ফাউ

সরোজ দরবার

খোকন খোকন করে মায়/ খোকন গেচে কাদের নায়/ অন্য কাকে দাঁড় বায়/ খোকনরে তুই ঘরে আয়... সুর করে কেটে কেটে বলছে বিশু। আর সমানে খৈনি ডলছে। এক হাতে নিয়ে অন্য হাতে দু’টো তালি দিতেই গুঁড়োগুলো নাকে এসে ঢুকল। আর সুড়সুড়িয়ে বেদম হাঁচি পেল খোকনের। পরপর গোটাকয় হেঁচে নিয়ে সে বলল, শালা তুই চুপ করবি? আর তো কিছু জানিসনি, ওই আতাগাছে তোতাপাখিতেই হয়ে গেল! বিশু খ্যাক খ্যাক করে হেসে বলল, কে বলেচে, জানিনি? এই তো, মাগো আমায় ছুটি দিতে বল, সকাল থেকে ফুচকা বেচেচি মেলা, এবার আমি তিথির ঘরে বসে, করব শুধু...
শেষ করতে পারল না। খোকন লাথি মারতে গেল। বিশু হাসতে হাসতে দূরে একটু ছুটে পালাল। খৈনি দেখিয়ে বলল, নিবি তো? খোকনও ততক্ষণে হেসে ফেলেছে। বিশু ফের এগিয়ে এল। দু’জনের মতোই খৈনি বানিয়েছিল। খোকন খৈনি ডলে না। ফুচকা বেচে বলে। পারেও না। গুঁড়োয় হেঁচে ফেলে। তবে বিশু বানিয়ে দিলে ঠোঁটের তলায় চালান করে দেয়। রোজকার মতোই সে খানিকটা খোকনের হাতে দিল। বাকিটা নিজের মুখে পুরে, বলল, ভাই ভুলে যা ভুলে যা। পাখি উড়ে গেচে।
পাখি এল কবে! উড়েই বা গেল কবে! খোকন থুক ফেলে মাটিতে। একটু দূরে তার ফুচকা রাখা। এখন আর লোকজন নেই। এবার সব গুটিয়ে বাড়ি।
মেয়েটা আসে না আসে না তো আসেই না। দু’দিন, চারদিন...সাতদিন দশদিন...এক মাস, আর আসেই না। অথচ এরকম সময়েই, ন’টার একটু পরের দিকে আসত। বিশু বেলুন-খেলনা বেচে, ঘুরে ঘুরে। ইচ্ছে করেই সে সময় কাছ থেকে ঘুরে যেত। চোখ মটকাত খোকনকে। পরে ফাঁকা হলে বলত, কী ইংলিশ দিদিমণি কী বলচে? বিশু কিছুতেই ‘ছ’ উচ্চারণ করতে পারে না। সব ‘চ’ ‘চ’ করে বলে, খাচ্চে দাচ্চে ঘুমোচ্চে। এই এলাকার পুরনো লোকেরা হলে বলত, খাইচু। খোকন, বিশুরা অবশ্য ওরকম বলে না। যাকগে, মেয়েটার এই নামটা হয়েছিল একটা ঘটনার পর। মেয়েটা, খোকনরা জেনেছিল ওর নাম তিথি, ওর বন্ধুদের ডাকাডাকিতেই, রোজ তিনটে করে ফাউ নিত। একটা ফাউ সবাইকেই দেয় খোকন। জোরাজুরি করলে বড়জোর দু’টো। তাই বলে তিনটে! মেয়েটা ঠিক আদায় করত। ওর বান্ধবী বলত, রোজ এতগুলো করে ফাউ দিচ্ছ? ব্যবসা টিকবে তো? খোকন হাসত। বান্ধবী তিথিকে বলত, আর তুইও বলিহারি, ফুচকা কিছু খেতেও পারিস! তিথি বলেছিল, ফুচকা ঠিক কীরকম জানিস? ইউ কানট লিভ উইথ দেম, অ্যান্ড ইউ কানট লিভ উইদাউট দেম। খোকন মনে মনে মানেটা করছিল। বিদ্যে তো ক্লাস টেন অব্দি। তবু এমন শক্ত কিছু নয়। লিভ মানে বাস করা অব্দি যখন পৌঁছেছে, এমন সময় তিথি তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, বুঝলে খোকন? খোকন বোকার মতো ঘাড় নেড়ে ফেলল। মানে বোঝেনি। তিথি বলল, এর মানে হল, তুমি এর সঙ্গে থাকতেও পারবে না, আবার একে ছেড়েও থাকতে পারবে না। এটা একটা বইয়ের মলাটে লেখা আছে। বান্ধবীটা রাগ করে বলল, নে তুই এবার এখানেও লেকচার দে, জ্ঞান দিতে পারলে আর কথা নেই। এইসব কথা যখন হচ্ছিল, বিশু তখন কাছেই ঘুরছিল। সেদিন থেকেই এই ইংলিশ দিদিমণি নামটা চালু করে দিল।
