ভ্রমান্ধ দৃশ্যের বায়স্কোপ

সুমন সুপান্থ

একলা দিনের বুকের ভেতর ব্যথার তুফান তুলে, মেয়েটাকে কাঁদিয়ে টাদিয়ে, রেলব্রিজের দুই পাতে পা রেখে তুতো এক ভাই চলে গেলে অবলীলায়, দূরে থাকার বেদনা সেইবার শিখতে শুরু। তারপর ওই দূর আর কাছে আসার দ্যোতনা রক্তজবা ফুলের মতো নির্ভার আর রক্তিম হয়ে বুকের ভেতরই জমা পড়ে রইলো কত কাল! আর আজ এখানে এসে মেয়েটার সেই ক্ষতস্থানেই বেপরোয়া এক নোনতা হাওয়া লেগে গেলো যেন!
রবীন্দ্রভাষ্যে বলা যেত নিভৃত নির্জন চারিধার, এমনই এক শূন্যতা নিবিড় হয়ে, ঘাপটি মেরে বসেই ছিলো। তারা তখন খেয়াল করে নি। মহানগরের আগ্রাসী থাবার নীচে এই বনবিন্দু এমন বিবিক্ত হয়ে রইলো কী করে, তারা কেউ কাউকে জিজ্ঞেসই করলো না। মেয়েটা আনত। উচ্ছ্বসিত। ছেলেটা বললো, ‘এ আর এমন কী! ইংল্যান্ডের উইলটশ্যারে একটা বাটারফ্লাই ওয়ার্ল্ড আছে, জানো? হাজারে হাজার প্রজাপতি, মথ, সেখানে। উড়ছে, উড়ে এসে বসে যাচ্ছে তোমার গায়ে, তাদের পাখনার আবির লেগে যাচ্ছে তোমার শরীরেচিন্তা করো !’
মেয়েটির বিস্ময় তখনো তুমুল দুলছে‘এখানেও কম নয়। দেখো কত্তো প্রজাপতি! এই রকম একটা জায়গা আছে আমি তো জানতামই না!’ কৃতজ্ঞতা। এর পরের পর্বও জানা আছে মেয়েটার। ছেলেটা এইবার তার ফেলে আসা মফস্বল কি মফস্বলের মতো গ্রাম আর তার রাঙ্গিফলের মতো স্মৃতিগুলো, নিজের যাতনা, প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে ব্যাখ্যা দিতে শুরু করবে।
‘গ্রীষ্ম মানে কী! টা টা দুপুর। আগুনের তাপে দেখো সব পাকতে শুরু করেছে। রাগি সূর্য তার তীব্র রোদে তৃষ্ণার্ত ফেরিওয়ালার মতো ক্লান্ত শ্রান্ত করে ফেলছে চারপাশকে। হয়ত দু’একটা কাঁচা আম ঝরে পড়ছে টুপ করে। দৌড়াও। কিন্তু তুমি পেলে তো! তার আগেই হয়ত কেউ ছোঁ মেরে নিয়ে গেছে! এমন সময় কি ঘুমাবার, তুমি-ই বলো? কিন্তু মা তখন সমানে ডেকে যাচ্ছে, ‘ঘুমুতে আয় রিপন। জলদি আয় ঘুমাবি’। মা’র ছিলো এই এক বিলাস। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত, ঠিক ভাতঘুম নয়, প্রায় মাঝ-দুপুরে একবার তার ঘুমানোই চাই। সঙ্গে আবার খোকাকে চাই! তা, আমি কী আর এমন; এমন দুপুর রেখে ঘুমানো যায় বলো, তুমি পারতে?’
মেয়েটা পারতো কি না আজ আর সেই মীমাংসায় পৌঁছনো যাবে না কোনো ভাবেই। সবার গল্প যেমন আলাদা, মীমাংসার ধরনও কি তাই নয়? মানব জন্মের রহস্য বোধ করি এই, প্রত্যেকের জন্মযাতনা আলাদাচুল সামলাতে সামলাতে সে ভাবলো। তবে এটা ঠিক, এই ছেলেটার মতো কোনো অনাবিল শৈশব নেই তার। পৌষরাত্রির নির্জনতম কুয়াশাপতনের মতো মখমল কোনো স্মৃতি নেই। আর থাকলেও সে এমন নিখাদ, এমন কবিতার মতো ভাষায় বর্ণনা দিতে পারতো না কোনোভাবেই। অতীতের জন্য এমন উচ্ছ্বাস সে জমাই রাখে নি কোনোদিন। জমাতে জমাতে গিয়ে খুচরো আধুলির মতো পথে পড়ে গেছে ঝনঝন !
