একটি স্বপ্নাহত বিমুগ্ধকরণ

সোহম দাস

মংপু। স্বপ্নের মতো জায়গা। ইতিহাসের সাক্ষী থাকা মংপু। যদিও ঘটনাকাল সওয়া দু’বছর। মংপু থেকে আরও একটু উঁচুতে। সুরেল। নামে সুর, অথচ বড্ড বিষণ্ণতা। অতীতের ভারে নুয়ে পড়া দ্বিতল বাংলো। একান্নটা দরজা ছিল-গুগল করে জেনেছি। সুরেলের পাইনবন। কবি ছবি এঁকেছিলেন। খুঁজেছিলাম। পাইনি সে ছবিখানা। পাইনবনের আড়ালে…ও কে? কাঞ্চন না? হবে হয়তো। আরও এগোলে চোখে আসে। একটা রাস্তা। তাগদার দিকে চলে গেছে। তাগদা! আর আছে রংলি রংলিওট। এইখান থেকে একটা ভ্রমণকাহিনীর শুরু হতে পারত।
ঝাউবাংলোর রহস্য। নীলপাহাড়ি বলে কোনও জায়গা? জানি না আছে কিনা। পুবং? জিগ্যেস করা হয়নি। গুগলেও পাইনি। শুধু আছে রংলি রংলিওট। মা খোকাকে ডাকছে ঘুম থেকে। ঢাকাই হাবুল সেনের ব্যাখ্যায় কি অদ্ভুত সারল্য! আক্ষরিক মানে অন্য। এই পর্যন্তই, আর না। হতেই পারত এখানেই গল্পের শেষ। হল না।কারণ? একটা শ্যাওলা রঙের বাক্স। স্টিলের। এখন জং পড়ে গেছে। চায়ের বাগান, কাঞ্চন আর বিউগল হাতে নিয়ে দাঁড়ানো একজন পাহাড়ি মানুষের ছবি! আর তাতে...ঝাউবাংলোর রহস্যোন্মচনের কদিন কি কবছর বাদে দেখা একটা চেনা নাম। সবুজাভ ছবিতে হলুদ রঙে লেখা। Runglee Rungliot. সঙ্গে আরও কিছু কথা! ও তো ইংলিশ! এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। অবশেষে একদিন-This far, and no farther. না, দিগন্তের শেষ নয়, এর চেয়ে ভালো চা আর নেই। বাবাপঞ্চাশ টাকা কেজি দরে একবার ওই বাক্স-চা কিনেছিল। সে চা কেমন ছিল আর বলতে পারেনি বাবা। বাবা তো আর বৌদ্ধ সন্ন্যাসী নয়, নইলে হয়তো বাবাও বলত-এই পর্যন্তই, আর না।
আমার এখনও ঘুম ভাঙেনি। প্যাট্রিক আর হেনরির সাথে জঙ্গলে পিকনিক। চাউমিনগুলো বটের ঝুরির মতো ঝুলছিল। হেনরি ভেবে মাকে বলেছিলাম, সরে বোসো। প্যাট্রিক সিংহ হয়ে জন্মে ভুল করেছিল। আর হেনরি ছিল ভালুক। হেনরিকে নিয়েই আমার বানানো হলিউডি সিনেমা “ব্রাউন বিয়ার”। রিচার্ড ব্রাউন আর তাঁর প্রিয় ভালুকের গল্প। ছোটবেলায় জঙ্গলে কুড়িয়ে পাওয়া ভালুকছানাকে বড় করে তোলা। তারপর সেই ভালুক বড় হয়ে মানুষ মারতে শুরু করল দুই বদমাইশের খপ্পরে পড়ে। রিচার্ডকে মারবার ফন্দি। বুদ্ধিমান রিচার্ড। ওই দুজনই প্রাণ দিল ভালুকের থাবায়। রিচার্ডের গুলি। ছোটবেলার প্রিয় চারপেয়ে বন্ধুর ঘাতক রিচার্ড নিজেই। তারপর তার সন্তানকেও বাড়িতে নিয়ে আসা। ক্লাইম্যাক্স হয়েছিল-রিচার্ডের স্ত্রী বলছেন, তুমি কি মানুষ, বাচ্ছাকে তার মায়ের থেকে কেড়ে আনো? রিচার্ড বলবেন-নো, আই অ্যাম আ ব্রাউন বিয়ার। সিনেমা শেষ। এরকম আরও অনেক সিনেমা বানানো। আর গল্পগুলো বলে বেড়ানো শর্মিষ্ঠাদির মতো কিছু মানুষকে। “আজকে এই সিনেমা দেখলাম, দিদি”।
