একটি পুরনো নিমন্ত্রণ

আন্তন

যদ্দুর মনে পড়ছে সালটা ১৮৭২, জুলাই মাস । তুমি আমাকে তোমার এক কাকার খামারবাড়িতে নিমন্ত্রণ করলে । হার্টফোর্ডশায়ারের রাস্তায় তখন আজকের মতন এত লোক সমাগম ছিল না । বাঙালী বোধহয় আমাকে নিয়ে মোট চারজন । বাকি তিনজন পাইক-পেয়াদা শ্রেণীর । আমি ছিলাম মিস্টার ওয়াটারফিল্ডের এ্যাসিস্ট্যান্ট । ভদ্রলোকের পাঁচ-ছ'টা বড় কোম্পানি ছিল । কয়লা আর জাহাজের ব্যবসায় তার খুব নামডাক তখন । আমি ওনার অফিসে নানারকম কাগজপত্র দলিল-দস্তাবেজ প্রুফ রিড করতাম, বিভিন্ন ফাইলে সাজিয়ে দিতাম যথাযথ । মিস্টার ওয়াটারফিল্ড আমার কাজে খুবই প্রসন্ন ছিলেন । খাঁজকাটা নরম মার্জারিন আলোয় ভরা নিজের লাইব্রেরির আরামকেদারায় স্কচ পান করতে-করতে বলতেন 'Oh Brajen, your eye for intricate details reminds me of my grandmother.' এমন অদ্ভুত প্রশংসার কোনো প্রতিউত্তর আমার কাছে ছিল না, শুধু মাথা নেড়ে এ্যাকনোলেজ করতাম, মৃদু হেসে । উনি মাঝে-সাঝে আমাকে নিজের টাই ব্যবহার করতে দিতেন, খাঁটি মসলিন । মদিরা সেবনের ব্যাপারে ওনার উৎসাহ ছিল অপরিসীম, আমায় বলতেন বিভিন্ন অঞ্চলের নানারকম ফ্লেভারগুলো বুঝে নাও একটু-একটু করে, প্যালেটে একটা রুচি তৈরি করো । আমি দায় পড়ে এক-আধটু পান করতাম । না , পান করা বলে না ওটাকে, চাখতাম, সপ্তাহে অনাধিক আড়াই পেগ, পাঁচ রকম মদ হাফ পেগ করে । বহুদিন অনুশীলন করার পরেও একইরকম লাগত সবকটার স্বাদ ।



বিভোর হয়ে গিয়ে এসব লিখছি না । আসলে কিছু লোকের, কিছু জায়গার মায়া থেকে যায়, তাদের উল্লেখ করে কয়েকটা লাইন বেশি বলে ফেলি, এর বেশি কিছু নয় । হ্যাঁ, খামারবাড়িতে নিমন্ত্রণ । আমি ভেবেছিলাম বিশাল কোনো এলাহি ব্যাপার হবে, কেননা জনশ্রুতি ছিল তোমার কাকাও বিশাল বড়লোক, আটখানা গ্রেহাউন্ড নিয়ে তিতির মারতে যান জলার ধারে একটা ফলের বাগানে । বেশ কয়েক বছর ইংল্যান্ডে একটা ঈর্ষনীয় রকম অভিজাত পরিবেশে থাকার দরুন খামারবাড়ি কিরকম কী হতে পারে, সেই অভিজ্ঞতা আমার হয়ে গেছে । কিন্তু ঘোড়ার গাড়ির কেবিনের পর্দা সরিয়ে বাদামী নুড়ির রাস্তায় যখন নামলাম, তখন দেখি একটা বেশ বদখৎ দেখতে মাঝারি ধরনের বাড়ির মতন কিছু একটা, বাইরের দেওয়াল আর কাঠে রঙটাও জায়গায়-জায়গায় চটে গেছে । বুঝলাম খুব একটা মেন্টেনেন্স হয়না । আমি জানি না তোমার কাকা হঠাৎ করে বড়লোক হয়ে গেছিলেন কিনা, কারণ আমি বরাবর দেখে এসেছি, যাদের হাতে দুম করে প্রচুর টাকা এসে যায়, আচমকা বিত্তশালী হয় যায় যারা , তারা জানেনা কেমন ভাবে টাকা খরচ করতে হয় । অর্থ তাদের রুচিকে পরিশীলিত করতে পারে না । তারা অন্ধের মতন নোট করে যে বড়লোকেরা সাধারণত কী-কী করে, তারা সেই মতন নানা ক্ষেত্রে, পূব-পশ্চিম কিছু না দেখে, অবুঝের মতন টাকা খরচ করে, সমাজে নিজেদের কেউকেটা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে । নিজেদের জৌলুস, নিজেদের বৈভব, নিজেদের কারুকার্যখচিত জীবন যাপনকে কিছু পূর্বনির্ধারিত সিম্বল ও টোটেমাশ্রিত ফ্রেমে তুলে ধরার জন্যে তারা সবসময়ে বদ্ধপরিকর ।



