"বিভ্রম"

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা

গল্পটা সেই ১৯৯৪ সালের; যখন ক্লাস নাইনে পড়ি| নাহ ভুল বললাম! আবার পুরো ভুলও হয়তো নয়| আসলে শুধু ১৯৯৪ এর বলা যাবে না; কেননা গল্পটা শেষ হয়েছিল আরো অনেক পরে| কিংবা কে জানে, হয়তো আজও শেষ হয়নি! সে যাইহোক, যা বলছিলাম-- ৯৪ এ যখন ক্লাস নাইনে পড়ি; তখন হঠাৎ আমাদের ছোট্ট শহরে বিরাট এক শোরগোল শুরু হলো| 'চুপচাপ নিরিবিলি সীমান্তবর্তী মফস্বল সাতক্ষীরা' রাতারাতি আলোচনার শীর্ষে উঠে এলো| ঘটনার সামান্য ভূমিকা এখানে প্রয়োজন!


ফেইসবুক তো দূরের কথা, তখন ইন্টারনেটেরও যুগ নয়| জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর লিডনিউজে নিয়মিত কয়েকদিন কোনো নাম আসতে থাকলেই তা সু/কুখ্যাতি পেয়ে যেত সেসময়| সদ্য নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়া 'যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত' গোলাম আজম এর প্রথম সমাবেশস্থল নির্ধারিত হলো সাতক্ষীরায়| সাতক্ষীরা সবসময়ই জামাত ইসলামীর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হয়| বিবেচিত হতো তখনও| সে হিসেবে, তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই ঠিক ছিল| তখন ক্ষমতায় ছিল জামাত-বিএনপি'র জোট সরকার| তাদের সফল একটি সমাবেশ করা জরুরি, কেননা শহীদ-জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বাধীন 'ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি'র সকল আন্দোলনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গোলাম আজমের নাগরিকত্বের এই রায়!


তো, এই খবরের পরপরই দেখা গেল দু-চারজনের ফিসফাস| চার/পাঁচদিন বাদেই মোড়ের চায়ের দোকানগুলোতে আরম্ভ হলো তুমুল আলোচনা, বাদ-প্রতিবাদ| সাতক্ষীরার প্রাণকেন্দ্র 'শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক'-এ, গোলাম আজমের সমাবেশ হবে ~ তা সফল করতে তোড়জোড় শুরু করেছে জামাত এবং এর অঙ্গ সংগঠন ছাত্রশিবির| সাথে পরোক্ষ সহযোগিতায় বিএনপি| বিপরীতে বিভিন্ন ছোট বাম দলগুলো সহ জেলা আওয়ামী লীগও শুরু করেছে প্রতিরোধের আগুন-মিছিল| ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী সহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোও নেমেছে কোমর বেঁধে| সাধারণ মানুষও এদের সাথে যোগ দিতে শুরু করল ধীরে ধীরে| ছাত্রদল প্রথমে কিছুদিন চুপচাপ থেকে পরে 'জেলা বিএনপি'কে চাপ প্রয়োগ করেছিল যেন এই ইস্যুতে তারা জামাতকে সাপোর্ট না দেয়! কিন্তু তাতে যখন লাভ হলো না, তখন উল্টো তারাই কেন্দ্র থেকে আসা দলীয় সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে ছাত্রলীগ-ছাত্রইউনিয় এর সাথে সমাবেশ-বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিলো|


নাহ, 'ধান ভানতে শিবের গীত' গাইছি না| এটুকু আমাকে বলতেই হবে! কেননা, আমার গল্পও যে এখানে! আমার মনে হয়, চৌদ্দ, পনেরো, ষোলো - এই বয়সগুলো একটু অন্যরকম| এ বয়সের আবেগ অতিরিক্ত| এ সময় যেকোনো বিশ্বাস থাকে তীব্র| প্রেমে কিংবা অপ্রেমে, দ্রোহে অথবা দ্রোহের বিপরীতে অনুভূতির তীব্রতা বেশ একটু বেশিই থাকে| সম্ভবত আমারও ছিল| আমিও তাই দারুণ উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম| গোলাম আজম এর সমাবেশ সফল 'হবে' নাকি 'হবেনা'!


অবশেষে সেই উত্তেজনার দিন আসলো| সাতক্ষীরা শহরের আনাচে কানাচে শুধু পুলিশ আর পুলিশ! হাজারে হাজার তরুণেও শহর ছেয়ে গেলো| সম্ভবত জীবনের প্রথম এবং শেষবারের মতো শহরের ছাত্রদল-ছাত্রলীগ হাতে হাত আর কাঁধে কাঁধ মেলালো! 'সমাবেশস্থল রাজ্জাক পার্ক' থেকে আমাদের বাসা সামান্য দূরে| রিক্সায় গেলে ১০ মিনিটের মতো হবে| দুপুর ১২টা থেকেই রাজ্জাক পার্ক তো বটেই, আশপাশের সব এলাকা রীতিমতো রণক্ষেত্র| দুপুর ৩টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা ছিল| বিকাল ৫টা নাগাদ খবর পেলাম, এখনো শুরু করতে পারেনি| হঠাৎ দেখি, পুলিশের সাথে ছেলেদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া আমাদের পাড়ায়ও এসে পৌঁছেছে| আমাদের পাড়াটি এমনিতেই অলওয়েজ রিস্কি| ভোটের সময় দেখেছি! একপাশে 'পাল পাড়া', আরেকপাশে 'সাহা পাড়া' পেছনের দিকটায় আবার 'খ্রিষ্টান মিশনারি পাড়া'| বিবিধ ধর্মের এমন সমাহার রাজনীতিবিদদের কাছে বরাবরই জরুরি! রাজ্জাক পার্ক সংলগ্ন এলাকা ছাড়া শহর-কেন্দ্রের বাইরে তাই একমাত্র আমাদের এলাকাতেই শুরু হলো ব্যাপক গোলাগুলি| পুলিশের ভ্যানে করে ধর-পাকড়ও চলছে সাথে|


