অন্ধ হওয়ার আগে

প্রণব আচার্য্য

অন্ধ হওয়ার আগে
অন্ধ হওয়ার আগে ঘুমিয়ে নেবো কিছু কাল। হাওয়ার ভেতর ছিপছিপে রঙিন মাছ, ডলফিন রোজারিওর কথা মনে করিয়ে দেয়। হ্যাঁ, রোজারিও; আমরা স্বল্পপরিচিত। লোকাল বাসে পাশাপাশি সিটে যে যার মতো উদাস বসে ছিলাম। জানালার ঝাপসা কাঁচের দেয়াল পার হয়ে রৌদ্র এসে পড়েছিল— দু’জন পাশাপাশি অযৌন ঘামে মগ্ন...। সেই পরিচয়, সেইটুকু পরিচয়ের শেষে নেমে গেলাম পরস্পর।
অন্ধ হওয়ার আগে একটিবার শুধু রোজারিওর পাশে বসতে চাই; আমাদের ঘামের ভেতর রঙিন মাছ ডলফিন খেলা করুক।

পিঠ জুড়ে ক্রুশ চিহ্ন
পিঠ জুড়ে ক্রুশ চিহ্ন। সেদিকে তাকিয়ে সন্ধ্যা নামছে। সড়ক বাতির ঘোলা আলোয় হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে যাচ্ছি একুরিয়ামের দৃশ্যে। কত বিচিত্র মাছ! কত সাঁতারচিহ্ন...।
গীর্জায় ধ্বনিত হচ্ছে সাধুসঙ্গীত। তুমি ডানা মেলে আছ, চুলে লেগে রয়েছে মীনজন্মের স্মৃতি। অথচ কেউই আমরা সাঁতার শিখিনি।

ভাঙ্গাজীবন
জীবন ভেঙ্গে যায়। ঐ রোদ এসে পড়ে ক্ষতস্থানে। ফুটপাথে পথশিশুদের খেলা দেখি। উলঙ্গ সেই শিশুরা মেঘের সাথে সাথে দৌড়ায়। এ দৃশ্য সহ্য হয় না, তাই পান্থপথে নেমে সিগনাল পার হতে চাই। তখনই মনে পড়ে, এ শহরে সিগনাল বাতিগুলো বহুদিন ধরে নিভে আছে।
হায়, ঐশ্বর্যচূড়ায় বসে আমরা তবু অবিচল দাঁড়কাক গুনি। রোজারিও, তোমার ভাঙ্গাচোরা দেহবটে কেন বসেছে কোকিল?

তৃষ্ণা
তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যায়—এমন দুপুর। শহরতরলীর বাসগুলো তখনও ভাসছিলো। লাগোয়া সিট ফুঁড়ে বিপুল বনসাই, তার ছায়ায় দগ্ধচারী আমরা দুইজন। বাকি বাস তখনও জলে ডুবে আছে। কোন কথা নয়, আমাদের সামনে ছিল বিষণ্ন হকার। চোখের স্বল্পাভাষে কেউ আর দাঁড়ালো না।
যীশুর আয়নায় এ দৃশ্য রাখেনি সন্তরা, জেরুজালেমের রুক্ষ পথে তারা খুঁজেছেন নির্বাণ।

রমনার স্মৃতি
আমার পাওয়ার কিছু ছিল না। একটি দু’টাকার কয়েন শুধু ভাংতি ছিল। যে রবিবারে মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে, সেরকম একদিনে দেখেছিলাম তার হাত। জিরাফের কদাকার হাসির কথা অথবা একুরিয়াম ভর্তি পোনামাছ, লেলিয়ে দেয়া কুকুর—এইসব টুকটাক আলাপও হয়নি।
খানিকটা তন্দ্রার ঘোরে ভাড়া মেটানোর ছল—তার ডান কব্জিতে ছিল রমনার ধূসর হাওয়া।