ড.আম্বেদকরের প্রতিঃ নামদেও ধাসালের দুটি কবিতা

ভাষান্তরঃ শৌভিক দে সরকার

ড.আম্বেদকরের প্রতিঃ ১৯৭৮

সকলের জন্য সমান অধিকার
অথবা
ভারতবর্ষের মৃত্যু

এরপর থেকে
কারও উচিত না দুর্বোধ্য
কোন কিছু লেখা।
জটিল কবিতার দিকে কারও
পা বাড়ানোও উচিত না।
হঠাৎ ক্ষেপে উঠে কোন কিছুর দিকে ছুটে যাওয়া
ঠিক না, শেকড় থেকে সবকিছু বুঝতে হয়,
আর আমাদের দেশ তো সবেমাত্র
রেড়ির ঝোপের মত বাড়তে শুরু করেছে।

আর আমরা
বোকার মত ঐ ঝোপের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছি
ফালতু পাতাগুলির দিকে তাকিয়ে লালা ঝরাচ্ছি
নিজেদের জিভ থেকে গড়িয়ে পড়া লালা চাটছি

ওরা আমাদের ভালোবাসার কোন দাম দেবে না
ওরা শুধু ভান করতে পারে
আমরা নিজেদের মাংস নিজেরাই উপড়ে ফেলব
ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোলে বের হোক

রাগে ফুঁসে উঠছে ওরা
মাথা ঠিক রাখতে পারছে না ওরা
সন্ত্রাস, হত্যা, রক্তের স্রোত
ওদের গায়ে বোটকা দূষিত গন্ধ
সবাইকে ওরা অয়াদিপাউস বানিয়ে ফেলছে
এই দেশটাকে ওরা টুকরো করতে চায়
ওরা দাঙ্গা চায়
মানুষকে ওরা রাক্ষস বানিয়ে ফেলবে
মনুষ্যত্ব শব্দটিকেই ওরা শেষ করে ফেলতে চায়
ছাই আর হাড়
কবরের ভেতরে বসে গান গাইতে চায় ওরা
ওদের মাটি/ ওদের মগজ/ ওদের গর্ত
ওদের ঝাড়ফুঁক/ ওদের রক্ত

আচ্ছা ওরাই শুধু মানুষের বাচ্চা?
আমরা কি কুকুর বেড়ালের পেটে জন্মেছি?
কী রকম ধারনা নিয়ে বেঁচে আছে ওরা?
আর কতদিন নিজেরা কু-যুক্তির ক্রীতদাস হয়ে থাকবে?
লোভ আর লালসাঃ
ওদের লোভের দুনিয়াটা একদিন ফেটে যাবে
আকাশের দিকে মুখ করে ওরা থুতু ছেটাচ্ছে
আকাশের গায়ে কি দাগ লাগবে ?
ওদের নিজেদের মুখেই তো ঐ থুতু এসে পড়বে
অন্যদের গালি দেওয়াতে কি
ওদের নিজেদের পাপের বোঝা কি হালকা হবে?

এসব এখন ওদের বন্ধ করা উচিত
নিজেদের পাল্টানো উচিত ওদের
অন্যদের ঠিক করার আগে
নিজেদের ঠিক করা উচিত ওদের।

আপনি আপনার মূর্তির থেকে
আরও অনেক উঁচুতে উঠে গিয়েছেন।
জাতির নামের থেকেও আরও অনেক বিশাল
একটি বাঁজা মুরগির মত বসে বসে
অন্য কারও ডিমে তা দেননি আপনি,
একটি তীব্র স্রোতের মত এসে
আমাদের পাল্টে দিয়েছেন আপনি।
এই সত্যিটাকে কি আমরা এড়িয়ে যেতে পারবো?
আমাদের ঐ মানুষগুলির মত হতে হবে যাদের শ্বাসপ্রশ্বাসে
আলো ফুটে ওঠে, যাদের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সবাই শান্তি পায়।
মানুষের মনের ভেতরেই প্রকৃত সত্যটি লুকোনো থাকে।
আপনি কোনদিন অন্ধবিশ্বাসী ছিলেন না
আপনি উদার দৃষ্টির মানুষ ছিলেন
আগাছা উপড়ে আপনি সবকিছু সমান করে দিয়েছিলেন
ইতিহাসকেই পাল্টে দিয়েছিলেন আপনি
একটি আশ্চর্য রাস্তার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়েছিলেন
সবার সামনে আপনি নিজে দাঁড়িয়েছিলেন
কোনও রহস্যে মুড়ে রাখেননি নিজেকে
আমার জীবনও এখন স্পষ্ট কাঁচের মত হয়ে উঠছে
মৃত্যুকে ডিঙ্গিয়ে যাচ্ছে আমার জীবন।

