সত্যাসত্য

রাজিব মাহমুদ

ঘটনার শুরুটা গ্লাস থেকে ছলকে পড়ে যাওয়া এক ফোঁটা পানির মতই সাধারণ-আমার স্কুল-বন্ধু হাসিব আর আমি একুশে বইমেলার মূল ফটকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাচ্ছিলাম। আমি ফুচকা আর হাসিব শিঙাড়া। নিজের আধ-খাওয়া শিঙাড়াটাতে সব মনোযোগ এক করে হঠাৎ-ই হাসিব বেশ উত্তেজিত গলায় বলে উঠলো-

‘আচ্ছা দোস্ত, বল তো শিঙাড়ার ভিত্রে আলু ঢুকলো ক্যাম্নে?’

আমার খাওয়া থেমে গেলো। দাঁতের নিচে ক্রাশ ক্রাশ শব্দে ভেঙে যাওয়া ফুচকার স্বাদু শব্দের ভেতর এরকম একটা কাঁটা-প্রশ্ন। প্রসঙ্গের কী দুর্ভিক্ষ লাগলো না-কি? এ সপ্তাহের রাজনীতি বা ক্রিকেট নিয়ে কিছু বলা যেত। ভেতরে চলা বইমেলা চলছে; নতুন আসা বই নিয়ে একটা আলোচনা জমে উঠতে পারতো। আর এসব সব না হয় বাদ-ই দিলাম; সামনে দিয়ে এইমাত্র যে সুন্দর মেয়েটা হেঁটে গেলো তার সৌন্দর্য নিয়ে একটা বাক্য বলা যেতো। তা না বলে কি-না শিঙাড়ার ভেতর আলু কীভাবে ঢুকলো! শালার আঁতলামি দেখে মাথাটা এই মাঝ-দুপুরে একাডেমির ঐ জংধরা গেটটার মতই তেঁতে উঠলো। বললাম-

‘তুই ঝিঙ্গা ঢুকা, চিচিঙ্গা ঢুকা। মানা করসে কে?’

আমি শফিক রায়হান। বয়স ২৯ এবং সদ্য বিবাহিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম এ শেষ করে মাঝারি মানের একটা প্রাইভেট ফার্মে ম্যানেজমেন্ট শিক্ষানবিশ হিসেবে ঢুকেছি মাস তিনেক হলো। যা পড়ে এসেছি আর যে কাজ করছি এউ দু’টোর কোন মিল না থাকলেও বেকার যে বসে নেই তাতেই আমি মহা খুশি। গায়ে এখনো ক্যাম্পাসের নির্ভার সময়ের গন্ধ; দায়িত্ব-টায়িত্ব নেয়ার কথা এখনো ঠিক ভেবে উঠতে পারি না। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে পাশ করে এখনো চাকরি খুঁজছে হাসিব। অবশ্যই অবিবাহিত। মাসে ২/৩ বার আমাদের দেখা হয়। কখনো ক্যাম্পাসে আবার কখনো রেস্টুরেন্টে। যেখানেই দেখা হোক না কেন, খাবারের বিলটা সব সময় আমাকেই দিতে হয়।

আমার বিরক্তির জবাবে হাসিবের ঠোঁটে হাসি দেখা যায়। নিতান্তই বেহায়া হাসি। সে তার শিঙাড়া থেকে বেশ ডাঁশা সাইজের একটা আলুর টুকরো নিয়ে ঠিক টম এ্যান্ড জেরির টমের মত টুপ করে মুখে ছেড়ে দিলো। গলায় একটা বেশ খুশি খুশি তারল্য এনে বললো-
‘কথা তো সেইটা না রে বন্ধু! যে কোন একটা র্যান্‌ডম সবজি শিঙাড়ার ভেতরে ঢুকায়ে দিলেই তো আর হইলো না…ব্যাপারটার আদি কার্যকারণ জানতে হইব। আলু-ই ক্যান…অন্য কিছু না ক্যান?’

‘দামে শস্তা, খাইতে স্বাদ, বেশির ভাগ মানুষ পসন্দ করে…’

‘এগুলা তো বুঝলাম...কিন্তু এর বাইরে কোন কারণ নাই? শস্তা আর খাইতে ভালো আরও সব্জিও তো আসে...আলু-ই ক্যান?’

‘আলুতে তোর প্রব্লেম কী?’

‘প্রব্লেম তো আছেই... কারণ আমি আদি কার্যকারণ জানতে চাই...যেইডা যেম্‌নে চইলা আইসে হেইডারেই স্বাভাবিক ধইরা নিতে চাই না...এইভাবে ধইরা নিলে তো কোন কিসুর গভীরে মানে ভিত্‌রে ঢুকা যায় না দোস্ত...তুই শুধু মচমচ কইরা শিঙাড়া খাইয়া যাবি অথচ শিঙাড়ার ভিতরের আলুগুলা ঢুইকা পড়ার আদি কার্য-কারণ জানবি না সেইটা কি হয় নাকি হওন উচিৎ?’

