লুচি

প্রলয় মুখার্জী

হাতে লুচি থাকায় দেড় হাত দূরে সে দাঁড়াল। মাঝারি স্বাস্থ্য, চোখের নীচে কাটা দাগ। কোঁকড়ানো লেজ। স্বাস্থ্যবান আর লাজুক। ক্রমশ লুচির দিকে তাকাতে তাকাতে আমার কাছে আসবে কি আসবে না ভাবছে। তখনো অশত্থের ওপর মালগাড়ির ক্ষীণ আলো পড়ছিল।আলোয় ওর কৌতুহল চকচক করছে। লুচির দিকে যতটা আসার ইচ্ছে প্রবল ততটাই আমার কাছাকাছি প্রায়।একখানা লুচি প্রবল ক্ষিদের মুখে দুই ভিন্ন প্রজাতি প্রাণীর মাঝে ঝুলছে। চাঁদ থেকে সাদা সুতো আর বঁড়শি গাঁথা লুচি, মাটিতে গোল তার ছায়া।

লুচির সাহায্যে আমি আর স্টেশনের কুকুর এই রিক্ত জগতে ফের অস্তিত্ব লাভ করলাম। পাঁচবছর পর এই প্রথম কেউ কাছে এল। আমার শুখনো হাত চেটে দিতে বুঝলাম কাছে টেনে নেওয়ার হাত আমারও প্রবল।প্রবল শীতে আমার গা ঘেঁষে বসেছে। ওর দেহের উত্তাপ আমার দেহে সঞ্চার হতে ভালই লাগল। মাথায় হাতবুলিয়ে লুচি দুটুকরো করলাম। খেতে খেতে কিছু বুঝে নিতে চাইছিলাম যখন মাল ট্রেন দ্রুত বেড়িয়ে গেল।

গার্ড সবুজ পতাকা উড়িয়ে ফের কেবিনে ঢুকে গেল, আমার চোখে কয়লার গুঁড়ো, চোখ কড়কড় করছে, দু চোখে জল। এই দিনেই উকিল সাহেব খবর দিয়েছিলেন দোষী সাব্যস্ত হতে পারি। সাজা যতটা কম হয় চেষ্টা করবে। সাজা তো কম হল দশদিন, আমি আর নবহরী প্রায় পাঁচ বছর পর বাড়ি ফিরছিলাম। ফেরার পথে দেখলাম মুমুর্ষ বেঁজির দেহ, মুখের কাছে রক্তের স্ফটিক। পেট ধুঁকছে, চাকা এই মাত্র তলপেটের ওপর দিয়ে যেতে গিয়েও পিছলে গেছে। দূরে, গাড়ির ভিতর থেকে ভোজপুরি গান ভেসে আসছে, যদিও সাদা গাড়ি চেপে কারা কোথায় চলে গেল কোনোদিন জানা যাবে না। হয়তবা ভক্তিগীতি চলছে।

নবহরী বেঁজির লেজ ধরে ঘাসের ওপর রেখে দিল কেন?দু চোখ ওর লাল, ও ডাকাতির কেসে ছিল। আমি প্রতারণার। এখন মুমুর্ষ বেঁজির দিকে তাকিয়ে কেউ কাউকে ক্রিমিনাল মনে করছি না। আমরা প্রত্যেকেই জঘন্য কাজের মধ্যে দু একটা বেঁজির প্রতি এমন সহৃদয় হয়ে উঠি, নির্জন নদীর তীরে বসে গাঁজা সেবনের মত আনন্দ হয়, আনন্দ ফুরিয়ে গেলে লোকে বলে ওই ক্রিমিনাল আসছে। জেল খাটা মাল।এই উক্তি নবহরী করল, আমায় গালুডি স্টেশনে অমুকদিন আসতে বলল। ওর পরিত্যক্ত ধানজমিতে লেবুগাছ লাগানোর কথা বলছিল। দুচোখ নবহরীর গোল গোল, কপালের অনেকটা ভেতরে ঢোকা। কামানো বগল, চ্যাপ্টা বুক। কোমোর নেই বললেই চলে। পাতলা শরীরেও কি কারণে পেটে চর্বি জমেছে। খুঁড়িয়ে চলছে। ডিম্বাকৃতি মুখ নিয়ে হাসলে বোঝা যায় হাসিটা প্রহরীর নজর এড়িয়ে চামড়ার নীচে লুকিয়ে ছিল। ঘোলাটে চোখ যদিও, যাওয়ার আগে আপ্রাণ বোঝাচ্ছিল গালুডি এলে লাফিয়ে নামতে হয় ট্রেন থেকে। ফের হাসি। তারপরও ট্রেন থেকে মুখ বাড়িয়ে কিছু বলছিল, কথা শুনতে পাইনি। ট্রেনের হুইসেল ভেদ করে নবহরীর হাসি ছুঁয়ে যাচ্ছিল ঘুঘুর বাসা, কুকুরের ঘুম আর আমায় । দ্রুত ট্রেন নবহরীকে নিয়ে মিলিয়ে গেল। স্টেশনে পড়ে রইল তার প্রতিশ্রুতি, খুচরো আশা। কিছু কিছু মানুষ কোনো কারণ ছাড়াই যে ভাল লেগে যায় নবহরী তাদের একজন।সহজেই পাশ কাটানো যায়, কথা না রাখলেও হাসে। রাখলেও।


