অন্ধকার ও মনোরমা

ইন্দ্রনীল বক্সী

“ আমার এই অন্ধকার থেকে তুমি সরে যাও মনোরমা । তুমি কাছে থাকলে আমি আরও ভয় জড়সড় হয়ে পরি । তুমি জানোনা – এ অন্ধকার শুধু অন্ধকার নয় , অন্ধকার শুধুই কখনো অন্ধকার হয়না । অদ্ভুত সব রঙিন রেখা বিচিত্র জ্যামিতিক আকার গড়ে তোলে আর মিলিয়ে যায় ...গড়ে তোলে আর মিলিয়ে যায় । কখনও কিছুর আকার নেয় , যা আমার খুব চেনা চেনা লাগে , আবার কখনওবা অবয়ব গড়ে ওঠে ...যাদের আমি হয়তো চিনি ...চিনতাম ... আমি খুব ভয়ে ভয়ে থাকি ......”

বার্নিশের গন্ধ কেমন নেশা ধরিয়ে দেয় মনোরমার ,কিছু গন্ধ যেমন আছে খুব ভালো লাগে কারো কারো সেরকমই । দগ্ধ দুপুরের জানালায় দাঁড়িয়ে ঘ্রাণ নিতে থাকে সে নিচে রাস্তার উলটো দিকে ফার্নিচারের দোকানের । এরকম দুপুরগুলো শুধু ওর একার । আয়তকার ঘরের আসবাবগুলো মার্জিন মেনে নিজেদের জায়গায় নির্লিপ্ত পড়ে রয়েছে কতকাল । মনোরমা দেখছে । দেখছে মানে তাদের প্রতিচ্ছবি ধরা থাকছে ওর চোখে । মনোরমা এবার চোখ বন্ধ করে ,বুঝতে চেষ্টা করে মানুষ দেখতে না পেলে কি দ্যাখে ! আদৌ কি কিছু দ্যাখে ? না: ,ওর বন্ধ দৃষ্টিতেও থেকে যাচ্ছে পরিচিত দৃশ্য-ছায়া । ও পারলোনা ...
সাড়ে তিন বছর হলো । দৃষ্টিহীন মানুষের পক্ষে এটা খুব কম সময় নয় নিজেকে দৃষ্টিহীন ভাবে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে । কিংবা হয়তো এটা কোনো সময়ই নয় ! কোনো সময়ই এটা হয়ে উঠতে পারেনা ,সে শুধু অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে তার একটা প্রধান ইন্দ্রিয় ছাড়া । স্পর্শ প্রধান হয়ে ওঠে তার যাবতীয় পর্যবেক্ষণ –আবিষ্কার ।

“......তোমার জ্বর এসেছে ? গা গরম । অবেলায় স্নান করেছিলে বুঝি ! কি দরকার ছিলো ? দেখো আমি কেমন ঠাণ্ডা শুয়ে আছি , কোনো অনিয়ম নেই । একটা প্যারাসেটামল খাও , কাঠের আলমারির তিন নম্বর তাকে প্লাস্টিকের বাক্সে আছে ...ঝরঝরে লাগবে ...”
জানালা থেকে সরে আসে মনোরমা । কপাট ভেজিয়ে দেয় ।

কিছু দৃশ্যতা ও ডায়েরী মুহুর্ত
14.7.2008 - দুপুর
আজ সকাল থেকে ঝম ঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে । সামনের রাস্তা –নালি সব এক হয়ে গেছে। আজ বিকেলে ঋষির আসার কথা । একটু চাপা টেনশন হচ্ছে । আজ কলেজে যাই নি । এরকম বৃষ্টিতে কেমন মন খারাপ করতে ইচ্ছে হয় । আইপডটা কানে দিয়ে শুয়ে পরি । বড্ড শুতে ইচ্ছে করছে ___________
____________________________________________________________ ____________________________________
____________________________________।



16.7 .2008 – রাত
দুদিন কথা বন্ধ ঋষির সাথে । ভীষণ রেগে আছি । সেদিন আমায় ঘাড়ে আঁচড়ে দিয়েছে ও । যাচ্ছেতাই । এতো হ্যাংলামি ভালো লাগেনা। কিন্তু ও হ্যাংলামি না করলেও ভালো লাগেনা । কোনটা যে ভালো লাগে ছাই ________________confused __________________ আমার কুর্তিতে এখনো ওর আফটার শেভের গন্ধ লেগে আছে _________________MUSK__________________কাচিনি । আজ বেশ গুমোট গরম । যাই বারান্দায় গিয়ে বসি ____________________________________________________________ ____________________________________________________
____________________________________________________________ ____________________________________________________________ ____________।_

06.11.2009 অল্প গভীর সন্ধ্যা

বেশ শীত করছে । ঋষিটা যে কোথায় গেল ! অনেক্ষন গেছে রাতের খাবার আনতে । মনে হয় সব দোকান বন্ধ ,পাহাড়ে এই এক মুশকিল বড্ড তাড়াতাড়ি রাস্তা ঘাট ফাঁকা হয়ে যায় সন্ধ্যায় । দোকান-পাটও সব বন্ধ হয়ে যায় । আজ চারদিন হলো আমরা পাহাড়ে এসেছি । তুমুল কাটছে কটা দিন...শুধু ঋষি আর আমি ...আমি আর ঋষি ...আমি ...ঋষি ...আর পাহাড় ...আর শীত ...।অনেক্ষন হলো ...এবার দুশ্চিন্তা হচ্ছে...

