জায়া-পতির তালা-চাবি

মেহেদী উল্লাহ

আজ সুনীতির আসার কথা বাসায়, অথচ এখনো চুলায় চা বসায়নি আফ্রোদিতি। কনডেন্সড মিল্ক কিংবা গ্রীন টি, কোনোটাই নয়, কড়া লিকারে বেশি করে আদা-দারুচিনি চা টাই বেশি পছন্দ সুনীতির। দু’দিন আগেই কক্সবাজারে গিয়েছিল কোম্পানীর ব্র্যাণ্ডিংয়ের কাজে। সে অবশ্য মার্কেটিং এর লোক নয়, সরাসরি উৎপাদন বিভাগের লোক, বড় অফিসার- সতেজ ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের। কক্সবাজারে বাজার ধরতে না পারায় চট্টগ্রামের সব জোনাল অফিসার সমেত হোটেল অবকাশে ওঠেছিল স্ট্রেটেজি ঠিক করতে। সে হিসেবে এটি গুরুতর কাজের মধ্যে পড়ে। অথচ সকালবেলা ফোন করে আফ্রোদিতিকে বলে কিনা,‘শোন আফ্রো, তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে, একটু পরে ফ্লাইট, সকাল এগারোটার আগেই ঢাকায় আসছি। বাসায় থাকছ তো?’

আফ্রোর সোজাসাপ্টা জবাব,‘হ্যাঁ, আছি আমার বাসায়-ই, চলো এসো। আর দারোয়ান ফোন দিয়েছিল ধানমণ্ডি থেকে- বাসার সামনের কি একটা লাইট যেন কেটে গেছে।’
- ওহ, ওরা যে কেন আমায় এসবে জড়ায়! কতদিন বলেছি...। আচ্ছা, সে আমি... হবে। তুমি কিন্তু চা টা করো, এক সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করবো।’

এই চা টা তাই স্পেশাল। সুনীতির করা খবরে প্রথম যে বাক্যটা আফ্রোর মাথায় খেলে, তা হলো এই চা। তাই কিচেনে ঢুকি ঢুকি করার আগে আফ্রো ভাবছে, ইস্, জানতে হতো, কিন্তু ও তো বললো এগারোটা, তারপরও ল্যাণ্ড করে তাকে একটা কল করার কথা বলতে পারতো। তবে সে এখনো জানতে চাইতে পারে, কল ব্যাক করে। কেন জানি ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছেটা এই মরে, এই বাঁচে।

ধ্যাৎ ছাই, এর চেয়ে সে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত জ্যাঁ পল সার্তের ‘নো এক্সিট’ বইটা নেড়ে-চেড়ে দেখছে।

ঘন্টা দু’য়েক হয়ে গেলো থামেনি, চলছেই। আজকালকার দম্পতিদের হন্যে হয়ে বাসা খোঁজাখুঁজি দেখলে মনে হয় এই যুগের লাইলী-মজনু; ওঠার পর আর মনে থাকে না। একেবারে দরজা-জানলা খোলা রেখেই ঝগড়া করে। আরে বাবা না পোষালে চলে যাবি। ব্যালান্স জিরো! আফ্রোর পাশের ফ্ল্যাটের দম্পতির ঝগড়াটা সকাল থেকেই চলছে, হাউকাউ বন্ধ হচ্ছে না দেখে ভাবছে সে। কি যেন করে বলেছিল লোকটা, ও আমলা। কাণ্ডজ্ঞান দেখে তো থ আফ্রোদিতি। বউটাকে ধরে ধরে মারে, মড়া কপালী কেন যে আছে পড়ে! তুইও তো একটা কিছু করছিস, হোক না মাস্টারি, মাস গেলে তো অন্তত কিছু পয়সা-কড়ি পাস, কলেজের আশপাশে একটা ছোট-খাটো বাসা নিয়ে পড়ে থাক না। আফ্রো এই মুহূর্তে আরো ভাবছে, বাবা তার জীবনের মোড়টাই ঘুরিয়ে দিয়েছে। বলা যায় একটা লটারীর টিকেটের চেয়েও বেশি কিছু! এই বাড়িটা মেয়ের নামে উইল করে না দিলে যে কি হতো! পুরুষ মানুষ, বলা যায়, হয়তো তখন বারোমাস চোখের সামনে দেখতে দেখতে অন্য রকম আচরণ করতে পারতো সুনীতি। এখন আর পারবে কোত্থেকে? নাগালে পেলে তো!
গুলশানের এই বাড়িটা আফ্রোর। তার বাবার প্রথম বাড়ি এটা। পরে অবশ্য জার্মানীতে গিয়ে আরো জায়গা জমি নিয়ে বাড়ি করেছিলেন ঢাকা শহরে। ওসবে এখন ভাড়াটিয়ার বসত। আর আফ্রোর মা এখনো যশোরে।