আজ দুটি জামা। স্যান্ডো গেঞ্জি , সাদা হাফপ্যান্ট, মোজা আর দাড়ি কামানোর বাক্স গুছিয়ে ফিরে এসেছি স্টেশন। ট্রেন রাত আড়াইটেয়। সময় বাকি আছে বলেই তনিমার কথা মনে আসছে। এতদিনে তনিমা স্যাণাল তনিমা দাশগুপ্ত হয়েছে। ডক্টর হৃতেশ দাশগুপ্তের স্ত্রী।তা ভালই লাগছিল। তনিমা তার অন্তঃসত্বাকে বাঁচাতে চেয়েছে, পেরেছেও। এখনই তোমার মনে আসা উচিত হয়নি। আমার সে বয়স নেই, চাকরীও নেই। উপরন্তু পাঁওরুটি মুখের ভেতর এত বেশি ঢুকিয়েছি, জল খেতে গিয়ে গলায় আটকেছে, এখন তুমি নয় নিশ্বাস মনে পড়া উচিত। বিষমের শব্দে কুকুরটা চমকে উঠছে। ওকে আদর করছি।

তুমি ছাড়াও বাঁচার উপায় আছে এটা ভেবে গর্ব বোধ করতে যাচ্ছিলাম , তুমিই গর্বিত হলে অন্তঃসত্বাকে বাঁচিয়ে। মায়ের কাছে সন্তানের চেয়ে গুরুত্ব কিছুই নেই। দেখেছি মুমুর্ষ বেঁজি ফের বেঁচে উঠবে বলে উঠতে যাচ্ছে আর পড়ে যাচ্ছে। ধুলো ওর নাড়ি আর রক্তে আটকে যাচ্ছে।পেট ঘষে ঘষে চলার চেষ্টা করছিল। ফের ঝোপের ভিতর ডেকে নিচ্ছিল সন্তানদের। হয়ত এখনই মারা যাবে।

এখন থাক তোমার কথা, তোমার প্রসঙ্গের অতীত থাক। ওই অফিসেই তুমি আছ শুনেছি। আ্যকাউন্ট্যান্ট ভুবন মাঝি ভেবেছিল তোমায় নিয়ে পালাবে। পালানোর জন্য সুরঙ্গ খুঁরছিলাম। মাঝে ধস নামল জীবনের। এখন আমার কথাও থাক।

