ক্যাশ হাতে এসেছে, ফিক্সড ডিপোজিট করা আছে ভাগে পাওয়া টাকা। চারতলার ওপরের ছাতে শেষ আশ্বিনের হাওয়াতেও রাতে গা শিরশির করে ওঠে। সারা পাড়াটা দেখা যায় - প্যাণ্ডেলের সামনে পর পর দুটো লরি দাঁড়িয়ে, ভাসান দিয়ে ফিরে এলো ছেলেরা। জেনারেটরের আওয়াজ এখন গম গম করছে। বক্সে এখনও কিছু একটা হুল্লোড়ের গান চলছে হইহই করে।
- একটা কথা জিজ্ঞেস করব? সত্যি বলবি? - আর কত মিথ্যে বলব বলো তো? মিথ্যে নিয়েই তো জীবন! - বিয়ের পর, ডাকুদি তোকে কখনও যোগাযোগ করেনি? - না। -আর তুই? - না। - ডাকুদির বিয়ের পর থেকে... তোদের মধ্যে আর কোনও যোগাযোগই ছিল না? - না।
ঢাকের শব্দ কিছুক্ষণের জন্য হঠাৎ থেমে গেল। তারপর আবার বাজতে শুরু হ’ল। শেষ বারের মত নেচে নিচ্ছে সবাই। নেশায় নাচ আর নাচে নেশা মিশে আছে।

- বিশ্বাস করলে না তো? জানি। করো না। আগেও করনি, এখনও করো না।
- সেই... আমার আর এখন বিশ্বাস করা বা না করায় কী আসে যায় বল তো? মানুষটা হঠাৎ... আর এই ভাবে!
- থাক, বলো না... কষ্ট হয়। শীত শীত করছে, আমি বরং নিচে যাই।
ভাস্কর ছাতের গেটটা ঘটাং করে খুলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গেলো। একা একা খোলা ছাতে দাঁড়িয়ে ডাকুদির মুখটা মনে পড়তেই একটা বুক হু হু করা কান্না ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। কিন্তু কিছু একটা যেন ভেতর থেকে টেনে নিলো কান্নাটা। ডাকুদির কথা মনে পড়তেই ভাস্করদাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা পরপুরুষ মনে হ’ল হঠাৎ। কেন ভাঙবে? কেন ভাঙবে নিজেকে এভাবে... পরপুরুষের সামনে? এত বছর পরেও এমন? কী করেছিলে সেদিন ডাকুদি?
ভাল থাকা , মন্দ থাকার কথা... এবারে বিয়ে করে নাও... নিজেকে শাস্তি দিয়ে কী লাভ? ... নিজের খেয়াল রেখো; বুক ভারী করে দেওয়া একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস - এসব আগে ছিল। এখন নেই। রূপাঞ্জনার একটা নতুন জীবন আছে, পূর্ণতা নিয়ে। আর ভাস্করও ভাল আছে, ব্যক্তিগত জীবনে যে ভাবে সে নিজে ভাল থাকতে চায়, ভাল থাকার চেষ্টা করতে পারে... সেই ভাবেই। তবে বিজয়ার প্রণাম নয়, ভাস্করকে কাটিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়ার আগে রূপাঞ্জনা চাপা গলায় ‘শুভ বিজয়া’ বলে ভাস্করের গালে ঠোঁট দুটো ঠেকিয়ে দিয়ে গেল। আর পেছন ফিরে তাকাল না।
---০---
সেলফিটা খুব অদ্ভুত উঠেছে। টিটো সিংহর মত হাঁ করে হাত দুটোকে থাবার মত করে আছে, আর রূপাঞ্জনা চোখ বড় বড় করে হাসছে। মোটা করে কাজল দেওয়া চোখ। রূপাঞ্জনার বাঁ হাতেই ফোনটা ধরা, সেটা বোঝা যাচ্ছে। বরকে কোন ছবিটা পাঠাবে, স্লাইড করে দেখতে দেখতে মোবাইলে এই ছবিটার কাছে এসে আটকে গেল রূপাঞ্জনা। অদ্ভুত সুন্দর ছবিটা... কী ভাল লাগছে দু'জন কে! পেছনে ভাস্করদা দাঁড়িয়ে আছে হালকা গোলাপী পাঞ্জাবী পরে, যেন আবির মাখানো। হাসছে। রূপাঞ্জনাদের পেছনে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ওদের দিকেই তাকিয়ে হাসছে। বুঝতে পারেনি্‌ যে এই ভাবে ক্যামেরার কাছে ধরা পড়ে যাবে। এই ছবিটা বর কে পাঠাবে না, এটা ওর নিজের। অন্য ছবিতে চলে গেলো... একের পর এক ছবি স্লাইড করতে থাকল ভুরু কুঁচকে। ভাস্করের হাসির রেশটা রূপাঞ্জনার ঠোঁটে বেঁচে আছে।
“ভুল বুঝোনা ডাকুদি। তুমি আর ও, দুজনের থেকেই তো দূরে সরে গেছিলাম আমি। তুমি মেনে নিতে পারলে না... কিন্তু আমাদের তো বেঁচে থাকতে হবে, বলো? থাকতেই হবে!”