অবসাদগ্রস্ত এক লোক

বিভাস রায়চৌধুরী

অবসাদগ্রস্ত এক লোক

আমার উন্মাদ কোনও
রাত্রিবেলা চাঁদ ধরে খায়...

সামলে রেখো, ভালোবাসা!
মৃত্যু আজ ঘন অন্ধতায়...

আমার উন্মাদ মুঠি
ঘোরেফেরে...সমর্থন খোঁজে...
বালুকা শুষেছে আলো
একপলক আমার মগজে...

অস্ফুট প্রণয়, ওই
শুকতারা... জন্মভেজা চোখ...
আমার উন্মাদ লেখে
অবসাদগ্রস্ত এক লোক
খেয়েছে হলুদ তারা!

ঝরে পড়ে আকাশের ছাই...

খাদের কিনারে ঝুঁকে
চুম্বনের অনুভূতি পাই...



______________





পাঠক

আমার যা-যা হচ্ছে হোক গে,
তা বলে তো মিথ্যে হয় না ঘাসের ডগায় শিশির
ঐটুকু তো ধৈর্য ধরি
ভিড়ের চাপে সহ্য করি
আমার যা-যা হচ্ছে হোক গে
তা বলে তো মিথ্যে হয় না তোমার রাত্রি জাগা

সমসময় অপর-নিয়ন্ত্রিত

মিশে যাচ্ছে বাংলাভাষা, শ্রমিক লোকাল, পণ্য হয়ে ওঠা

আমার যা-যা হচ্ছে হোক গে,
তা বলে কি কাউকে আমি দায়ি করতে চাই?
বাক্য এসে ধাক্কা মারে
লিখছি দ্রুত
এত পরিশ্রমের পরে ভাবব কেন
কেউ কি আমার লেখা পড়ছে?

একজীবনে জেনে গেছি তোমার কোনও বিকল্প নেই
কেউ না পড়ুক
কবিতা নিজেই আমার লেখার প্রথম পাঠক!







__________________________




রবীন্দ্রনাথের ছবি

একটা হাত। আলোর প্রিয় হাত।
সাদা কাগজ হাতটা নিয়ে বাঁচে।
অনেক আলো অনেক আলো লিখে
ক্লান্ত কবি মগ্ন হয়ে আছে।

মগ্ন। কিছু দ্বিধায় দিশেহারা।
প্রশ্নাতুর। অন্ধকার। মনে।
‘আমাকে তুমি অস্বীকার করো?’
স্তব্ধ কবি। মগ্ন। সংগোপনে।

পাণ্ডুলিপি কাটতে হয়। স্রোতে
নতুন লেখা সারিয়া নিতে হয়।
স্তব্ধ কবি। শব্দ কাটতেই
লাফিয়ে এলো চকিত বিস্ময়!

আলোর কাছে চিরদিনের কথা
পাঠান তিনি অন্ধকার চেপে।
কিন্তু সেই সংশোধনী কালো
উঠে আসছে ক্ষ্যাপার মতো ক্ষেপে?

স্তব্ধ কবি। মগ্ন কবি। সাদা।
শব্দহীন কাগজ। একা কবি।
কবিতা নেই। সংশোধন আছে।
আলোর হাতে অন্ধকার-ছবি...





________________________



জ্ঞান হারাবার মতো

সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর কে যান জেগে উঠল
আমার ভেতরে...

সারারাত অনেক খুঁজেছি আমি...
কে জেগে উঠল?
কে টের পেল আমি এখন একা?
সে-ই বা আমাকে কী বলতে চায়?

জমিয়ে বৃষ্টি পড়ছিল...
জানলা খুলে বাইরে তাকাতেই
পৃথিবীটা ভেঙে পড়ল কান্নায়...

জানি, এ সবই প্রস্তুতি...
একটা কিছু ফিরে পাওয়ার প্রস্তুতি

কিন্তু কী ফিরে পাব বুঝতে না পেরে
জ্ঞান হারাবার মতো লুকিয়ে পড়লাম...

ভোরবেলা ধড়ফড় করে উঠে
পাগলের চোখে একবার দেখলাম
বহু পুরনো একটা চিঠি এসেছে আমার!
ওই তো চিঠিটা পড়ে আছে জানলার বাইরে...

মুখে বলি ফুটবার মতো আলো ফুটছে পৃথিবীতে...
ছুটে গিয়ে চিঠি কুড়িয়ে নেওয়ার ভঙ্গিতে
নিচু হয়েছি যেই,
অমনি একফালি রোদ্দুর এসে হামলে পড়ল গায়ে...
আর, সব ভোঁ-ভোঁ...
কোত্থাও কিছু নেই!

সেই থেকে ফকির হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি রাস্তায়-রাস্তায়...
খুঁজে বেড়াচ্ছি...

অবশেষে বুঝতেও পারছি, যে লিখেছিল চিঠিটা, সে চায়
আমার জীবনে কেবলই থাকুক
কবিতা লেখার অন্ধকার...
___________________________



কামদুনির মেয়েটির মৃত্যু মনে রেখে

ছিঁড়ে যেতে যেতে আর
মুছে যেতে যেতে
ওই
মেয়েটি গোঙায়!

আমাকে নীরব দেখে
সমস্ত কবিতা মরে যায়...

সব শব্দ শেষ হলে
বুক জুড়ে ভেঙে পড়ে
ভূমি...

আমার প্রেমিকা, শোনো,
আমি তো পারিনি,
যতদিন আসবে না ভোর
মৃতদেহ আগলে রাখো তুমি!



_____________________










সন্ধ্যা

যে-সন্ধ্যা আসন্ন, তার
নৌকোর হৃদয়ে জ্বলে
অপরের আলো

নদীটির জল যেন ভাঙাচোরা কাচ

গাছটির গাঢ় ছায়া ঝুঁকে পড়া ছিপ
তোমার প্রসঙ্গ পরে হবে

চুম্বন বৃথাই, শরীরের
পাতালে ঝিমোয় পরাবাস্তব মাছ...


____________________