কলিং বেলটা বাজতেই আফ্রো ফিরে আসে। সুনীতি এলো বুঝি? রিমোট চেপে সদর দরজা খুলে দিতেই ঢুকলো সুনীতি। হ্যাণ্ডসাম আর স্মার্টনেসের কমতি নেই এই যুবকের। বিয়াল্লিশ বছরের বয়সটাকে সাতাশে আটকে দিয়েছে যেন! ঢুকতে ঢুকতেই বলছিল সে,‘এদের কি আর জ্ঞান ফিরবে না। যে দিন আসি সে-দিনই শুনি ঝগড়া। থামে কখন এরা! উফ্।’
হাত থেকে বইটা নামিয়ে আফ্রোর সোজা উত্তর,‘ অফিস গেলে আর কলেজ গেলে।’
- মানে!
- তা তোমার এসেই ওদের দিকে নজর গেল বুঝি।
- না বলছিলাম, বউটাকে বোধ হয় পেটাচ্ছে। শুনলাম, তাই আর কি। বাদ দাও। প্রত্যেক দম্পতির তালা-চাবি আলাদা।
সুনীতির কথা শুনে বড় পরিসরে একবার বুক ওঠা-নামা করলো আফ্রোর। আফ্রো আর নাক গলালো না। বলল,‘ যাও ফ্রেশ হয়ে এসো, আমি চা-টা নামাই।’
- ওকে, সোনা।

সুনীতি ড্রয়িং রুমে বসে হালকা রেস্ট করতে চাইলো, পথের এক দঙ্গল জ্যাম জয় করে ঘরে ঢুকেছে। আফ্রোর ঘরটাই দেখছে, বেশি সুন্দর, তার ঘরের চেয়ে। আফ্রোর ড্রয়িং রুম দেখলেই তা বোঝা যায়। কথায় আছে না, মর্নিং শোওজ দা ডেজ- কবে হাতের ধাক্কায় একটা হাতি ফেলে দিয়েছিল সুনীতি, একেবারে সেন্টার টেবিল থেকে মেঝেতে, শুড়টাই ভেঙে গেছে! তাই কেনার সময় হলো না আজ পর্যন্ত সুনীতির। হায়। কিন্তু, উল্টো করে সে যখন ভাবে তখন মনে হয়, আফ্রোর টা আফ্রোর মতোন সুন্দর, সুনীতিরটা সুনীতির। দুইটা ঘর দুই রকমের সুন্দর! গুলশান ইজ গুলশান, ধানমণ্ডি ইজ ধানমণ্ডি। দশ-বারো বছরে যখন এক নয়, শুধু বাসার সৌন্দর্যের তুলনা করে কি লাভ! ভাবনা বাদ দেয় সুনীতি। ফ্রেশ হতে চলে যায় ওয়াশ রুমে। আর আফ্রো তখন হয়তো কিচেনে কেটলীর ঢাকনা সবে উল্টালো।

ব্রেকফাস্ট টেবিলে কথাটা ওঠায় সুনীতি। কোনো অনুভব থেকে নয়, তারই বরং বেশি আসা হয়ে যাচ্ছে আফ্রোর বাড়িতে। এই কথা তো ছিল না, তাই জিজ্ঞেস করে বসে, ‘গত দুইমাসে ক বার এসেছো ধানমণ্ডি, আফ্রো?’ আফ্রোদিতি খানিক ভেবে হাত থেকে কাটা চামচটা সরিয়ে উত্তর দেয়,‘ ফার্মগেটের জ্যামটা অসহ্য’।