08.12.2009 রাত

এই মাত্র ফিরলাম । স্নান করার পরেও গা দিয়ে হাসপাতালের বিচিত্র গন্ধটা যাচ্ছে না । আজ একমাস হলো এই চলছে আমার । ঘণ্টার পর ঘন্টা ঋষির বেডের পাশে বসে থাকা । এক মাস হলো ঋষি সংজ্ঞাহীন – কোমায় । মাথায় মারাত্মক চোট , ডান পা ফিমার ফ্র্যাকচার ,মেরুদণ্ডে চির । এরকম ভাবে আছি মাঝে মাঝে বিশ্বাস হয়না । ঋষির বন্ধ চোখের পাতার ভিতর মণিটা মাঝে মাঝে নড়ে ওঠে ,আমি সোজা হয়ে কাঠ হয়ে বসি ,এই বোধহয় ও চোখ খুলে ডেকে উঠবে ... ও কিছু দেখছে !




14.12.2009 বিকেল
ঋষির জ্ঞান ফিরেছে আজ ! ওঃ ...আমার ভীষণ কাঁদতে ইচ্ছে করছে । আমি কিছু লিখতে পারছিনা ____________________________________________________________ ______________________________ __________________________________________________________

03.01.2010 রাত
ঋষি বড্ড শান্ত হয়ে গেছে । আজ ভিজিটিং আওয়ারে আমি শাড়ি পরে গেছিলাম । আমার আঁচলটা নিয়ে ও হাতে ঘষছিলো ,আঙুলে প্যাঁচাচ্ছিল । বলল-এতো ম্যাড় মেড়ে সুতির শাড়ি পড়েছ ! সেই হাল্কা অরেঞ্জ ধনেখালিটা না ! তোমায় মানায় না ...। ঋষি দেখছে ,ছূঁয়ে। এ কদিনেই ও কেমন অভ্যস্থ হতে শুরু করেছে । ওরা ওকে একটা কালো চশমা পরিয়ে দিয়েছে । সেরিব্রাল ট্রমা । সবকিছু ঠিক হবে শুধু দৃষ্টি ফিরে পাবেনা ঋষি । ওরা বলেছে ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ২০% । ঋষি কি মানিয়ে নিচ্ছে এর মধ্যেই ! কেন ? ............তাহলে চলে আসার সময়ে ওরকম কেঁদে ফেললো কেন ! ____________________________________________________________ ______________________ ____________________________________________________________ ___________________________________________
বেশ বুঝতে পারছি আমার জীবনটা পালটে গেলো________________________________________________ _______



রোজকার মতো বিকেলে অফিস থেকে ফিরে চা নিয়ে ঋষির পাশে এসে বসে মনোরমা । ঋষি ওর হাতটা তুলে নেয় হাতে । একটা কাঠের আর্ম চেয়ারে বসে থাকে ঋষি এসময়ে ব্যালকনীতে । নিচে রাস্তার চলমান জীবনের শব্দ প্রবাহ প্রবলভাবে আছড়ে পড়ে ওর চেতনায় । ধরে থাকা মনোরমার হাত শুধু ধরে থাকার জন্য নয় , ঋষি আর মনোরমা দুজনেই এসময়ে চোখ বন্ধ রাখে , দুজনার ধরে থাকা হাত এসময়ে একটা পারস্পরিক সংযোগ প্রবাহ সৃষ্টি করে - ধ্বনিপ্রতি ব্যাখ্যা চলতে থাকে , বিশ্লেষণ চলতে থাকে – মনোরমাও শিখতে থাকে অন্ধকার কিভাবে দেখতে হয় ।
মনোরমার আপত্তিতে কালোচশমা পালটে এখন ও একটা হাল্কা চশমা পরে । না: ওর চোখে কোনো বিকৃতি নেই , শুধু তৃতীয় কারো কাছে ওর আলোহীন দৃষ্টির বিভ্রান্ত নড়াচড়া যদি অস্বস্তির উদ্রেক করে –সেই ভয়ে । মনোরমার কাছে কিছু লুকবার নেই । আজ হাল্কা বিশেষ বডি স্প্রের গন্ধটা আবার পাচ্ছে ঋষি ,তার মানে মনোর মন আজ ভালো । এই সুগন্ধিটা যেদিন ও লাগায় সেদিন ভীষণ ফুরফুরে থাকে মনোরমা । আজ অনেক বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বুঝতে পারে ঋষি । ওর খুব আনন্দ হয় ...