সমস্ত দলিতদের মসিহা ছিলেন আপনি
সমালোচকদের কথায় কিছু মনে করতেন না আপনি।
যারা পরিহাস করত তাদেরকেও দূরে সরিয়ে দিতেন না।
দৃঢ় পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে থাকতেন আপনি মাটির ওপর
যে মাটি অনেকদিন আগেই তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি হারিয়েছে
কুৎসার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন আপনি
স্পষ্ট ভাষায় কথা বলতেন আপনিঃ
কারন মানুষের মুক্তি চেয়েছিলেন আপনি
যে হৃদয়ে সবকিছু সহ্য করতেন আপনি
সেখানেই বিদ্রোহের আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ত
কিন্তু আপনার বিদ্রোহ কখনও দিশাহীন ছিল না
দুনিয়াটাকেই পাল্টে দিয়েছিলেন আপনি
নতুন দৃষ্টি, নতুন হৃদয়
সন্ত্রাসে না, জাগরণে বিশ্বাস করতেন আপনি
শিক্ষা আর সেবার ওপর দাঁড়িয়েছিল এই জাগরণ।

আপনার ‘বাবাসাহেব’ নামটিই সবকিছু।
একটি বিশাল বটগাছকে আপনি একা উপড়ে ফেলেছিলেন
অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন হাতে
কিন্তু হত্যাকারীরা যে অস্ত্র তুলে নেয় সেসব না!
অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন আপনি
ঈশ্বরের ময়না তদন্ত করেছিলেন আপনি
সেই লোকদেবতাটির নাক কেটে ফেলেছিলেন আপনি
মানুষ যাকে ভয় পায়
পাপ-পুন্য, স্বর্গ- নরকের ফাঁপা গল্পগুলিকে
নর্দমায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন
তেত্রিশ কোটি দেবতার ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন আপনি।
জলে আগুন জ্বালতে পারতেন আপনি
আপনার কণ্ঠে সেই জোর ছিল
আপনার কথায় স্বর্গ ভেঙে টুকরো হয়ে যেত
আপনার কথায় দ্রুত এগিয়ে আসত ঋতুরা।
আপনাকে সারা দুনিয়ার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে
আগুন নিয়ে খেলতে হয়েছে আপনাকে
ঝড়ের মধ্যে গানের সুর খুঁজে পেয়েছিলেন আপনি।
দুঃখ,
দুঃখের উৎস
দুঃখ থেকে মুক্তির রাস্তা
বাঁজা জমির ওপর মুক্তির রাস্তা তৈরি করেছিলেন আপনি
ঘৃণিত মানুষদের স্পর্শ সহ্য করেছেন দিনের পর দিন
প্রিয়জনদের দূরে সরিয়ে রেখেছেন
আবেগকে সংযত রেখেছেন, হতাশাকেও নিয়ন্ত্রন করেছেন।
জীবন মানে দুঃখ
জরা মানে দুঃখ
ব্যাধি মানে দুঃখ
মৃত্যু মানে দুঃখ

আপনিই তো লড়াই করতে শিখিয়েছেন
ছোট, বড় সাফল্য তুলে দিয়েছেন আমাদের হাতে
মানুষকে স্বচ্ছ করে তুলেছেন আমাদের কাছে
এখন কাঁচের মত এপার ওপার দেখতে পারি আমরা।