আমাদের তিনতলা বাসার ছাদে উঠে রাস্তায় উঁকি দিতেই দেখি, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে! নাহ, পুলিশের টিয়ার গ্যাসের জন্য নয়; রাস্তায় ছেলেদেরকে ফেলে পুলিশের এলোপাতাড়ি বেয়োনেট/লাঠিচার্জ আর বুট জুতোর লাথালাথি দেখে| মাত্র এক/একজনের উপর ৪/৫ জন করে পুলিশের একযোগে এমন বেধড়ক পিটিয়ে যাওয়া, সাধারণ মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব না| আমি, নানী, আমার দুইজন কাজিন অল্পকিছুক্ষনের মাঝেই নিচে নেমে এলাম|


নিচে নামতেই শুনি, উঠোনে সদর দরোজার গ্রিলে কে যেন জোরে জোরে বাড়ি দিচ্ছে আর বলছে, "কে আছেন? প্লিজ আমাকে একটু ভেতরে ঢুকতে দেন!" দৌঁড়ে গিয়ে গেট খুলতেই দেখি, ২০/২২ বছর বয়সী এক মাথা লম্বা একটি ছেলে| গায়ের কাপড়ে ধুলো-ময়লা| ছেলেটির ফর্সা কপাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে| গড়াচ্ছে বাম গাল দিয়ে| রক্তের কিছু ছোপ তার খাড়া নাকেও দেখা যাচ্ছে| খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে লম্বা পা ফেলে উঠোনের পিছন দিকে যাচ্ছে আর আকাশী রঙের ফুল স্লিভ শার্টের গোটানো হাতায়, গাল বেয়ে নামা রক্ত মুছছে| আমরা বাড়ির সকলে হতভম্ব হয়ে দেখছি! কি বলব বুঝতে পারছি না! নানী এগিয়ে গেলেন-

-- ইশ, কিভাবে মেরেছে! এসো পরিষ্কার করে দেই| ওষুধ লাগিয়ে, ব্যান্ডেজ বেঁধে দেই? এখনই রক্ত বন্ধ করতে হবে!
---না না ধন্যবাদ; এসব কিছু লাগবে না! আমাকে বরং আপনাদের পিছনের গেটটা দেখিয়ে দিন; আমি ধানক্ষেত এর ভেতর দিয়ে চলে যাই?
--কি বলছো ভাই! এ অবস্থায় কাউকে যেতে দেয়া যায়? বোসো| পানি আর এক গ্লাস গরম দুধ অন্তত খাও!
---উঁহু, আমাকে যেতেই হবে! নইলে, আপনারাও বিপদে পড়বেন| আমাকে এখানে দেখতে পেলে, এখনি পুলিশ চলে আসবে!


ঠিক তখনি আবার গেটে ধাক্কা! এবার গেটে ৭/৮ জন পুলিশ| নানী এগিয়ে গেলেন| গেট না খুলেই ওদেরকে বললেন, চলে যেতে! এও জানালেন বাড়িতে কেউ নেই| কিন্তু লাভ হলো না! ওরাও নাছোড়বান্দা| পুলিশের সাথে আসা অর্ধ পরিচিত এক শিবিরের ছেলেকেও গেটের ফাঁকা দিয়ে দেখলাম! সে বললো, "ভেতরে একটা ছেলে ঢুকেছে; আমি দেখেছি| সাহা পাড়া'র| শালা মালাউনের বাচ্চা! ...আমাদেরকেও তাই ভেতরে ঢুকতে হবে|" নানী রাগী গলায় বললেন, 'এসব কি কথা? বলছি তো বাইরের কেউ নেই এখানে!' বলতে বলতে গেট খুলতে গেলেন আর আমাকে ইশারায় বললেন ছেলেটিকে পেছনের গেট দিয়ে পুকুর পাড় হয়ে ধানক্ষেতে পৌঁছে দিতে|


আমি ভয়ে-টেনশনে দ্রুত তার শার্টের হাতা ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম পুকুরঘাটে| অবাক হয়ে দেখি, পুকুর লাগোয়া ধানক্ষেতের পিছন-রাস্তায়ও অনেক পুলিশ! ছেলেটি আমার হতাশ চোখের দিকে তাকিয়ে অল্প হাসলো| বললো---

---চিন্তার কিছু নেই| তোমাদের এই তালগাছের নিচে যে বিশাল ঝোপ দেখা যাচ্ছে, আমি এর নিচেই লুকাতে পারবো| কষ্ট করে শুধু একটু জানাবে, পুলিশ চলে গেলে!
--না, ওখানে লুকাবেন না! ওই ঘন সবুজ কচু আর আটষট্টি গাছের ঝোপ হচ্ছে সাপ-গিরগিটির আখড়া| বিপদ হতে পারে! যদি কামড় দেয় কিছু একটা?
---কিচ্ছু করার নেই| পুলিশের চেয়ে আপাতত এরাই ভালো!


