লে বা ন নে র ছো ট গ ল্প

ভাষান্তর : এমদাদ রহমান

লে বা ন নে র ছো ট গ ল্প
যে সুর বাজে একটি হারিয়ে যাওয়া তারে
নাযিক সাবা ইয়ারেদ
ভাষান্তর : এমদাদ রহমান



[লেবাননের উপন্যাসিক নাযিক সাবা ইয়ারেদ-এর জন্ম- জেরুজালেমে, ১৯২৮ সালে। লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে আরবি সাহিত্যের অধ্যাপনা করেছেন ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত। পড়াশোনা করেছেন আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত-এ, পিএইচডি'ও করেছেন এখান থেকে, ১৯৭৬ সালে। ফিকশন, নন-ফিকশন মিলিয়ে তার পনেরোটি বই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। উল্লেখযোগ্য বইগুলি হলো- Cancelled Memories, Arab Travelers and the West, Improvisations on a missing string, Secularism and the Arab World। রোজিয়েনে শাদ খালাফ-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত 'Hikayat: Short Stories by Lebanese Women' গ্রন্থটি থেকে গল্পটি বাংলায় ভাষান্তরিত হয়েছে। গল্পটি মূল লেবানিজ থেকে 'Improvisations on a missing string' নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন- স্টুয়ার্ট এ. হানকক্স।]




শায়দা, ঢিলেঢালা জামা গায়ে জড়ানো, হাসপাতালের বেডে শুয়ে শোহা আর আনোয়ারের জন্য অপেক্ষা করছিল। সময়ও তখন এগারোটা বেজে গিয়েছিল, কিন্তু তারা আর ফিরছিল না। সে চকিতে জানলা দিয়ে বাইরেটা একবার দেখে নিল। সম্ভবত মুষলধারার বৃষ্টি তাদেরকে কোথাও আটকে দিয়েছে। তার দৃষ্টি বেডের ওপর পড়ল- চাদরটি দলা পাকিয়ে গেছে এমনভাবে যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে খসে পড়তে চাইছে। এখানে তার দুই সপ্তাহ হয়ে গেছে কিন্তু মনে হচ্ছে দীর্ঘ দুইটি মাস, এখন আবার নিজের বাড়িতেও একনাগাড়ে দুই-তিন মাস থাকতে হবে। দুই মাসের বেশিও লাগতে পারে। তাহলে ছাত্রদের কী হবে? ডাক্তাররা তার এই প্রশ্নটিকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেছেন। তার এখন সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হওয়ার কথাই শুধু ভাবতে হবে।
'শায়দা, আমাদের দেরি হয়ে গেলরে, সরি।' আনোয়ার গাড়িটাকে সুবিধামত একটা জায়গায় পার্ক করার চেষ্টায় ব্যস্ত কিন্তু শোহা'র কণ্ঠস্বর চকিতে তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে।
'শায়দা, বলছি কী, তুই এখন হাসপাতালে, আমি তোর কষ্ট আর বাড়িয়ে দিতে চাইছি না, কিন্তু আমার এমন কিছু কথা আছে যা তোর জানা উচিৎ।' শোহা কথাগুলি বলল অপ্রত্যাশিতভাবে।
'কী কথা? ডাক্তাররা কি এমন কিছু জানতে পেরেছিলেন যা এতদিন আমার কাছে গোপন করা ছিল? আমি আর কখনওই ছাত্রদের কাছে ফিরতে পারব না? আমি কি মা'র মতোই সবকিছু এখানেই শেষ করে ফেলব?'
'আরে না না, এত দুশ্চিন্তার কিছু নেই। সেরকম জটিল কিছু অবশ্যই নয়। বিষয়টা হলো যে আমরা দূরে কোথাও চলে যাচ্ছি।'
'আবারও?'
'হ্যাঁ, আল্লাহর ইচ্ছায়, শেষ বারের মতো।'
শায়দা শোহা'র কথার মানে কিছুই বুঝতে পারে না।
'কী শেষ বারের মতো? কেন?'