প্যাট্রিক, হেনরিরা চলে গেছে কবে। একে একে গেছে ঠাকুমাও। নারকেল গাছে বসে হিহি করে হেসেছে!কখনও ডানা মেলে উড়েছে। একসপ্তাহ একা শুতে ভয়। সিংহের একটা সাজানো সংসার। তার বাড়িতে অতিথি চিতা পরিবার। যদিও লায়ন কিং দেখেছি যখন থার্ড ইয়ারে! মানুষ এসেছে অনেক পরে। অন্তত শৈশবে নয়! সেই শৈশব! বিকেল চারটের হিরো! সোয়াট ক্যাটস! ওদের চোখ দেখা যেত না! আমি দেখে ফেললাম একদিন! ওদের জেটে এক চক্কর।পরে জেনেছি ওটার নাম টার্বোক্যাট। মরাল সায়েন্স! মিশনারি স্কুল! নীতিশিক্ষায় জোর দিয়ে শয়তান আর ভগবানের পার্থক্য শেখাত! স্পষ্ট দেখেছি শয়তানের চেহারা! “শয়তান, ভগবানের শিশুর ক্ষতি করে!” অনাবিল বলল, অত বেশি কার্টুন দেখিস না, এসব আরও আসবে তাহলে!
যোধপুরের গোরবান্দ অতিথিশালা। দেখে নিয়েছি ততদিনে চিতোরগড়, রনকপুর, অম্বর, হলদিঘাট! অত দুর্গ, প্রাসাদ, স্তম্ভ, সংগ্রহশালা! শেষে কিনা এক অন্ধকার গুহার সাধু! কাট টু অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ড। অনেকটা নারীটের ভোলাদা দের বাড়ির মতো। সেই বড় লাল মোরগটা, বড্ড ভয় পেতাম। এখনও ভয় করি। তাই দেখলেই কেমন খুন করতে ইচ্ছে করে। খুন দেখেছি কি একটাও? নাঃ, রক্ত, বিষণ্ণতা, মরবিডিটির খোলসে থাকা পৃথিবীটা দূরেই থেকেছে বরং! সেই ভোলাদা আর নেই এখন! স্পাইনের অপারেশনে একটা ছোট্ট ত্রুটি! তবু হাসপাতাল ভাংচুর করেনি ওরা!সেই ইংল্যান্ড কেউ কখনও দেখেনি যেখানে ভোলাদা মাকে ডাকছে, ‘ভাত দেবেনে? বেলা হয়ে গেল!’এবার আরও একটু পশ্চিমে! একদিন অ্যাটল্যান্টিক! তার ওপর দিয়ে ব্রিজ! বাসে করে পার হচ্ছি! অবশ্যই জানলার ধারে! নাহলে দেখতে পাব না তো! ‘বাপি, আমরা এখন অ্যাটল্যান্টিক পার হচ্ছি!’
আবার ছুটছি। একটা চিড়িয়াখানা। শেষদিন। জানোয়ারগুলোকে ছেড়ে দেওয়া হবে। বাঘের খাঁচায় পড়ে যাওয়া। বাঘ নেই। ও, বাঘ বলতে মনে পড়ল। আমাদের বারান্দায় অনেক মুরগি রাখার খাঁচায় চেপ্টে ঢোকানো একটা বাঘ। কীভাবে যেন বেরিয়ে পড়ল। আমি আর বাবা বড় ঘরে দরজা দিয়ে দিলাম, কিন্তু মা তখনও রান্না করছে। আবার বাঘ। একটা হোটেল। হোটেলের সামনেটায় একটা বড় গোডাউন। রোজ দুপুরে হোটেলে বাঘ। গোডাউনে আমরা সবাই। আমি পা কেটে ফেলেছি। ওষুধ হোটেলের ঘরে। খুব সাবধানে। আমার ঘর খোলা। তারমানে ভেতরে বাঘ, আলতো করে ঢুকে যাওয়া। আর মনে নেই। শেষ হয়না কিছু। আরও একবার লড়েছিলাম,কাঁচের অটোম্যাটিক দরজাটা বন্ধ করতে দেবে না কিছুতেই। আমার সঙ্গে পেরে ওঠে নাকি! হ্যাঁ, কোথায় ছিলাম?সেই চিড়িয়াখানা, তাই তো? পাঁচটা বাজছে। আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে সকলে। সমস্ত ফাঁকা। আর কেউ কখনও আসবে না। আমি আর...