কি আর করা! আমি পুকুরঘাটের মোজাইকে বসে একমনে দোআ ইউনুস পড়তে শুরু করলাম| একবার অবশ্য মনে হলো, শুনলাম ছেলেটা সাহা পাড়ার| দোআ ইউনুস কি তার ক্ষেত্রে কাজ করবে? পরক্ষণেই মনে হলো, আন্তরিক ভাবে কারোর শুভকামনা করাই তো দোআ| সবার জন্যই নিশ্চয়ই তা করা যায় এবং করা উচিত! আর করা যাক বা না যাক, সে নিয়ে ভাবনা'র সময় তখন নয়| পুলিশদের সাথের ওই ছেলেটা লিড দিয়ে সবাইকে নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে পুকুর ঘাটে চলে এলো| লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চারপাশে খুঁজলো| শুধু নিরীহ ঝোঁপটিকে তাদের গণনায় রাখলো না| সুতরাং কাউকে না পেয়ে, রাগে গজগজ করতে করতেই ওরা চলে গেল| ওদের গজগজানিতেই জানতে পারলাম, রক্তাক্ত এই ছেলে একাই অনেকগুলো পুলিশ আর শিবিরের ছেলেকে ঘায়েল করে এসেছে| এইজন্যই ওরা খুব খুঁজছিলো ছেলেটিকে| একবার হাতের নাগালে পেলে নাকি পায়ের রগ কেটে দেবে!


কিছুক্ষণ বাদে ধানক্ষেতের ওপারের পুলিশও চলে গেল| অন্ধকারও নামলো ধীরে ধীরে| আমরা ডাকাডাকি শুরু করলাম তাকে| কিন্তু সে আর বের হয়ে আসছে না| সাড়া শব্দও নেই কোনো| ততক্ষনে বড়মামা এসে পৌঁছেছেন| তিনি টর্চ নিয়ে ঝোপের ভেতরে ঢুকলেন| তারপর টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এলেন শিথিল চোখ বোজা, লম্বা একটি দেহ| বুক ধ্বক করে উঠলো! কেন জানিনা মনে হলো, সাপের কামড়ে ছেলেটা মারাই গিয়েছে! কিন্তু না; পুকুর থেকে আঁজলা আঁজলা পানি এনে তার মুখে দিতেই চোখ মেলে তাকালো| অপ্রস্তুত হেসে, উঠে বসলো| তারপর নানীর দিকে তাকিয়ে বললো

---টায়ার্ড হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম| স্যরি, আপনাদেরকে অনেক বিরক্ত করলাম| আমি এখন যাই?
--তুমি তো এভাবে একা যেতে পারবে না| আমরা তোমাকে চিনতেও পারছি না| কোন বাড়ি, বলো দেখি? বাবার নাম কী?
---ঠাম্মা, আপনারা আমাকে চিনতে পারছেন না কারণ আমি এখন আর এখানে থাকি না| কলকাতায় পড়ি| ছুটিতে বাড়ি এসেছি| আমার বাড়ি সাহা পাড়ায়| আপনাদেরকে আমি চিনি| আপনার ছেলে জামিল কাকু আমার মেজোকাকা 'মিন্টু সাহা'র বন্ধু|
--ওহ তাই নাকি! তুমি মিন্টুর বড় ভাইয়ের ছেলে? ভালোই হলো, চেনাজানাই দেখছি|
---জ্বী, আমি ছোটবেলায় ঈদ-এ আপনাদের বাসায় এসেছি| আপনাদের বসার ঘরে বসে সেমাইও খেয়েছি|


নানী সহ সবার সাথে ছেলেটির আরো এমন কথাবার্তার মাঝে বড়মামা ফস করে আমার সুতি লাল ওড়না'র একটা সাইড ছিঁড়ে ফেললেন! অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি, ছেলেটার কপাল বেড় দিয়ে মাথার পুরোটা ওড়নার সেই টুকরো দিয়ে বেঁধে দিলেন| চেপে কয়েক প্যাঁচ দিয়ে! ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে লজ্জ্বায় কুঁকড়ে গেল! বললো "স্যরি! আমি খুবই স্যরি|" তারপর মামাকে বললো-

---কাকু, ব্যান্ডেজ দরকার ছিল না! এখনই বাসায় চলে যাব|
--তা যাও, তবু ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত পড়াটা বন্ধ হওয়া দরকার ছিল| বাসায় ইলেক্ট্রিসিটি নেই; তাই আর বাসার ভেতরে গিয়ে ওষধু/ব্যান্ডেজ খোঁজার ঝামেলায় গেলাম না| আর এই লোডশেডিং এর অন্ধকার থাকতে থাকতেই দ্রুত তোমার বাসায় ফেরা দরকার|
---জ্বী, যাই! কিন্তু আপনারা আমার জন্য এমন করলেন! কৃতজ্ঞতার শেষ নেই!
--আরে বোকা ছেলে, কৃতজ্ঞতার কি আছে? যে কেউই এটুকু করতো| আর হ্যাঁ শোনো, এ হচ্ছে ইয়াকুব| খুব করিৎকর্মা ছেলে, আমার দোকানে থাকে| এখন তোমার সাথে যাবে, বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসবে| রাতে জামিল বাড়ি ফিরলে, তোমার বাসায় ফোন করে একটা খোঁজ নেব|
---জ্বী আচ্ছা! কিন্তু দরকার ছিল না, এতো ঝামেলা করার| আমি একাই যেতে পারতাম!
--উহু, দরকার আছে| বাইরের রাস্তায় এখনো পুলিশ টহল দিচ্ছে| ও তোমার সাথে যাক!
---পুলিশ? এখনো?! তাহলে কি কাকু, গোলাম আজম সমাবেশ করেই ফেলেছে??
--হাহাহাহা ... নাহ! পারেনি! অনেক চেষ্টা করেও সফল হয়নি| পুলিশের প্রহরায় শেষমেশ পালিয়ে যেতে হয়েছে| ....তোমার মতো দস্যি ছেলেতে যে সাতক্ষীরা শহর ভরা, তা আমার জানা ছিল না, বাবা!