গ্রীষ্ম পেরিয়ে ছেলেটা এবার বর্ষায়। জল। শুধু জল। থৈ থৈ। সমুদ্রের মতো হয়ে ওঠা বাড়ির পাশের নদীটা দেখো উঠোন পর্যন্ত এসে গেছে! আর ধুম পড়ে গেছে কে কত বড় করে বানাতে পারছে একেকটা ভেলা। না দেখলে বিশ্বাস করবে না। কেমন একটা উৎসব উৎসব হাওয়া সবখানে। তারপর রাত। কুপির আলোয় অল্প একটু সরে যাওয়া রাত। গরিব, হতদরিদ্র গ্রামজননীর মেয়ে ওই নিশি। সেই নিশিতে যখন আবার চাঁদ উঠছে, তার আলোয় তখন সেই গ্রামকেই আবার মনে হচ্ছে বেহেস্তের পাশের একটা ছোট্ট দ্বীপ। মাথার ভেতর ক্রমাগত ঘণ্টাধ্বনি নিয়ে মেয়েটা তখন মনে করতে চাইছিলো, মিলিয়ে নিতে চাইছিলো দৃশ্যের ভেতরের দৃশ্যগুলোকে। তার ছোটোচাচা এমন করে বলতেন। বলতেন, মানুষের জীবন তো পরস্পরকে নিয়ে এমনই ছিলো। পরে তারা নিজেরা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে। কারা যেন ছিন্ন করে দিয়েছে। আগল খুলে দিয়েছে সমস্ত যৌথতার। এই ছেলেটার সঙ্গে পরিচিত হবার পর থেকে ছোটোচাচার কথা খুব মনে পড়ছে তার। কোথায় যেন একটা মিল আছে দুজনের। কথা বলবার ঢং। সবকিছুকে অনুপম করে ব্যাখ্যা করবার এক আশ্চর্য দক্ষতা। রিপন ছেলেটার প্রতি তার মুগ্ধতা কেবল বেড়েই চলছে। সে কি প্রেমে পড়ে যাচ্ছে? আরে ধুর, কবি কবি স্বভাবের এইরকম ছেলেদের প্রেমে পড়লেই কী আর না পড়লেই কী? এদের নিয়ে বেশি দূর যাওয়া যায় না।
জীবন তাকে এইসব শিখিয়েছে ।
তুমি তোমাদের গ্রাম দেখতে নিয়ে যাবে আমাকে?
প্রায় অপ্রস্তুত এক গলায় তবু কথাটা বলে ফেললো সে। কে যেন বলিয়ে নিলো! ছেলেটাও অবাক। যে ক’দিন থেকে সে জানে মেয়েটাকে, এমন দুম করে কিছু বলে বসবার মেয়ে সে নয়। আর একেবারে গ্রামে যাওয়ার প্রস্তাব! ছেলেটা বললো, ‘গ্রাম তো আর সেই গ্রাম নেই। এখন শহর প্রায়। শহরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। বলতে পারো শহর খেয়ে নিয়েছে আর কি !’
