সাবিরা নামের মেঘ

সুমী সিকানদার

ঠিক নিখোঁজ বলা যাবে না। বরং আত্মগোপনকারী বললেই এ শব্দের প্রতি সুবিচার করা হয়। আজ নিয়ে সাত দিন ধরে কোন খবর নেই তো নেই । প্রথমে দিয়া বোঝেনি এটা আত্মগোপন হতে পারে। ছিন্ন ছিন্ন মুহূর্তের ভাবনা তুচ্ছ লাগতো। সে বিকেলের ফুলটোক্কা রোদে লোকজনের হাঁটাহাঁটি বেড়ে যাবার আগেই বারান্দায় চলে আসে। বড় বারান্দার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত বিরাট ঘোড়দৌড়ের মাঠ যেন। দূর থেকে এগিয়ে আসতে থাকা চিলতে পায়ে চলা পথ কিরকম একগুঁয়ের মত থমকে থেমে গেছে পাঁচিল ঘেঁষে। দিয়া এসেই দুই চোখ দিয়ে দশ দুগুনে বিশ এঙ্গেলে দেখতে থাকে উল্টো দিক থেকে কারো হেলতে দুলতে আসা ছায়া মাটিয়ে পরে কি না। না পাওয়া ছায়া কে খুঁজে বেড়নো একটা জীবনব্যাপী কাজ।


মজার ব্যাপার হলো ছায়া যে মাটিতেও পড়ে সেটা দিয়া হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করেছে। রোদ যখন মরে আসে , জংলি ফুলের ওপর পড়ে থাকা আলো যখন কমে ফ্যাকাসে হয়ে আসে, তখন ঈষৎ লম্বা ফর্সা কারো ছায়া বাঁকা হয়ে হয়ে মাটিতে পড়ে। সে সময়ে নির্ঘাত তার হাতে ধরা থাকবে হয় বই নইলে খাতা কিম্বা ছাতা। এসব আসলে ভাণ । সে এলে কিছু লেখাও হয় না পড়াও না। লম্বা ছায়ার ছেলেটা দিয়াকে পড়ানোর চেষ্টা করেও দেখেছে। দিয়ার সকল আগ্রহ তাকিয়ে থাকায় আর মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ধরে এলে, চোখের পাতাসহ কয়েক সেকেন্ডের জন্য জিরিয়ে নিয়েই ফের তাকিয়ে থাকা। এভাবে করে তাকিয়ে থাকা আর অতি সামান্য শব্দে কথা বলার মধ্য দিয়েই শেষ হলো সে বারের ক্রিস্টমাসের ছুটি। স্কুল বন্ধ , ছুটিতে মাটিতে ছায়া পড়ে কম।


ক্রিস্টমাসের বন্ধের এক মাত্র হোম ওয়ার্ক দিনভর খেলাধুলা। এর মধ্যে কেক বানিয়ে খাওয়া হলো দুধে ভেজা ছোট ছোট পুলি,খাওয়া হলো। পুলিটার মাঝখানে ঝকঝকে সিলভারের চামচ দিয়ে কাটলেই ঠান্ডা এক রকম ধোঁয়া উড়তে থাকে। দুধসাদা ছোট তস্তরিতে দুধসাদা পুলি মিলেমিশে একাকার। এমন মধুর নরম কোন খাদ্যদ্রব্য থাকতে পারে এবং তা মুখে না দিলে এক জীবনে মালুম হতো না দিয়ার। মৌরির বাসায় এই পুলি দিয়ার জন্য বাঁধা । বড় দিনের এক সপ্তাহ পরে গেলেও দিয়ার পুলি পিঠা ঠিক সামনে এসে হাজির করবেন মৌরির মা ।

মাসিমা তার প্রিয় মানুষ। কত নিপুণতায় এতটুকু সঞ্চিত আলো চোখে না থাকলেও একজন মানুষ আঙ্গুলের ক্রমাগত একপেশে চাপ দিয়ে দিয়ে অগনিত পুলিপিঠা বানাতে পারেন তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না। একজন সহকারী নিয়ে জ্যোতিবিহীন এই মাসিমা মজাদার সব রান্না করে খাইয়ে এবং শিখিয়ে , দিয়ার চোখের এবং চোখের বাইরের অনেক কিছুর দৃষ্টি খুলে দিয়েছিলো। দিয়া শিখেছিলো চোখ না থাকলেও অন্তরদৃষ্টি থাকে । তা দিয়েই ভোর থেকে রাত অব্দি দেখে দেখে অনেক না পাওয়াকে অনায়াসে পাওয়া যায়। মাসিমার কাছে রান্না হলো বন্ধু। মন খারাপের মেডিটেশন। রান্না পর পরই তার মন কিভাবে যেন মন ভালো হয়ে যায়।