এই গভীর দার্শনিক প্রশ্ন করার কয়েকদিনের মাথায় হাসিব এক ছিপছিপে শ্যামবর্ণা রূপসীর প্রেমে পড়ে গেলো। আমি ধরে নিলাম যে তার শিঙাড়া বা আলু বিষয়ক আগ্রহে বিদ্যুৎ-প্রবাহ কমে গেছে অথবা স্থায়ী লোড শেডিং-ই হয়ে গেছে। বেকার মানুষের মাথায় কখন কোনটা ঢুকে পড়ে আগে অনুমান করা মুশকিল। তবে কথা সেটা হলেও আসলে কথা সেটা না। কথা হলো হাসিবের এই বাজে প্রশ্নটা আমার মগজে নিয়ে নিলো কোন যাচাই বাছাই ছাড়াই আর মগজে ঢুকেই প্রশ্নটা একটা মিহি যন্ত্রণার মত কিটকিট করতে থাকলো। নিজেকে একটা লম্বা প্রশ্নবোধক ছায়ার ভেতরে আটকা পড়া একটা বোবা প্রাণী’র মতো লাগছে। যত দিন যায় এই ছায়া দীর্ঘ হতে থাকে।

প্রতিদিন বেলা এগারোটায় অফিস থেকে বের হয়ে উল্টো দিকের ‘বাবার দোয়া’ রেস্তোরায় গিয়ে শিঙাড়া খাই। মাঝে মাঝে শুধু লবণ কম আর আলু কেন আধা-সেদ্ধ রয়ে গেলো- শিঙাড়া-বিষয়ক এই দু’টো বিরক্তি ছাড়া অন্য আর কিছু নিয়ে কখনো অভিযোগ করেছি বলে মনে পড়ে না।

কিন্তু এই বাক্‌ওয়াজ প্রশ্নটা দৈনন্দিন চিন্তার ছকটা দিলো উল্টে। ইদানিং শিঙাড়ায় কামড় দেয়ার সাথে সাথে আমার চোখ-মুখ বদলে যাচ্ছে। প্রথম কামড়ের সাথে মুখের ভেতরে ঢুকে যাওয়া আগুন-গরম ধোঁয়াটাকে মুখ বড় করে হা হু হা হু করে সামলাতে সামলাতে চোখ আটকে যাচ্ছে শিঙাড়ার ভেতরের আলুগুলোতে। আজও তা-ই গেলো। চশমার ফাঁক দিয়ে দেখি যে মচমচে খোলসের ভেতর বেশ গাদাগাদি করে বসে আছে ছোট ছোট নরম-হলুদ আলুগুলো; আর ওগুলোকে পেঁচিয়ে-জড়িয়ে আছে সেদ্ধ-সবুজ ধনেপাতা-প্রতিদিনের এই চেনা দৃশ্যটা এত দিন চোখের বাইরেই ছিলো। এখন সুযোগ পেয়ে সেটা চোখের ভেতর দিয়ে মগজে ঢুকে ধক-ধক প্রতিধ্বনি তুলতে লাগলো করোটিতে-আলুগুলোর শেষ ঠাঁই এই গরম শিঙাড়ার খোলসেই কেন হলো? অন্য কোথাও কেন নয়?

এরই মধ্যে কান ধরে আমাকে আরও দুই সিঁড়ি টেনে তুলে কে যেন প্রশ্ন করে, ‘এই আলুগুলোর জীবনের সত্য কী?’ প্রশ্নের এই পরিবর্ধন ভেতরের কোথায় যেন একটা জোরালো কম্পন তুলে ঝাঁকিয়ে গেলো আমাকে। বিড়বিড় করে বললাম-‘সত্য! আলুর সত্য! এসময় রেস্তোরার পিচ্চিটা এসে হলুদ দাঁত বের করে হেসে জিজ্ঞেস করলো, ‘স্যার, চা খাইবেন?’

পিচ্চির নাম অন্তর। তার এই হলুদ-দাঁত হাসির দাম পাঁচ টাকা। কখনো কখনো দশ টাকা। বিল ত্রিশ টাকার কম হলে ওকে পাঁচ টাকা দেই আর বেশি হলে দশ। শিঙাড়ার সাথে চা খেলে বিল ত্রিশ টাকা ছাড়িয়ে যায় আর সেই কেও কারাডং-এ ওঠাই অন্তর মিয়ার লক্ষ্য থাকে।

অন্তরের বয়স দশ ছাড়াবে না কিছুতেই। ওর নেশাখোর বাবা কিছুদিন আগে ওর মা আর ছোট দুই ভাই-বোনকে ছেড়ে গিয়ে আরেকটা বিয়ে করেছে। কোন খোঁজ-খবরই রাখে না ওদের। কিন্তু এরপরও বাবাকে ভীষণ ভালোবাসে অন্তর। বাবা তাকে একবার কাঁধে চড়িয়ে মেলা থেকে একটা লালা খেলনার লঞ্চ কিনে দিয়েছিলো। পরে বাপ-বেটা মিলে তাদের বস্তির পাশের খালে এক বৃষ্টির দিনে সেই লঞ্চ চালিয়েছিলো। এই দৃশ্য ওর মনে এমনভাবে গেঁথে আছে যে সে চাইলেও বাবাকে ঘেন্না করতে পারে না। ও বরং দোষ চাপায় ওর নতুন মায়ের ওপর-পিতা- পুত্রের সম্পর্কের ঘন রসায়নে যে পানি ঢেলে দিয়েছে। অন্তরের ভাষায়, ‘বেডিডা এমন খাচ্চর স্যার, কী কইতাম! আমার বাজানের মাথাটা আউলাইয়া দিসে।’