খোকনও মনে মনে তিথিকে ইংলিশ দিদিমণিই বলত। কিন্তু মেয়েটা দিদিমণি নয়। কথা শুনে মনে হত, পড়ে টড়ে। কিন্তু স্কুলে নয়। আজ এতবছর স্কুল মাঠের সামনে ফুচকা বিক্রি করছে খোকন। এটুকু আন্দাজ তার আছে। প্রথম প্রথম কাজটা করতে খারাপই লাগত। বয়স তখন কম। স্কুলে আসছে যাচ্ছে প্রায় ওরই বয়সি ছেলেরা। এবং মেয়েরা। তাদের সামনে ফুচকা বেচতে লজ্জা করত। এটা ওর স্কুল নয়, এইই রক্ষে। ওর বাবা যে ফুচকা বিক্রি করত, ব্যাপারটা পারতপক্ষে নিজের স্কুলে বলত টলত না। এই চক্কর থেকে বেরনোর ধান্দা ছিল। পড়াশোনা করত। আহামরি কিছু নয়। তবে ফেল করেনি। কিন্তু টেনে উঠল আর বাবা চোখ বুঝল। জমিজমা নেই। একঘর যাইহোক ভাড়াটে ছিল বলে বেঁচে গিয়েছিল। প্রথম যখন এক কামরা ভাড়া দিয়েছিল বাবা, মায়ের সঙ্গে সে কী ঝগড়া। দু’কামরা ঘরের একটা কেউ ভাড়া দেয়? আবার ছেলে যখন এতবড়! বাবার বোধহয় সংসার টানতে চাপ হচ্ছিল। ওরা কেউ সেদিন বোঝেনি। বাবাও কোনও কথা শোনেনি। বরং অ্যাডভান্সের টাকায় ভাড়াটেদের জন্য একটা বাথরুম বানাতে শুরু করে দিল। পরে বাবা চলে যেতে ওই ভাড়াই বাঁচাল। মাসে কিছু টাকা তবু বাঁধা। কিন্তু তাতে আর কদ্দিন চলে! খোকন বুঝে গিয়েছিল, বাবার ব্যবসায় হাত লাগানো ছাড়া গতি নেই, অগত্যা। তবে তাদের শীতলপুরে তো কিছু করতে হবে না। উজিয়ে চলে এসেছিল শ্যামপুরে। স্কুল মাঠের পাশে বাবার জায়গা নেওয়া ছিল। মাস কয়েক পর বলে কয়ে সেখানেই ব্যবসা শুর করল। তখন থেকেই বিশুর সঙ্গে আলাপ। সেও কতদিন হয়ে গেল। প্রথম প্রথম কাজ করতে ঠোক্কর খেত। ফুচকা বিক্রিকে যত অচ্ছেদা করেছিল, ততটাও নয়। টক জল বানানো, আলু মাখা, ঝাল-টক ঠিকঠাক দেওয়াটা একটা হাতের ব্যাপার। হাত তৈরি হতে সময় লাগে। কাস্টমারদের ঝাড় খেয়ে খেয়ে সে সব শিখেছে খোকন।
এর মাঝে একদিন এল তিথি। কোথেকে এল খোকন জানে না। এদিকের কেউ নয়। অন্তত বিশু, খোকন চেনে না। ফুচকা খাওয়া হয়ে গেলে সাইকেল নিয়ে ডিঙেখোলার দিকে চলে যেত। ওদিকেই বাড়ি তাহলে। কিন্তু বাড়িই যদি হয়, তাহলে এখন আর আসে না কেন? স্কুলে যে পড়ে না, এমনকী উঁচু ক্লাসেও নয়, সে খোকন চোখের আন্দাজেই বুঝেছে। বেলপুকুর কলেজে পড়ত কি? এদিকে কোনও টিউশুনির জন্য আসত হয়তো। কিছুই জানে না খোকন। এসব তো আর জিজ্ঞেস করা যায় না। শুধু অপেক্ষা করত। ন’টা বাজবে বাজবে করলেই, বিশু বলত, তুই তো এখনও গোটাবিনি? পাখি আসবে তো? খোকন বলত, ভাগ শালা। বিশু বলত, হয়ে গেলে ডাকিস, খৈনি বানাব। ওই হয়ে ওঠা সময়টুকুর জন্য খোকন অপেক্ষা করত। তার খুব ভাল লাগত। এক একদিন এসে এক একরকম কথা বলত মেয়েটা। খোকন কোনওদিন সামসামনি ঝর্ণা দেখেনি। তবে মনে হত, তিথির মতোই হবে।