বাড়িটি উল্লেখযোগ্য রকম বিশ্রী দেখতে হলেও, যা আমাকে আকৃষ্ট করল সেটা হল বাগান, কম্পাউন্ডের ভিতরে একটি সুবৃহৎ ও সুললিত বাগান । হাল্কা নীল লিলাকের আধিক্য মোহিত করল । এছাড়াও চার-পাঁচ রকমের গোলাপ দেখতে পেলাম অনতিদূরে । সার দিয়ে বুগেনভিলিয়ার গাছগুলো হাসিখুশি যাযাবরের দল বলে মনে হল । খুব দরদ দিয়ে বাগানটির পরিচর্যা হয় নিয়মিত, সেটা বুঝলাম । মনে ভেসে উঠল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যুগলবন্দি' কবিতার প্রথম দু'লাইন 'ওইখানে ওই বাগানে তার ফুল ফুটেছে কত / জানতে পারি, ওর মধ্যে কি একটি দেবার মতো?', যা তখনো লেখা হয়নি, তার কোনো প্রশ্নও নেই সেই সময়ে, সেটা লেখা হবে কাঁটায়-কাঁটায় ১০০ বছর পরে । আমি মার্গারিটাকে অত্যন্ত মূর্খের মতন বলে বসলাম জানো রিটা, আমার হঠাৎ করে খুব কবি হতে ইচ্ছে করছে। একদিকে তোমাদের খামারবাড়ি, আরেকদিকে এত সুন্দর ছড়ানো বাগান, আর এসবের মাঝখানে আমরা দু'জন । তেরছা হেসে উনি জবাব দিলেন ইচ্ছে হলেই তো হয়না, তার জন্যে চর্চা লাগে, আপাতত বাড়িতে চলো, আয়েশ করে চা পান করা যাক, কোন অঞ্চলের জানো ? দার্জিলিং ।