এদিকে ওর বাবা ওদেরকে ছেড়ে যাবার পর ওর মা তিন বাসায় ছুটা বুয়ার কাজ করে। বাবা থাকার সময় অন্তর একটা স্কুলে পড়তো। এখন ওকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এই রেস্তোরায় কাজে লাগিয়ে দিয়েছে ওর মা। এতে অবশ্য অন্তর খুব একটা অখুশি না। এখানে সে টুকটাক ভালোমন্দ খেতে পায়, বখশিশও জোটে ভালোই। স্কুল তার কাছে ভালো লাগতো না। এর কারণ হিসেবে ও বলে, ‘ঐহানে কুনু বিচার নাই স্যার। পরা পারলে গাইল্লায় আর না পারলে মারে।’ পড়া পারলেও কেন গালি দেয় এ বিষয়ে ওকে জিজ্ঞেস করলে জানা যায় যে একদিন পড়া পারার পরে স্যার ওকে বলেছিলো, ‘ঐ ফইন্নির পুত...অহন পারলি তো কাইল পারলি না ক্যান? কাইলকা কি কুত্তায় কামরাইসিলো তরে?’

পড়া পারার পরেও একটা বাচ্চা ছেলেকে শিক্ষকের মার খেতে হচ্ছে। কেন? এর পেছনের সত্যটা কী? বাচ্চাটার দারিদ্র? ওকে মারলেও প্রতিবাদ করার কেউ নেই সেজন্য? না-কি এই ‘ফইন্নির বাচ্চা’র লেখাপড়া শিখে বড় কিছু হওয়ার স্বপ্নটাই শিক্ষকটির মাথায় আগুন ধরিয়ে দেয়?

যেদিন বাসা থেকে নানা কারণে খাবার আনা হয় না সেদিন ‘বাবার দোয়া’তে খেতে যাই। তবে দুপুরের সময়টায় অন্তরকে টেবিল মোছার কাজে ব্যস্ত দেখা যায়। একদিন ও আমাকে চুপিচুপি বলেছিলো যে রেস্তোরার ‘মামারা’ দুপুরে ওকে কোন অর্ডার নিতে দেয় না; ওকে দিয়ে শুধুই টেবিল পরিষ্কার করায়। এর কারণ দুপুরের খাবারের বিলে টিপ্‌স্‌ বেশি পাওয়া যায় তাই প্রতিযোগিতাটাও বেশি।

‘বাবার দোয়া’ এর লাগোয়া একটা চীনা কাম থাই কাম দেশি খাবারের রেস্তোরা আছে। ওটার নাম ‘ড্যাডি’স কিচেন’। বেশ কয়েকটা স্প্লিট এসি একটা আয়েশী গুঞ্জন তৈরি করে সারাক্ষণ চলে ওখানে। খাবার টেবিলগুলো সুন্দর লাল কাপড়ে মোড়া। চেয়ারগুলোরও আছে চমৎকার নকশার সব জামা। মাথার ওপরের স্পিকার থেকে ভেসে আসে বিদেশি সুরের মিষ্টি সুর। ইউনিফর্ম পরা ওয়েটাররা এখানে বিনয়ে ঝুঁকে বিভিন্ন লাঞ্চ বা ডিনার আইটেম সার্ভ করে। স্টেইনলেস স্টিল অথবা কাঁচের পাত্রে স্পাইসি ফুড আইটেমগুলো চকচক করতে থাকে। ভারী কাঁচের দরজা বাইরের পৃথিবী থেকে এই রেস্তোরাকে আলাদা করে এর ভেতরে তৈরি করেছে এক শান্ত সৌম্য আভিজাত্য।

ওদিকে ‘বাবা’র দোয়া’তে এসব কিছুই নেই। থেকে থেকে রেস্তোরা’র মামা’দের হাঁক শোনা যায়, ‘চালু কর দুই গরু এক খাসি...ওওওই...খানা একটা...’। অর্ডার অনুযায়ী এক হাতে তিন ধরণের খাবার নিয়ে তারা টেবিলে টেবিলে যায়। তাদের পরণে ফুটপাথের শস্তা শার্ট ও লুঙ্গি; কেউ কেউ আবার প্যান্ট পরেও কাজে আসে। খাবার পরিবেশন করা হয় মেলামাইনের বাটিতে পুরনো কাঠের ন্যাংটা টেবিলে। কাউন্টার থেকে রেডিও’র খবর ভেসে আসে, ‘এদিকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে দেশের এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয় নি…’। সুর বলতে খবরপাঠের এই সুরেলা ওঠানামাটুকুই। তবে ভেতরের রসুঁই ঘর থেকে মশলা-তেল-সব্জি’র যে ঘ্রাণটা আসে সেটা মোটামুটি অপার্থিব। ঐ ঘ্রাণটুকুই এই রেস্তোরার সব দারিদ্র্য ছাড়িয়ে ম ম করে ভাসতে থাকে এখানে খেতে আসা মানুষগুলোর নাকের চারপাশে।

‘ড্যাডি’স কিচেন’-এ খাবারের দাম স্বাভাবিক ভাবেই বেশি; শুধু যে চীনা বা থাই খাবারের দাম-ই বেশি তা নয়; দেশি খাবারের দামও এখানে ‘বাবার দোয়া’ এর তুলনায় বেশি। খাবারের স্বাদ বদলাতে মাসে দুই-এক বারে যাই ওখানে। স্বাদ বদলায় ঠিক-ই তবে আরাম পাই না খেয়ে। আর পয়সাটা দেয়ার সময় বেয়ারাগুলো’র আলগা আদিখ্যেতা বিরক্ত লাগে।