উজ্জ্বল হাসিতে চোখ-মুখ মেখে নিয়ে, পুকুরের শেষ প্রান্তে গিয়ে, ছেলেটা ইয়াকুবের সাথে ধানক্ষেতের আইলে নেমে গেল| আমরা সবাই দাঁড়িয়ে ছিলাম অন্ধকারে ঝিল এর মাঠে তাদের উঠে যাওয়া পর্যন্ত| ওরা ঝিল-পাড়ে'র উঁচু মাটিতে ওঠার পরপরই আমরা পুকুরঘাট ছেড়ে বাসার দিকে পা বাড়ালাম| কি মনে করে একবার পিছনে ফিরে ঝিল বরাবর তাকাতেই দেখি, লম্বা ছায়ামূর্তিটিও থমকে পিছনে ফিরে কি যেন দেখছে!


পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনি চারপাশে অদ্ভুত এক হৈহৈ রৈরৈ অবস্থা! আমরা সাতক্ষীরাবাসী এর আগে কখনোই দেখিনি সাতক্ষীরার এমন ঝলমলে উৎসবমুখর সাজ| নাস্তা সেরে স্কুল-ইউনিফর্ম পরে রেডি হয়ে, আম্মার সাথে স্কুলে চলে গেলাম| আপু গেলো কলেজে| রিকশায় কিছুদূর এগুতেই মনে হলো পুরো সাতক্ষীরা আজ রাস্তায় নেমে এসেছে| স্কুলে গিয়ে দেখি, রাজ্জাক পার্ক সংলগ্ন আমাদের স্কুল-বিল্ডিং এ প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে| আমার মা এই নবারুণ গার্লস হাই স্কুলের টিচার| স্কুলের সাথে আমাদের সম্পৃক্ততা তাই অপেক্ষাকৃত বেশি| মন খারাপ করে ঘুরে ঘুরে দেখলাম পুলিশের গোলাগুলিতে কি অবস্থা হয়েছে আমাদের ক্লাসরুমের জানালা-দরোজার! স্কুল কমিটির সাথে টিচারদের মিটিং ঘোষণা করে, ছাত্রীদের ছুটি দিয়ে দেয়া হলো ঘন্টাখানিক পরই| আমি স্কুলগেটে আসতেই পরিচিত রিক্সাওয়ালা জোহর চাচাকে পেয়ে গেলাম| খুশি মনে রিক্সায় চড়ে বসতেই জোহর চাচা জানালেন ছাত্রদল-লীগের নেতারা সহ সাধারণ ছেলে-ছোকড়ারাও নাকি আজ সব সাদা পাঞ্জাবি পরে, শহরের মোড়ে মোড়ে মিষ্টি বিলাচ্ছে! প্রতিবাদী ছেলেদের জয়ের মিষ্টি!


কথা সত্যি| রাজ্জাক পার্কের মোড়ে আসতেই, আমাদের রিকশা থামানো হলো| অপরিচিত এক ছেলে হেসে এগিয়ে এলো| সন্দেশ-রসগোল্লা আর কমলাভোগের প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে বললো~ চাচা এবং আপু আপনারা কে কোনটা খাবেন, খান! যতোগুলো ইচ্ছে, খান! আজ মহা আনন্দের দিন! জিতে যাবার দিন! অপরিচিত মানুষের দেয়া মিষ্টি খাওয়া ঠিক না; তবু খেয়ে ফেললাম| উৎসবের আনন্দ যখন সার্বজনীন রূপে দেখা দেয়, নিয়ম-কানুন ঠিক রাখা তখন কঠিন| এরপর খাঁ ডাক্তারের মোড়ে আসতেই আবার আরেকজন রিক্সা থামালেন| ইনাকে হালকা চিনি| আজাদ ভাই, ছাত্রদলের বড় এক নেতা| চোখ কপালে তুলে দেখি, ছাত্রলীগের রাশেদ ভাইও আছেন তার সাথে! উনারা সাদা পাঞ্জাবি, চোখে সানগ্লাস আর ব্লু জিন্স পরে একসাথে মিষ্টি বিতরণ করছেন| আবারো মিষ্টি খেলাম হাসিমুখে| তাদের সাথে দেখলাম, বালতি বালতি ফুলও আছে| কেউ মিষ্টি খেতে না চাইলে, তাকে নাকি ফুল দেওয়া হচ্ছে!


