মিশেল ফুকো ও মামুন হুসাইনের চিকিৎসাপদ্ধতি

ওবায়েদ আকাশ

এক প্রকারের চাওয়া

আমার দুটি সন্তান, তারা
অচলায়তন থেকে বিদ্যায়তন- দিনরাত দাবড়ে বেড়াতে শিখেছে

ওদের কারো হাতের কলম এবং
কারো হাতের ঝুনঝুনি থেকে দীর্ঘ চল্লিশ বছরের দূরত্ব মেপে
এই মাত্র কুমার নদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছি। আর দেখি
বড়শিতে আটকে পড়েছে তুমুল শৈশব-

সমস্ত শারীরিক কসরত দিয়ে বড়শিটি টানছি আর
ক্রমেই তা ভারি হয়ে হয়ে কখনো উঠে আসছে আমবাগান, ঝাউবাগান
আবার কখনো দেখি রাইসর্ষের মাঠ, চলনবিলের ঢেউ, সবুজ কলমির দাম

এবার যখন শোল বোয়াল মৃগেলের লেজে তাড়া দিতে দিতে
বাড়ির দিকে ছুটছি; আমার সন্তানেরা মোবাইল ল্যাপটপ কিংবা অন্য কোনো
প্রাযুক্তিক বোঝাপড়া নিয়ে দিনের পর দিন ভবিষ্যৎ ভারি করে তুলছে-

এবার আমি মনে মনে ভাবছি যে, তাদের জন্মদাতা পিতার আসনে বসে
এমন কিছু চাইতেই পারি : যাতে একটিমাত্র সুইচ টিপলেই
মুহূর্তে ফিরে পেতে পারি ছেলেবেলার হারানো স্মৃতি- বিল, ঝিল, নদী
অকৃত্রিম সবুজ প্রকৃতি থেকে ঝড়বাদল, আউল বাউল, জারি সারি গান...

আর তুমি কল্কেপাড় শাড়িতে সেজে- গরুর গোয়ালে ধূপ দিতে যাবে!
আর সখিরা সকলে ঢলাঢলি করে, ছুটে যাবে কলাইয়ের মাঠে
ফুঁ দিয়ে ওড়াতে থাকবে অনুর্ধ কিশোরী বয়স





মিশেল ফুকো ও মামুন হুসাইনের চিকিৎসাপদ্ধতি

মিশেল ফুকো পাগলাগারদের বৃত্তান্ত বোঝেন
তার প্রতিটি অস্থিসন্ধির প্রলাপ- ভিসুভিয়াসের উত্তপ্ততায়
মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে অকৃত্রিম অনুরাগীকুলে

পাশ্চাত্য-যৌনতার উন্মুক্ততা ও অবদমন বিষয়ক তর্ক কিংবা
স্বভাব মনোবিকলনকালে, যখন তিনি হেঁটে হেঁটে
আমাদের মধ্যরাত্রিক চেতনার উদ্যানজুড়ে বসিয়ে দেন মীমাংসা;-
আমরা কি তখন ততটাই প্রলাপমুখর গভীর তন্দ্রায়?

কিংবা আমাদের প্রতিদিনের কারাগারের অবিশ্বাস্য বোঝাপড়ায়
যখন মিশেল ফুকো দাম্পত্যে, প্রেমে, রান্নাঘরে, বাথরুমে
অফিসে, বক্তৃতায়, সংগ্রামে, সৈকতে- ঘরে ঘরে পাঠ্য হয়ে ওঠেনা-
আমরা তখন ফুকোর চকচকে টাক উঠোনের আমগাছের ছায়ায়
বিছিয়ে নিয়ে দল বেঁধে দিবানিদ্রায় যাই-

আজ প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্যে দর্শন ও শল্যচিকিৎসার
করুণ পরিণতিজুড়ে একদিন আমাদেরও খোয়াবনামায়
জুড়ে বসেছিল মিশেল ফুকোর আসমান-সমান প্রকাণ্ড- ছায়া

তবু ফুকো আমাদের প্রতিদিনের আসবাবপত্র ঝাড়মোছ
ঘষামাজায় কতটা কি যোগান না যোগান, তার চেয়ে বড়
তিনি আমাদের অগণিত প্রধান সড়কের পাশে পদ্মপাতার
অসংখ্য শুশ্রূষালয় ফেরি করে ফেরেন ফরাসি ভাষায়-

তখন আমি আমাদের অসামান্য কথাকার, মনোচিকিৎসক
মামুন হুসাইনের শরণাপন্ন হলে- তিনি আমাকে তার উপন্যাস
ও গল্পের বিভাষায় একটি টাকা আটকানোর রাবার বাঁহাতে লাগিয়ে
চলতেফিরতে ও সময়মতো টেনে আবার শরীরে ছুড়ে মারতে বলেন!
তাতে আমি যেমন চিৎকার করে সুস্থ হয়ে উঠি;
তেমনি দিনদিন মামুন হুসাইনের অন্ধ ভক্ত হয়ে- প্রতিদিন তার
কোলেপিঠে চড়ে মিশেল ফুকোর বেবাক গল্প শুনি