'আমি আর কোনওদিন এই দেশে ফিরে আসব না। এমনকি, আনোয়ারও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আমরা কানাডায় চলে যাচ্ছি।'
শায়দা মুহূর্তে যেন কথা বলবার দরকারি শব্দগুলি খুঁজে পায় না। সে কি আবারও তার বোনটিকে হারাতে চলেছে? আজকের পর থেকে সে কি তার বোনটিকে আর কখনও দেখতে পাবে না? আসলে কী এমন ঘটেছে?
শায়দা নিজের ভেতরে জেগে ওঠা আলোড়নটাকে নিয়ন্ত্রণ করার মরিয়া চেষ্টা করে।
'ডাক্তাররা কি কানাডায় বেশি ইনকাম করে?'
শোহার হাসি বড় তিক্ত লাগে শায়দার কাছে। ওখানে সে প্র্যাকটিস করতে পারবে না, তার মেডিক্যাল ডিগ্রিটি ওদেশে স্বীকৃত নয়। সে আর কখনওই ওদেশে প্র্যাকটিস করবে না।
দু'বোন হঠাৎ অসীম নীরবতায় পতিত হয়।
এক সময় শায়দা জিজ্ঞেস করে- তাহলে সে ওখানে কী কাজ করবে?
'সে ওখানে হাসপাতালের জিনিসপত্র সরবরাহ করার একটা প্রশাসনিক কাজ খুঁজে নিয়েই যাচ্ছে।'
শায়দা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। আনোয়ারের অসীম ধৈর্য তার কাছে ছিল একটা শক্তির মত, আর এখন সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে শেষ পর্যন্ত এটা ঘটতে চলেছে।
'তাহলে তোর শিল্পচর্চার কী হবে, শোহা? এখানকার লোকেরা তোকে জানে। তাদের কাছে তোর কাজের একটা আলাদা মূল্য আছে।'
'আরে, আমি তো এখানে এক অপরিচিত শিল্পী হিসেবেই শুরু করেছিলাম, সফলতাও পেয়েছি, আর ওখানে আবার সবকিছু নতুন করে শুরু করতে চলেছি। ঠিক এখানকার মতোই।'
শায়দা তার বোনকে বোঝাবার চেষ্টা করছিল পশ্চিমে ব্যাপারটা কী পরিমাণ প্রতিযোগিতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। আর এ কারণেই কোনও এক আরব শিল্পীর জন্য পশ্চিমা শিল্প দুনিয়ার দরোজা খুলে সেখানে প্রবেশ করাটা মোটামুটি অসম্ভব। কোনও শিল্পী কি আর শিল্পী থাকে সে যদি তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে? শায়দা কথাটা জিজ্ঞেস করেই বসে তার বোনকে।
শোহা'র উত্তর তার কাছে ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
'আমার শিকড়! এখানে আমার কোনও শিকড় ছিল না। সম্ভবত তোর শিকড় এখানে আছে, হ্যাঁ, থাকতেই পারে, তবে আমি জানি না তোর তা আছে কি না, এমনকি আনোয়ারও এখানে এক আগন্তুক। এক যুদ্ধ, হ্যাঁ, সেই এক যুদ্ধ আমাদেরকে আমাদের সমস্ত অধিকার থেকে বিচ্যুত করেছে। এখানে এমন কোনও আইন নেই যার মাধ্যমে আমাদের অধিকারগুলি রক্ষিত হবে। আর কোনও সরকার এখানে আসবে না যে অধিকার রক্ষার আইনগুলিকে অনুমোদন দেবে। তাকিয়ে দেখ নিজের চারপাশে। আমাদেরকে সর্বক্ষণ কারা চোখে চোখে রাখছে? তারা আর কেউ নয়- একেকজন বন্দুকধারী খুনি।'
'তাহলে এই হচ্ছে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণ?' শায়দা'র কণ্ঠস্বর বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। হ্যাঁ, এটা অবশ্যই সত্য- রাজনীতি সবকিছুকেই কলুষিত করে ফেলেছে।