কিন্তু সে আর আসে না। কোথায় যে গেল, তার ঠিক নেই। খোকন এখনও অপেক্ষা করে। মাস পেরিয়ে যায়, বছরও ঠিক ঘুরে যাবে। বিশু এখনও পিছনে লাগে। লাগবেই তো। কতদিনের বন্ধু। বলে, পাখি মনে হয় মাওবাদী বুজলি। এসে দেখে টেকে ফুড়ুৎ। এলেও লাভ নেই, পুলিশে ধরবে। বিশু যাই বলুক, আসলে সত্যি কথাই তো বলছে। যদি আসে, তাতেও বা খোকনের কী! ফুচকাওলার ভাল লাগাকে কে পাত্তা দেবে! খোকন নিজে নিজে ভাবে, শালা এতবড় গাণ্ডু সে। এরকম একটা কাণ্ড বাধাতে পারল! সব গুছিয়ে সাইকেলের পিছনে বাঁধতে বাঁধতে সে আপনমনে বলে ফেলে, এই প্রেম জিনিসটা তো আচ্ছা শুয়োরের বাচ্চা!

২)
-তোমার খাবার রাখলাম, খেয়ে নিও।
একা একা একটা ম্যাগাজিন পড়ছিল খোকন। মিনতির গলায় অভ্যেসবশে মুখ তুলে চাইল। মিনতি, ওকে মিনু বলে ডাকে ওর মা-বাপ, খোকন কিছুই বলে না। রোজকার মতো খাবারটা রেখে ওড়নাটা গুছিয়ে চলে গেল। মিনু খুব শান্ত মেয়ে। এক একদিন দরজার সামনে একটু দাঁড়ায়। কোনওদিন বলে ডালটা, কোনওদিন চচ্চড়িটা, খেয়ো। খোকন বোঝে, ওগুলো মিনু রান্না করেছে। কখনও খোকন পরেরদিন বলে, চচ্চড়িটা ভাল হয়েছিল। মাছের মাথা দিয়ে মা করত, অনেকদিন পরে খেলুম।
এই এক ব্যাপার হয়েছে। নিজের বাড়িতেই পরগাছা হয়ে গেছে খোকন। বাবা গেল। পড়াশোনা গেল। মিনুদের ভাড়ার টাকা আর তার ব্যবসায় মোটামুটি চলছিল। ব্যবসাটা জমতে শুরুও করেছিল। খোকন ঠিক করেছিল, এবার মিনুর বাবাকে বলবে, ঘরটা ছেড়ে দিতে। যা রোজগার হচ্ছিল, তাতে ভাড়া না হলেও চলবে। হুট করে মা চলে গেল। একদম আচমকাই। বাবার সঙ্গে দিনরাত ঝগড়া। অথচ বাবা যাওয়ার পর দিনে দিনে কেমন জবুথবু হয়ে পড়ছিল। তারপর একদিন ঘুমের মধ্যেই চলে গেল। খোকন বিছানায় শুত। মা মেঝেতে। সেদিন দেখল মা ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছে, আর দরদর করে ঘাম দিচ্ছে। ব্যস, ওটুকুই। তারপর খোকনের হাতেই শুয়ে পড়ল। মিনুদের ডাকার সময়টুকু অব্দি হল না।
মুখের কথা গিলে নিল খোকন। মিনুরা থেকেই গেল। আর তার খাওয়ার বন্দোবস্ত হল। দুপুরটা বাইরেই খেয়ে নেয়, বিশুর সঙ্গে, যেদিন যেমন হয়। ভাত হলে ভাত, নইলে পরোটা ঘুগনি। রাতের খাবারটা মিনু এসে দিয়ে যায়। আগে খোকনদা বলত, এখন আর বলে না। সেও কতদিন হয়ে গেল। খোকন পাত্তা দেয় না। এখন আর ভাড়াও নেয় না সে। নিজের ঘরেই যেন ভাড়াটে হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরে নিজের বাথরুমে ঢুকে স্নান করে খোকন। মিনুর মা একটা অদ্ভুত ব্যবস্থা করেছে। দু’দিকে দু’টো বাথরুম। মাঝখানে পা চালাবার একটু জায়গা। সেখানে দড়ি টাঙিয়ে সবসময় কাপড় ঝুলিয়ে রাখে। যেন এমনিই শুকোচ্ছে। খোকন বোঝে, আসলে আড়াল। ঘরে ফিরে গায়ে পাউডার ঢেলে সে এক একদিন টিভি চালায়। দেখতে অবশ্য ভাল লাগে না। তখন ম্যাগাজিন পড়ে। ১২ টি প্রেমের গল্প- এরকম ম্যাগাজিন বেরলে সে কিনে নেয়। গাছতলার সম্বিতকে বলা আছে। এরকম কালেকশন এলেই তাকে দিয়ে যায়। একটা একটা করে পড়ে সে। একটা গল্পে লিখেছে, মেয়েটা ছেলেটার কাছে এলেই যেন একরাশ মেঘ নেমে আসে। মেঘ কী করে নেমে আসে খোকন জানে না। তার শুধু চোখে ভাসে, মিনু দরজা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর ওড়নাটা ভেসে ভেসে উড়ে যাচ্ছে। কেন রোজ মিনু খাবার দিতে আসে? মা পাঠায় বলে? নাকি নিজে থেকে? খোকন ভাতের ঢাকনা খোলে। চচ্চড়ি একটু মুখে দিয়ে বোঝে, আজও মিনুই রেঁধেছে।

৩)
মিনুদের এককালে নাকি ভাল অবস্থাই ছিল। কিন্তু বাপটা মাতাল। সব খুইয়েছে। একদিন মিনুর মা দুঃখ করে বলছিল। তারপর কে একজন ধরে বেঁধে মিনুর বাপকে কলকাতায় নিয়ে যায়। ওখানেই একটা কাজকম্ম জুটিয়েছে। এখনও মদ খায়। তবে মাতলামি করে না। মাসে মাসে মিনুর বাবাকে আসতে দেখে খোকন। তার সঙ্গে টুকটাক কথা হয়। ভাড়া দিতে চায়। খোকন হাতে করে নিয়ে আবার খোরাকি বাবদ দিয়ে দেয়। মিনুর বাবা হাসে, খোকনও। মিনু কলেজে উঠল যখন, তখন টানাটানি পড়েছিল। মিনুর মা-বাপ কিছু বলেনি। মিনুকে দেখে সন্দেহ হয়েছিল খোকনের। জিজ্ঞেস করে অনেক জোরাজুরিতে জানল। হাতে টাকা ছিল। দিয়ে দিল। বাড়ির আর কেউ জানে না। খোকন মাঝে মধ্যেই মিনুকে দুশো, তিনশো টাকা দেয়। কলেজে পড়ে। হাতখরচ লাগে নিশ্চয়ই। মিনু নিতে চাইত না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকত প্রথম প্রথম। এখন নেয়। কিন্তু ওটুকুই। আর মিনুকে কোনওদিন কিচ্ছু বলে না খোকন। মিনুও বলে না। খোকন ভাবে, কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে মিনু। আর বলছে ফাউ দেবে না, আর একটা? জোরাজুরিতে একটা নিশ্চয়ই বেশিই দেয় ফুচকাওলা। কে সে? খোকন জানে না। ম্যাগাজিনটা সে বালিশের তলায় সেঁধিয়ে দেয়। গল্প পড়ে পড়ে যত উদ্ভট চিন্তা মাথায় এসে জোটে। একটা কথা খোকন খুব ভাল বুঝেছে, এই পড়াশোনা করাটাই কাল হয়েছে। খালি অশান্তি। কিছুতেই স্থির থাকতে দেয় না। বিশুর পেটে বিদ্যে নেই। পেটে ভাত জুটলেই তার শান্তি। খোকন কিছুতেই বিশু হতে পারে না।
