তুমি যাচ্ছ

দীপান্বিতা সরকার




শ্বাস বন্ধ কর। মধুবাতাসের মুঠো খুলে দাও। যমঅগ্নিকৃচ্ছ্রপিণ্ড হাতে গুনি । চাল ভাগ করে করে রাখা, বাসনাপাত্রে... কাকডাকা ভোরে হৃদপিণ্ড কাঁপে কই? পায়ে ব্যথা করে কই? তোমার নাম ছুঁয়ে এই যে সাততাড়াতাড়ি বিকেলে ফিরলাম। সত্যি এই তিন সত্যি রেখেছি দু'ঠোঁটে। তীরে দাঁড়িয়ে ভাসানো কি চাট্টিখানি কথা? এসো জলকন্যারূপে এসো গলা বুক জল ঠেলে এসো, চাঁদ পুড়ে যাচ্ছে, তবু একবার ডুবিয়ে দিলে আর পেছন ফিরে তাকাতে নেই


তুলসীতিলফুলজপমন্ত্র এ জন্ম সারাৎসার। কুশে অধিকার নেই তাই দূর্বা ছুঁলাম। দায়মাত্র আগুন ছুঁলাম। কানের লতি ছিঁড়ে সোনা খুলে রাখলাম বৈতরণী তীরে। পার হও। সারাদিন কী খিদে সারা অঙ্গে নিয়ে, অর্ধ দেহ অর্ধ চক্ষু ডুবে গেল দুধের বাটিতে। বাটিতে না, ওই ঘি মধু কোশাকুশি ঠিক করে রাখো উত্তরে দক্ষিণে, দিক ঠিক করো, প্রেতপর্ব মহাসনে ওম শান্তি। আঙুলের ফাঁক দিয়ে পড়ে গেল নামমাত্র সুখ, তোমার অসুখ। গলে গেল টুপ করে ঝরে গেল বচ্ছরান্তে... এই সব বিছানা বালিশ ছাতা সব তোমার, নাও, ষোড়শী মেঘ। আমায় ছাড়ো, আমার ঘুম পাচ্ছে।


বৃষ্টি নামলে ট্যাক্সি ধরি ফের। তোমাকে নিয়ে যাই। নিয়ে শোয়াই হাসপাতালের বেডে। তুমি কাঁদো। কাঁদতে কাঁদতে ধুলোর কথা বলো। জলের কথা, কত জল জমতো তোমার শৈশবে। খাটআলমারি সব ডুবে যেত কেমন! চৌকী উঁচু করে পাতা, খিচুরি। বলে যাও, পুরনো প্রেমের কথা বলো। দারিদ্র্যের কথা। বলো স্বামীর সংসারে মাকে এনে রাখার জেদের কথা বলো অশান্তির কথা বলো। আমি সব জমিয়ে রাখি। এক বছর এগারো দিনের মাথায় দপ করে জ্বলে ওঠে তোমার বিছানা ভরা সুখ। আমার হিংসে হয় খুব। বুঝতে চেষ্টা করি, মৃত্যু ঠিক কতটা পথ এগিয়ে দিয়ে এসে ফের বালিকারূপ ধরে। বেসুরো গান গায়, আলুকাবলিআলার জন্য স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে থাকে ঠায়। টিফিনের ঘন্টা বেজে যায়। সন্ধে হতেই কার বাড়ির কুপি ফুঁ দিয়ে নিবিয়ে আসো তুমি । দুধসাদা পরী, আমি দু'হাতে সাজাই। আমি মৃত্যুকে সাজাই দু'হাতে


মাথার ওপর গোটা রান্নাঘর ভেঙে পড়ল কবে? পড়েনি ঠিক, অল্পের জন্য বেঁচে গেছিলে। বাথরুমে স্নান করতে করতে দরজা ভেঙে পড়ে গেল। যে এত ভাঙতে দেখেছে সে-ই এত জোড়া লাগিয়ে গেল! ফুলপিসি ছোটপিসি ঝগড়া থামিয়ে এ ওকে জড়িয়ে কাঁদে। মুখদেখাদেখি নেই, দুই জা মিলে আলতা পরায় কাকে? আমি তো চিনি না। ডুব মেরে পালিয়ে আসি। আম কুড়োতে যাই। টক আমগাছটা আর ওই কয়লা ভাঙা লোকটা যাকে তুমি দুটো টাকা বেশি দিতে চেয়ে জোর বকা খেয়েছিলে, সে তো মরেও গেছিল পরের মাসেই, আর আসেনি। সেও আজ এসে দাঁড়িয়েছে দেখো। তোমার রাজার মতো গাড়ি দেখে একটু ভেবলেও গেছে। তুমি যাচ্ছ... সারা পাড়া ভেঙে পড়েছে এই এত রাতে।