- তা মাঝরাতে গাড়ি টান দিয়ে ভুলেও তো আসতে পারো। আসার ইচ্ছা থাকলে...।
- বুনন আসে মাঝে মধ্যে...তাই যাওয়া হয় না, যে টুকু সময় পাই ওই দখল করে রাখে। তাছাড়া তুমি তো কম্পানীর ধকলেই শেষ!
- বুননের কি খবর? ও কি আর বিয়েটা করলোই না! বেচারা। অবশ্য বয়েসে আর কত কুলোয়।
- ও ভাবে না বললেই পারো। ইটস হিজ হেডেক।
- সরি।
- ওকে। তা তুমি আজ থাকছো তো? হুট করে চলে এলে, যাবে কেন?
- দেখি...। তুমি কি বেরুবে আজ?
- জানি না। ও তোমাকে একটা খবর দিই। আমি বলবো, না তুমি নিজেই পাশের ফ্ল্যাটে গিয়ে নিজ কানে শুনে আসবে?
- কোন ফ্ল্যাটে?
- ওই যে, ঝগড়া।
- ওর মধ্যে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। কি হয়েছে? তুমিই দাও। তা হঠাৎ ওই ফ্ল্যাটে প্রয়োজন পড়লো কেন আমার!
-মহিলা মাঝে মাঝে এসে গল্প করে আমার সঙ্গে। মাঝে মধ্যে বলতে ওই শুক্রবারে কলেজ বন্ধর দিনে। একদিন তোমার টানানো ছবিটা দেখে বলল, আরে! সুনীতি যে! আমরা তো এক সঙ্গে ভার্সিটিতে পড়েছি। ও আপনার হাজব্যাণ্ড। কখনো দেখিনি তো বাসায়?
- আর কিছু বলেনি?
- কেন? প্রেম ছিল না কি? হা হা হা...
- তোমাকে বলেছে বুঝি?
- না।
- তাহলে? বুঝলে কি করে!
- ইমোশন দেখে আন্দাজ করতে পেরেছি, পুরনো পাপি।
-ও...। তাহলে, বিকেলে আসতে বলো না, তোমার বাসায় কথা বলি।
- হতে পারে, কিন্তু আমি থাকছি না। বিকেলে একটু বেরুবার প্ল্যান আছে। বুননের সঙ্গে ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ দেখতে যাচ্ছি স্টার সিনেপ্লেক্সে।
- জ্যামের মধ্যে ধানমণ্ডিতে নাকি মন যায় না, ও আর্ট-কালচারও তাহলে আজকাল মন চুরি করে তোমার?
- ঠাট্টা করো না।
- হা হা হা...
- ঠিক আছে, যাওয়ার আগে ডেকে দিও ওকে। আর হ্যাঁ, নামটা কি, বললে না তো?
- নাম শুনে কি হবে? দেখলেই চিনবে।

প্রথম যৌবনে, যে কালটা অধিক দুষ্টু। সেই সময়ের কথা তুললে; আফ্রোদিতি আর সুনীতি কোনো ডাক্তারের চেম্বার বাকি রাখে নি। কিন্তু, আফ্রো অক্ষম, আর সুনীতি আর বিয়েই করলো না। তাই সময় চলে গল, পাজল আর মিললো না। সুনীতিও আর বাড়াবাড়ি করে নি। যে ব্যস্ততা তার, সন্তান তার জন্য নয়, আফ্রো একা থাকে বাসায়, তার জন্যই বেশি দরকার ছিল। তা যখন সম্ভব নয়, তার ভাবনা কি? প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগতো তার। এখন আর লাগে না। আফ্রোর লাগে কিনা, কখনো জানতে চায় নি। সে সুযোগও অবশ্য দেয়নি আফ্রো। সে জানতে চায় নি কারণ, এই নারীর অক্ষমতাই এর যথার্থ উত্তর এই পুরুষটির জন্য।

তা সত্ত্বেও সুনীতি জানে, আফ্রোদিতির জানার কথা, সে সার্তে পড়ে- সার্তের দর্শনে আছে, ‘মানুষ কেবল পরিবেশের সৃষ্টি নয়। আপন প্রচেষ্টা ও পরিবর্তনের আকাঙক্ষা দ্বারা সে পরিবেশকেও আমুল পালটে দিতে পারে।’ অথচ তারা দু’জনের কেউ চায় নি, কারো আকাঙ্খা ছিল না সন্তানের; আফ্রোর হয়তো শুরু থেকেই, আর সুনীতির পরে। থাকলে, টিউব বেবির কথাই ভাবতে পারতো দুজনে।