আজকে শিঙাড়া খাওয়ার পর চা আর খাই না না কিন্তু কী মনে করে অন্তরকে দশ টাকাই দিই। সে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে সেনা কায়দায় কপালে হাত ঠেকিয়ে স্যালুটের মতো ভঙ্গি করে। আমি হেসে ওর মাথা নেড়ে দিই। তবে আলুর শেষ ঠিকানা নিয়ে কোন সিদ্ধান্তে আসতে না পারার যন্ত্রণা বহন করেই অফিসের লিফ্‌টে উঠতে হয় আমাকে। আমি বসি সাত তলায়। লিফ্‌টে কাঁধে-কাঁধ-ধাক্কা-লাগা ভিড়। দরজা বন্ধ হবার ঠিক আগ-মুহূর্তে এ্যাকাউন্ট্‌স এর শায়লা দৌড়ে এসে দরজার কাছে দাঁড়ানো একজনের গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে যায়।

চোখে চোখ পড়ে গেলে দু’ জনেই হাসি, বলি, ‘কী, তাড়া নাকি খুব?’। শায়লা বল্‌লো, ‘না, এই নিচে গিয়েছিলাম চা খেতে। আজকে কাজের চাপ কম। শায়লা এমনিতে বেশ রক্ষণশীল। পোশাকে সতর্ক রাখঢাক, কোন পুরুষ সহকর্মীর সাথে কথা বলার সময় পুরুষটির চোখের ভ্রমণ ফলো করা ও ক্ষেত্র বিশেষে নিজের কাপড় ঠিক করা, কোন পুরুষ বেশি ‘হে হে’ টাইপ ভাব দেখালে তাকে এড়িয়ে চলা- এ সব-ই শায়লা’র চরিত্রের স্বাভাবিকতায় মিশে আছে। কেবল লিফ্‌টে উঠতে গেলেই তার এই রক্ষণশীলতায় যেন ছেদ পড়ে যায় কয়েক মিনিটের জন্য। এই যেমন এখন। চোখে-মুখে কোন অস্বস্তির ছাপ নেই। যেন কোনভাবে জায়গা করে নিয়ে উপরে উঠতে পারলেই জীবনের সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়ে যাবে।

রক্ষণশীলতার এই সাময়িক ছেদের পেছনের সত্যটা কী?

সত্যের পোকা আমার পিছু ছাড়ে না। যেখানেই যাই, যাই দেখি, সবসময় সবকিছুর সত্য নিয়ে প্রশ্ন করতে থাকি। এই যেমন সেদিন এক বিয়ের দাওয়াতে গিয়েছিলাম। আমার পাশে বসা লোকটা কাচ্চি বিরিয়ানির ডিশ থেকে বেছে বেছে খাসির নরম কুচকুচা হাড়ওয়ালা মাংশগুলো নিজের প্লেটে নিচ্ছিলো আর পাশে বসা নিজের ১২-১৩ বছরের ছেলেটাকেও তুলে দিচ্ছিলো। সেই হাড় গুলোকে মড়মড় শব্দে দাঁতের নিচে গুঁড়িয়ে দিতে দিতে বাবা ছেলেকে দুই হাঁড়ের মাঝখানে আটকে পড়া মাংশ খাওয়ার কৌশল শেখাচ্ছিলো-
‘মাঝখানে বুইরা অঙ্গুল দিয়া মাংশটা উপ্‌রে ঠ্যালা দিয়া দাঁত দিয়া টাইন্না ছিরবি তয় দাঁতে চর্বি লাইগা গেলে জিব্বা দিয়া প্যাচায়ে ধইরা ‘থু’ কইরা ফালায়া দিবি, বুঝ্‌ছস্‌?’

ছেলে গম্ভীর ভাবে ‘হ্যাঁ-সূচক’ মাথা নাড়ে। সে বুঝতে পেরেছে। বাবা-ছেলে দুইজনের-ই সারা মুখে ঘাম-কপালে, মাথার দুই পাশের চিপ-এ, গলায়, উপরের ঠোঁটের চার কোণা গর্তে। কিন্তু সেটা নিয়ে তাদের কোন হাত-পা ব্যথা নেই। গভীর অভিনিবেশে খেয়ে যাচ্ছে দু’জন। আমি পিতার কানের কাছে ফিশ ফিশ করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই যে খাশিটার মাংশ খাচ্ছেন, তার জীবনের সত্যটা কি জানেন?’

‘এ্যাঁ!! কী?? উনি তখন একটা শাদা হাড় চুষে চুষে আরও শাদা করায় ব্যস্ত তখন।
আমি তার ছেলেকে বললাম, ‘খোকা, তুমি কি জানো?’ ছেলে খাওয়া বন্ধ করে ভীত চোখে তাকালো আমার দিকে। তখন বাবা আর থাকতে না পেরে খেঁকিয়ে উঠলো-
‘ভাই আপনের সমস্যা কী? কী ‘সত্য’ ‘সত্য’ লাগাইসেন?’

