মাতৃপক্ষ

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

মাতৃপক্ষ ১

নতুন শাড়ির উজ্জ্বলতায় শব্দ করে
হাঁস ,কলাবউ আর শূন্য পালকি
আটপৌরে জীবনের আগমণী
গান গিরিশ , রামপ্রসাদের

দিঘির জলে ফুল আমপাতা সিঁদুর ছোঁয়ানো
বধূ বোধনের মন্ত্রে ঘরে ফেরে
হয়তো পাশেই শুধুই নীরবতা
ছিঁড়ে নেওয়া একশো আট পদ্মের

ঘটের নির্জনতা রাত্রির প্রহর দেখে
ক্লান্ত ঢাকের পাশে শুয়ে
পাত আলতা লোহা ও শাঁখায়
দেবী মানুষী হয়ে ওঠে

বলে , আমার শিব এনে দাও


মাতৃপক্ষ ২
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম । রোদ নিচ্ছে চেয়ার ।
দীর্ঘ সময় কে তাকে ছেড়ে গেছে

মায়ের আদর আর নেই বলে ফুলের
ক্ষেতে বিষন্ন বাছুরের আর্তনাদ

জানালা এসব কথা জেনে গেলে কখন অভিমানে ঘুমিয়ে পড়ি

দেবীপক্ষ এলেই মা আসে আর ষষ্টির সূতোয় বাঁধা


মাতৃপক্ষ ৩
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

বারান্দা আশ্বিন হলে দেবীকে দেখি
তৃতীয় চোখ ঢেকে
বালিকা শিউলি তুলে দেয়

মেঘের শরীরে মেঘ শরীরে
শিহরণ তোলে পাখির
ডানাও জড়িয়ে পড়ে গানে
ভিজে ওঠে দুর্বার দেহ

মায়া চোখ কাজল নিয়েছে
মুখ ঘামতেল মাখা
ঈশ্বরী দেখে নি কিন্তু আমি চিনে গেছি জন্মেছে কাশফুল কিছু
তার এলোকেশে


মাতৃপক্ষ ৪
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

পিতল কাঁসার বাসন ঘাট পেলে
রোদের নজর লাগে গায়ে
জলে তাদের প্রতিচ্ছবি কাঁপে
এ দোলা আর কোন দোলা আনতে যাবে !

শুয়ে আছে নিহত কলাগাছ
দেবী হবার বেদনায়
বিয়ে না হওয়া তাদের পিসিটি
গণেশের খোলা শরীরে
কোন কল্যাণ খুঁজে মরে কে জানে !

গৌরী মেয়েটি এবাড়ি ওবাড়ি
কাজ সেরে পলিথিনে ভাত
আর নতুন পোশাক নিয়ে
নেভা আলোয় হেঁটে গেলে
আরতি শুরু
মূর্তি আর মাটিতে থাকতে পারে না


মাতৃপক্ষ ৫
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

মন্ডপ উমা হয়ে গেলে
আর উপমা লাগে না
ভাবের ঘরে মেয়ে আনন্দ
ফোটায় নাড়ু দিতে দিতে

মেঘের ভিতরে কোথায় কে বাজায়
বিসমিল্লা সাতসকালেই
মায়েদের ভিতরে মেনকা গুঞ্জন
ছাইগাদা থেকে চোখ মেলছে
বিড়ালীর চার সন্তান

ঘুমিয়ে থাকা রাস্তা আড়মোড়া ভেঙে
মেগা স্ক্রিনে লিখে রাখে
আনন্দময়ীর আগমনে ভেসে যাক
বাংলার হৃদয়
ভাঙাচোরা সব পায়ে পায়ে ঢেকে
উড়ে যাক নীলকন্ঠ পাখি


মাতৃপক্ষ ৬
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

সপরিবারে পাখির ফিরে আসা
গাছটিকে আনন্দিত করে
আকাশে কার শাড়ি মেলা
নানা রঙ ছাপিয়ে যায় চোখ