'তুই যদি আমার জীবনকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলে থাকিস'-শোহা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে- 'তাহলে, শোন, আমার জীবন তো অনেক আগেই কলুষিত হয়েছে, সেখানে রাজনীতি তেমন কিছু করেনি।'
'কিন্তু রাজনীতি তো সবকিছুকেই চূড়ান্ত পতনের দিকে নিয়ে যায়'- শায়দা তার বোনকে বলে। 'আনোয়ারকে এই কারণে বলির পাঠা বানানো ঠিক হবে না।'
'লেবাননের যুদ্ধই তাকে বলির পাঠা বানিয়েছে, তার অনেক আগেই আমি শেষ হয়ে গেছি। আর দেখ, আনোয়ার শুধু তার নিজের কাজ আর রোগীদের ব্যাপারেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে।' শোহা তার কথার শেষ শব্দটির ওপর একটু বেশিই জোর দিয়ে ফেলে। শায়দা চেয়ে দেখে তার বোনের চোখে কান্নার জল।
'তোকে সে ভালোবাসে, শোহা।'
কথাটা শোনা মাত্রই নিদারুণ ক্লেশ আর পরিহাস মাখানো এক হাসিতে ফেটে পড়ে শোহা। তার বোন এখনও জানে না যে আনোয়ার আর তার সম্পর্ক এখন অনেক বদলে গেছে। যে আনোয়ারের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল, জানাশোনা ছিল, সে আনোয়ার আর নেই।
'হ্যাঁ, সে তোকে ভালোবাসে। রাতদিন সে শুধু কাজ করে তোর জন্য আর নাদিয়ার জন্য, তদের যাতে একটুও কষ্ট না হয়।'
'সে দিনরাত বেঁচে থাকে শুধু কাজে যোগ দেবার জন্য। আমার জন্য তার ভেতর আর কোনও আবেগ, অনুভূতি নেই।'
শায়দাকে মর্মাহত লাগে কিন্তু শোহা তার বোনকে গ্রাহ্যই করে না। 'রঙিন টিভি, বড় ফ্রিজ, নতুন একটা গাড়ি থাকা মানেই কি ভালোবাসা? ভালোবাসা কি কয়েক লাখ লিরা, যার একটি পয়সাতেও বিন্দুমাত্র আকর্ষণ কিংবা মনোযোগ মেশানো নেই! গুরুত্ব নেই।' শোহা তার প্রতি ঘটে যাওয়া সমস্ত অপমানকর ব্যবহারের কারণে যেন এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় পতিত হয়েছে।
শায়দা'র কাছে ভালবাসা সব সময়ই এমন একটি ব্যাপার যার সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে লোকেদের নিজস্ব যোগ্যতা, সামাজিক অবস্থান, চাকুরি- ইত্যাদি। আর সে ভালোবাসা সম্পর্কে কিভাবেই বা এত জানবে? সে তো ব্যাপারটিকে বইয়ে পড়েছে। ভালোবাসা! সে একমাত্র তার নিজেকেই ভালোবাসে।
সব সময়ই এত আদর্শবাদীতা। তুমি যদি সাহিত্যের ভেতরে বসবাস করতে থাকো, তাহলে কীভাবে তুমি জীবন সম্পর্কে এত কিছু জানতে পারবে? শোহা কর্কশ কণ্ঠে বলে।
'তোর আর আনোয়ারের মাঝে কতোগুলি বিষয়ে মিল ছিল, কী পরিমাণ ভালবাসা, বোঝাবুঝি দুজনের- সব ভুলে গেলি?' কথাগুলি বলতে বলতে শায়দা শোহা'র চোখে ঘৃণার এক তীব্র স্রোতকে বয়ে যেতে দেখে।
'এসব যদি ভালোবাসা হয় তাহলে তো সবকিছুই তার সমস্ত রঙ হারিয়ে ফ্যাকাসে আর মলিন হয়ে গেছে।' শোহা কান্নার ফোঁটাগুলিকে আর আটকাতে পারল না।