বেলকনিটা ভালোই সাজিয়েছে আফ্রো। বড়সড় পরিসরে উপরে নিচে চারপাশে টব। বাহারি। বসে গল্প করার ব্যবস্থা আছে। একটা দোলনা চেয়োর মাত্র। তবে, একাকী গল্প করে সে, চেয়ারটা অবার রাস্তার দিকে নয়, ঘরের দিকে মুখ করে রাখা।
বিকেলে বেলকনিতে বসে বসে সে হয়তো ভাবে এখন সময় কয়টা? এই বুঝি সুনীতি... আজ থাইল্যাণ্ড, কাল ব্যাংকক, পরশু মুম্বাই...সঙ্গে নারী-নিশুতি-মদ-স্বস্তি আর রাজ্যের ক্লান্তি। সময়টা তার জীবন থেকে চুরি হয়ে গেল পুরোটাই বুঝি। অতঃপর সুনীতি? তার জীবনে আফ্রোর জীবনের সময়টা বোনাস টাইম। পরক্ষণে সে ভাবে, ছিঃ এরকম ভাবে ভাবছে কেন সে? যার যার জীবন তার তার। বরং সেই তো জীবনটা এভাবেই কাটাতে চাইছে। একটা কাগুজে বিবাহের নোটিশ ছাড়া বাদবাকি সবই তো করেছে বুননের সঙ্গে। অথচ মনে হয়, বুনন নিজেই নিজেকে বুনে নিতে পারে নি ভালো করে, তার জীবনটা বুনবে কিভাবে? বরং সেই ভাবনাই ভালো, জীবনাটা কোনো ছাঁচে ঢালা আর গতানুগতিক হয় নি। এই বুনন, এই হুইস্কির গ্লাস, এই বেলকনি, এই সুনীতি-সবকটাকেই সে নিজের প্রয়োজন মাফিক খাটাচ্ছে। কারো দরকারে ব্যবহৃত হয়নি সে, না কোনো স্বার্থে। বরং এই সবুজ বৃক্ষ-লতার জন্যই সে খেটে-মেটে মরে। রোজ যত্ন-আত্তির শেষ সর্বত্র যেন শুরু হয়। বৃক্ষই তাকে খাটিয়ে নিল নিজের জীবন মতো!

অথচ গুলশানের রাত্রিকালীন ক্লাবের সঙ্গে কোথায় যেন মিল আছে এই বেলকনিটার। এখানে সব বৃক্ষ দোলে বাতাসে, তাকে ছোঁয় আপন আপন সুযোগে, ওখানে সব নেশায় হেলে, তাকে ছোঁয় আপন আপন খেয়ালে। ইচ্ছে হলে সেও বেলকনির বৃক্ষের যত্নের মতন করে সাড়া দেয় মাঝে মাঝে, কখনো বা যদি মন চায়, নতুন বা বের হয়ে সোজা বাসায়, আর এখন সোজা ঘরে। আফ্রো যখন বেলকনি থেকে বেরিয়ে যায়, তখন মনে হয় ঘরটা না থাকলে এ অসহ্য হতো , আবার যখন ঘরে থাকে তখন ভাবে ওটা একটা দুঃস্বপ্নের দ্বীপ, অথচ কেউ কাউকে ছাড়ে না।