প্রাকৃতিক সত্য

মায়ের মুখ থেকে শোনা প্রতিটি গল্পই
প্রাকৃতিক সত্যে ভরপুর

আমার মায়ের প্রতিটি উচ্চারণ এখন
কোথাও না কোথাও কোনো গভীর অরণ্য কিংবা
সামুদ্রিক অবয়ব নিয়ে বেঁচে আছে

জানি যে মায়ের প্রতিটি কথা কিংবা
একটিও বাক্যাংশ আমার স্মরণে থাকবার কথা নয়
কিন্তু তার কবরের পাতাবাহার ও শেফালিফুলেরা
প্রত্যহ নিয়ম করে
বিচিত্র রঙ ও গন্ধ পাঠিয়ে থাকে-

ভেবে তাদের বলি- বলো দেখি প্রতিটি সূর্যাস্তকালে
আমার মায়ের মুখ কত দূরব্যাপী বিস্তৃত থাকে?

তখন কেউ কেউ যেমন মায়ের হাতের রান্নার
শংসা রচনা করে, কেউ কেউ আবার
মায়ের মুখে শোনা গল্পে পৃথিবীকে প্রাকৃতিক করে তোলে




বৃষ্টির জন্য

বৃষ্টির ওপর ঘোড়া চাপিয়ে
বিদ্যালয় ঘরে নিয়ে এলো বাবা

মায়ের উৎকণ্ঠা তখন
টিফিনের মাছগুলো ভিজে জলে নেমে গেলে
আজ অনাহারে থাকত ছেলেটা!

বাবা ভাবছে, আর এমন হলে
মাছের ছেলেমেয়েগুলো
পুনর্বার ফিরে পেতো তাদের বাবা-মায়ের ওম

এমন বৈপরীত্য সত্ত্বেও আজ
দীর্ঘকাল পর পেছনের জংধরা শাহী দরজাটা
বৃষ্টির জন্য খুলে দিলো তারা



ট্রেন

ট্রেনটি গাছে ওঠার ছলে
তোমার আমার মাঝখান দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল

আর দু-পাশের দরজাগুলোয় ঝোলানো থাকলো
উভয়ের জন্য অভ্যর্থনা

অভ্যর্থনার মুখ একবার অতলে একবার ইথারে
শ্বাস গ্রহণে ব্যতিব্যস্ত বলে
তারা আমাকে দেখছে পাচ্ছে না

আর যতবার ট্রেনের এপার থেকে ওপার
তোমার দিকে হাত বাড়িয়েছি
ততবার কিছু প্রকাণ্ড জাহাজ
আমার জন্য বয়ে এনেছে সামুদ্রিক অভ্যর্থনা

সকলে যা জানে, এই ট্রেন
কখনো তোমার বাড়িতে কখনো আমার বাড়িতে
নিশ্চিন্ত দৌড়ঝাপ করে কাটিয়েছে তাদের
প্রেমিক-কৈশোর, বিকল্প শিশুবেলা

আর তুমি আমি এই ট্রেন কাঁধে করে
পাহাড় সমুদ্র প্রপাত- নিমিষে ঘুরেছি

দু-চোখে অজানা ভ্রমণ সাজিয়ে, একদিন
বিভোরে ছুটতে দিয়েছি অবিশ্বাস্য অনুগত ট্রেন-



একটা কিছু বলছে

নিজেই করেছ নিজেকে এমন নিঃস্ব
হাড়গোড় ভেঙে পড়ে থাকা কিছু চিত্রে
কাকেরা খেয়েছে শালিকের কিছু অন্ন
অথচ তোমাকে তাক করে আছে বিশ্ব

তুমি তারপরে ফুটপাত ধরে হাঁটছ
সম্মুখে নদী পশ্চাতে সে কী কান্না
ঘুম ফুটো হয়ে সংসারে এত বন্যা
বিপ্লবী আজ শানশওকতও ঘাঁটছ

ছেঁড়াখোড়া দেহে রিফুকর্ম তো চলছে
ক্ষতভেজা পায়ে নতুন জুতোরা উঠল
টাওয়ার-মুকুরে নিজেকে খোঁজাই নিষ্ফল
নির্ঘুম রাত কিছু তো একটা বলছে

অবশ টেবিলে কান্নারা বসে চুপচাপ
মুখোমুখি কেউ কড়ে আঙ্গুলে ঘুরছে
কারো ঠোঁটে আছে বাঁচবার দাবি দীর্ঘ
কারো বুক কেটে কেড়ে নেয় কেউ উত্তাপ