আনোয়ার শরীর থেকে এক প্রস্ত পোশাক খুলে শাদা সার্জিক্যাল গাউন পরে নেয়, তারপর অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে ঢোকে। টেবিলের অজ্ঞান রোগীর ওপর দ্রুত চোখ বুলিয়ে নেয়। সে হাত ধুয়ে নেয়, হাতে গ্লভস পরে, যা সামিয়া তার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। সে কিছুটা ঝুঁকে দাঁড়ায়, সামিয়া যাতে সার্জিক্যাল মাস্কটা তার নাক অ মুখের ওপর সঠিকভাবে বেঁধে দিতে পারে। তারপর সামিয়া রোগীর পাকস্থলীর চারপাশের চামড়া আর কোমরের দিকটাকে অবশ করতে শুরু করে। আনোয়ার তখন শল্যচিকিৎসার উপযুক্ত ছুরিটি বেছে নেয়। সে তার সামনে রোগীর শরীরটাকে একদম ভেতর থেকে মেলে ধরতে চায়। তার দক্ষ আঙুলগুলি গভীরভাবে নিরীক্ষণ করে নিশ্চিত হতে চাইছিল যে ঠিক কোন জায়গাটায় অস্ত্রপচার হবে। আর ঠিক এরকম একটা মুহূর্তে সে বাইরে বেশ তাড়াহুড়া আর উত্তেজিত কথাবার্তা শুনতে পেল যেন কাছেপিঠে কোথাও ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে। যে অদ্ভুত দ্রুততায় তার পেছন দিকের দরোজাটি খুলে যায় আর আচমকা খুব শক্ত একটা কিছুর ধাক্কা লাগে তার পিঠের ওপরের দিকের অস্থিতে, তাতে তার হাতগুলি যেন প্রচণ্ড হিমে জমে যায়! 'যা করছিলে তা বন্ধ করে আমাদের কমরেডের বুক থেকে বুলেটটি বের করে ফেল'- একটা কর্কশ কণ্ঠ তাকে হুমুকের সুরে বলে।
আনোয়ার কোনও কিছু বোঝে ওঠার আগেই দুজন অস্ত্রধারী লোক অপারশনের টেবিলটিকে একটু দূরে সরিয়ে নেয়, আর অন্য একটি টেবিল এদিকে নিয়ে আসে, যে- টেবিলে রক্তে লাল হতে থাকা এক যুবক।
'জলদি করো। জলদি। আমাদের কমরেডের বুকে বুলেট ঢুকে গেছে। জলদি বের করে আনো।'
আচমকা সেই শক্ত জিনিসটি তার পেছনে আবার ধাক্কা মারে, এমনকি আগের চাইতেও জোরে। তারপর সে তার সহকর্মী শা'দের চিৎকার শোনে, সে বলছে- আরে তুমি কি পাগল? এটাকে বের করে আনো, এখনই!'
'আমরা কিন্তু এখান থেকে নড়ব না। ডাক্তার যদি তাৎক্ষণিকভাবে এই অপারেশনটি না করে তাহলে আমরা তাকে খুন করব'-- আরও একটি কণ্ঠ, উদ্ধতভাবে বলে ওঠে।
এটা কি কোনও ভীতিকর অভিজ্ঞতার স্মৃতি, নাকি- বাস্তব? হঠাৎ আনোয়ার খেয়াল করে যে যোদ্ধারা তাকে ঘিরে রেখেছে, তাদের বন্দুকগুলি সরাসরি তার দিকে তাক করা। সে তাদের মুখের দিকে তাকাতে ভয় পায় না। রক্ত হিম করে দেয়া আতঙ্ককর এই পরিস্থিতিতে সামিয়ার কোমল কণ্ঠ ভেসে আসে- 'তোমরা সবাই এখান থেকে যাও। আমরা এখনই তার অপারেশন করব, তার গায়ের পোশাক খুলে ফেলতে হবে, আঘাতের জায়গাটিকে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।'
'ডাক্তার অপারেশন শুরু করলেই আমরা দ্রুত চলে যাব।'
রক্ত আর ধুলোয় জমাট বেঁধে যাওয়া শার্টটিকে কেটে বের করবার জন্য আনোয়ার অপারেশনের ছোট হালকা চাকুটি ব্যবহার করে। শার্টটিকে কেটে বের করা মাত্রই রক্ত বের হতে লাগল গলগল করে।
'স্টেথিস্‌কোপ!'