বাসার খুব কাছে পিটিআই পেরিয়ে পালপাড়ায় আসতেই, একটা ছেলে দৌঁড়ে এসে হাত দিয়ে রিক্সার হ্যান্ডেল ধরে আমাদের রিকশা থামালো| এইটা বাড়াবাড়ি মনে হলো! সবার মতো ডাক দিয়েই সে থামাতে পারতো! বিরক্ত চোখে তাকালাম| সোজাসুজি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে সে বললো-
---হাই, কেমন আছো? আমি রঞ্জন| রঞ্জন সাহা| কাল সম্ভবত আমার নাম বলা হয়নি|
--আপনি? ওহ আপনিই সেই কাল বিকেলের ...
---জ্বী জ্বী.. আমিই সেই কাল বিকেলের অনাহুত অতিথি|
--না না..এভাবে কেন বলছেন! জানেন, চিনতেই পারিনি! আপনি বলার পর আর কপালের ব্যান্ডেজ দেখে এখন চিনলাম| এখন অনেক ফ্রেশ লাগছে আপনাকে| বোঝাই যাচ্ছে না যে কাল কতখানি ধকল আপনার উপর দিয়ে গিয়েছে! ...কিন্তু ওই ময়লা ব্যান্ডেজ চেঞ্জ করে নতুন কিছু লাগাননি কেন?
---নতুন কিছু ডাক্তার বাবু লাগিয়েছিলেন| সেই রাতেই| আমি এটা ধুয়ে, শুকিয়ে আবার পরে নিয়েছি; বাসা থেকে বের হবার সময়|
--আশ্চর্য! কেন!
---হুম... দেখেছ, আজ কি রঙিন একটা দিন! আমরা সাদা পাঞ্জাবি পরেও সব রঙিন করে দিয়েছি, তাই না?
--হ্যাঁ ঠিক| ধবধবে সাদাতেও যে সবাইকে এতো এতো সুন্দর লাগতে পারে তা ধারণাতেই ছিল না| সবাই এমন মিলিয়ে কিভাবে পরলেন?!
---ঠিক মিলিয়ে যে পরেছি তা না! শুধু সাদা পাঞ্জাবিটা সবার সাথে সবার মেলার কথা!...মিষ্টি খাবে না? বলো, কোন মিষ্টি খাবে?
--নাহ মিষ্টি আর খেতে পারছি না! কংগ্র্যাচুলেশন্স এন্ড থ্যাংকস রঞ্জনদা! গ্রেট এচিভমেন্ট ইনডিড! ...ভালো থাকবেন| আমি এখন যাই?
---থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ! যেও কিন্তু একটু দাঁড়াও| ... উমম... এই গোলাপটা নাও! (ঘুরে গিয়ে ব্যাগ এর ভেতর থেকে বের করে আনলেন বিশাল এক লাল গোলাপ)
--গোলাপ? আশ্চর্য, গোলাপ কেন দিচ্ছেন আমাকে?!
---কেন, কি সমস্যা?
--আপনাকে অন্যরকম ভেবেছিলাম!
---তোমাকে দিচ্ছি না! এটা তোমার নানীর জন্য (অপমানে লাল হয়ে গিয়ে, ধীরে ধীরে বললেন)! ঠাম্মাকে বেশ লেগেছে; উনি অন্যরকম একজন মানুষ|
--যাকে দিতে চান, তাকে নিজে গিয়েই দিয়ে আসবেন প্লিজ? আমি এখন যাচ্ছি| বাই!



বাসায় এসে দেখি, সবাই সবাইকে রসিয়ে কষিয়ে আজকের মিষ্টিময় ফুলেল সাতক্ষীরার গল্প করছে| আমিও সব বললাম, শুধু ওই গোলাপ অংশটুকু বাদে| তবে নানীকে একলা পেয়ে আলাদা করে বললাম, 'নানী, ঐ রঞ্জন আপনাকে গোলাপ দিতে চেয়েছিলো|' নানী খুব করে হাসলেন| তারপর বললেন, "গোলাপটা আমাকে নয়, তোকেই দিতে চেয়েছিলো|" বিরক্ত হয়ে গোলাপ চ্যাপ্টার ভুলে, 'দৈনিক সংবাদ' পত্রিকার চমকিত সব টুকরো খবরে ডুবে গেলাম| সে খবর সবই সাতক্ষীরার! তখন তো আর সেইভ বাটনে প্রেস করার যুগ নয়; তাই কিছু সংগ্রহে রাখতে চাইলে পেপার কাটিং করতে হয়! তাই করলাম|