ক্রমশ নরম হয়ে আসছে জীবন । স্বচ্ছন্দ হচ্ছে ঋষির ঘ্রাণ – স্পর্শ-ধ্বনি নির্ভর যাপন । ধীরে গড়ে উঠছে ঋষির নিজস্ব ঘ্রাণ- ধ্বনি সারণীর রোজনামচা – এই মনোরমা আলমারি খুললো , এবার শাড়ি/জামা বের করবে , বিছানার ওপর রাখবে । এই ও বাথরুম থেকে স্নান সেরে বেরোল ...সারা ঘর ওর স্নানের গন্ধে ম ম করছে ...। মনোরমা এখন রান্না ঘরে ...শসপ্যানের আওয়াজ , ফ্রিজ খুলে রেখেছে ...অনেকক্ষণ ,ফ্রিজ জানান দিচ্ছে । মনোরমা কি অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে ? ...ঘরের মধ্যে স্থির হয়ে বসেও ঋষি ওর আর মনোরমার মধ্যেকার ভৌগলিক দূরত্ব পরিমাপ করতে পারে এখন অনায়াসে , কিছুটা মনোরমার গায়ের নিজস্ব গন্ধের কাছে আসা –দূরে যাওয়া দিয়ে , কিছুটা বাতাসের ক্ষীণ তারতম্যেই ,চলাফেরার শব্দে এসময়ে ওর শুধু ঋষির শ্রবণ ও ঘ্রাণেন্দ্রিয়ই নয় ,ওর ত্বকের প্রতিটা রোমকূপও ভীষণ সক্রিয় হয়ে ওঠে টের পায় মনোরমার উপস্থিতি । মনোরমাকে নতুন করে আবিষ্কার করেছে ঋষি – গন্ধে –শব্দে । ওর অনন্ত অন্ধকারে মনোরমার রূপ রেখা নির্মাণ করে চলেছে ঋষি , গড়ে ওঠে আবার গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ভেঙে যায় , মনোরমার শরীরের ,পোশাকের অসংখ্য বিন্দুআলো জোনাকির মতো মুহূর্তে বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পরে ,আবার জড়ো হয় ...যেন কোনো কুশলী আলোকশিল্পীর অনবদ্য আলোকসম্পাত ...
“...তুমি জানো ! আমি তোমায় দেখতে পাই মনোরমা ! আমি আরও অনেক কিছু দেখতে পাই যা তুমি দেখতে পাওনা । ”
“ তাই ! ...তা আমায় কেমন লাগছে এখন বলতো !”
“তুমি এখন স্থির দেবদারু ...না না ...আর্কেরিয়ার মতো ...ক্রিস্টমাসে যেমন আলো লাগানো থাকে ...”
“তাই! আর আমি কি দেখতে পাচ্ছিনা ...অথচ যা তুমি দেখতে পাচ্ছ !?”
“...শব্দের ছবি ...গন্ধের আকার..প্রতিদিনের আলাদা আলাদা একটা গন্ধ থাকে , প্রতি ধ্বনির থাকে আলাদা আকার ...তুমি ফুরুসফুল দেখেছো মনোরমা ?...মৃদু ধ্বনিগুলো খানিক ওরকম...হালকা-ঝুরঝুরে ... ”

ট্যাক্সি ও উষ্ণশহর
বড় কাঁচওয়ালা রোদচশমাটা পরার একটা সুবিধে হলো ,এতে চোখের সঙ্গে ভ্রু ও গালের কিছুটা ঢাকা থাকে ।এবং এতে আরাম বেশী হওয়ার সাথে এটাই হাল ফ্যাশন –এই যুক্তিটাও মানে মনোরমা । সাদা সূতির ঢিলা টপ ,আর সমুদ্রনীল পায়জামায় দোহারা চেহারার মনোরমাকে কিছুটা ভারি লাগছে বটে । দুপুরের এলো গরম হাওয়া পথচলতি ওর পোশাকে ঢুকে পড়েছে । ফুটপাত থেকে নেমে আসে ও । এবার একটা ট্যাক্সি নেওয়া দরকার । দূর থেকে ধীরে সুস্থে আসতে থাকা হলুদ গাড়িটাকে হাত দেখিয়ে দাঁড় করায় ।
“_____________ যাবে ?”
“____________________”
“সেকি ! কেন?”
“ _____”
“বাঃ বেশ মজাতো !”

ট্যাক্সির নিরিবিলিতে সেঁধিয়ে যায় মনোরমা । যেতে যেতে ক্যাথলিনে একবার দাঁড়াবে , একটা কেক কিনে নিয়ে যাবে,চার পাউন্ডের ও চকোলেট । ঋষির জন্মদিন । কজন বন্ধু বান্ধব আসবে ওদের । খুব নিজস্ব একটা বৃত্তে এরকম আয়োজনে ঋষির তেমন আপত্তি নেই ।
শহর এখন গনগনে উত্তেজিত । এখনও দিনের অনেকটা বাকি , রাস্তা তেতে আছে ,রাস্তা থেকে ওঠা হল্কায় কেমন কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে জেব্রাদাগগুলো । প্রচণ্ড উত্তাপ দৃষ্টিবিভ্রম ঘটাচ্ছে ।

বৃত্তের সবাই এসে পড়েছে । ঋষি একটা চিকনের পাঞ্জাবি পরেছে । মিহি কাজের মাদুরাই, সোনালী পাড়, স্লেট জমিতে ঝলমল করছে মনোরমা । ঋষি শান্ত , সৌম্য । হাল্কা করে বেজে চলেছে ইনিগমা ,মৃদু কথাবার্তার গুঞ্জন আর মাঝেমাঝে ওদের বন্ধু প্রীতমের চড়া হাসি একটা অন্যরকম আবহ তৈরি করেছে । প্রত্যেকের আলাদা আলাদা পারফিয়্যুম মিশে গিয়ে একটা ঘ্রানিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে ঋষি-মনোরমার রোজকার ঘরের গন্ধটাকে গুলিয়ে দিয়েছে । ঋষির একটু অস্বস্তি হচ্ছেনা এমন নয় । কারণ ও মনোরমাকে মাঝে মাঝেই হারিয়ে ফেলছে । খেই হারিয়ে যাচ্ছে ওর চেনা শরীরঘ্রানের ।
“...হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ ...”
গান শেষ হলো ,কেক কাটা হলো । ঘরের সোফায় বসে শুরু হয়েছে কবিতা বলা , গান...
মাঝে হঠাৎ ঋষি উঠলো । বাথরুম যাবে । এসব কাজে ওর কারও সাহায্য লাগে না , একমাত্র রাস্তায় বেরোলে মনোরমার সঙ্গে সঙ্গে ওর সাথী হয় বেল লাগানো ওয়াকিং স্টিকটা । আচমকা পেতে রাখা ম্যাটে হোঁচট খেয়ে সেন্টার টেবলের কোনায় ধাক্কা লেগে ঋষি পড়ে গেলো , উপস্থিত সবাই হৈ হৈ করে উঠলো ,মনোরমা কয়েক মুহূর্ত
নিল ঘটমান ঘটনাকে বুঝতে ...চকিতে উঠে গেলো ঋষিকে তুলতে । সবাই ঘিরে ফেলল ঋষিকে ,কনুইতে অল্প চোট । ঋষি সবাইকে ব্যস্ত হতে বারণ করছে ,কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে ।
ওদের এক বন্ধু গুঞ্জা “ইস ...খুব লেগেছে নারে ?”
“__________________”
“ ওরকম হুট করে উঠেতে আছে ...কাউকে ডাকলেই পারতিস ”
“ __________________”
“ মনো তোর একটু খেয়াল রাখা উচিৎ ছিলো ...এমনিতেই...”
ঋষি এবার হাততুলে অসহিষ্ণুভাবে থামিয়ে দেয় ,কেটে কেটে উত্তর দেয়
“ আমার ছোট খাটো কাজে কারও সাহায্য লাগেনা , এবং মনো সেটা জানে ...বাইরেও আমি নিজেই চলাফেরা করি ও শুধু আমার সঙ্গে থাকে , এটা তোদের কারও সঙ্গেও হতে পারতো ...কেন কোনো দিন হোঁচট খাসনি ? ”
ঘরের পরিবেশ একটু ভারী হয়ে উঠলো । প্রীতম প্রসঙ্গ পাল্টাতে ঘিষাপিটা অফিস জোক বলতে শুরু করলো । মনোরমা একটু ম্রিয়মাণ হয়ে গেলেও ডিনারের প্রস্তুতির সাথে সাথে ওদের সঙ্গে মাঝে মাঝে এসে সঙ্গ দিয়ে গেলো ।
এরপর যা যা ঘটলো যা সাধারনতঃ এরকম ঘরোয়া পার্টিতে হয়েই থাকে । মনোরমার রান্নার প্রশংসার পর সবাই ওদের শুভরাত্রি বলে যে যার চলে গেলো ।