এই যে মিনুকে টাকা দেয় খোকন, কেন দেয়? অনেকবার সাইকেল চালাতে চালাতে সে নিজেও ভেবে দেখেছে। মিনুটা বয়সে তার থেকে ছোট। তার মানে, মায়া হয়! নাকি সে কলেজে পড়তে পারেনি সেই আক্ষেপটা এভাবে মেটায়! কলেজের ছেলেমেয়েগুলো ফুচকা খেতে এলে খুব হিংসে হত খোকনের। গোড়ার দিকে। মনে হত ধরে ক্যালাই। বাপ পয়সা দিচ্ছে। আর পড়াশোনা না করে মেয়েদের সঙ্গে ফুচকা খেতে এসেছে। হ্যা হ্যা করে দাঁত কেলাচ্ছে। পড়তে হত খোকনের মতো অবস্থায় তো বুঝত, কত ধানে কত চাল। তখন খোকনের বয়সও অনেক কম ছিল। এখন আর ওসব মনে হয় না। বরং খোকন ভাবে এখন, এই বয়সে আনন্দ না করলে কবে করবে? খোকন টের পায় হু হু করে বয়স চলে যাচ্ছে। সাইকেল জোরে চালালে যেরকম কানের পাশ দিয়ে বাতাস চলে যায়। একসময় ভেবেছিল, ব্যবসার পাশাপাশি রাতে কম্পিউটর শিখবে। তারপর এই ফালতু জীবন ছেড়ে একটা অন্য কাজ করবে। নিদেন সাইবার ক্যাফে ট্যাফে। ওই তো অশোক মাস্টারের ছেলে পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা। বাপের পয়সায় ক্যাফে খুলেছে। এখন গায়ে সেন্ট ছড়িয়ে বাইক নিয়ে দোকান খুলতে আসে। ফোনে দশটা গান ঢুকিয়ে দিলে কুড়ি টাকা নিত। রিংটোনের জন্য পাঁচ টাকা করে। ভাল কামাই। ওরকম একটা জীবন চেয়েছিল খোকনও। একটু ভদ্রস্থ। ফুচকাওলার ব্যাটা ফুচকাওলা হয়ে থাকতে চায়নি। তবু তাই হল। কমপিউটর ক্লাসের ভাড়া জোগাড় জোগাড় করতেই মা গেল। কটাদিন সব কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে কেটে গেল। খোকনের মনে হত, এই দিন দুই কাটল। আসলে বছর ঘুরে যাচ্ছে। তারপর তো টাচফোনই এসে গেল। সাইবার ক্যাফের দফারফা। কম্পিউটরের কাছেও আর কেউ যায় না। গান সিনেমা সব মোবাইল থেকে মোবাইলে বিনা পয়সায় চলে যায়। অশোক মাস্টারের ছেলে এখন মোবাইল আর রিচার্জ কার্ড বেচে। আর খোকন ফুচকা। এত বদল হল চাদ্দিকে, তবু কিছু বদলাল না। যে যেমন ছিল তেমন রয়ে গেল। এই তো শালার জীবন। কিছুতেই ইচ্ছের দিন আসে না। তিথিও আসে না। শুধু এখন পুরনো নোকিয়ার বদলে খোকনের হাতে এসেছে একটা টাচফোন। এই মাত্র বদলেছে। এইসব ভাবে আর জোরে জোরে প্যাডেল করে খোকন। বয়স যেন পায়ের চাপে চাপে গলে যাচ্ছে।
তারপর একদিন মিনুর মা এসে কথাটা পাড়ল। অনেকদিন থেকেই আঁচ করেছিল খোকন। বলল, তোমার আপত্তি থাকলে কোনও কথা নেই। মিনু বলেছে, তাই। এমনিতে পাড়ার অনেকেই খোকনকে বলেছিল। মিনুকে যে খোকনের ঘাড়ে গছাবে, এ প্রায় সবারই জানা। শুধু খোকন কিছু বলত না। কীরকম ভাবে মিনুর মা কথা তুলবে, তাও পাড়ার লোকেরা খোকনকে বলে রেখেছিল। মিনুর মা একদম সেরকম করেই এসে বলল। খোকন জানে, আজ মিনুর বাবাও আছে। একটু আগে বিড়ির গন্ধ পেয়েছে সে। কী বলবে? সে শুধু বলল, মিনুর সঙ্গে একটু কথা বলব, অসুবিধে আছে?