দিন দশেক পরে একদিন ভরদুপুরে জহুরুল হক স্যারের কাছে পড়তে যাচ্ছি| হেঁটে যাচ্ছিলাম; স্যারের বাসা কাছেই| হঠাৎ সাঁই করে একটা মোটর বাইক আমার সামনে এসে রাস্তা আটকে দাঁড়ালো| চোখ কপালে তুলে বললাম -
--আপনি? এই সময়ে! এখানে..?
---হ্যাঁ আমি| কেন, এই রাস্তা দিয়ে কি সব সময়ে যাওয়া যায় না? (হেসে ..)
-- না তা নয়...| আমি ভেবেছি আপনি এতদিনে কলকাতায় ফিরে গিয়েছেন! আপনি না ওখানেই ব্যাচেলর করছেন?
---করছি... কিন্তু আর করবো না ভেবেছিলাম| ভেবেছিলাম, ক্রেডিট ট্রান্সফার করে বা এখানেই নতুন করে আবার কম্পিউটার সায়েন্স -এই ব্যাচেলর শুরু করব| ... আসলে বাবা'র ইচ্ছার বিরুদ্ধে তখন কিছু বলতে পারিনি| তখন মাত্রই তো ক্লাস সেভেনে পড়ি! বড় দুই দিদির বিয়েও দিয়েছেন তিনি কলকাতাতেই| আমাকেও পড়তে যেতে হলো..| জানো, ভালো লাগে না ওখানে! একদম ভালো লাগে না!
--পড়া শেষ করে চলে আসবেন, তাহলেই তো হয়!
---নাহ, মা বাদে বাসার সবাই চায় পার্মানেন্টলি ওখানেই যেন থেকে যাই| কাকাতো-পিসতুতো-জেঠতুত ভাইবোনদের বেশির ভাগই ওপারে চলে গিয়েছে|
--তাহলে মা'র কথা বলে অন্তত এখানে থেকে যেতে পারেন!
---নাহ, মাও তো জোর দিয়ে কিছু বলতে পারেন না| মা যে বাস্তবতা জানেন না, তা তো না!
--বুঝি, অনেকরকম সমস্যা হয় আপনাদের| তবে যারা ওসব করে, তারা কি সংখ্যায় খুব বেশি? তাদের ভয়ে কেন পালতে হবে?
আপনি, আপনারা শক্ত করে বাংলাদেশকে ধরে রাখতে পারেন না?
---পারি কি? ....দুদিন পরপর কাকুকে 'সাহা সুইটস' এর পক্ষ থেকে বিশাল এমাউন্ট এর চাঁদা দিতে হয়| পাশের দোকান 'মুসলিম মিষ্টান্ন ভাণ্ডার'ও চাঁদা দেয়! তবে কাকুকে তার তিনগুণ বেশি দিতে হয়| ...আমার বাবা'র জুয়েলারির দোকান আছে নিউমার্কেটে, জানো বোধহয়| তার জন্যও সেই তিনগুণ চাঁদা তো আছেই; সাথে অতিরিক্ত পাওনা হলো দু/চারমাস পরপর দোকানে ডাকাতি, ভাঙচুর| থানার ওসি বাবার বন্ধু মানুষ| তিনিও নাকি সেদিন সরাসরিই বলেছেন, 'দাদা, আস্তে আস্তে ওপারে গুছিয়ে নিতে থাকুন...দেখছেনই তো দেশের কি অবস্থা!'
--আপনি/আপনারা চলে গেলে, ওরা আপনাদের জমি-দোকান নিয়ে নেবে| লোভী এই মানুষগুলো যত পাবে (মানে আপনারা যত ছেড়ে যেতে থাকবেন), ততই কিন্তু আরো লোভী হয়ে উঠবে| আপনার কি উচিত তাদেরকে সে সুযোগ দেওয়া?
---হা হা হা হা... না নৌজুলা, একদমই উচিত না! ..তবে কি জানো, তোমার সাথে আমার মিল আছে| আমরা দুজনই বোকা|
--মানে?
---শোনো, আমিও এবার থেকে যাবার সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম| বিশেষ করে সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরে রঙিন করা দিনটাতে মনেই করে ফেললাম, বাংলাদেশ বদলে গেছে| এই দেশ যেমন তোমার, তেমন আমারও| ভেবে ফেলেছিলাম, চাইলেই সবাই মিলে একাট্টা হওয়া যায়| প্রতিবাদ মুখর হয়ে নিজের অধিকার রক্ষা করা যায়!
--কেন? যায় না বুঝি?
---নাহ, যায় না! ... শোনো সবাই যখন মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছে, তখন আমার নামে নতুন করে আরো একটা এক্সট্রা মামলা দেওয়া হয়েছে| পুরোনোটা তো আছেই! হাস্যকর সব মামলা, শুনলে হেসে মরবে! আবার গত দুদিন ধরে ... না থাক!
--কী? কী হয়েছে দুদিন ধরে..?
---শুনে কি হবে!
--তবু শুনি?
---বাবাকে এসে থ্রেট দিচ্ছে, 'ছেলে কেন কলকাতায় ফিরে যাচ্ছে না? আর দু সপ্তাহ টাইম দেওয়া হচ্ছে| এর মাঝে চিরতরে ফিরে না গেলে, প্রাণ সায়রের খাল -এ, রঞ্জনের রগ কাটা লাশ পাওয়া যাবে|'
--আপনি তাহলে চলেই যাচ্ছেন?
---আরে দ্যাখো, এতো আস্তে হেঁটেও কি দ্রুত তোমার স্যারের বাসায় পৌঁছে গেলাম!
--আশ্চর্য! আমার স্যারের বাসা আপনি চেনেন?!
---হা হা হা হা... আজ যাই? মন দিয়ে পড়ো! আচ্ছা, নৌজুলা তুমি মাত্র ক্লাস নাইনে পড়ো কেন? আরেকটু বড় হতে পারলে না? জানো, যেদিন তোমাকে প্রথম দেখলাম, সেদিন তুমি যে এতো বাচ্চা একটা মেয়ে তা বুঝতে পারিনি| লাল বিশাল থ্রিপিস পরা, দেবী দূর্গা'র মতো মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা~ সব মিলিয়ে এট লিস্ট স্কুল পেরিয়েছো ভেবেছি!
--কেন! আরেকটু বড় হলে কি হতো?
---কিছু না! কিছুই হয়তো হতো না! এমনি বললাম| ...এই, তোমার নানী কেমন আছেন? উনাকে আমার সালাম দিও!



এ ঘটনার ঠিক ৮দিন পরে, এক ভোরে চমকে উঠলাম, পাশের বাড়ির বকুলতলায় গিয়ে| দেখি, রঞ্জনদা দাঁড়িয়ে আছে নীলচে একটা পাঞ্জাবি আর সাদা চুড়িদার পরে| পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল|

---অবাক হয়েছো আমাকে দেখে?
--হ্যাঁ, তা তো একটু হয়েছিই|
---রোজ ভাবি, কথা বলি এসে...কিন্তু তুমি এমন মগ্ন হয়ে বকুল ফুল কুড়াতে থাকো যে মনে হয়, বিরক্ত করা ঠিক হবে না! রেগে যাবে!
--আপনি কি সম্প্রতি রিপোর্টার এর কাজ নিয়েছেন?! কে কখন কি করে, কোথায় যায় ~সব আপনার নখদর্পনে?
---হা হা হা হা ...সবার সব খবরে কি দরকার? যার যেটুকুতে আমার প্রয়োজন, শুধু সেটুকু রাখলেই তো হয়|
--তাই?
---হুমম ....এই মেয়ে, বলো তো, তুমি কি করো রোজ এতো এতো বকুল দিয়ে? তোমার তো আবার পুজোও নেই আমার মা'র মতো!
--কিছু না! কেমন আছেন আপনি? আপনার মা কেমন আছেন?
---ভালো| ...চলে যাচ্ছি| আজ| আজ দুপুরেই|
--কি আশ্চর্য! ..আজই?! সব ঠিক?
---থেকে যাবার বহু উপায় খুঁজেছি| হলো না তো কিছুই|
--আবার কবে আসবেন?
---তোমার বয়স আঠারো হলে কি একবার আসবো?
--মানে?!
---ঠাট্টা করছিলাম...! সত্যি কথা হলো ~জানি না, কবে আর আসা হবে! মা বলেছেন, আর না আসতে| ২/৩ বছর বাদে আমার পড়াশুনা শেষ হলে, বাবা-মাই বলছেন এখানকার পাট চুকিয়ে কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট কিনে চলে যাবেন|
--ওহঃ...উনারাও..?
---সবাই ..
--হুমম ...! আচ্ছা ওখানে যেহেতু থাকতেই হবে| মেনে নিয়ে ভালো থাকারই চেষ্টা করবেন! ঠিক আছে?
---চেষ্টা কিভাবে করবো? ৮ বছর দীর্ঘসময়| এতোদিনেও যখন সেখানে মন লাগেনি, চেষ্টা করেও আর লাগবে না!
--সবই তো বাংলা! ভাষা এক, কালচারও মোটামুটি এক...
---আমি দ্রুত মানুষকে বুঝে ফেলতে পারি!তোমাকে যতটুকু বুঝেছি, তুমি যদি কোনোদিন দেশ ছেড়ে প্রবাসী হও তাহলে তখন আমার অবস্থা কিছুটা বুঝবে|
--'কিছুটা' বুঝবো?
---হ্যাঁ কিছুটা| পুরোটা বুঝতে হলে, আমাদের দুজনের দেশত্যাগের কারণটা একই হতে হবে! একই না হলে, শুধু কষ্টটুকু বুঝবে! অপমান আর গ্লানিটুকুন সেক্ষেত্রে অজানাই থেকে যাবে!


