কীর্তনখোলার পাড়ে

আনিফ রুবেদ

খটখট করে টিনের দরজাতে নখ দিয়ে নক করতেই একটা ধবধবে সাদা বেড়াল বেরিয়ে, ওপরে দাঁড়িয়ে, গোল দুটো চোখ পাকিয়ে তাকাল। শহুরে সবাই চোখ পাকায়। কুকুরগুলো আরো বেশিই, এ কারণেই সে আগেই নক করে কোনো কুকুর মুরুব্বী আছে কি না বোঝার জন্য, যদি থাকে ঘুঁককুউ... ঘক... করে ওঠে, বের হয় না। কুকুর আছে বোঝা হয়ে গেলে, হিরণ সেখানে আর থাকে না। কুকুরগুলো বড় বেয়াড়া কিচ্ছু বোঝে না, কামড়ে দেয়।

বিড়ালটাকে হুস্স্স্ করতেই ধপ করে লাফিয়ে পড়ে, দৌড়ে রাস্তার ওপাশে গিয়ে চোখ গোল করে। সাদা ধবধবে শরীরে এমন নোংরার মধ্যে থেকেও একটুও ময়লা লাগে নি। পাশে পড়ে থাকা একটা আধলা ইট দিয়ে কয়েকটা বাড়ি দিতেই ভেতরের চাপে ফস্ করে খুলে যায় দরজাটা। বেড়ালটা যা চাটছিল এতক্ষণ তা উছলে এসে পাশের জমাট বাঁধা ড্রেনের ওপর পড়ল। হিরণ পলিথিনের প্যাকেটটা তড়িঘড়ি তুলে নেয়। বেড়ালটা বেশি খেতে পায় নি, পলিথিনের মুখ গড়িয়ে কিছুটা ড্রেনের কাদালু পানিতে পড়েছে, প্যাকেটটা ঠিকমত বেঁধে সোজা হয়ে দাঁড়ায় হিরণ। খালুপ আর রোজাম হাজির। তাদের চোখে শূন্য আকাশ। ওদের দিকে হিরণ কঠিন চোখে তাকায় - ‘না, দিমু না।’ খালুপ হিরণের দিকে এগোয়। হিরণ প্যাকেটটা বগলে চেপে দৌড় মারে। ম্যুনিসিপ্যালিটির লোক এসে খালুপ আর রোজামের সাথে আসা আরো যে কয়জন ছিল তাদেরকে পেটাতে শুরু করে। ‘মোগো মারছ ক্যান খোলছেতো হিরইন্যা’ - খালুপ আর রোজাম আত্মপক্ষ সমর্থন করে। সুইপার ডাস্টবিনের দরজাটা লাগিয়ে দিল শক্ত করে। ইটটা ডাস্টবিনের ওপরের ছিদ্র দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়।

লঞ্চঘাটের কাছে এসে মানুষের ভিড় হতে একটু দূরে গিয়ে বসল হিরণ। পিছন ফিরে দেখার চেষ্টা করে, খালুপ আর রোজাম আসছে কিনা। হিরণ আজ সারাদিন কিছু খায় নি। কিছুতেই এই খাবারের এক কণাও কাউকে দেয়া যাবে না। সূর্যটা এখন আর আলো ছড়াচ্ছে না, ছবিতে আঁকা সকাল বা সন্ধ্যের সূর্যের মত কীর্তনখোলার জলে অর্ধেক ডুবে আছে। মোটা মোটা সোনার চাঁইয়ের মত আলো ঢেউয়ের ওপর দিয়ে এসে বড় বড় জাহাজের কালো তলাতে এসে মিশে যাচ্ছে। পারাবত এখন ছেড়ে যাবে ঢাকার দিকে। ভেঁপু বাজছে পোঁ... পোঁ... পোং আ...। ক্ষণেক পরপরই মানুষজনের জলমেশা গুঞ্জনের শব্দ ছাপিয়ে বাজছে বাঁশিটা। সারাদিন জাহাজের খেলা। কোনো জাহাজ এসে ভিড়ছে কোনোটা ছাড়ছে। পারাবত ছেড়ে দিল।