‘তবু যেতে চাই আমি। নিয়ে যাবে?’ প্রায় মিনতি এইবার।
‘হুম, যাবো একদিন।’
আমাদের গ্রামের পাশ দিয়েই একটা ছোট্ট মেঠোপথ, ওটা ধরে কিছুদূর এগোলেই রেললাইন, তারপরই বর্ডার। এই পাশে আমাদের গ্রাম, ওপাশে বিমলদের বাড়ি। বিমল আমার বন্ধু ছিলো। আমি বাংলাদেশি। বিমল ইন্ডিয়ান। তবু সেই বিমলই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলো ছেলেবেলায়। বিকেল হলেই আমরা বেড়িবাঁধের উপর উঠে যেতাম। তারপর দুইজন দুপাশের দুইটা গাছে বসে চিৎকার করে কথা বলতাম। আমি আমার স্কুলের কথা। বিমল বলতো বিমলের স্কুলের কথা। মাঝখানে এইটুকুন বেড়িবাঁধ। এটাই আলাদা করে নিয়েছে দুটো দেশকে। এক আকাশ, তার একই নীল রং। একই মাঠের হাওয়া দোল দিচ্ছে দু’দেশের ধানপাতাগুলোকে। তবু এটা এক নয়। তবু এটা দুই আলাদা দেশ। কী করে হয় বলো তো? মেয়েটাকে বিহ্বল করে দেয় ছেলেটা। তার ইচ্ছে করে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করে, এমন অন্তর কাঁপিয়ে, কবিতার মতো করে কথা বলা সে কোথায় শিখেছে! জিজ্ঞেস করা হয় না। বলে, ‘আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি যাবো’। ছেলেটা আপত্তি করে, ‘এই না মাত্রই এলে! এত্তো সুন্দর একটা জায়গায় নিয়ে এলাম, আর এখনই যাবে!’

মেয়েটা উঠে পড়ে। কিছুদূর হেঁটে আসে দুজনেই। তারপর রিক্সা। ছেলেটা দাঁড়িয়ে থাকে। সিগারেট ধরায়। মেয়েটা ঘাড় ঘুড়িয়ে একবার দেখে। তারপর সামনে তাকায়। দিনের অনেকগুলো অসমাপ্ত কাজের কথা মনে পড়ে যায় তার। যাবার পথে শিলাকে স্কুল থেকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে হবে। গলির মোড়ের দোকানটাতে বাকি পড়ে থাকা টাকার কিছুটা অন্তত আজ দিতেই হবে। বড় মামার বাসায় যেতে হবে একবার। উফ্... মুহূর্তেই অন্ধকার এক তোবড়ানো ঝুপড়ির উপর বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। কালো। ঝমঝম বৃষ্টি। সামনে কিছু দেখা যায় না। কিচ্ছুটি না। এক মুহূর্ত আগের সময়টাকে, ছেলেটার সঙ্গ, কুড়িয়ে পাওয়া, পেয়ে আবার হারিয়ে ফেলা একটা মার্বেলের মতো মনে হয় তার। গড়িয়ে গড়িয়ে অনেক দূর চলে যায় কেবল। হঠাৎ তার কী হয়, সবকিছুকে খুব ব্যর্থ মনে হয়। শূন্য শূন্য লাগে। নিজেকে রিপনের তুলনায় রিক্ত, নিঃস্ব মনে করে আফসোস বাড়ে, কেন যে সে বড় হলো! বড় না হলে তো তারও এমন একটা গল্প জমা থাকত। কিংবা বড় না হলে তার সঞ্চিত গল্পও এমন জমাট বেঁধে থাকত। ক্ষয়ে যেত না। হারিয়ে যেত না। বড় হওয়া অনেক কষ্টের। বড় হলে কেবল মরে যেতে ইচ্ছে করে। শৈশবে যে জীবনকে ঘুড়ির মতো পলকা মনে হয়, বড় হলে তাকেই বোঝার মতো লাগে। সবার কি এমন হয়? মনে হয় না। রিপনকে দেখলে তো মনে হয় তার সমস্ত জীবন একটা ধানিমাঠ, মৌসুম শেষে যেখানে শুধুই সোনালি ফসল। এতো অর্থবহ, জমাট হয় কী করে কারো কারো জীবন? রিপনকে নিখাদ নিছক এক কবি মনে হয় তার। ছোটোচাচাও এমন কবিই ছিলো ভেতরে ভেতরে আসলে। এদের, এই রকম স্মৃতিসঞ্চয়ী মানুষদের খুব ঈর্ষা করে মেয়েটা।