“ ভালোবেসে অনিবার্যভাবে সঙ্গে থেকো ,করুণা কোরোনা ”

জন্মদিনের রাতে কি ঝিঁঝিঁপোকারা কোরাস গায় ? ঋষি বেশ আমোদ পেলো এতরাতে ব্যালকনিতে এসে । এখন নিচের রাস্তায় আর আওয়াজ নেই তেমন । পাশের ফ্ল্যাটের কিছু সাংসারিক শব্দ , বাচ্চার কান্না । ঋষি জানে আজ ও পড়ে যাওয়ায় মনোরমা তেমন বিচলিত হয়নি , হয়েছে তার পরবর্তী কিছুক্ষণের জন্য । কিন্তু ঋষি কেন নিজে এত দমে আছে ! মনোরমার রাত্রিকালীন গন্ধটা ভেসে আসছে । সন্ধ্যার মিলিত গন্ধেরা এখন আর নেই । ঋষি জানে মনো ঘুমায়নি । ব্যালকনীর রেলিঙে রাখা হাতে আরও একটা উষ্ণ হাতের স্পর্শ ঋষিকে বুঝিয়ে দেয় মনোরমা এসে দাঁড়িয়েছে তার পাশে ...অনিবার্যভাবে ।


আবার পাহাড় ও কিছু ব্যক্তিগত কথোপকথন

সাংকেতিক ডাকাডাকিতে পাখিদের জুড়ি মেলা ভার । অচেনা পাহাড়ি পাখি ,যেটা ওদের ঘরের জানালায় বসেছিলো উড়ে গেলো । পাহাড়ি পাখিদের বাসা বুঝি আরও উঁচুতে ,ঐ যেখানে শেষ বেলার রোদ যেতে যেতে আরও কিছু মুহূর্ত লেগে আছে – সেখানে । মনোরমা ফ্ল্যাশব্যাকে বার্নিশের গন্ধওয়ালা জানালা ,এখন সেরকম কোনো গন্ধ নেই , একটা বুনো গন্ধ স্থির হয়ে আছে । আরও একটা মজার ব্যাপার হলো , পাহাড়ে উঠতে শুরু করলেই মনোরমা আজিনোমোটোর গন্ধ পেতে শুরুকরে ,সেই গন্ধ সঙ্গ ছাড়ে সমতলে ফিরে । এ নিয়ে ওদের নিজেদের মধ্যে বেশ হাসি-মস্করা আছে । ঋষিও আগে শুনেছিলো একেকটা জায়গার এক একরকম শব্দ আছে , এক এক রকম গন্ধ আছে আলাদা আলাদা শহরের , ওর মামার বাড়ি শান্তিপুরে গেলে একরকম গন্ধ পেত ,আবার আসানসোলে পিসির বাড়িতে একরকম । মামার বাড়িতে ঢুকেই নানা গাছপালার সঙ্গে দিদিমার বাতের মলমের গন্ধ , দাদুর নস্যির গন্ধ,মিনু মাসির বসন্তমালতী মিশে একটা বিশেষ গন্ধ ওর স্মৃতিতে রয়ে গেছে , যেমন রয়ে গেছে একটানা খটাং খট তাঁতের মাকু টানার শব্দ... এখন ব্যাপারটা আরও তীব্র বুঝতে পারে ও ।