খাবারের প্যাকেটটা সামানে নিয়ে বসে হিরণ। কিছুক্ষণের মধ্যেই খেলনা জাহাজের আকার নিল পারাবত। রাজহংসের বাঁশি বাজল এখন। প্যাকেটটার দিকে লোভী চোখে তাকিয়ে আছে একটা কুকুর, টলটলে মুক্তার মত জল খসছে জিহ্বা দিয়ে। কুত্তার মুখে মুক্তা। অস্তায়মান সূর্যের আলোয় বিড়ির আগুনের মত জ্বলছে চোখ। দূরে যাত্রী ছাউনির রাস্তা ধরে খালুপকে দেখা গেল এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আর হাঁটছে। রোজামকে দেখা যাচ্ছে না। পাশে থেকে মাঝারি সাইজের একটা পাথর তুলে কুকুরটার দিকে কষে চালাল। কুকুরটা হঠাৎ এমন মার খেয়ে - ঘাঁই কি কিঁ কুক... শব্দ করে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল। সেখান হতে মুখ খিঁচিয়ে হিরণকে উদ্দেশ্য করে চেঁচাতে লাগল - ঘাঁ - আঁ - আঁ ভাউয়াঁ। হিরণ কুকুরটার দিকে তাকিয়ে সমগ্র কুকুর জাতিকে গাল দিতে লাগল - ‘হালা হুয়ারের ছাওগুলো সব ডাস্টবিনগুলা দহল কইরা ফলাইছে, না হইলে এই ছোট্ট একটা প্যাকেটের জন্য খালুপ আর রোজাম কুত্তার মতন খুইজ্যা বেড়াইতো না।’ কুকুরদের ওপর হিরণের যত বেশি রাগ হয় তত বেশি মায়া বাড়ে খালুপ ও রোজামের ওপর - ‘অবশ্যই কোনো জায়গায় খাওন খুইজ্যা পায়নি। ভাবে - এইটা দিয়া তাগো অল্প পরিমাণ দেই। হিরণের পেটের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে, ভাবনাটা ছিঁড়ে যায় এক মুহূর্তে। আজ সারাদিন খায় নি সে, যে পরিমান খাবার প্যাকেটটাতে আছে তাতে নিজেরই হবে না। খালুপ যাত্রী ছাউনি ধরে সোজা চলে গেল, কিন্তু উত্তর দিক হতে রোজামকে এবার আসতে দেখল হিরণ, মনে হচ্ছে এদিকেই আসছে। পলিথিনের প্যাকেটটা খুলে বসেছিল হিরণ। রোজামকে দেখে তাড়াতাড়ি গুটিয়ে নেয়। এপাশে মোটা পিলারের আড়ালে ক্ষীণ দেহটা লুকিয়ে রাখে। একবার রোজামকে উঁকি মেরে দেখতে চেষ্টা করে - এখন কোথায় সে। কোথাও দেখা যাচ্ছে না। প্যাকেটটা খুলে খুব সাবধানে। চোখ আবার চকচক করে ওঠে।

সূর্যটা ডুবতে ডুবতে ডুবছে না যেন। আরো সিকি ভাগের অর্ধেক বেরিয়ে আছে। হঠাৎ কিছুদূরে চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেল। কোনো মানুষকে মারছে মানুষ। তৃতীয়বারের মত প্যাকেটটা বন্ধ করে হিরণ উঠে দাঁড়ায়। গোলমাল হৈ চৈ হিরণের নেশার মত লাগে। সাথে সাথে ছুটে যেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু ভাবল - ‘না, খাইয়াই যাই।’ আবার প্যাকেটটা খুলে বসল হিরণ। খেতে যাবে এমন সময় মনে হলো গোলমালের ভোঁতা শব্দের মধ্যে সরু একটা চিড় ধরিয়ে যে গোঙানিটা আসছে সেটা রোজামের। তাড়াতাড়ি প্যাকেটটা বন্ধ করে পূবদিকের যাত্রী ছাউনির ভাঙা ইটের যে স্তূপটা ছিল তাতে গুঁজে রেখে গোলমালের দিকে হাঁটতে লাগল। পেট চোঁ চোঁ করছে, ক্ষিধের জ্বালায় পদক্ষেপ নিতে পারছে না। ঠিকই, রোজাম। ভিড়ের মধ্যে সব শরীরই বলিষ্ঠ। পোশাক আর টাইয়ের উজ্জ্বলতা। হিরণ মার থামাতে বলতে পারছে না, উল্টো তাকেও মারতে শুরু করবে। রাজহংসের বাঁশি বাজল। জাহাজটা এক্ষুনি ছেড়ে দেবে। ভিড়টা পাতলা হচ্ছে। হিরণ দাঁড়িয়ে থাকে। যতক্ষণ না সব মানুষ যাচ্ছে ততক্ষণ কিছু করা যাবে না। ভিড় কমে গেছে। জাহাজের নোঙর তোলা হচ্ছে। একটা লোক শেষ গাট্টা মেরে রাজহংসের দিকে দৌড়াতে লাগল। শেষ গাট্টাটা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে রোজাম। হিরণ গিয়ে তার কাছে বসল। রোজাম কষ্ট করে উঠে বসে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। হিরণ দয়াদ্র গলায় জিজ্ঞাসা কারল - কি করছিলি?
- কিছু করি নাই।
- মারছে যে!
কান্নার দাগ শুকিয়ে গেছিল। সেই দাগ বেয়ে আরো ফোটা ফোটা জল গোল গোল হয়ে গাল দুটো প্রায় না ছুয়েই গড়িয়ে পড়ল। রোজাম যা বলল তা হচ্ছে - ২নং যাত্রী ছাউনিতে বসে ছিল স্বামী-স্ত্রী, সাথে একটা বাচ্চা। বাচ্চাটি পাউরুটি খাচ্ছিল। যতটুকু খাচ্ছিল তার চেয়ে বেশি ভেঙ্গে ভেঙ্গে নিচেই পড়ছিল আর সেগুলো কুড়িয়ে খাচ্ছিল রোজাম। বাচ্চাটা এক সময় গোটা রুটিটায় রোজামের দিকে এগিয়ে দেয় - ‘নাও, খাও, সিবু কাকা খাও।’ সিবু কাকা কে রোজাম জানে না কিন্তু পুরো রুটিটা নিতেও ভয় করছিল, স্বামী-স্ত্রী যদি সন্দেহ করে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রী একমনে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে কি কি সব গল্প করছে আর হাসছে। হাত বাড়িয়ে রোজম রুটিটা নিয়ে নেয়। এরপরেই স্বামী স্ত্রীর চোখ পড়ে রোজামের হাতের পাউরুটির ওপর আর স্বামীটি এসে বকাঝকা শুরু করে। এসময় আশপাশ থেকে আরো কয়েকটা লোক এসে জোটে। স্বামীর বকাঝকাকে জোটা লোকগুলো প্রহারে রূপান্তর করে। তারপরতো এই অবস্থা।