কে ছিল?এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে না!দুজনে একটা করে খাঁচা টপকাচ্ছি, আর দৌড় দিচ্ছি। লাস্ট খাঁচাটা টপকে দেখি দুজন বসে আছে। “জুটাকে কোনওরকমে বাঁচিয়ো”। ও, ওটা কোনও প্রাসাদের প্রাইভেট মিনাজেরি যাকে বলে, তাই ছিল। ছুটতে ছুটতে একটা মাঠ। অনেকগুলো শেয়াল। ঘিরে ফেলেছে আমাদের। কোথা থেকে একটি মেয়ে। ঝিকিরার বাবলির মত না অনেকটা? চলে গেল! রেখে গেলসামনে একটা গ্রাম।
গ্রাম আর জানোয়ার বড় বেশি। স্কুলের বিশ্বনাথের সাথে খুব বন্ধুত্ব ছিল। ওর নাম শুনেছিলাম ত্রিপাই বিশ্বনাথ। সেই আবার কোন একটা গ্রাম। ব্যাডমিন্টন। মফঃস্বল। উঠোন। ফুলগাছ। সবই থাকত। কখনও কলকাতা দেখিনি। দেখেছি কি? ও, মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউণ্ড দেখেছি। সেওয়াগ ৯৫ করে আউট জীবনের শেষ টেস্টে, দ্রাবিড় ৬৭ ব্যাটিং, তারও শেষ ম্যাচ। সৌরভ, সচিন, লক্ষ্মণ সবাই একসাথে রিটায়ার করছে। পরিষ্কার কানে ভাসা কমেন্ট্রি। “Now India is expecting something very special from Rahul Dravid which he had delivered throughout his entire career..” ফলো-অন বাঁচাতে লড়ছে ভারত।
১৯১১-র আই এফ এ শিল্ড ফাইনাল! যদিও লোকে বলে, ওটা ২০১৬-র ফেড কাপের ফাইনাল ছিল! ও হ্যাঁ, এই তো কলকাতা!ইতিহাস খুব বেশি করে আসে! অমিত স্যার লেখা পড়ে বলেছিলেন, ইতিহাস থেকে অনিতিহাসে অনায়াস যাতায়াত! বর্তমানে থাকার কষ্ট! ‘Midnight in Paris’ দেখার পর একটা জাগ্রত বোধ! “বিংশ শতক”! সায়নীর প্রিয় একটা কবিতা! কি আশ্চর্য, এর কদিন বাদেই ‘ত্রিংশ শতাব্দী’-র অভিনয় মুক্তাঙ্গনে! ভাবনার মিল! আরও একবার! অসমাপ্ত ‘ছুট’! ভয় পেয়ে পালাতে থাকা একটা ছেলে! পালানোর অভিনয় করতে করতে দৌড়বাজ! কিছুদিন বাদেই রবিন রাইটের আকুতিভরা-“Run, Forrest, run!”
ধরো, আবার দৃশ্যপট বদলে যায়! অটোচালক কাকা হয়ে যায় রহমত আলি! আমার চেনা গড়িয়া মোড় হয়ে যায় অন্যকিছু, নিদেনপক্ষে একটা ছাদ! সেখানে একটা ছেলে তার উনিশ টাকা দিয়ে কেনা বাজি শুকোতে দিতে গেছে রোদ্দুরে। পাশেই হাজার টাকার বাজি রোদ পোহাতে পোহাতে ছেলেটাকে বলছে, একটু তফাতে রেখে শুকোতে দে। বাজি, সে কতরকমের! রংমশাল, ফুলঝুরি, সাপবাজি! সাপ! অবলীলায় ধরে ফেলতেন একজন! ছ বছর বয়সে পাওয়া ছ ফুট লম্বা পাইথনে হাতেখড়ি যার, সেই খাঁকি হাফপ্যান্ট আর খাঁকি বুশশার্টের সাথে একটা হাসি, কত কুমিরের কামড় থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছেন, আর বুক থেকে স্টিং রের কাঁটাটা পারবেন না! পারবেননা, স্টিভ? “Danger, Danger, Danger!”
ওই তো আমি! দেখতে পাচ্ছি আমাকে! সবে তো শুরু হল একটা ভ্রমণকাহিনী! এরপর?