দুই মাস পর। আমার সত্যানুসন্ধান তখনো অব্যাহত। এটা নিয়ে অফিসে ও বাড়িতে বেশ হাসাহাসি চলছে। এরই মধ্যে একদিন দুপুরে ‘বাবার দোয়া’তে খেতে গিয়ে শুনি এই রেস্তোরার মালিক আর রেস্তোরার জায়গাটার মালিকের পাঁচ বছরের চুক্তি শেষ হয়ে যাবে এ মাসেই। আর এই সুযোগে ‘ড্যাডি’স কিচেন’ এর মালিক অনেক বেশি অগ্রিম ও মাসিক ভাড়ার প্রস্তাব দিয়ে একটা নতুন চুক্তি করতে চাইছে ‘বাবা’র দোয়া’র’ জায়গার মালিকের সাথে। এটা করা গেলে দুই রেস্তোরার কাস্টোমারকে এক রেস্তোরায় বসিয়ে দ্বিগুন মুনাফা গোনা যাবে। যদিও ‘ড্যাডি’স কিচেনে’র মালিক ভালো করেই জানেন যে তার হোটেলে খাবারের দাম বেশি হবে; সব কাস্টোমার তিনি পাবেন না। তবে কাছে-ধারে আর কোন রেস্তোরা না থাকায় এদিককার অফিসগুলোর অনেকেই বাধ্য হবে বেশি দাম দিয়ে তার রেস্তোরায় খেতে।

এদিকে ‘ড্যাডি’স কিচেন’- এ চাকরি পাওয়ার জন্য ‘বাবা’র দোয়া’র’ স্পেসের মালিকের কাছে এই রেস্তোরার কর্মচারীরা গোপনে তদ্‌বির শুরু করে দিয়েছে। এই চীনা-থাই-দেশি রেস্তোরায় বেতন ও অন্যান্য সুবিধা তুলনামূলক ভাবে বেশি হওয়ায় বাংলা রেস্তোরার কর্মচারীরা উপরে উপরে তাদের বর্তমান মালিকের পক্ষে জোর সাফাই গাইলেও ভেতরে ভেতরে উল্টো পথে হাঁটছে। কল্পনায় ফ্রি এসি’র বাতাস খেতে খেতে তারা মাঝে মাঝে কাজ করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়ে।

আজকে দুপুরে খেতে আসার পর থেকে দেখছি অন্তরের মন খুব খারাপ। মন খারাপের কারণ হলো চীনা রেস্তোরায় তার বয়সের কোন কর্মচারীর প্রয়োজন নেই। পিচ্চি লাগে শুধু বাংলা রেস্তোরাগুলোতে। তাই অন্য ‘মামা’দের মত তার নতুন চাকরি পাবার কোন আশা নেই।

আজ অর্ডার করেছি ভাত আর পাঙ্গাশ মাছ। কিন্তু খবরটা শোনার পর থেকে খেয়ে কোন স্বাদ পাচ্ছি না। এই রেস্তোরার গরম মচমচে শিঙাড়া আর হলুদ-মশলা-পেঁয়াজের ঘনীভূত ঘ্রাণের সাথে কেমন একটা অভ্যস্ততা গড়ে উঠেছে। ক’দিন পরে এগুলো আর থাকবে না আর এখানে ঘর ঘর করে চলা এসি’র মধ্যে মিশ্র খাবারের অভিজাত সুবাস ভাসবে এটা ঠিক মেনে নিতে পারছি না।

আমার খাওয়া যখন মাঝ-পর্যায়ে তখন এক ভদ্রলোকের আবির্ভাব। আমার সামনের চেয়ারটার দিকে ইঙ্গিত করে ভদ্রলোক জানতে চান ওখানে কেউ বসেছে কি-না। আমি মাথা নেড়ে ‘না’ বলতেই তিনি চেয়ারটা টেনে বসে পড়েন। আমার প্লেটের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসেন তিনি, ‘মাছটা কি ভালো? তাহলে আমিও অর্ডার করতে চাই।’

আমার কাছ থেকে হাসিমুখ সায় পেয়ে তিনিও ভাতের সাথে পাঙ্গাশ মাছ অর্ডার করেন। খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে তিনি বেশ কয়েকটা ফোন করে নিলেন; বেশির ভাগই আইনি ঝামেলা সংক্রান্ত। একটা ফোনে উনার কথা শুনে আমি চোখ তুলে তাকাই। শুনলাম উনি বলছেন, ‘দেখেন এই রেস্তোরাটার জন্য কিছু করা যায় কি-না। এখানের রান্না ভালো, দামও কম। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে খেতে আসে। পাশের চাইনিজ রেস্তোরাটা এই রেস্তোরার জায়গার দখল নিয়ে নিতে চাইছে। দেখুন তো কিছু যদি করা যায়...’

আমি ঢক ঢক করে পানি খেয়ে ভদ্রলোককে ভালো করে দেখি। এই মে মাসের গরমেও ফুল-হাতা শার্ট পরা। হাতে বড় ডায়ালের ঘড়ি আর চোখে কালো চশমা। হাতের ঘড়িটি খুব সাধারণ হলেও চোখের রোদ-চশমাটা দেখে বেশ দামি মনে হয়। হাতে মোটামুটি দামি একটা এ্যাটাচি কেস। উনার ফোনে কথা শেষ হলে আমি ‘বাবার দোয়া’ দখলের প্রসঙ্গটা নিয়ে একটা আলাপ তোলার আগ্রহ দেখাই-

‘দ্যাখেন তো কী অন্যায়! শুধু টাকার জোরে এই জায়গাটা নিয়ে নেবে?’