ওরা ভাবে, ওরাই একমাত্র দেখতে পারে, বাকিরা অন্ধ
ওরা ভাবে, সবাই ওদের পায়ের নীচে থাকবে
ওরা ভাবে, সবাই দুর্বল
ওরা আসলে মানুষের ছায়াকেই ভয় পায়
ওরা নিজেদের বর্ম দিয়ে ঢেকে রাখে
ওরা নিজেদের ওপর উইপোকাদের ঢিবি বানাতে দেয়
ওরা নিঃশ্বাস নিতে পারে না, বিষাক্ত থুতু ছেটায় শুধু।

এরপর থেকে কারও উচিত না দুর্বোধ্য কোন কিছু লেখা।
গাধায় টানা লাঙল দিয়ে চাষ শুরু করা উচিত
-ঐ আঁচড়ের দাগটি থেকে

সকলের জন্য সমান অধিকার
অথবা
ভারতবর্ষের মৃত্যু

- এবং হৃদয়ে খোদাই করে লেখা
আম্বেদকরঃ ১৯৭৮




উৎসর্গ

বাবাসাহেব-
আমাকে ক্ষমা করুন!
আপনি পুতুল পুজাকে ঘৃণা করতেন,
অনুগামীদের আপনি কখনো আপনার পূজা করতে দেননি।
কিন্তু আমি এই অপরাধটি করে ফেলেছি!
আপনি চলে যাওয়ার পর আপনাকে নিয়ে
কবিতা না লিখে থাকতে পারি নি আমি।
বাবাসাহেব, আমি আপনার পায়ে মাথা ঝুঁকিয়ে রাখলাম
যা শাস্তি আপনি দেবেন,
সারা জীবনের জন্য আমি তা মাথা পেতে নেব।
পুরাণের গল্পে তো এরকম অনেক ঘটনা ঘটেছে
অভিশপ্ত মানুষরা আবার তাদের চেহারা ফিরে পেয়েছে।
বাবাসাহেব,
আপনি আমাকে শাস্তি দিলে
আমার জীবন আবার আগের মত হয়ে উঠবে।





নামদেও ধাসালঃ

গত শতকের অন্যতম মারাঠি কবি এবং ‘দলিত প্যান্থার’ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা নামদেও ধাসাল ১৯৪৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি পুণের কাছে পুর-কানেরসর গ্রামে একটি দলিত মাহার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭২ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘গোলপিঠা’ প্রকাশিত হয়। ‘মূর্খা মাতারায়াণে ডোঙ্গর হালাভিলে’, ‘তুহিন ইয়াত্তা কাঞ্চি’, ‘খেল’, ‘গান্ডু বাগিচা’, ‘মী মারালে সুরিয়াচ্যা রাথাঞ্চে ঘোড়ে’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।‘হাড়কি হাড়াভালা’এবং ‘উঝেদাচী কালি দুনিয়া’ নামে দুটি উপন্যাস লিখেছিলেন তিনি।

১৯৭২ সালে, জে ভি পাওয়ার, অরুণ কাম্বলের সহায়তায় আমেরিকার ‘ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টি’-র অনুকরণে তিনি ‘দলিত প্যান্থার পার্টি’-র প্রতিষ্ঠা করেন।তবে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রয়োজনে সমাজ সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে কবিতাকে ব্যবহার করেন নি নামদেও ধাসাল।নাগরিক আধুনিকতার ছদ্ম সংবেদনশীলতাকে ডিঙ্গিয়ে সমকালীন মারাঠি কবিতাকে এক আশ্চর্য বিস্তৃতির দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ‘পদ্মশ্রী’ ,’সেভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু পুরস্কার’ ছাড়াও ২০০৪ সালে সাহিত্য অকাদেমির ‘লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছিলেন তিনি। ২০১৪ সালে ১৫ই জানুয়ারি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মুম্বাইতে মৃত্যু হয় তাঁর।