পালক গুঁজে এই যে ঢাকির আসা
কাঠি আর কাঁসরের ছোঁয়ায়
মৃন্ময়ী থাকতে পারে না
ধুনুচি হাতে বালিকা হয়ে যায়

শঙ্খের সাথে জোকারের যোগ
ধুনোর ধোঁয়া আর অগুরু
মিশে যাচ্ছে মানুষ মানুষীতে
ক্ষুদ্রতা ভেঙে যাচ্ছে


মাতৃপক্ষ ৭
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

ভোর অন্ধকারে দেবী জাগে
বীরেন্দ্র ভদ্রের মেঘমন্দ্রিত কন্ঠস্বরে
ঘুমিয়ে থাকা কুকুরটিকে অবাক পায়
ভিজে মাটিতে চিহ্ন আলতা পা

পালকিতে মিলিয়ে গেলে
এক সকালের মেয়ের ঘরে ফেরা
দোপাটির কুড়ি ছড়ানো পথে
বাউলের একতারায় গানের আগম

পুকুরে পুকুরে কলা বউয়ের স্নান
মর্জিনা গোসল করতে করতে
নিজেকে জলের আয়নায়
দেবী ভ্রমে ভেসে যায়


মাতৃপক্ষ ৮
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

কুমারী ভোরের কাছে চোখ
হাতের কচি রেখাগুলি
শিউলি স্পর্শ এ মেলে দিচ্ছে
মুখপদ্মের কোরক

কোথায় সন্ধি হচ্ছে মায়া আর মহামায়ার
শিশির আর রোদ্দুরের ভিতরে
ক্রীড়া নিরীহ কাঠবিড়ালীর
মথের সঙ্গম শেষে ক্লান্ত কুসুমের স্মাইলি

ভিতরে অবিরাম যজ্ঞ আর আহূতি
তোমাকে পাল্টে দিচ্ছে
পোশাক কিন্তু না
ছুঁয়ে আছি তবুও কখন তুমি ঈশ্বরী
নিকট কিন্তু যেন অনেক দূরে


মাতৃপক্ষ ৯
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

কুয়াশা ও ছাগশিশু নবমী
আর যূপকাষ্ঠের আর্তনাদ
ঢেকে দিচ্ছে পুরোহিতের মন্ত্র
ধুনোর ধোঁয়ায় নজরে আসছে না
বৃষ্টি মায়ের চোখের

আয়ুর দেহি শব্দ কানে বড়ো বাজে
অঞ্জলির জোড়হাত থমকে
দাঁড়িয়ে খুঁজতে থাকে সেই
রূপহীনাকেই
তার বিন্দিয়ায় তৃতীয় নয়ন
মায়ার বড়ো টান

নিশি না পোহানোর আর্জি
ফিরিয়ে দিয়েছে কেউ
জমা জলে অসংখ্য তারার টলটল
ব্যথার গভীরে যেতে না পেরে
ভীড়ে ভিড়ে যাচ্ছে
হারানো শব্দটি হার হচ্ছে না


মাতৃপক্ষ ১০
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

জলের ডাক আসছে
গমন বিসর্জন সবই তো জলেই
গলে যাচ্ছো উল্লাসের ভিতর
মাছেরা শুধু টের পাচ্ছে

কালও তো ছিলে আরতিতে
হোমের আগুনে
সেই চেনা মুখে ভীড়ের লাইনে
তোমার গা থেকে সুগন্ধ
ছড়িয়ে পড়ছিল সারা মন্ডপে

সিঁদুর খেলায় তোমার গৌরী মুখ
ক্রমশ রক্তবর্ণ ঢেকে রাখছিল
সেই জলই
ফিরে যাচ্ছো যাও ফের ফিরে এসো
কিভাবে বলতে হয় তাও শিখি নি
জল নামছে ঠিক কোথায়
ছাই সেও কি জানি