তো লম্বা ছায়া যে বড়দিনের ছুটির দিন গুলোতে আসতো না, সে দিয়াকে ডাকতো সাবিরা। সাবিরা মোটেই তার নাম নয় ত্বু সে দিয়াকে এই নামেই ডাকবে। সাবিরা মানে নাকি মেঘ। দিয়া তার জীবনের ইচ্ছেমেঘ। যখন তখন ভাবায় , জমাট হয়ে ভাসায়, ঘুমের সময়ের বিনা অনুমতিতে ঢুকে পড়ে স্বপ্নের রিনরিনে হাতছানিতে। স্বপ্নের খোলা পিঠে আঙ্গুলে আঁকে অনিবার্য আঁকিবুকি। কোথাও কিছু নেই বলেই তো সমর্পণ।শূন্যের মধ্যে আঁকড়ে ধরে থাকার নাম আসলে ভালোবাসাই।

সাবিরা মানে মেঘ , সে উড়ন্ত মেঘও হতে পারে । যে পাখিদের ডানা ধরে সাঁঝে ঘরে ফিরতে থাকে সাদা আঁচলের হাজার বুটি গুটাতে গুটাতে। সরু সরু হাতের লেখায় সে প্রতিদিন পাঠাতো খানিকটা কবিতা আর কিছু কথা। আর প্রায় কিছুই না পড়ে যত্ন করে রেখে দিতো দিয়া। ভয়েই তো শেষ ,পড়বে কখন? কেউ দেখে ফেলে যদি। প্রতিদিনের লেখা জমতে জমতে এবার বেড়ে যাচ্ছে। তাদের কি করে? শেষমেশ লাল জ্যমিতি বক্সে ঠেসে ঠেসে ঢুকিয়ে বেশ করে চাপ দিয়ে লাগিয়ে জীবন্ত কবরের ব্যবস্থা। লম্বা ছায়ার সেই ছেলেটা নিখোঁজ হবার পরো অনেক বছর লেখাগুলো রেখে দিয়েছিলো দিয়া, বোকার মত। দিয়ার মনে হতো সাবিরা শব্দের অর্থ আসলে মেঘ নয় । খুব বোকা বোকা জংলি ফুল। রূপ গন্ধ কিছু নেই। অকারণ বাতাসে ব্যর্থতার দোলা আছে কেবল।

সে সময় পাড়াটা জুড় ফিসফাস শুরু। সন্ধ্যার বোর্ডের আলোতে ব্যাডমিন্টনের সাদা পালক কর্কের গায়ে ধাক্কা লেগে লেগে নানা রকম রিউমার বেরুলো। লম্বা ছায়াকে কে বা কারা যেন মেরে রেখেছে। অথবা লম্বা ছায়াকে বাড়িতেই আটকে রেখেছে , খিষ্টান ধর্মের কোন মেয়ের সাথে মিশতে দেবে না। এসব কথা পাড়ার কৃষ্ণচূড়া ঝরে থাকা মাঠগুলোতে কিভাবে যেন রটে গিয়ে হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে বেড়াতে লাগলো। দিয়া পায়ে পায়ে লাল লাল রঙ মাড়িয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটে । তার পায়ের নূপুর ক্লান্ত হয়ে যায় সে ক্লান্ত হয় না।

দিয়া কেমন চুপ হয়ে গেছিলো। শূন্য দেয়ালের দিকে মুখ করে দিনের পর দিন চুপ করে বসে থাতো। বিকেল হলেই বই খাতা নিয়ে রোজ বসে থাকতো বারাব্দার লাগোয়া টেবিলটাতে। শার্প করা পেন্সিল বার বার শার্প করতে করতে দেখা গেলো পেন্সিলটাই নেই , ঐ লম্বা ছায়ার মতো, সেও নিঁখোজ হয়ে গেছে হাঁটতে হাঁটতে। শরীর এক সেতার , বাজলেও বাজে, না বাজলেও যেন বেজে ওঠে প্রতীক্ষার সমস্ত পাঠ চুকিয়ে।

