অ্যাবেরিস্টউইথের কবিতা

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়



স্বাধীনতাসমূহ


সারাগোসা ১৮১২

আমরা তো ক্রমাগত পালাতে চাইছি
রৌদ্র স্বাধীনতা থেকে বাষ্প ব্যাকরণে
গোইয়ার ঘোড়ার পেশিতে সূর্যাস্তের রং
কালো পোশাকে ডিউক পালাফোক্স
একটু দূরে অপেক্ষমান বন্ধু ইংরেজ বাহিনী

স্বাধীনতা তো চিরকালই ক্ষমতার লোভ

স্বচ্ছ্ব ম্লানিমার ওপর এক স্তবক গ্রীষ্ম মালভূমি
দীর্ঘ যুদ্ধ সন্ধেবেলা; ডিউক অফ ওয়েলিংটন কি
কলকাতার গল্প করবেন আমার সঙ্গে?

সালামাংকা

আমি পালিয়ে এসেছি, এমনকি রাস্তায় পড়ে থাকা কারুর বাড়ির চাবির প্রলোভন থেকে
সোনালি হলুদ একটা শীতলতা এখানকার সন্ধ্যায়
এই যে ছাত্রদের ভিড়
তোরমেস নদীর দিকে চলে যাচ্ছি আমরা
একটু পরেই ফ্রাই লুইস দে লেওন শুধুমাত্র
ছাত্রাবাস হিসেবে ধরা পড়বে আমাদের মাথায়
এইসব অচেনা একঝাঁক মুখ আমাকে দেখছে
বদ্ধ বাড়ির দুঃস্বপ্নে ফিরে আসবে
চৌকো ছাদ মিলিয়ে যাবে ছককাটা আকাশে

এই জুলাই বৃষ্টির নয় জেনেও গামবুট
নিয়েছি আমরা – একটু দক্ষিণে গেলে শহর আরপিলেস

মানুষের মুখের কোনও রহস্য বা
নতুন কারুর সঙ্গে দেখা হবার রোমাঞ্চ নেই এখানে
নাকি কেউ অপেক্ষা করেছে দীর্ঘদিন?
আমিই আসিনি শুধু
ইতিহাস একধরণের ধারালো কাঁচি
আমাদের ছবি থেকে নামহীন মুখগুলো কেটে
রাজাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারকে ছড়িয়ে দিয়েছে


ওয়েলিংটন স্কোয়্যার, কলকাতা

সারা ইন্টারনেট তন্ন করেও কেউ নামের ইতিহাস বলতে পারল না শুধু টানটান হয়ে উঠল ১৮ শতক শেষের ধর্মতলা – জেনরাল ওয়েলেসলি দীর্ঘ মারাঠা যুদ্ধের শেষে গরমে নাজেহাল ইংল্যান্ডে ফেরায় মগ্ন

পেশাদার সৈন্যের সামনে শত্রু কি আমার কাজের মত? ক্লান্তি আসে? বিশেষ করে সে কাজ যখন কোনও কোম্পানির?

আমার ফেরার ট্যাক্সি পার্ক স্ট্রিট ছুঁয়ে যায়; বেরিয়াল গ্রাউন্ড রোড, বন্ধুকে ঔপনিবেশিক কলকাতা দেখানোর মধ্যে দিয়ে এসেছি কবরখানায় – ম্যালেরিয়ায় মৃত সদ্য যুবক ইংরেজের এপিটাফ; কোম্পানি পেইন্টিঙের উজ্জ্বল রঙের ছায়ায় স্পষ্ট হাঁটু অব্দি বুট পরা সাহেবরা কাদায় নাজেহাল পাথর বসানো তদারকে...

স্বাধীনতা কি আসলে নিজের মত কোনও জায়গায় কাদার গন্ধ?



এইস্টেথউওড

সিডনি থেকে আসা বৃদ্ধা আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন সম্পূর্ণ খামরাইগভাষী এ মেলায় আমি কতটা আনন্দ পাচ্ছি

বৃষ্টির জন্য প্রস্তুত, উত্তরের বাতাস ও জিভ নেংড়ানো চুম্বন পেরিয়ে যে সব কিশোর ও কিশোরী মিলিয়ে গেল তাদের নাম হোন সেতুহীন অ্যাংগেলসি দ্বীপ

নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে মনে হল এই কাদাস্নান আমাদের অগাস্ট ফুটবলের চেয়ে আলাদা নয় – শুধু এই গামবুটজোড়া যা কিনা ডিউক অফ ওয়েলিংটনের নাম বহন করছে তারা কোনও স্বাধীনতার যুদ্ধ জানে না

ভাষা তো লড়াই দেখেছে তবে আমার ভাষায় কেন যুদ্ধের জোরদার প্রতিশব্দ নেই!



অ্যাবেরিস্টউইথ

তারপর ভুরুর উপরে একটা ভারি ভাব
কাদা মাড়িয়ে চলা ঘোড়া
খুরের ভার ও থেঁতলানো ঘাসে গন্ধ
নেমে আসতে থাকে নাকের পাশ দিয়ে

স্বপ্ন মানে পুকুরঘাটে ঊরু অব্দি কাপড় গোটানো
মহিলার কাচার শব্দ
ব্যবহৃত স্তন অন্তর্বাসহীন লাল ব্লাউজ
নিজেরই পায়ে ভিজে ঘর্ষণ

এরপরেই সমুদ্র আসে, আমার মাঝবয়েসী
শরীরের মত কর্কশ সিগাল ডাক
আমি লাল একটুকরো উপল তুলি
তালুর দাগ মিলিয়ে যাচ্ছে
অ্যাবেরিস্টউইথ টাউনের এলোমেলো রাস্তায়

পাথুরে দুপুর শেষ, এইবার তোমার শহরের সঙ্গে
আমার বোঝাপড়া – মেরুদণ্ডই তো ঘরে ফেরার পথ –
বুঝি চোখের উপর ঘোড়ার ভার
এই বহুদিন অব্যবহৃত দেহে আঁশটে লাল প্রস্তরখণ্ড
আমার বিকেলহীন, আকাশের রেশম পোড়ানো
শহরে ভীষণ বিপদজনক