আফ্রোদিতির খোলামেলা জীবনে যুক্ত এই খেলাময় বারান্দার বাগানে এসে কথামতো ঠিক বিকেলে উপস্থিত হয় সুনীতি আর সেই মহিলা। সুনীতি তাকে দেখে চিনতে পারে সঙ্গে সঙ্গে, ভাবে, ও এই তাহলে সেই মহিলা, সেই তরুণী, যে কিনা তার ভার্সিটি জীবনের সুধু... অবশ্য এ নামে সে ছাড়া কেউ ডাকতো না, মেয়েটার নাম ছিল সুধা চক্রবর্তী। তবে এই বলেকনি সব উলট-পালট করতে জানে। এখানে বসে স্বপ্ন দেখা কিংবা দূরবর্তী কোনো স্বপ্নের দিকেও চাইতে মানা। প্রতিদিন নিয়ম করে বসে আফ্রো যে নীতি তৈরি করে রেখেছে, তা জানে কি সুনীতি?
সুনীতি মেঝেতে বসে, আর সুধা দোলনা চেয়ারে। সুনীতিই আগ বাড়িয়ে বসতে বলছে। এ যাবত কালের সমূহ বৃত্তান্ত নিয়ে বসার পর থেকেই অনেক কথা হয়ে গেছে তাদের মধ্যে। অথচ সুধার কাছে সব বিভ্রান্তি। মানুষ আজো যা যা শিখতে পারে নি, করতে অক্ষম সেই লিস্টে সুনীতিরি সঙ্গে তার ঘর বাঁধার স্বপ্নটাও থাকবে বোধ হয়, ভাবে সুধা। এখনো তা মনুষ্য জীবনে অধরা, তা তার মতো অনেকের বেলায় সত্যি-স্বাভাবিক।
অনেক্ষণ দুজনে চুপ থাকার পর এবার প্রশ্ন করে সুনীতি।
- সুধা তোমায় মারে কেন, তোমার হাজব্যাণ্ড?
- আমি মারি না, তাই।
উত্তর শুনে হকচকিয়ে গেল সুনীতি। কি প্রশ্ন করবে ভেবে পায় না। এবার সুধাই জানতে চায়,
- জানতে ইচ্ছা হয় না, কেন আমি হারিয়ে গেলাম? আর কোথায় বা হারালাম?
শুধু অস্পষ্ট ভাবে ঠোঁট থেকে ‘জানি না’ শব্দটি বের হলো সুনীতির।
- কারণ, সেটেল্ড ম্যারেজ। আমি সংসারে হারিয়ে গেছি নীতি। সংসারে। স্বামীর সংসারে। বাবা জেনে শুনে এমন জানোয়ারের সাথে পাঠালো আমায়।
বেশ আবেগ প্রবণ হয়ে নিজেকে আবার সামলে নিল সুধা। সুনীতি রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল, থাক। সুধা বললে, কিছু অমত হলেই, ধমক দেয় নিশককে নিয়ে চলে যাবে। ও, তোমাকে তো বলাই হয় নি, দশ বছরের একটা ছেলে আছে আমার।
- তাই নাকি! কোথায় সে?
- এই বাসাটায় নতুন উঠেছি তো, আসার আগে ওকে মায়ের কাছে ধানমণ্ডিতে রেখে এসেছি। এখানে থেকে কি শিখবে?
- ও, ধানমণ্ডিতে এখনো তাহলে মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় নি?
- বুঝিনি।
- বুঝবে না, শুনতে চাইলে বলতে পারি।
- বলো।
- দুটো বাসা মিলে আমাদের সংসার। বলেছে বোধ হয় আফ্রো। গুলশানের এই বাসাটায় থাকে সে, আর আমি থাকি ধানমণ্ডিতে। ওটা আমিই নিয়েছি। এ বাসাটা অবশ্য বাবার কাছ থেকে পেয়েছে আফ্রো। বিয়ের আগেও যেমন ছিলাম, এখনো আমারা তেমন। দুজনে আলাদা আলাদা। যার যখন মন চায়, সময় হয়, তখন সে চলে আসি। বেশ কিছুদিন যাবত ও ধানমণ্ডিতে আসে না, তাই আমিই এলাম বাধ্য হয়ে। জানো, সংসারটা বেশ ভালোই চলছে আমাদের। কোনো ঝামেলা নেই, ঝগড়া ঝাটি নেই, যার মতো সে সে। শুধু, শুধু শারিরীক প্রয়োজন দেখা দিলেই তাবে আমাদের দেখা করার প্রয়োজন হয়। সম্ভবত, দুটো বাসার মতো মনও আমাদের দুটো-অর্থাৎ মনের প্রযোজনে আমরা একত্রিত হইনা কখনো।
সুনীতিকে থামিয়ে দিয়ে সুধা বলে, ‘এটা কোনো সংসার, কেমন দাম্পত্য?’