ছোটোচাচা বলতেন জীবন এমনিতে একটা অর্থহীন ব্যাপারই বটে, তবে তাকে অর্থবহ করে তুলে নিতে হয়। ছোটোচাচা তো কত কিছুই বলতেন! ছোটোচাচা স্বপ্ন দেখতেন এই দুনিয়াটাকেই বদলে দেবেন। যৌবনে পাওয়া এক রাজনৈতিক আদর্শ আর আবেগ তাকে বদলে দিয়েছিলো আর সবার থেকে। দুরন্ত করে তুলেছিলো। কবে কোথায় উত্তরবঙ্গের এক বিরাট জনসভায় গেছেন। ছাত্র, কর্মচারী আর মজুরের জনসমুদ্র। ঢাকা থেকে আসা বড় বড় নামকরা নেতার মাঝে উঠে দাঁড়িয়েছিলো এক সাঁওতাল। আঁটসাঁট জামার তল থেকে তার চওড়া কাঁধ আর অসম্ভব শক্তিশালী মোটা ঘাড়ের দীপ্ত ভঙ্গিমা এক মুহুর্তে স্তব্ধ করে দিয়েছিলো গোটা জমায়েতকে। অল্প একটু জড়ানো বাংলায় বলেছিলো, ‘এইটে বাংলা। দেশটো হামার। এই বাংলা বদল করবি...’। পেশল হাত দু’টো মুষ্টিবদ্ধ। ছোটোচাচা অনেকবার সেই গল্প করেছেন। বলেছেন, তার নাকি ঘুমের ভেতর, স্বপ্নের ভেতরও সেই আওয়াজটা গভীর ঘণ্টাধ্বনির মতো বাজে। ‘এই বাংলা বদল করবি...’। এই এই করে, বলতে গেলে তার কাছে কত কী শুনেই তো তার জীবনকে বুঝতে শেখা। জগতকে জানা। ছেলেবেলায় কি তার মেয়েবেলায়, সবে এইট কি নাইন, চাচার এমন সব ভারী কথাগুলোকেও হঠাৎ ভালো লাগতে শুরু করলো। ইচ্ছে করতে লাগলো, বড় হয়ে চাচাদের দলে চলে যাবে সে। গোপনে এক রাতে সব কাপড়চোপড়, মা’র সব গহনা নিয়ে সত্যিই চলে যাবে একদিন। তা বাবা ছোটোচাচাকে যতই বকুক, সে তো জানে ছোটোচাচার স্বপ্নগুলো অনেক সুন্দর। সব সর্বহারারা তো আর ডাকাত নয়! আর ছোটোচাচা তো কোনোভাবেই না। মাঝে মাঝে বাড়ি এলে যে অসীম মমতায় তার লাগানো ফুলের গাছগুলিতে পানি দিতেন ছোটোচাচা; এই জন্মে এমন ভালোলাগার দৃশ্য খুব বেশি একটা তার নেই। এমন মানুষ ডাকাত হতেই পারে না।
সবচেয়ে মুমূর্ষু গাছটাতে পানি ঢালতে ঢালতেই একদিন সবচেয়ে বড় স্বপ্নটা তার চোখে গেঁথে দিয়েছিলেন উনি। ‘জানিস তো তোর নাম কে রেখেছে?’
আমি। ইলা। কেন ইলা রেখেছি, সেটা জানিস?’
মেয়েটা মাথা নাড়ছিলো। জানে না।
‘ইলা মিত্রকে একদিন তুই জানবি। তোদের পুরো প্রজন্মটাই জানবে। জানতেই হবে। তোদের নিজের স্বার্থেই জানবি। না জানলে যে মুক্তি নেই রে। এই নারী একদিন আমাদের এই অঞ্চলে আলো নিয়ে এসেছিলেন। জমিদার বাড়ির বউ ছিলেন, বুঝলি? কিন্তু লড়ছিলেন তাঁর প্রজাদের হয়ে। সব মানুষের ভেতরে আলো থাকে। কিন্তু বারুদ থাকে কেবল অল্প কিছু মানুষের ভেতর। ইলা মিত্র সেটা সবখানে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তুইও একদিন ইলা মিত্র হয়ে উঠবি।’
‘না আমি হবো ইলা লস্কর’। মেয়েটা ফাজলামি করছিলো।
‘ওই হলো। নামে কী আসে যায়? বারুদ পুষে রাখাই আসল...’
পরে, কলেজে পড়তে যেয়ে, হোস্টেলের ছাত্রফ্রন্ট করা আপাদের কাছ থেকে ইলা মিত্রের উপর অনেক বইটই পড়ে সে যখন সত্যি সত্যি মরিয়া হয়ে উঠছিলো ভেতর ভেতর, যখন সেই গরম ডিম প্রবেশের গল্পে এসে তার নিজের নিন্মাঙ্গ অবশ হতে শুরু করলো, আর হাতের শিরায় জমা হতে লাগলো আগুনের মতো গরম রক্ত; তখনই একদিন শুনলো ছোটোচাচার গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া গেছে চকের গহীনে। বালিকার প্রচ- অভিমান থেকে সেই তার অভিশাপ দিতে শেখা। অথচ ভেতর ভেতর অভিমান নয়, অভিশাপ নয়, জেদ সঞ্চয়ের বাসনা ছিলো তার ষোলো আনা। ছোটোচাচাকে সেটা জানানোই হলো না!