মনোরমা নিচে গেছে ,ঠিক রান্নাঘরের সামনে বসে পাহাড়ি রাধুনি মহিলাটির সঙ্গে গল্প জুড়েছে । খানিকটা জেদের বশেই ওদের আবার পাহাড়ে আসা । মনোরমা কিঞ্চিৎ ইতস্তত করছিলো , ঋষি জানে ওর ঘটনার পর থেকে পাহাড়ের প্রতি একটা চাপা অভিমান রয়ে গেছে মনোরমার । জানালার ধারে দাঁড়ালে ঠাণ্ডা পাহাড়ি হাওয়া এসে লাগছে ঋষির চোখে মুখে ,এখন ও এখানে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে । দূরে নিচে কোথাও নেপালি গানের সুর ভেসে আসছে মাঝে মাঝে আবার হারিয়ে যাচ্ছে হাওয়ার গতিপথ বদলের সঙ্গে সঙ্গে । পাহাড়ি ফুলের মরশুম এখন নয় ,তবু একটা মৃদু গন্ধ ঋষি টের পায় , নিচে উঠোনের উল্টোদিকে রান্নাঘর থেকে মনোরমা এবং রাঁধুনি মহিলার গলা ভেসে আসছে । কেউই কারও ভাষা জানেনা, ভালো হিন্দিও জানেনা দুজনেই ,কিন্তু তাতে কিছু আটকাচ্ছে না ,পৃথিবীর সব মহিলাদের একে অপরের গল্পবুঝে নিতে বুঝি অসুবিধা হয়না .....

“কিতনা দিন শাদী হুয়া আপকি ?”
“শাদী ! _________________”
“বাচ্চা?”
“___________”
“ আভিতক নেহি !! মেরি বড়ি বেটিকি উমর চৌদা সাল হো গায় ...হি হি হি ”
“ হা হা হা ______________”
“শাবকো লেকে আপকো পরিসানি হোতা হোগা ? ইস হালত মে ...!”
“ কিঁউ ___________!!!”

কিছুক্ষণ নীরবতা ,পাহাড়ি মহিলা মনোরমার ঠিক পছন্দের কথা বলেনি বুঝে চুপ করে যায় । মনোরমা সামান্য দমে গিয়ে সহজ করার জন্য আবার গল্প শুরু করে , মহিলার আর দোষ কি! সেও তাই জিজ্ঞেস করেছে যা তাকে বাইরে প্রতি দিনই কেউনা করে ,মনোরমা গায় মাখে না , শুধু চিন্তায় থাকে কেউ যদি ঋষির সামনে বলে ফ্যালে ! এমন নয় যে ঋষি ভীষণ কমপ্লেক্সে ভোগে , কিন্তু ঋষির কেন জানি মাঝে মাঝেই মনে হয় এরকম জীবন না বেছে নেওয়ারও একটা বিকল্প ছিলো মনোরমার । এই নিয়ে বিস্তর ঝগড়াও হয়েছে , ঠিক ঝগড়া নয় একতরফা রাগ দেখিয়েছে –অভিমান দেখিয়েছে মনোরমা ।ঋষি শুধু মুচকি হেসে গেছে চেয়ারে বসে ,মনোরমা আরও জ্বলে-পুড়ে গেছে রাগে তাতে । মাথা ঠান্ডা হলে মনোরমার মনে হয় ঋষি মধ্যে মধ্যে ঝালিয়ে নেয় ওদের সম্পর্কটাকে, কোন এক সূক্ষ্ম নিরাপত্তাহীনতা থেকেই হয়তো । এসব থাকেই , মনোরমা তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়াটুকু ছাড়া এসব নিয়ে বেশী ভাবে না ।
“চলো আজ নিচের গ্রামটার দিকে যাই সন্ধ্যে নামার আগেই ফিরে আসবো ...সারাদিন হোটেলে বোর হয়ে গেলাম ”
“নিচে ! কিভাবে যাবো ?”
“একটা পায়েচলা সরু রাস্তা নেমে গেছে , আমি দেখেছি ”
“ তুমি চেনো ঠিক ?”
“না, তবে মনে হয় ওটা নিচে ওই সরু সোঁতাটার পাড় অবধি গ্যাছে , কাউকে জিজ্ঞেস করে নেবো !”
“ ওই রাস্তায় আমায় নিয়ে সমস্যায় পড়বেনা !”
“পড়লে পোড়বো , শুধু তুমি ডানধারে থেকো ,কারণ বাঁয়ে খাদ”
“ওকে, ম্যাডাম যা বলবেন”