- কিন্তু এভাবেই দেখবে সব ভালো চলে। হাঁড়িতে হাঁড়িতে বাঁধে না। আমদের না হয় দোষ দিতে পারো, আমাদের সন্তান নেই, তাই অমারা এক সঙ্গে না থাকলেও চলে, কিন্তু তোমার সংসারে সন্তান কোথায়? এখনো সময় আছে। জীবনের শেষ দিনে মৃত্যুর এক সেকেন্ড আগেও যখন পেছন ফিরবে তখন পেছনের দুঃসহ স্মৃতি ওই একটু খানি সুযোগের সৎ ব্যবহার করে প্রচন্ড খাবলা দিয়ে কলিজা ছিঁড়ে নেবে, তাই আর খারাপ স্মৃতি বাড়িও না। ভালো স্মৃতি যোগ করো জীবনে। অন্তত যোগ, বিয়োগ হয়ে যাতে জিরো হয় কষ্ট।
- আমি কি করবো এখন?
- তুমি নাকি কলেজে চাকরি করছো, যাও না, আলাদা বাসা নিয়ে কেটে পড়ো। অলাদা থাকো। মনে রাখবে, তোমাদের মন মরে গেছে, বলতে আর কিছু নেই, যদি বা শরীর বলতে কিছু থাকে, তবে দেখা হবে, তুমি আসবে তার বাসায়, সে যাবে তোমার বাসায়, মিলন শেষে বিচ্ছেদ নিয়ে ফিরবে।
- সে যদি একমত না হয়?
- তাহলেও তুমি চলে যাবে তোমার ভালো স্মৃতির খোঁজে। ভয় পেয়ো না, গিয়ে দেখবে, আরেক পুরুষও এভাবে যৌথ ঘর ছেড়েছে নিজের একার ঘরে থাকতে। তখন তাকে পেলেও দুজনে আলাদা থাকবে বুঝলে।
- তাহলে নিশক?
- তুমি ওকে নিয়ে ভাবছো কেন? ছেড়ে দাও ওর ওপর? সে কি করে দেখ, বাবা না মা? সেটা তার আগ্রহের ব্যাপার। আর এখন তো অনেক দম্পতি আলাদা বিছানায় থাকছে, থাকছে না, শুধ কামের সময় ‘কাম’। কিন্তু, তোমাদের সমস্যাটা বিছানায় নয়, মনে। তাই আলাদা ঘর নাও। ওটাই তোমার ভালো স্মৃতির বাতিঘর। এই আইডিয়াটা আমি কিভাবে পেয়েছি জানো? আমার খালা আর খালু। বড়ো হওয়ার পর থেকেই দেখছি, একজন চাকরি করে যশোরে আরেকজন ঢাকায়, এখন অবশ্য জার্মানীতে। নিজেদের পেশাগত কারণেই তাদের আলাদা থাকতে হতো। অথচ, তাদের কি সুন্দর সংসার! যে যখন সময় পেতো ছুটে আসতো। মাসে পাঁচ ছ বার দেখা হয়ে যেতো এই করেই। অথচ তারা কিন্তু বুঝতেই পারে নি ব্যাপারটা। শুধু চাকরি বাঁচাতে গিয়েই তারা আলাদা থেকে টেরই পায়নি যে, তারা একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তারা না বুঝেই, এমনকি দাম্পত্যে কোনো ঝামেলা করেও নয়, এমনিতেই আলাদা থেকে জীবনের শেষ প্রান্তে। এটা দেখে আমি শিখেছি। তাদের কাছে এটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই ছিল, কিন্তু আমার কাছে তা অস্বাভাবিক দাম্পত্যের সমাধান।
- তাদের সন্তান?
- সন্তান, একটাই। মেয়ে। এখনো বেড়ে উঠছে সে। রোজ একটা বেলকনি বড় করে তুলছে তাকে। আমার স্ত্রী, তার নাম আফ্রোদিতি। তুমি বাবার ইচ্ছায় বিয়ে করার পরপরই আমরা বিয়েটা সেরে ফেলি। আসলে তোমাকে হারানোর পর আমার এমন একটা আশ্রয় দরকার ছিল। তোমাকে ঘিরেই তো সব প্ল্যান-পোগ্রাম ছিল-তাই কিনা একটু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল সব। কখন যে আফ্রোর দিকে ঝুঁকে গেছি টেরই পেলাম না।

পরের মাসের ঠিক এক তারিখ। সুধার ফোন। রিসিভ করলো সুনীতি। সুধা বলল,‘ধানমণ্ডিতে মায়ের বাসার পাশেই বাসা নিলাম। আজি উঠলাম কেবল। উঠেই তোমাকে মনে পড়লো। নিশক মায়ের ওখানেই থাকতে পছন্দ করে। প্রথমে শুনে আমার হাজব্যাণ্ড ডিভোর্স দেবে বলে ভয় দেখালেও আজ আসার সময় বলেছে, চলেই যাবে, মনে পড়লে কখনো, এসো এখানে, দরজা খোলা থাকলো। যাক গে সে কথা । তুমি কিন্তু মাঝে মধ্যে আসতে ভুলবে না, বলে দিলাম।

জানি, সে দিন থেকে হয়তো সুনীতি গুলশানে কম কম যায়। আফ্রো তো আগে থেকেই কম আসতো ধানমণ্ডি।