হলো না তো আরো কত কিছুই! সাদা এপ্রোন, গলায় স্টেথো ঝুলানো ডাক্তার আপা হয়ে রোগীর সেবা করে যাচ্ছে সেবাবার এমন একটা নির্দোষ স্বপ্নও পূরণ হলো না। বাবা চলে গেলেন বছর দু’এক পরে। বাজারফেরতা স্কুল শিক্ষকের বুকে হঠাৎ ব্যথা উঠলে, যেমন ত্বরিৎ এক মৃত্যুদৃশ্যের ছবি ভেসে উঠে, বাবার মৃত্যুদৃশ্য নির্মিত হলো সেই সব নিয়ম মেনেই। সদরে নিয়ে যাবার সময় মিললো না। বাচ্চাদের সবার মুখ দেখা হলো না। সবার বড় ইলা তখন ইডেন হোস্টেলের ব্যালকনির দড়ি থেকে রোদে শুকোতে দেয়া কাপড় তুলে নিচ্ছিলো, তেরো বছর বয়সি মিলা ছিলো মা’র পাশেই। আর সব ছোটো শিলা তখন খেলার মাঠে।
হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরে বাবার লাশ উঠোনে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে টেদে সেই যে চোখ মুছে নিয়েছিলো সে, পরে অকারণে চোখে জল এনে তার মুল্য আর কমতে দেয় নি কোনোদিন। না, আরো একদিন। ওই তুতো ভাইটা তার প্রেম অবহেলা করে চলে গেলো যেদিন, সেদিন খুব করে কান্না এসেছিলো। পৃথিবীর সব রং মুছে যাচ্ছিলো। একটা হাহাকার তাকে পাখির ঝরে যাওয়া পালকের মতো শূন্য করতে করতে আছড়ে ফেলছিলো। প্রেম! এখন মনে পড়লে হাসি পায়। ছেলেমানুষি। মেয়েমানুষি হবে, না? হা হা হা...
মেয়েটা সেই শহর ছেড়ে এই মহানগরে এসেছে, তরতাজা রূপসি মা প্রায় বুড়ো হতে চলেছেন, ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে তাও কত বছর! মিলা কলেজ পেরিয়ে গেছে। শিলাও স্কুলের শেষ ধাপে। চাকরি খুঁজতে খুঁজতে, চাকরি পেয়ে সেটা আবার হারাতে হারাতে, গার্মেন্টসে গার্মেন্টসে পোশাকের ডিজাইন করতে করতে, আটকে থাকা বেতন তুলে আনতে যেয়ে ক্লান্ত হয়ে উঠে মরে যেতেও ইচ্ছে করেছে বার দু’য়েক। তবু তার চোখে জল আসে নি কোনোদিন। আজ এলো। আজ আবারো ছোটোচাচা... নিজের হাতে লাগানো ফুল বাগান... ইলামিত্রের জীবনী... বাবার মৃত্যুসব সারি ধরে উঠে আসলো রিপনের বদৌলতে। এই ছেলে এতোটা দখলপ্রবণ হয়ে উঠছে কোন শক্তিতে!