৪)
মেঘ নেমে আসাটা আজ টের পাচ্ছে খোকন। গল্পে সব মিথ্যে কথা লেখে না। তক্তপোশে একটু দূরে বসে আছে মিনু। মাঝখানে যেন মেঘেদের রাজত্ব। যা পেরিয়ে কিছুতেই মিনুকে চেনা যায় না যেন। এত কাছে, তবু আবছা যেন সবকিছু। খোকন বলল, তুমিই তো বলতে পারতে? মাকে দিয়ে বলালে কেন? মিনুর মুখে কথা নেই। খোকন আবার আসতে আসতে জিজ্ঞেস করে, কই কিছু বলছ না যে? এবার একটু একটু করে কথা বলে মিনু। খুব ধীরে। বলছে, আমার আবার কী কথা? আমি কে? চমকায় খোকন। বলে, মানে? মিনু বলে, তুমি কি কিচ্ছু বোঝনি? খোকন বোকার মতো ঘাড় নেড়ে ফেলে। এবারও সে কিছুই বোঝেনি। কোনওদিন যে সে কেন প্রথমে কিছু বুঝতে পারে না ভগবান জানে। মিনু বলে, আমার বিয়ে দেওয়ার মতো পয়সা নেই বাবার। যা পায় তাতে ওই সংসারটাই চলে। এখন তো ভাড়াও নেই। তোমাকে পেয়ে গলায় ঝুলিয়ে দিচ্ছে আমাকে। তোমার কেউ নেই। তাই তুমি রাজি হচ্ছ। আমি কে সেখানে? সবাই সবারটা বুঝে নিচ্ছে। আমি তো ফাউ।
খোকন এবার একটু রেগে যায়। বলে, কে বলল, আমি রাজি? বলিনি তো। তোমার আপত্তি আছে নাকি তাই শুধু জানতে চেয়েছি?
মিনু কথা বলে না। ওড়নার আড়াল থেকে একটা ব্যাগ বের করে তার সামনে রাখে। এলোমেলো করে গোঁজা টাকা। একশোর নোট। খোকন বোঝে, এগুলোই সে মিনুকে দিত। মিনু এক টাকাও খরচ করেনি। মিনু ব্যাগটা তার দিকে ঠেলে দেয়। তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, আমাদের উঠিয়ে দাও তুমি। বাবা আছে। এখনই ঘর দেখে চলে যেতে বলো।
খোকন তাকায় মিনুর দিকে। সত্যি মিনুকে সে কোনওদিন ভাল করে দেখেনি। অথচ সে দেখার মতোই। কেন দেখেনি তাহলে খোকন? মিনুকে সেও তবে ফাউই ভেবেছে। দিয়ে দেওয়া একটা দু’টো, কখনও তিনটে ফুচকার মতো। যার হিসেব রাখতে নেই। হিসেব মেলেও না। মিনু আসবে যাবে, খাবার দিয়ে যাবে। মিনু চচ্চড়ি রাঁধবে। দরজার পাশে একটু থমকে দাঁড়াবে। এসব তো হতেই থাকত, হয়েই থাকে। হিসেব রাখেনি খোকন। ইচ্ছে করেই। এখন মেঘ কেটে কেটে এগোয় সে। মিনুর দিকে। মিনুর একটা হাত নিজের মুঠোয় নেয়। বলে, কে বলল, তুমি ফাউ? আমি কোনওদিন তাই বলেছি?
তখন আরও অনেকটা মেঘ নেমে এসেছে কামরায়। দূর থেকে বিড়ির গন্ধও আর পাওয়া যায় না। খোকনের কাঁধে ফোঁপাতে ফোঁপাতে মিনু শুধু বলে, খৈনিটা ছেড়ে দেবে তো, বলো?