কিছু পরেই মনোরমা চুড়িদারের উপর একটা সবুজ কার্ডিগান চাপিয়ে ,গলায় স্কার্ফ,ঋষি জিনসের ওপর একটা হাল্কা ইঁটরঙের পুলওভার চাপিয়ে কটেজ থেকে বেরিয়ে এলো । কিছুপথ ওরা কোনো কথাবার্তা বলল না , ঋষি শুধু মাঝে মাঝে ওর ওয়াকিং স্টিকের বেলটা মিছিমিছি বাজাতে লাগল ,এটা ওর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ।
“আঃ কি হচ্ছে কি ! শুধু শুধু বাজাচ্ছ কেন ?”
“তাইতো ! এখানে কাকে আর সরতে বলব !”
“কান পেতে শোনো নিচে সোঁতাটার কেমন একটানা আওয়াজ !”
“হুম, একটা কপারস্মিথ বারবেট ডাকতে ডাকতে ডানদিকে উড়ে গেলো...”
মনোরমা এক ঝলক ঋষির দিকে অবাক হয়ে তাকায় । এরকম নয় যে ঋষি ওকে প্রথমবার চমকালো । ওদের ফ্ল্যাটের নিচে কোনো বাইকে এসে দাঁড়ালে ও অনায়াসে বলে দিতে পারে কোন মেক ,কোন মডেল । বেশীরভাগ সময়ে মিলিয়ে দিত ।
আবার নিস্তব্ধতা নেমে আসে ,শুধু ওদের পায়ের স্নিকার ঝুরো পাথরের রাস্তায় মৃদু আওয়াজ তৈরি করে ।
অনেকটা নেমে এসেছে ওরা । সোঁতার আওয়াজটা এখান থেকে বেশ জোরে শোনা যাচ্ছে ।কিছু মানুষের গলাও পাচ্ছে যেন মনে হলো । ঋষি এবার একটু হাঁপাচ্ছে । পায়ের ডিমে অল্প ক্র্যাম্প মতো মনে হলো । ধীরে নামতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছে ওদের । এবার একটু বসলে হয়...
“মনো,চলো একটু বসি ”
“ হ্যাঁ, আমিও তাই ভাবছিলাম...চলো ওই সামনের পাথরটায় বসি ”
হাত দিয়ে দিয়ে পাথরটা বুঝতে থাকে ঋষি । অমসৃণ ,এবড়োখেবড়ো , বৃহৎ পাথরটার ওপরের দিকটা কিছুটা মসৃণ । কত হাজার কিংবা লক্ষ বছর এখানে পড়ে আছে পাথরটা ,নিশ্চল। পাথরটার অনেকটা অংশ পাকদণ্ডী রাস্তার ডানধারে পাহাড়ের ভিতরে রয়ে গেছে সম্ভবত । মানুষ পাথরটাকে এড়িয়ে বেড় কেটে পায়ে পায়ে রাস্তা তৈরি করে নিয়েছে বহুবছর ধরে ।
মনোরমা চুপ করে আছে । এখানে বসে কথা বলতে ওর ভালো লাগছে না ,মনে হয় শুধু শুনে যায় কান পেতে চারিধারের সবুজ অরণ্যের নিজস্ব শব্দ । বাঁ ধারে ধাপে ধাপে নেমে গেছে লতা-গুল্ম-গাছেদের সারি , এদের বেশীর ভাগের নাম মনোরমা জানেনা । এই লতা-গুল্মের কি কোনো পরিচিতি আছে ! আছে নিশ্চয়ই , স্থানীয়রা জানে ,আর জানে বোটানির বই । মনোরমার কি দরকার জানার ! চোখ বন্ধ করে আদিম অরণ্যের ঘ্রাণ নিতে থাকে , এক হাতে ধরা থাকে ঋষির হাত , এই মুহূর্তে ওর নিজেকে আর ঋষিকে মনে হতে থাকে আদিম অরণ্যচারী মানব-মানবী ।
ঘোর কেটে যায় ঋষির চঞ্চলতায় ।
“এবার ওঠো , এখানে বেশী দেরী করলে চলবে না ,তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে ”
“চলো”
আর কিছুটা নেমে যেতেই ওরা একটা বিস্তীর্ণ সমতল ভূমিতে এসে পড়ল । একটা ত্রিভুজাকৃতির ক্ষীণ উপত্যকা ,যার এক ধার দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ক্ষীণকায় অথচ খরস্রোতা সোঁতা । দুচার ঘর দেহাতির বাস এখানে । একটা চায়ের দোকানো আছে , চায়ের ধূমায়িত কেটলির সঙ্গে ঝুলে আছে রঙ চঙে নানা ব্র্যান্ডের চিপসের প্যাকেট , লম্বা চাঁদমালার মতো ঝুলে আছে রকমারি গুটখার স্যাচেট । মনোরমা দৃষ্টিকে এবার একটু হোঁচট খেতে হলো ।দুজনে গিয়ে বসলো চায়ের দোকানে ,ধূমায়িত চায়ের গ্লাস হাতে নিয়ে বসে থাকলো কিছুক্ষণ । অনর্গল বিবরণ দিয়ে চলেছে মনোরমা জায়গাটার ,ঋষি মন দিয়ে শুনে যাচ্ছে ,যা ও সাধারনতঃ করে থাকে ...ওরা আস্তে আস্তে সোঁতাটার ধারে গিয়ে দাঁড়ালো কিছুক্ষণ , মনোরমা আরো কিছুটা যেতে চাইছিলো ,ঋষির আপত্তিতে গেলনা । কোন ওই উঁচু থেকে জানা নেই পাহাড়ি জলধারা তীব্র বেগে নেমে আসছে , খল খল করে আওয়াজ ভালো লাগার পাশে একটা চাপা অজানা উব্দেগ ঋষির মনে বাসা বেঁধেছে । রোদ যে মরে এসেছে ঋষি টের পায় , ঠাণ্ডা হাওয়ার একটা লহর সামান্য কাঁপুনি ধরিয়ে দেয় ওর শরীরে । মনোরমা কেমন উচ্ছল ,বন্য হয়ে উঠেছে । একটু যেন বেপরোয়াও । ঋষি এবার শক্ত করে হাতটা টেনে ধরে
“চলো ,এবার ফিরি মনো অন্ধকার হয়ে আসার আগেই পৌছতে হবে যে !”
“ ধুস , এখন বেশ আলো ...কেন? তোমার ভয় লাগছে ...ভিতু ছেলে ...হাহাহা...”
“ না...মানে এখানে সন্ধ্যে বড় তাড়াতাড়ি নামে যে ” “ আরে ,চিন্তা করোনা , মেঁ হূঁ না ...হা হা হা ”
“কি আশ্চর্য ! তুমি আছো এটা মনে করিয়ে না দিলেও চলতো মনোরমা ......”
মনোরমা নিভে গেলো মুহুর্তে । অবাক হয়ে ঋষির দিকে তাকালো ভালো করে ,ওর খেয়াল হলো অনেকক্ষন পর এই পাহাড়,নদী ,উপত্যকার অপূর্ব মুগ্ধতা থেকে চোখ সরালো ঋষির মুখের দিকে । দিন শেষের নানা আলো খেলে যাচ্ছে ঋষির মুখে ।ওর পরিচিত প্রশান্তির বাইরে যেন একটা যন্ত্রনার ছায়া মিশে আছে মুখের রেখাগুলোয় । মনোরমা চকিতে ঋষির দুটোহাত চেপে ধরে তীব্রভাবে ...
“কি বললে ! ......কি বললে ...” থর থর করে কাঁপছে মনোরমা , ওর অজান্তেই ঋষির মুখটা ঝাপসা হয়ে এলো ...
ঋষি এবার কুন্ঠায় ,অনুশোচনায় স্থবীর হয়ে গেলো ।
“আমি...আমি ...বলতে চাইনি মনো ...”
“ না বললেও ,ভাবো ,তাই বেরিয়ে গেলো !”
“ না ...আমি কেমন যেন টেনশড হয়ে পড়লাম ...আমি...আমি...”
“ থাক , আর ব্যাখা করতে হবে না , এবার সত্যি ফিরতে হবে ...”
খানিক গুম হয়ে রইল মনোরমা । ওরা ফিরতে লাগলো ক্ষীন পায়েচলা পাকদন্ডী রাস্তাটা দিয়ে । ওঠার সময় বেশী পরিশ্রম । মাঝে মাঝেই একটু করে দাঁড়িয়ে পড়ছিলো ওরা , একটা গাছের গুঁড়ি দেখে আড়াআড়ি রাস্তার ধার বরাবর পড়ে আছে ।একটু জিরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ওরা দাঁড়ালো । চারিদিকে নানান পাখ-পাখালির সমবেত কলরব ,বাসায় ফেরার তোড়জোর তাদের । পাহাড়ে বিকেল ঘন হচ্ছে ,এরপর ঝপ করে সন্ধ্যে নেমে যাবে , সেভাবে পাহাড়ে সন্ধ্যা নামে না একেবারে রাত্রি নামে বলা যায় । গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে মিহি দিনের আলো এখন চরাচরকে দৃশ্যমান রেখেছে । কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল ওরা , এখন কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথা না বলাই ভালো ,তাছাড়া এই দিন শেষের পাহাড়ি রাস্তায় ,পাহাড় –উপত্যকা-চরাচর জুড়ে নানা বিচিত্র শব্দের একটা জোয়ার যেন ঝাঁপিয়ে পড়ছে ওদের ওপর ,এখন সম্মোহিত হয়ে চুপ করে বসে থেকে এই শব্দ জোয়ারে ভিজে যাওয়াই একমাত্র পরিণতি বলে ঋষির মনে হয় । কিছু মুহূর্ত কেটে যায় ,ফিরবার তাড়া ওদের তাড়িয়ে নিয়ে উঠিয়ে দেয় -ওরা আবার উঠতে থাকে পাকদণ্ডী বেয়ে ।
ওই ওদের হোটেলটা দেখা যাচ্ছে ! বেশ কিছুটা ওপরে ,যেন আধো অন্ধকারে কোনো ভিন গ্রহের মহাকাশ যানের মতো ঝুলে লেগে রয়েছে পাহাড়ের গায় ! আরো একটু ওপরে ছেঁড়া মেঘের শ্রেণী , গাঢ় কমলা থেকে দ্রুত কালচে কমলা ...পৃথিবীর অন্য প্রান্তে এখন ভোর হচ্ছে নিশ্চয়ই , পাখিরা জেগে উঠছে গাছে গাছে গা ঝাড়া দিয়ে , গবাদিরা নিশ্চিন্তে চড়ে বেড়াচ্ছে বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে , পাহাড়ি বাড়িঘরের চিমনী দিয়ে উঠে আসছে দিন শুরুর সাংসারিক ধোঁয়া ...এরকম ভাবতে ভালো লাগছে এখন মনোরমার ।