সেই ভোরের পরে তার সাথে আর দেখা হয়নি| দৈনন্দিন ব্যস্ততা, সাতক্ষীরার পড়াশুনাপর্ব ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়া, অসংখ্য বন্ধুবান্ধব, সব মিলিয়ে রঞ্জনদাকে সম্ভবত ভুলেই গিয়েছিলাম| গল্পটা তাই শেষও হয়ে গিয়েছিলো| এমন হাজার হাজার দেশত্যাগের গল্প আছে, আমাদের আশেপাশেই| এ আর এমন কি! কি লাভ এটাকে আর আলাদা করে মনে রেখে! নিজের সাথে সংশ্লিষ্টতা না থাকলে, সবই তো আমরা ভুলে যাই| আর গল্পটাও তখন 'শোনা কিংবা দেখা একটা গল্প'ই থেকে যায়!


তেমনই ছিল| হঠাৎ ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে দূর্গা পূজার ছুটিতে অদ্ভুত একটা চিঠি পেলাম| রঞ্জনদা'র| ...চিঠি লেখালেখির যুগ তখন প্রায় শেষ| মনে আছে খুব অবাক হয়েছিলাম অমন মোটা একটা খাম দেখে| পূজার ছুটিতে সেবার সাতক্ষীরায় যাইনি, সামনেই পরীক্ষা তাই| পড়ছিলাম, হোস্টেলের রুমে বসে| হলের দাদু রুমে এসে চিঠি দিয়ে বলেছিলেন 'এটা রেজিস্ট্রি চিঠি ছিল| আপনার পরীক্ষা, তাই ডাকপিওনকে বলে আপনার হয়ে আমিই সাইন দিয়ে রিসিভ করেছি|' দাদুকে ধন্যবাদ জানিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা চিঠিটা পড়তে শুরু করি----


প্রিয় নৌজুলা,

সম্বোধনের এই 'প্রিয়'টা চিঠির ভদ্রতা থেকে লিখিনি| চিঠি পড়া শেষে তুমিও তা বুঝবে| প্রিয় মানুষকে 'প্রিয়' ডাকতে পারার সৌভাগ্য সবার হয় না| আমারও হয়নি, তাই চিঠিতেই লিখলাম|

ভণিতা করবো না, কেননা তুমি ইন্ডিরেক্ট কথাবার্তা একদম বুঝতে পারো না| বুঝলে, অনেক আগেই বুঝতে! সুতরাং সোজাসুজিই বলি, 'তোমাকে ভালোবেসেছিলাম'| স্যরি, 'ভালোবেসেছিলাম' না; কারণ 'এখনো তো বাসি'!

ওই যে ইনজুরড হয়ে তোমাদের বাসায় বেশ কিছুক্ষন আশ্রয় নিয়েছিলাম; সাতক্ষীরার এক উত্তাল দিনে, মনে আছে? ঐদিনই তোমার প্রেমে পড়েছিলাম| তোমার চোখে আমার জন্য তীব্র আবেগ দেখেছিলাম| পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছিলাম, দেখাটায় ভুল ছিল| তোমার ইমোশন ছিল আসলে গোলাম আজমের সেই সমাবেশকে ঘিরে, যেমনটা আমারও ছিল| তুমি আর দশজন প্রতিবাদী ছেলে হিসেবেই আমার প্রতি ইতিবাচক সেই আবেগ দেখিয়েছিলে|

আর আমার কি যে হলো! জানোই তো, সবকিছুতে তখন দেশে থেকে যাবার একটা ভালো উপায় খুঁজতাম| তোমার সাথে মানসিকতায়ও হুবহু অনেক মিল খুঁজে পেলাম| মনে হচ্ছিলো তোমার সাথে মিলে গিয়ে আমি এই দেশে থেকে যেতে পারবো| কিন্তু কিছুতেই সরাসরি বলতে পারলাম না ওই ১৮দিনে, ১৮হাজার চেষ্টাতেও| তুমিও বুঝলে না একটুও|

মেনেই নিয়েছিলাম| চলে গেলাম, সেদিন তোমাকে দিতে চাওয়া সেই গোলাপের শুকনো পাপড়িগুলো আর তোমার ওড়নার ছেঁড়া অংশটুকুকে আমার একার বোকা-গল্প বানিয়ে| হ্যাঁ এগুলো আমার সাথেই থাকে| হাসলে নাকি, ছেলেমানুষি ভেবে? হাসতেই পারো| জানো, একসময় কি হলো? মা হঠাৎ উঠেপড়ে আমার বিয়ের জন্য চেষ্টা শুরু করলেন| প্রথমে
বেশ রেগে গেলাম| তারপর একদিন ভরদুপুরে অফিস থেকে আগেভাগে ফিরে, মাকে তোমার কথা বললাম| মা বেশ কদিন মন খারাপ করে ঘুরে বেড়ালেন| এ ঘরে, ও ঘরে| তারপর এই এবছরের শুরুতে বললেন, বাংলাদেশে গিয়ে
তোমার খোঁজ নিতে| আমি বললাম, লাভ নেই মা, ও আমাকে ভালোবাসেনি|