রোজামকে উঠিয়ে ধরে হিরণ তার সেই ডেরায় ফিরে যায়। এটি একটি পরিত্যক্ত যাত্রি ছাউনি। ডাস্টবিন থেকে পাওয়া সেই খাবার যেখানে লুকিয়ে রেখেছিল সেখান থেকে বের করে আনে। পিঁপড়া ধরে গেছে। মনে মনে পিঁপড়াদের মা বাপকে তুলে গাল দেয় হিরণ। যতদূর সম্ভব পিঁপড়া দূর করে খাবারটা ভাগ করে কিছুটা নিজে খায় কিছুটা, কিছুটা রোজামকে দেয়। পিঁপড়া মিশ্রিত ভাত দু জনে খায়। কিছুক্ষণ পর রোজাম বমি শুরু করে। হিরণ বলে শুয়ে পড়, ঘুমিয়ে পড়, সকালে দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে। রোজাম কাতরাতে কাতরাতে ঘুমিয়ে পড়ল।


রাতের পেট চিরে একটা ভোর জন্মিছে। সারারাত জ্বলে জ্বলে একটা ভোর জন্মাতে জন্মাতে ক্লান্ত শুকতারা মলিন মুখে পুবাকাশের কোল হতেই লুকিয়ে যাচ্ছে। তার মুখে প্রসব বেদনার ছাপ স্পষ্ট। চলে যাওয়া সময় চলে যাওয়া রাতের পাতলা আঁধার ফুঁড়ে ফুটফুটে একটা ভোর হাঁচড় পাঁচড় করে ছোট জরায়ূ ছিড়ে বের হয়ে আসছে। রাতের নাড়ির শেষ বাঁধনটি ছিড়ে বের হয়ে এলো ভোর। পৃথিবী কোঁকাচ্ছে যেন, রক্তরশ্মিতে ভেসে যাচ্ছে সবকিছুই। কিন্তু সূর্যটা উঠতেই পৃথিবীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। সফল জন্মদাত্রী পৃথিবী এখন মা, মায়ের হাসি মুখ। ঘুম থেকে জেগে হিরণ দেখল রোজামের মুখটা শোল মাছের মত ঢোল হয়ে ফুলে আছে। অথচ শান্ত, খুবই শান্ত মুখখানা। বাম হাতটা রোজামের নাকের কাছে ধরে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ভাবে, এ মৃত্যুটা কেমন? বুকটা চড়চড় করে ওঠে হিরণের - সুন্দর একটা মৃত্যুর আকাঙ্খা জাগে মনে, সীমাহীন আশা। আরো একটা দীর্ঘশ্বাস বাতাসের প্রতিটি কোনায় কোনায় কণায় কণায় মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল। বিষাদে ভরে গেল। বিষাদ মাখা ঘটনাটা কিছুতেই ভুলতে পারছে না। মেঝে থেকে উঠে বাইরে এসে সবুজ ঘাসের ওপর, সবুজ ঘাসের ওপর হেমন্তের শিশির দেখতে পেল। শিশিরের শুদ্ধতার দিক হতে চোখ গেল মুনিসিপ্যালিটির গাড়িটির দিকে। এ গাড়ি দেখে রোজাম সম্পর্কিত মনের সব বিষাদ দূর হয়ে গেল। নতুন বিষাদ দেখা দিল তার মনে। পৌরসভার সুইপাররা ডাস্টবিনগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করেছে। আরো একটু আগে বাহির হলে ভাল হতো। রাতে যে সকল উচ্ছিষ্ট জমা হয়েছিল গাড়িটা সব নিয়ে চলে যাবে এখন। কি খাবে তাই নিয়ে চিন্তা করতে লাগল। তৎক্ষণাৎ তার রোজামের কথা মনে পড়ল। ওর কোমরে দু চার আনা পয়সা আছে কিনা দেখা যেতে পারে। রোজামের কোমরে কোনো পয়সা নেই তবে কালকের পাউরুটির খ-টুকু গোঁজা আছে এখনো। সে রুটির খ-টুকু নিয়ে কামড়াতে কামড়াতে হয়ে বের গেল, এখনো পরিস্কার করা হয়নি এমন কোনো ডাস্টবিনের দিকে।