“Living is Easy with Eyes Closed.” জানো কে বলেছিলো মনো ? ”
চারিধারে নিস্তব্ধতার সমাবেশ । নেপালি গানের কলি আর ভেসে আসছে না । জানালার আরশিতে বাষ্প জমে উঠে ঝাপসা ওপারের দৃশ্যমানতা । অন্ধকারের ক্যানভাসে তারা ভর্তি আকাশের প্রেক্ষাপটে তুলনায় বেশী গাঢ় বৃহৎ জমাট অন্ধকারের পাহাড়ের শ্রেণী ।আরশির কাঁচে হাত দিয়ে মুছে বাইরেটা দেখার চেষ্টায় মগ্ন ছিলো মনোরমা । ঋষির কথায় ফিরে তাকালো ... “কে বলেছিলো ?”
“জন লেনন” ...ঋষির মুখে একটা অনাবিল প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে । হঠাৎ একথা কেন ! মনোরমার চিন্তায় ঢুকে পড়ে কৌতূহলটা । মুখে কিছু বলে না । এরকম হয় , অনেক সময়েই ঋষি অদ্ভুত সব কথা বলে ওঠে একদম অপ্রাসঙ্গিক – যার খেই ধরা মুশকিল হয়ে পড়ে - এটাও সেরকমই কিছু হয়তো ভেবে নিয়ে মনোরমা অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার জন্য কথা খুঁজতে থাকে ।

শহুরে অন্ধকার ও খেলা ...খেলা

“আমি ভালো আছি মনোরমা আমার অন্ধকারে , তুমি কেমন আছো ? কদিন আমরা পাহাড় ঘুরলাম ...পাখির ডাক শুনলাম ,পাহাড়ি ঝর্না শুনলাম ,তুমি দেখলে ,তুমি দেখালে । নিরাপদে ফিরিয়ে আনলে বাসায় । তোমার অন্ধকার দেখার কতদূর ? জানি খুব মন দিয়ে তুমি চেষ্টা করছ ,তুমি পারবে ...পারবেই ...”