‘তা-ই তো হয়, ভাই।’

‘কিন্তু তা তো হওয়া উচিৎ না।’ আমি অধৈর্য হয়ে বলি।

‘উচিৎ? হা হা হা। এটা একটা আরোপিত শব্দ।’

‘মানে?’

‘পরে বলছি। আগে বলেন এ ব্যাপারে আপনার সত্যানুসন্ধান কী বলে?’
আমার বুকের ঠিক মাঝখানটায় ঝাঁ করে ওঠে। এই লোক আমার সত্য অনুসন্ধানের ব্যাপারটা কী করে জানলো? তাকে আগে কখনো দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। চোখ তুলে আবারও ভালো করে তাকিয়ে দেখি তাকে। তার ঠোঁটে মোলায়েম হাসি। চোখ দুটো চশমার কারণে দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু মনে হলো ওগুলোতে বিদ্রুপ নেচে বেড়াচ্ছে।

‘জ্বী??’ আমি কোন রকমে বলি।

‘ঘাবড়ে গেলেন নাকি?’ ঠোঁটে হাসি ধরে রেখে বল্‌লেন তিনি।

‘না...তা না...’

‘শুনুন আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন তো বলবো সত্যটত্য বলে কিছু নেই। যা হয় বা ঘটে তা-ই সত্য। পুরোটাই একটা র্যান্‌ডম ব্যাপার।’
আমি চুপ করে থাকলাম। তিনি বলে গেলেন-

‘ফিলোসফিতে একটা কথা আছে-‘Truth is constructed’। আমি বলি-‘Truth is whatever happens’। আজকে যদি ‘ড্যাডি’স কিচেন জিতে যায় যায় তাহলে দুই দিন এই ‘বাবার দোয়া’র জন্য শোক করে তিন দিনের দিন আপনারা ঐ ‘ড্যাডিস কিচেন’-এই খেতে যাবেন। শহরের মানুষ ঝামেলা পছন্দ করে না। তারা আরামে থাকতে চায়। তাই কিছুদিন একটু হাল্কা প্রতিবাদ বা লুতুপুতু মন খারাপ ছাড়া শেষমেশ আর তেমন কিছুই হবে না। আর তাছাড়া আইনও ওদের পক্ষে। অতএব এটাই সত্য হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে।

‘আর যদি ‘ড্যাডি’স কিচেন’ হেরে যায়?’

“সে সম্ভাবনা হলিউডের নায়িকাদের কটি’র মতই ক্ষীণ। তবে যদি হয় তাহলে সত্য বদলে যাবে। এই রেস্তোরার কর্মীরা তাদের কর্মস্থলের প্রতি বিশ্বস্ততা দেখানোর নৌকা বাইচে নেমে পড়বে। আপনারা যারা এখানে কম পয়সায় খান তারা খুশি হবেন। হয়তো একটা আনন্দ মিছিলও বের করবেন। খাওয়ার পর দাঁত খিলাল করতে করতে বলবেন, ‘সত্যের জয় হয়েছে।’ হা হা হা”

‘তাহলে কী দাঁড়ালো?’

‘দাঁড়ানোর তো কিছু নেই। ঘটনা, দুর্ঘটনা, দৈব-ঘটনা এ সব ঘটনার পর তলানিতে যা রয়ে যায় সেটাই সত্য। আর সেই সত্য আবার একেক জনের কাছে একেক রকম। একে চিরায়ত ভাবার যেমন কোন যুক্তি নেই, তেমনি একে কাব্যময় করে তোলার প্রচেষ্টাও হাস্যকর। তাই ঐ যে কবি কীট্‌স বলেছেন ‘সত্যই সুন্দর’ বা ‘সুন্দরই সত্য-আমি তার সাথে একমত নই একেবারেই- এগুলো সত্যের ওপর আরোপ করা নীতিকথা ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা শেষমেষ যা টিকে থাকে তাই সত্য বলে মানুষ মেনে নেয়। এটা একটা অবস্থা মাত্র। আর এই অবস্থাটা তৈরি করে বিজয়ীরা, বিজিতরা নয়- প্লেইন এ্যান্ড সিম্‌পল।

কথাগুলো খুব রুক্ষ শোনায়। তবে কোথায় যেন একটা নাড়া খাই। এর মধ্যে ভদ্রলোকের খাবার এসে গেছে। তিনি খাবার নিয়ে আসা ছেলেটাকে ধন্যবাদ দিয়ে খেতে শুরু করেন। আমার খাওয়া অবশ্য শেষ। টেবিল মুছতে এসে অন্তর খুব আগ্রহ নিয়ে ভদ্রলোককে দেখতে থাকে। আমি হাত ধুতে উঠে যাই।

ফিরে এসে আমার খাবারের বিলের অঙ্কটি লেখা নিউজপ্রিন্ট কাগজের টুকরোর তল থেকে গুয়া মুড়ি তুলে নিতে নিতে আড়চোখে তাকিয়ে দেখি ভদ্রলোককে। তিনি একমনে খেয়ে যাচ্ছেন। আমি মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে বিল দিতে যাব এমন সময় মুখ-ভর্তি খাবার নিয়ে উনি হঠাৎ-ই অস্পষ্ট ভাবে বলে ওঠেন-

‘আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?’

‘করেন।’

‘আপনি তো মোটামুটি ভালো মানের একটা চাকরি করছেন, বিয়েও করেছেন। সুখেই তো আছেন। হঠাৎ এই ‘সত্য’ নিয়ে পড়লেন কেন?’