ও দেড়হাত দূরে লেজ নাড়বে। দুই পা এগোবে। ভীরু নাক এনে হাঁটু শুঁকবে। নিজেকে জটিল অস্তিত্ববাদ চাকরীবাদ শিল্পী বাদ দ্বারা নিজেকে ও! অত্যধিক নিজেকে প্রতিষ্ঠায় বঞ্চিত হতে হতে, এই মাঘিপূর্ণিমায় গোল লুচি দ্বারা কুকুরের কাছে আমার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হল তনিমা।ঘর বাড়ি অতীত জমি দলিল ভোটার কার্ড কিছুই লাগল না। সেলফি সিগারেট তামাক চায়ের পয়সা খরচ না।কিন্নরী কি চাইতে পারে তার একটি তালিকা তার দুই চোখে নিবদ্ধ। মাথায় স্পর্শ। পেটে স্পর্শ। গলায় ঘাড়ে স্পর্শ। সকালের রোদে ছোটাছুটি। দুই টুকরো লুচি, দুই মুঠো জল। এভাবেই লুচি দ্বারা দুই ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী একে অপরের কাছে সম্পর্ক, অস্তিত্ব, বাক্য, ভালবাসা অর্জন করলাম। যদিও লুচি ছিল ঠাণ্ডা, বাসি, কোঁকড়ানো। তার কৌতুহলের তালিকায় আমার জুতা, বগলের ঘ্রাণ। জলজ প্রজাপতি। কুনো ব্যাঙ। শিয়ালের ডাক ছিল। ওর নাম দিলাম কিন্নরী।

কিন্নরীর পাশে বসে নতুন করে সামাজিক হতে হচ্ছিল না। দাড়ি না চেঁচেই যাওয়া যাচ্ছিল। ভালবাসা ও আমার অস্তিত্ব সংকট কখনই সংকোচে পড়েনি। বরং লুচি দ্বারা একখানা মানুষ গভীর রাতে বিপরীত মুখী এক কুকুরের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারে।লুচি ভাষার স্বরবর্ণ, ভালবাসার শিষ ধ্বনি আর অক্ষরের ভূমিকা পালন করে। যাতে ভুল বুঝে আরো বেশি বেশি চাপ দাড়ি রেখে আয়নার কাছে দাঁড়াতে না হয়। ইন্টারভিউ যাওয়ার আগে জামা ইস্ত্রি না করতে হয়, আর দূরে অতি দূরে স্বজন দ্বারা প্রতারিত হলে জমির দলিল, সোনার গয়না, প্লাটিনার নাকছাবি হিরার চাকরী হারিয়ে আমরা যখন ফের নিঃস্ব, নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভাবছি। যখন ধ্রুবতারার নীচে এই ফুটপাতের পাশে এসে দাঁড়াই। লুচি ভাগাভাগি করে খাই। এক ভিনদেশী কুকুরের বুকে নিজেকে রোপন করি ফের, ভাবি বেঁচে থাকাই উচিত। একটুকরো লুচি থাকাই উচিত আমাদের।

ট্রেন তো এলো, যেহেতু ওর বয়স খুব কম কোলে তুলে নিলাম। ব্যাগের ভিতর নিয়ে উঠে পড়লাম। ওর আর আমার এই অল্প সময়ের গল্প। অল্প সময়ের রোদ্দুর। দরজার গা ঘেঁসে বসে পড়লাম। আমার পোষাক এমনই ছিল লোকজন কথা বলবে না। চোয়াল ভাঙা, দু চোখ উজ্বল।মুখে জেল খাটার দাগ। বসেছি গালুডি গামী ট্রেনে। কুয়াশা ভেদ করে সূর্য উঠবে তার আগেই গালুডি এসে ট্রেন থামল। লাফিয়ে নামলাম। বিস্কুট খেলাম। হাঁটছি নবহরী সাঁতরার বাড়ি। কে জানে ও কাকে জড়িয়ে কাঁদছে। কেউ ওর ঘর বলতে পারছে না। গালুডি স্টেশনে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বসলাম। নবহরীর দেখা নেই। ফের ট্রেন এল। চেপে বসলাম। কোথায় যাব জানিনা। বুকে এখন কিন্নরীর ঠাণ্ডা নাক, গরম নিশ্বাস লাগছে। একটুকরো লুচি দিয়ে এই রিক্ত নিঃস্ব পৃথিবীতে ফের বেঁচে উঠলাম। ট্রেনের আলোয় তারই ছায়া পড়েছে। সমান্তরাল রেললাইনে মাঝে মধ্যেই এই অন্ধকার আর আলো প্রকট হয়ে ওঠে। চলন্ত লাইনে আমি তারই প্রতীক্ষায়, আর বিহারী চেকার হিন্দিতে বললেন 'টিকেট টিকেট'।