ঋষি আর মনোরমার ৫৭৫ স্কোয়্যার ফুটের ফ্ল্যাটের বাইরে একটা বিষণ্ণ আলো ক্রমশ নিভে আসছে । বিকেল ঘনিয়ে সন্ধ্যা নেমেছে । পাহাড় থেকে ফিরে ঋষি আর মনোরমা দুজনেরই বেশ একচোট শরীর খারাপ হয়েছে । এছাড়া ঋষি যেন কিছুটা অন্যমনস্ক – বিক্ষিপ্ত । মনোরমা লক্ষ্য করেছে ,কিছু বললে কয়েক মুহূর্ত পর তার উত্তর দিচ্ছে ঋষি কিংবা ওকে বলা কথাটা আবার বলতে হচ্ছে । জিজ্ঞেস করে উত্তর পায়নি বা উত্তর পেয়েছে ‘কিছুই হয়নি’ ধরনের । কোথাও একটা গোলমাল হচ্ছে । আজ যেন বেশ কদিন পর ঋষির শরীরে ভাষা বেশ চনমনে ,ওদের মিউজিক সিস্টেমে সন্তুর বেজে চলেছে ,ঋষি মগ্ন হয়ে শুনছে ...

“চলো ...আজই হয়ে যাক ...” চোখ বন্ধ রেখেই ঋষি বলে ওঠে ।
“ কি হয়ে যাক ! ” মনোরমার কৌতূহলের ভ্রুকুটি ।
“খেলা ...”
“মানে !”
“ না: ঠিক খেলা নয় ...পরীক্ষা বলা যায় ।”
“ পরীক্ষা ! কিসের ? ”
“ তুমি কতটা শিখলে আমি হতে ... অন্ধকার দেখতে ।”ঋষি আশ্চর্য হাসছে ...
মনোরমা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ঋষির দিকে ... কয়েক মুহূর্ত কেটে যায় বুঝে উঠতে কি বলতে চাইছে ঋষি ।
“ কিভাবে প্রমাণ হবে আমি শিখেছি ! অন্ধকার ...”
“ চিন্তা নেই ...একটা খুব সহজ পরীক্ষায় ,তবে তা বাইরে …ঘরের ভিতরে নয় ।”
“ আর যদি আমি রাজী না হই পরীক্ষায় !”
“ তাহলেও নো প্রবলেম ! ... আমি যেমন আছি থাকব, শুধু করুণা নির্ভর ।”

কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতায় কেটে যায় .. একটা অদ্ভুত হাসির আলো জেগে ওঠে মনোরমার ! খুব ধীরে বলে ওঠে...
“বেশ... চলো ...হয়ে যাক ...আজই...”


ওরা বেড়িয়ে এসছে ওদের বাসা থেকে । অন্যদিনের মতই দুজনা পাশাপাশি হাঁটছে । সন্ধ্যার রাস্তায় মাঝে মাঝে এক-দুজন পেরিয়ে যাচ্ছে ওদের । ঋষি বেশ বুঝতে পারে একজন অভিজাত মহিলা পেরিয়ে গেলেন ,পারফিউম, এই এবার একজন শ্রান্ত - কাজ ফেরত ঘেমো পুরুষমানুষ ... ফুচকার গাড়িটা বাঁদিকে দাঁড়িয়ে । ক্রিং ক্রিং... স্টিকের বেলটা মাঝে মাঝে বাজিয়ে চলেছে ঋষি ।
ওরা এসে দাঁড়িয়েছে ওদের বাসা থেকে অল্প রাস্তা দূরে বাইপাসের ক্রশিংয়ে । প্রচণ্ড গতিতে নানা রকমের আওয়াজ নিয়ে গাড়িগুলো হুস করে পেরিয়ে যাচ্ছে । ঋষি স্টিক ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে জেব্রা ক্রশিংয়ের পাশেই যে লাইট পোস্টটা আছে তার ধার ঘেঁসে দাঁড়ায় । মনোরমা ঠিক ওর পিছনেই হাত ধরে আছে । ক্রশিংয়ের লাউড স্পিকারে হঠাৎ নিয়মমাফিক রবীন্দ্রসংগীত বেজে উঠল ... গাড়ির হুস-হাস শব্দ থেমে রয়েছে ,শুধু বন্ধ না হওয়া ইঞ্জিনের চাপা ঝিমঝিমে শব্দ । ঋষি হাত ছাড়িয়ে নেয় , ওয়াকিংস্টিকটা সামনে রেখে ডোরাকাটা দাগে পা রাখে । উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে মনোরমা । ঋষি পেরিয়ে যাচ্ছে ওপাড়ে ...যাচ্ছে ...পেরিয়ে গেলো , একা একদম একা, এই প্রথম ! ওপাড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ঋষি , এদিকেই ফিরে আছে ,অসম্ভব উৎকণ্ঠায় ওর গলা বুজে আসছে ...শক্ত করে ধরে আছে ওর ওয়াকিংস্টিক ...
“ তুমি চেনো Derek Rabelo কে ? সার্ফার ! ...তুমিও পারবে জানি ...ঠিক পারবে ...ঢেউয়ের মাথায় চড়ে ঢেউ পেরিয়ে যেতে ...”
মনোরমা ডোরা দাগে পা রাখে ধীরে , পেরিয়ে যেতে থাকে ...
...হঠাৎ লাউড স্পিকারে গান বন্ধ হয়ে যায় , মনোরমা কি শুনতে পেয়েছে ! শুনতে ওকে পেতেই হবে , কালো চশমার নিচে ওর যে চোখা বাঁধা ! আজ যে খেলার দিন ... মনোরমার পরীক্ষার দিন ...
____________________________________________________________ ____________________ [ মার্চ ২০১৫]