সামিয়া দ্রুত তার হাতে স্টেথিস্‌কোপটি দিয়ে দেয়, অস্ত্রধারী লোকগুলিও তখন বাইরে যেতে শুরু করে। গুরুতর জখম তরুণটির হৃদযন্ত্র তখনও স্পন্দিত হচ্ছিল কিন্তু স্পন্দনের মাত্রা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল আর স্বাভাবিক মাত্রা হারাচ্ছিল। 'কী ঘটবে যদি ক্ষতের ভেতর ছুরি ঢুকানো মাত্র সে মারা যায়, কিংবা কী ঘটবে যদি আমি এই অপারেশনটি না করি?' আনোয়ার ভাবছিল। কিন্তু তার পিঠের ওপর দিকের অস্থিতে লেগে থাকা শক্ত জিনিসটি তার এই ভাবনায় ছেদ ঘটায়।
সামিয়া যুবকটির বুকের ক্ষতে জীবাণুনাশক দিতে থাকে, তখন আনোয়ার হাতে তুলে নেয় শল্যবিদের ছোট সাঁড়াশিটি। সে হেসে ফেলে যখন তার চোখ আগের সেই অজ্ঞান করে রাখা রোগীটির ওপর গিয়ে পড়ে, সে জ্ঞান ফিরে পাবে গুরুতর জখম হওয়া এই যুবকটির অপারেশন শেষ হবার আগেই। সে বুঝতে পারছিল না হেসে উঠবে না কি কেঁদে ফেলবে ঠিক যখন তার ছুরি আর সাঁড়াশিগুলি ঢুকে পড়বে এই যুবকটির বুকের গভীর ক্ষতের ভেতর।
সার্জিক্যাল গাউনটিকে যা এতক্ষণে তার ঘামে ভেজা শরীরে লেপটে গিয়েছিল, সেটা খুলে ফেলবার পর দরোজা খুলবার আগে সে একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। হিংস্র লোকগুলি বাইরে তার জন্য অপেক্ষমাণ।
'সব ঠিক আছে, ডাক্তার?'
অস্ত্রধারী ছয়জন লোক বারান্দাটিকে ঘিরে রেখেছিল, তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল দুজন নারী, এদের একজন বৃদ্ধা, আরেকজন যুবতী। তার হৃদযন্ত্রটি ধক্‌ ধক্‌ করছিল, দ্রুত।
'বুলেটটি বের করতে পারলে?'
'হ্যাঁ, ঈশ্বরের কৃপায়।'
ঈশ্বরকে সে ধন্যবাদ জানায়, তাদের প্রশ্নের উত্তরে মিথ্যা বলতে হয়নি বলে। এখন আর একটা মাত্র কাজ বাকি আছে। লোকগুলি একপাশে সরে গিয়ে পথ করে দেয়, তারপর, তারা অপারেশন কক্ষে ঢুকেই চিৎকারে ফেটে পড়ে। সে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামতে থাকে। এখনই তারা জানতে পারবে বুলেটটি তার হৃদযন্ত্রটিকে শেষ করে দিয়েছে। গভীরে ঢুকে পড়ায় হৃদযন্ত্রের একটি ধমনী ছিঁড়ে গেছে। এ অবস্থায় সে কিংবা অন্য কারও পক্ষে কিছুই করার থাকে না। সে দ্রুত তার অফিসকক্ষে ঢুকে, ব্রিফকেসটিকে নিয়েই বাড়ির পথ ধরে, আর যেতে যেতে এ ব্যপারে নিশ্চিত হয়ে যায় যে- সে তাকে উষ্ণ অভিবাদন জানালে সেও তাকে ফিরিয়ে দেবে না, আর তা হবে জীবনের শেষ বিনিময়।