আমি চুপ করে থাকি।

কিছুক্ষণ থেমে উনি আবার বললেন, ‘আরেকটা কথা বলি?’

‘জ্বী।’

‘আপনার মনে আছে আপনি একবার এক শীতের রাতে মালিবাগ বিশ্বরোডের পাশে একটা বস্তির সামনে চৌদ্দ-পনেরো বছরের একটা মেয়েকে আগুন পোহাতে দেখেছিলেন?’

আমার বিস্মিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি বলে গেলেন-

‘মেয়েটার শরীরে গরম কাপড় ছিলো না দেখে আপনার কষ্ট হয়েছিলো। কিন্তু তার পাশাপাশি মেয়েটার পিঠ-খোলা শরীর দেখে আপনার মধ্যে কামভাবও জেগেছিলো। এখন এই দুটোর মধ্যে কোনটাকে আপনি সত্য বলবেন?’

আমি মাথা নিচু করে টেবিলের উপর রাখা একটা গ্লাস আঙুল দিয়ে আঁচড়াতে থাকি।
‘আরেকবার আপনি মুরগি কিনতে গেলে মুরগি ওয়ালা আপনার কেনা মুরগিটাকে ঠিকমত জবাই না করেই ওটার একটা পা কেটে ফেলেছিলো বলে আপনি খুব আহত হয়েছিলেন। মুরগি বিক্রেতাকে বার বার বলছিলেন, ‘এইটা কী করলেন, ভাই? ইশ্‌শ্‌!’ অথচ সেদিন দুপুরে সেই মুরগিটারই কশানো মাংস আপনি ভীষণ তৃপ্তি নিয়েই খেয়েছিলেন। পায়ের আঙুলগুলো দাঁত দিয়ে গুঁড়ো করতে করতে বেঁচে থাকার অপার স্বাদ গ্রহণ করেছিলেন। এই দুটো ঘটনার মধ্যে সত্য কোনটাতে লুকিয়ে আছে বলতে পারেন?’

হঠাৎ-ই আমি কেমন শক্ত হয়ে যাই। একটা অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতির চার দেয়ালে আটকা পড়ে হাঁশফাঁশ করতে থাকি। এই রাগ হচ্ছে, এই আবার লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছি। আবার হঠাৎ-ই নিজের জামা টেনে ছিঁড়ে ফেলে দৌড়ে বের হয়ে যেতেও ইচ্ছে করছে। এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই প্রথমবার আমার সত্যিকারভাবেই মনে হলো আমি নিজেকে চিনি না। নিজের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা সত্যগুলোকে গুম করে আমি কি-না সত্য খুঁজছি শিঙাড়ার আলুতে?

হঠাৎ-ই পাশে তাকিয়ে দেখি হাসিব দাঁড়িয়ে আছে। মুখ-ভর্তি ফিচেল ধরণের হাসি। কোন কথা না বলে আমাকে প্রায় জোর করে পাশের টেবিলটায় টেনে নিয়ে গেলো। উঠে আসার সময় লোকটা আমার সাথে হাত মিলিয়ে তার নাম বলে বল্‌লো ‘অসুবিধা নাই। আপনারা কথা বলেন। আমি বরং খেয়ে নেই। পরে কখনো হয়তো কথা হবে। মনে কিছু রাখবেন না। অনেক উল্টাসিধা কথা বলে ফেলেছি।’ আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে কেমন পিলে চমকানো একটা হাসি হাসে লোকটা।
আমার মাথা-ভর্তি অসংখ্য ঘর্মাক্ত সাপ হিশ হিশ করছে । পাশের টেবিল থেকে আড়চোখে ভদ্রলোককে দেখতে দেখতে হাসিব বলে-

‘কীরে শালা! তোর তো কোন খবর-ই নাই’

মুখে জোর করে হাসি ফুটিয়ে কোন রকমে বলি-

‘খবর আবার কী!’

‘ক্যান কী হইসে?’

‘বাদ দে। তোর প্রেমিকা কেমন আছে?’

‘আর প্রেমিকা! শালা দুনিয়াটাই তিন নাম্বার।’

‘ক্যান কী হইসে?’

‘আরে শালী তিন নাম্বার। আমার সাথে প্রেম প্রেম খেলা শুরু’কইরা আরও দুই পোলার লগে প্রেম করতেসিলো। ফোনের কল লিস্ট বাইর কইরা ক্যাঁক কইরা ধরসি।’
কথা বলতে বলতে হাসিব ভদ্রলোকের দিকে একটু পর পর তাকাচ্ছে আর মিটি মিটি হাসছে। কী যেন একটা বলতে গিয়েও যেন বললো না ভদ্রলোক শুনে ফেলতে পারে এটা ভেবে।

‘কস্‌ কী মোমিন?’

আমি একটা নতুন উত্তেজনার প্রসঙ্গ খুঁজে পেয়ে সহজ হতে শুরু করেছি।

‘বাদ দাও। তোমার খবর কও চান্দু।’

আমি একটু থেমে হঠাৎ বল্‌লাম-

‘তুই কি শিঙাড়ার ভিতরে এখনো আলু ঢোকার রহস্য নিয়া ভাবোস?’

‘না, ধুর্‌!’

‘ক্যান তোর না এতো আদি কার্যকারণ জানার আগ্রহ?’