মৌরি এসে এসে নানারকম গল্প করতো দিয়ার সাথে। দিয়াও করতো কিন্তু কোন গল্প শেষ করতে পারতো না। কিভাবে যেন এক গল্পের শুরুর সাথে অন্য গল্পের শেষটা ঢুকে পড়তো। মৌরি সব বুঝেও নির্বিকার থাকতো। তার কাজ ছিলো মায়ের পাঠানো পুলিগুলো দিয়াকে খাওয়ানো। পাড়ার গুজগুজ ফুসফুস শেষমেশ এ রকমে এসে ঠেকলো যে লম্বা ছায়াটাকে একেবারে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে বিধর্মী মেয়েটার সাথে মাখামাখির ফলে। দিয়ারা পাড়া ছাড়লো এক ভোরে , লোকাল বাসগুলো তখন বাসস্টপ ছেড়ে দূরে দূরে চলে যাচ্ছিলো সিটি বাজাতে বাজাতে।ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে কবিতা আসে, প্রেম আসে। আবার ফিরে যায় ভিন্ন মানুষের সন্ধানেও ।স্বপ্ন বিবরণ স্বপ্নেরও অধিক সত্য মানি।

এন্তার একঘেয়ে শব্দে ডেকে ডেকে ঘুঘুটা ঘুমালে দিয়াও পড়া ছেড়ে লাগোয়া বিছানায় শুয়ে পড়েছে। নতুন পাড়ায় বাসা, দরজাটা খোলাই । সে একটু পরেই বারাব্দায় যাবে। সেদিন কিভাবে যেন সেকেন্ডেই ঘুমিয়ে গেছে। দরজা খোলা দেখে সামান্য ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছেন পরিচিত এক মামা। দিয়া অঘোরে ঘুমাচ্ছিলো। হঠাৎ বুকের ওপর আলগা গরম নিঃশ্বাস মনে হতেই ধড়মড় করে উঠে বসেছে। বসতে গিয়ে টের পেলো তার ফ্রিল দেয়া ফ্রকের সামনের বোতাম অতি সাবধানে খুলতে গিয়ে শরীরের উপর উবু হয়ে আছে সাজুমামা। সেকি সাজুমামা এরকম করছে কেন ! ওমনি কি হয়ে গেলো বিকট চিৎকার দিয়ে সাজুমামা কে এমন জোরে ধাক্কা দিয়েছে যে সে স্টিলের আলমারির কোনায় গিয়ে পড়ে মাথা কেটে সেই কপালের দরদর করে পড়তে থাকা রক্ত চাপ দিয়ে ধরে এক দৌড়। বাকি জীবনে সহসা আর মুখের সামনে পড়েনি সাজুমামা। দিয়ার খুব গা ঘিন ঘিন করছিলো। আম্মু কে সন্ধ্যায় সব খুলেই বললো দিয়া, খুব সংকোচেই । কিন্তু আম্মু তখন খুব মন দিয়ে ম্যাকগাইভার দেখছেন মটরশুঁটি বাছতে বাছতে। দিয়াকথা শেষ না করেই উঠে চলে এলো।

তো সাজুমামাকে ধাক্কা দিয়ে কপাল ফাটিয়ে দেবার পর থেকেই দিয়ার অসুখটা আস্তে আস্তে সারতে লাগলো। ঐ যে মৌরির সাথে কথা বলতে গিয়ে কথার খেই হারিয়ে ফেলা কিম্বা এক নাগাড়ে কয়েকদিন কথা না বলা, কিম্বা রুটিন ভুল তুলে ভুল সময়ে স্কুলে পরীক্ষা দিতে চলে যাওয়া। ছাদের একদম কিনারে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে দেখে তো আম্মু একবার ফিট হয়ে যাচ্ছিলেন। মৌরিই সে বার দিয়ার পাশে গিয়ে বসে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঘরে এনেছিলো। লম্বা ছায়া দিনের পর দিন শুধু লিখে লিখে তীব্রতর যে ক্ষতি করে রেখে গেছিলো, সাজুমামাকে ঘৃণা করতে গিয়ে সেই ক্ষতি একা একাই পুষিয়ে গেলো। দিয়া কিম্বা সাবিরা কিম্বা মেঘের গুটানো কালো অংশ খোল পালটে সাদা হয়ে গেল। ভিজিটিং আওয়ার শুধু রোদের জন্যই।