স্মৃতিশিহরিত মেয়েটা কান্না মুছে দেখলো আকাশে শেষবেলার খেলা। কোথাও কোনো মেঘ নেই। ভ্রম। তার নিজের মনের সাপলুডু খেলা। পাখিরা তখন ডানায় রং নিয়ে বাড়ি ফিরছে। আর রিপন ছেলেটা তার হাতে গুঁজে দিচ্ছে একটা সবুজাভ পালক। মনে মনে সে রিপনের পালক ধরা হাতে চুমু খেলো। পৃথিবী পৃথিবীকে ঠিক এমনটাই দেখতে চায়। জীবন জীবনকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ায় সবখানে। মানুষ একদিন এইসব জানতো। ছোটোচাচা জানতেন। আজ কেন সব ভুলে গেলো মানুষ? আচ্ছা, রিপন কি জানে? মেয়েটা আসন্ন গোধূলির দিকে প্রেমার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে।
একদিন সত্যি রিপনদের গ্রামে গেলে সে জিজ্ঞেস করে নেবে এইসব।

প্রথমে ভার হয়ে এসে এখন ভনভন করে ঘুরছে মাথাটা। এক লক্ষ জোনাকপোকা এক সঙ্গে নেচে উঠে খেয়ে নিচ্ছে চৈতন্যের শেষটুকু। বাইরে দু’পাশের অপস্রিয়মাণ গাছপালা, দীর্ঘ একরোখা রাস্তাটাসব কিছু আবছা হয়ে যাচ্ছিলো ক্রমশ। মৃত্যুর মতো এক হিম, ঘুমের মতো পেলব এক ক্লান্তি টানছিলো নীচের দিকে। ইলা আর তাকাতে পারছিলো না। মাথার ভেতর বড় একটা নদী বিশাল বিশাল ঢেউ ফেলছে। মরিয়া হয়ে সে তবু চোখ খুলতে চাইছিলো। পারছিলো না।
অথচ আজ দেখবারই কথা ছিলো তার। সব কিছু। আবার নতুন করে। নিত্যদিনের এই যুদ্ধ, শর্ষেদানায় পা রেখে দৌড়ানো কান্নালাগা, দমবন্ধ এই দিনগুলি উজিয়ে ইলা দেখে আসতে চাইছিলো একটা ধানখেত। সারা আকাশ নীল। মাঝখানে এইটুকুন বেড়িবাঁধ। আর ওপারে বিমল বসে কেবল স্কুলের গল্প শোনায়। রাতে অন্ধকার নেমে এলে অনেকগুলো কুপি জ্বলে উঠে একসঙ্গে। এইসব।
সবকিছু দেখে এসে আবার কুড়াতে চাইছিলো তার হারানো স্মৃতিভস্ম, নিখোঁজ আধুলিটা। দেখতে চাইছিলো কী ভীষণ সাহসে ভর করে রিপন এত পরাক্রমশালী হয়ে ওঠে প্রতিবার। কিসের জোরে সে জিতে যায় অনায়াসে। কিন্তু তার মাথার ভেতর এখন সেই ধানখেতটা মরে যাচ্ছে। মগজের পরতে পরতে নীল রং মুছে পা-ুর হয়ে পড়ছে পুরো আকাশ।

ডানহাতে রেন্ট-এ-কার থেকে ভাড়া নেয়া গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে রেখে, বাঁ হাত দিয়ে জুসপ্যাকটা এগিয়ে দিলো রিপন। ‘সবটুকু শেষ করো। ভালো লাগবে’। ইলা মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্ট্রটা মুখে পুরতে চাইলো একবার। পারলো না। বরং বেরিয়ে আসা আমের জুসটা ছলকে পড়ে তার গোলাপি জামাটার একটা অংশ ভিজিয়ে দিলো। রিপন যুগপৎ নির্বিকার আর প্রশিক্ষিত এক ভঙ্গিতে দেখছিলো সব।
তারপর তিন মিনিটের নীরবতা। রিপন আবার বাঁ হাতটাকে কাজে লাগিয়ে মোবাইলের বোতাম টিপলো। ‘কাজ হৈ গেছে বস... ধরেন অর্ধেক সারা। আপডেইট জানাইতাছি...’
গাড়ি সাঁ সাঁ করে ছুটছিলো। রাস্তার এই অংশটা খানাখন্দে ভরা। গাছগাছালি নুয়ে এসেছে কোথাও কোথাও। নিস্তব্ধ। শুনশান। একটু দূরে মরে যাওয়া একটা নদীতে জাল ফেলে বসে থাকা কিছু অলস মানুষ। তাদের শরীরে মেঘের আবছায়া। চকের বাকি অংশে ঝাঁঝালো রোদ।
আর এইসব কিছুর মাঝে, চকের একেবারে গহিনে ফাঁদে আটকে পড়া একটা জলঢুপি কেবল সমস্ত প্রতিরোধের শেষে ধ্বস্ত, ক্লান্তভীষণ, ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ছিলো।