‘জানসি তো’

‘তাই নাকি? কী জানসস্‌?’

‘জানসি যে এইসব ভুয়া। আলু ছাড়াও শিঙাড়ার ভিত্‌রে অন্য সবজি ঢুকতে পারে এইটা

বুঝছি। শালা তোর কথাই ঠিক রে।’

‘কী কস্‌ ব্যাটা!’ আমি মনে মনে খুশি হয়ে উঠলাম।
এই পর্যায়ে আমি আড়চোখে দেখলাম ভদ্রলোক খাওয়া শেষ করে অন্তরের সাথে কথা বলছেন। কিছুক্ষণ পর হাত ধুতে উঠে গেলেন।

হাসিব বল্‌লো যে কিছুদিন আগে তার সদ্য-প্রাক্তন প্রেমিকাকে নিয়ে সে ‘ড্যাডি’স কিচেন’-এ খেতে গিয়েছিলো। খাওয়ার এক পর্যায়ে একজন ওয়েটার এসে তাদেরকে বল্‌লো যে তারা দিন ধরণের শিঙাড়া নিয়ে কাস্টোমারদের মধ্যে একটা ফ্রি সার্ভে করছে। এরপর ওদের দুই জনকে তিনটা করে শিঙারা, একটার ভেতর ঝিঙা, একটার ভেতর পেঁপে ও একটার ভিতর করল্লা, ফ্রি টেস্ট করতে দিলো। সাথে দেয়া হলো একটা মিনি সার্ভে ফর্ম যেখানে এই তিন শিঙাড়ার স্বাদ অনুযায়ী এদেরকে নম্বর দিতে হবে। শুনে আমি কিছু না বুঝে তাকিয়ে থাকি। শালা বলে কী!

আমিও এর মধ্যে ড্যাডি’স কিচেনের নতুন চুক্তির বিষয়টা খুলে বললাম হাসিবকে। শুনে ও বল্‌লো, ‘ও, এই ব্যাপার! শালারা এই হোটেলের শুধু দুপুরের খাওয়ার কাস্টোমার না বরং সকালের শিঙাড়ার কাস্টোমারগুলাও ধরতে চায়। নিশ্চয়ই পয়সা দিয়া এই বাবুর্চি আর কর্মচারীগুলানরেও হাত কইরা ফালাইসে। ব্যবসা, মামা এরই নাম ব্যবসা। কী করলা জীবনে!’

ভদ্রলোক হাত ধুয়ে ফিরে এসে বিল দিচ্ছেন। একটু পর আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বেরুবার দরজার দিকে এগিয়ে যান তিনি।
ভদ্রলোক শ্রুতি সীমার বাইরে যেতেই হাসিব বলে-

‘তা মামা এইবার কও আসল কথা’

‘কী আসল কথা?’

‘এই শাড়ি পড়া চোখ ধাঁধানো সুন্দরীটা কে?’

‘সুন্দরী!! মানে?

‘আহা হা! সুন্দরী কী বুঝে না! তুমি যার লগে এই পাশের টেবিলে বইয়া খাইতেসিলা সেই সুন্দরী… এইমাত্র তোমার দিকে তাকাইয়া মধুর হাসি দিয়া যে বাইর হইয়া গেলো তার কথা জিগাই চান্দু।’

‘চোখের কি মাথা খাইসস্‌? উনি তো রীতিমত একটা পুরুষ মানুষ। সুন্দরী পাইলি কই? আর শাড়িই বা দেখলি কই? ফুল শার্ট আর সানগ্লাস পরা ছিলো।’
এ পর্যায়ে হাসিব দৌড়ে দরজার কাছে যায় ভদ্রলোকটিকে অথবা সুন্দরী মেয়েটিকে আবার দেখে নিয়ে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করতে পারার আশায়। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে।

আরো বেশ কিছুক্ষণ তর্ক-বিতর্কের পর অন্তরকে ডাকা হয় কেননা তাকে ঐ ব্যক্তির সাথে কথা বলতে দেখা গেছে। কিন্তু ও দেয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বর্ণনাঃ ভাঙা চোয়াল, তেল না দেয়া কাঁচা-পাকা চুল, ময়লা শার্ট আর চেক লুঙ্গি পরা একজন দরিদ্র লোক। যে দেখতে একদম অন্তরের বাবা’র মতো আর যার চোখে অন্তরের জন্য গাঢ় মমতার ছায়া।

আমি এরপর কী বলবো ভেবে পেলাম না। মনে হচ্ছে কোন পারলৌকিক যাদুর ইহলৌকিক দর্শক হয়ে হাবার মত বসে ভাবছি কীভাবে কী হয়ে গেলো।
হঠাৎ হাসিব বলে-

‘আচ্ছা লোকটা কি তরে নাম বলসিলো? নাম শুইনা যদি এ্যাট লিস্ট বুঝা যায় হালায় ব্যাটা না বেটি...’ সে এখনো আশা ছাড়তে রাজি নয়।
আমি নামটা মনে করার চেষ্টা করি এবং মনে করতে পারি। কিন্তু বুকের ভেতরে আমার শাস আটকে ফেলেছে কেউ বা কিছু একটা।

‘কীরে! বলসিলো নাম?’

‘হুম।’

‘কী নাম?’

শুকিয়ে চিড়ে হয়ে যাওয়া গলায় কোনরকমে জবাব দিই-
‘সত্য’।