কিন্তু কি যে হলো এরপর! থেকে থেকেই মনে হতে থাকলো~ এই একই গল্পটা হয়তো তোমারও! তুমিও হয়তো 'গল্পটা শুধু তোমার' ভেবে, আমার মতোই কষ্ট পাচ্ছ! হতেও তো পারে! নিজের সাথে নিজের সব যুদ্ধ শেষ করে, বাংলাদেশ আর তুমি 'একাকার' হয়ে গেলে| তুমি আমার হতে যাচ্ছ ভেবে, এই সেদিন শরতের সোনারোদ গায়ে জড়িয়ে সত্যি সত্যি ভোমরা বন্দর দিয়ে সাতক্ষীরায় চলে গেলাম| একদিনের মাঝে অনেক কষ্টে, তোমার ঢাকার ঠিকানা বের করলাম| ঠিক করলাম, দেখা হওয়া মাত্রই সরাসরি বিয়ের কথা বলবো! আর বলবো, 'আমার এতদিনের অভ্যাস, ধর্ম, সম্প্রদায় ~ সবই তোমার হাতে দিয়ে দিলাম| বিনিমিয়ে তুমি বাংলাদেশ সহ আমার হও!'

উত্তেজিত আমি ভোরে ঢাকা পৌঁছেই রোকেয়া হলের সামনে হাজির হলাম| আর কি অবাক কান্ড! জানো, না ডাকতেই তোমার দেখা পেয়ে গেলাম| এই দেখাটা অবশ্য আমার কল্পনাতেও ছিলোনা| ভালো মতো দেখলাম| ঘুরেফিরে বারবার তোমাকে দেখলাম| অবশেষে 'বজ্রাহত আমি' বুঝতে পারলাম তোমার সাথের ছেলেটির সাথে তুমি সম্পর্কিত| পাশ দিয়ে অসংখ্যবার ঘুরেফিরেও তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারিনি| বুঝতে পারলাম ঘোরের মাঝে আছো| এই সেই ঘোর~ যাতে আমি তোমাকে দেখে নয়, তোমাকে ভেবেই দিনরাত থাকি!

ফিরে এলাম| গল্পটি আর দুজনের হলো না| দুজনের যে ছিলই না কখনো! কলকাতায় ফিরে দমবন্ধ করা একটা কষ্ট শুরু হয়েছে| মরে যেতে ইচ্ছে করছে! হঠাৎ মনে হলো, তোমাকে এটলিস্ট জানাই~ আমার একটা ছোট্ট জমানো গল্প ছিল| যেই গল্পটায় শুধু 'তুমি' আর 'বাংলাদেশ' ছিল| তাই এমন চিঠি লিখতে বসা! সাথে শুকনো গোলাপ, লাল টুকরো ওড়নাটিও পাঠিয়ে দিলাম| এখন ভালো লাগছে কিছুটা| চেপে রাখার কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়াটাও তো কম কিছু না!

তুমি নিশ্চয়ই খুব অবাক হচ্ছ| আর একটু পরপর বলছো 'আশ্চর্য'! তোমাকে এই শব্দের ব্যবহার করতে দেখেছি যত্রতত্র| আচ্ছা, এখনো কি তেমন করে, কথায় কথায় 'আশ্চর্য' বলো?

ভালো থেকো! 'প্রিয় বাংলাদেশে আমার প্রিয় তুমি' ভালো থেকো!

------ রঞ্জন|




কোনো একজন মানুষের এমন ভয়ঙ্কর এক কষ্টের গল্পে এভাবে জড়িয়ে ছিলাম! কিংবা এখনো আছি! কখনো ভাবতেই পারিনি!


অনেকদিন আগে চমৎকার একটি গল্প পড়েছিলাম, যেখানে গল্পের নায়িকার খুব গোপন একটা গল্প ছিল| সে বলেছিলো এটা তার একার গল্প| রঞ্জনদার চিঠিটা পড়ার পর থেকে মনে হয়, কোনো গল্পই আসলে কারোর একার হয় না| কম করে হলেও, দুজনের হবে সেই গল্পটা| কিংবা তিনজনের! যেমন রঞ্জনদা'র এ কষ্টগাঁথায় রয়েছে বাংলাদেশ|মূলত বাংলাদেশ! 'আমি'ও আছি| যদিও 'আমি' এখানে তার স্বপ্নের দেশে পৌঁছানোর আধার মাত্র!


প্রথম তারুণ্যের আবেগময় স্বপ্নে যে মানুষ বুকের গহীনে, এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বাংলাদেশকে বাঁধে, তার জীবনে প্রেম আসে হয়তো ভুল সুরে| নিজে ভোলে; কিন্তু কাউকে ভোলাতে পারে না| তখন দূর প্রবাসের এক ভরা জ্যোৎস্না-রাতে, কিংবা রিমঝিমঝিম বর্ষাতে কিংবা বাদামি বিবর্ণ কোনো শুকনো দুপুরে 'প্রিয় বাংলাদেশ' আর 'প্রিয় মানুষ'টাকে সে আলাদা করতে পারে না! কখনো ক্ষনিকের জন্য, আবার কখনো বা সারাজীবনের জন্যই 'বিভ্রম' তার সঙ্গী হয়ে যায়|