অফিস থেকে ফিরে কাপড় ছেড়ে চা আর মুড়ি মাখা নিয়ে বসে আয়েশ করে খেতে খতে মেইল চেক করছে দিয়া। কাজের মেইলগুলোর রিপ্লাই দিলো দ্রুত। অনলাইন রান্নার কোর্স করায়। হোমসার্ভিস দেয় অনেক অফিসে এবং অনুষ্ঠানেও। সেলিব্রিটি কুক দিয়া নেট থেকে বের হবার আগে এবার ফেইসবুকে ঢুকলো মেসেজ এসেছে কি না দেখতে।

অদুভত এক মেসেজ এসেছে।
প্রোফাইল পিকচারে সেই আইডির কোন ছবি নেই। নামটাও বানানো যে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু সংলাপটা যেন বহুযুগ আগেই শুনে ফেলা। লম্বা ছায়ার যে চিঠি গুলো লাল জ্যামিতি বক্সে রাখা হত তার প্রতিটাতেই একটা করে ইংলিশ কবিতা আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের এক লাইন লেখা থাকতো । আজ মেসেজেও সেরকম কবিতার সাথে বাংলা গানের এক লাইন,’’ প্রাণ চায় চক্ষু না চায়’’। দিয়া লগ অফ করে বের হয়ে এলো। চোখে ভাসছে সম্বোধন ।সমস্ত আকাশ মাথায় নেমে এসেছে। এই মুহূর্তে কেন বৃষ্টি হলো না। এই মুহূর্তে কেন পায়ে পায়ে জল লুটালো না।

কলিং বেলের শব্দে চমকে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই বাইরে থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বোনের মেয়ে আর নিজের মেয়ে । তারা দুইজন রাজ্যের কেনাকাটা করে ফিরলো। ‘’দিয়ামনি আজ থাকবো তোমার সাথে’’। জালালি কবুতরের মত কলকল করতে গল্প করতে লাগলো দুই মেয়ে। দিয়ার কানে কিচ্ছু ঢুকছে না। ছাদের কোনায় বসে দুজনের একসাথে চুপ থাকার ঝিঁঝিঁ গানের সন্ধ্যাটা ভাবনায় ভাসে। তাহলে সে বছরে সে ইচ্ছে করেই সরে গিয়েছিলো। সরাসরি সত্য বলতে পারে হাতে গোনা কয়েক জন। বেশীর ভাগ মানুষই সত্য গোপন করে , সরলতার লিখুঁত ভাণ করে দিন পার করে। সত্য বলতে পারলে তারা হয়তো অন্য চেহারার মানুষ হতো ।

ল্যপটপে বসে মেসেজটা ডিলিট করে ‘’অনাহুত ঝিঁঝিঁ সন্ধ্যা ‘’নামের আইডি কে ব্লক করে দিলো দিয়া। ডাইনং রুম থেকে মেয়েদের আওয়াজ কানে আসছে। তারা দুইজনে কি কি সব বেইক করে টেবিল সাজিয়ে এখন খেতে ডাকছে। খেতে এসো মা , খেতে এসো দিয়ামন। দিয়ার চোখে কোত্থেকে মেঘ গলে গলে ঝম ঝম শ্রাবণ নেমেছে । দ্রুত চোখ মুছে হুইল চেয়ারটা ঘুরিয়ে নিয়ে খাবার টেবিলের দিকে চালিয়ে নিয়ে গেলো সে। একা একা দোতালার ছাদ থেকে শূন্যে ভেসেছিলো দিয়া । কিছুতেই ভাল লাগতো না।, মৌরি গল্প করতে এসে কেবল একটু ঘুমিয়েছিলো দুপুরে। তার পাশ থেকে উঠে গিয়ে ছাদের একাবারে কিনারে চলে গেছিলো দিয়া। প্রাণ সমেত বেঁচে গেলেও পা তার হেঁটে বেড়াবার জন্য আর ফেরৎ আসেনি। একেবারে শূন্য থেকে বর্তমানে স্থাণু হয়ে গেছিলো । মাঝে মাঝে নিজেকে দোতালা থেকে নিচে আবার ভূমি থেকে উর্দ্ধে ভাসমান ভেবে ভ্রম হয়। আরও ভ্রম হয় সদ্য উড়ে আসা অদর্শনের দর্শনে। । এত বছর পর মেসেজ এসেছে মেঘ নামেই । শোনো সাবিরা নামের মেঘ।