আমি বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম বাইরেটা যতটা সাদামাটা, ঘর-দোর অতটাও খারাপ নয়, বরং বেশ ভালোই । হলঘরটা একটা মেরুন পার্শিয়ান কার্পেটে মোড়া । আসবাবগুলো সব মেহগনি কাঠের, চকচক করছে । জুঁই ফুলের মতন গন্ধওয়ালা একটা আতরের আভাস পেলাম হাওয়ায় । এই যে আমার কাকিমা, ওহ গুড মর্নিং ম্যাডাম, গ্ল্যাড টু মিট ইয়ু, মাই প্লেজার মাই প্লেজার মিস্টার...? চট্টরাজ । চ্যাটোরাজ ! উড ইয়ু লাইক টু হ্যাভ সাম ফাইন টি ? হাউ কাইন্ড অফ ইয়ু, সার্টেনলি ম্যাম । হলঘরেরই দক্ষিণ প্রান্তে একটি আরামদায়ক বসার জায়গায় গিয়ে আমরা তিনজন বসলাম । শার্সির বাইরে একটা মাঝারি মাপের ফার্ন গাছ ছিল, যেটার পাতার জালি দিয়ে ফালিফালি রোদ একটা ডিম্বাকৃত মার্বেলের টেবলে পড়ে বোঝাচ্ছিল এই চা পান ব্যাপারটাও একটা মায়া, বা বলা ভালো বহু মায়াবী ব্যাপারই চা পান দিয়ে শুরু হয় । রিটার কাকিমা মিসেস অ্যাল্ড্রিন নিজের আর্দালিকে বললেন চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে আসতে । আমার তখন মন পড়ে আছে বাইরে, সেই বাগান যেটা আমি ফেলে এসেছি । পোর্টেবল ডিজিটাল ক্যামেরা - এমন কোনো যন্ত্র বাস্তবে থাকলে তাই দিয়ে সহজেই অনেক ছবি তুলতে পারতাম, এইসব ভাবছি ; আর ভাবছি এই ঝিম ধরা ক্লান্তিকর গদ্যপ্রবাহে আর কতক্ষণ থাকতে হবে পুতুল সেজে । আমি কি তাহলে ভুলই করলাম এখানে এসে ? অযথা ফিকল-মাইন্ডেড হওয়াটা এক প্রকার রোগ, আমার রাঙামামার একটি চিঠির পোস্ট-স্ক্রিপ্ট অংশটি স্টিকার হয়ে উড়ে আসে । বসবাস ছিল বগুরা জেলার আদম দীঘি গ্রামে, চারশো বিঘা ধানজমি ছিল । সেই একবার জ্যোষ্ঠ মাসে খুব দাবদাহ, বেড়াতে গেছি ওর বাড়িতে, তখন আমার বয়স নয় কি সাড়ে-নয়, আমায় সাথে করে নিয়ে গেল গ্রামের পূবদিকে একটা নদীতে । একটা সাধারণ কোষা নৌকার জুটের গন্ধওয়ালা ছইয়ের ভেতরে আমাকে বলল দ্যাখো বুড়োবাবা, তোমায় তো আস্তে-আস্তে বড় হতে হবে । আমি বললাম হ্যাঁ হতে হবে । তার জন্যে অনেক কিছু জানতে হবে, শিখতে হবে, হাত-পা-চোখ-মাথা সবকিছু দিয়ে । তুমি বুঝতে পারছো কী বলছি আমি ? তোমাকে সব ঠিকঠাক শিখিয়ে দেব আমি । আমি তখন দরদর করে ঘামছি , কিরকম সব আলোটালো ফুল পাখি একসাথে তালগোল পাকিয়ে নিংড়ে-নিংড়ে মেদ মাংস মজ্জা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল, বৃষ্টি নেই বৃষ্টি নেই , নৌকার শীর্ণকায় মাঝি, নাম বোধহয় কাশেম মিঁয়া, উঁচু স্বরে গান ধরল - সাঁই, নদীটারে উপুড় কইর্যা আকাশ কইর্যা দাও / ঝরঝর্যায়া নামুক পানি, ভাঙুক মেঘের নাও । ওই গান আমার কাছে বিষ আমার এখনো মনে পড়ে, ওই গান আমার কাছে বিষ আমার এখনো মনে পড়ে, মাঝীর গান কী কখনো বিষ হতে পারে, হ্যাঁ হতে পারে, ওই গান থেকে জঘন্য লালা ঝরে, ওই সুর রক্তে মাখা, ওই গানের আঁশটে গন্ধ ফরাসি আতরও ঢাকতে পারেনা, ওই গান আমার কাছে বিষ আমার এখনো মনে পড়ে, ওই গান আমার কাছে বিষ আমার এখনো...



চা । কী ভাবছেন ? আপনি এত চুপ করে আছেন, কোনো অস্বস্তি হচ্ছে আপনার ? Not at all ! I am sorry but I was so engrossed with the sheer beauty of the nature outside - the swaying daisies, the chirping blackbirds, the indulging breeze.. Ah ! Tea. A perfect complimentary addendum to all these, thank you. মার্গারিটা, তুমি তো ওনাকে চা-পর্বের পর বাগানে ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে পারো। হ্যাঁ তা পারি, ঘোরাব। সত্যিই আপনারা খুবই অমায়িক, আমার যে কী ভালো লাগছে, খুব ভালো সময় কাটাচ্ছি, আর আমি তো.......!!!! মিট মাই ডটার, লুসি। আগামী বছর কেম্ব্রিজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হবে । আমি খেয়ালই করিনি কখন আমার সামনে একটি পরীর মতন মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সোনা আর আখরোট মেশানো চুলের রঙ, চেরা কামরাঙার মতন চোখ, লুসি, ওহ্‌ লুসি, চিবুক থেকে আলো চুঁইয়ে পড়ে শরীরজুড়ে সহস্র হীরের ফুল হয়ে গেছে, মাছ-মাছ ফ্রিল দেওয়া আকাশী নীল ফ্রক পরে লুসি। এই মেয়েটিকে নিয়ে একটা গান হওয়া দরকার, যার টাইটেল হবে Lucy in the sky with diamonds. আমি সম্ভ্রমের সাথে উঠে ওর ডান হাতে আলতো করে ঠোঁট রাখি। স্মিত হেসে লুসি আমাকে বাউ করে। এই মেয়েটি কিরকম ভালোবাসা পছন্দ করতে পারে? খুব লিরিকাল কিছু নিশ্চয়ই, অনেক ফুল আর স্পর্শসহ। আচ্ছা, মিস্টার অ্যাল্ড্রিনকে দেখতে পাচ্ছিনা, উনি কি কোথাও ব্যস্ত আছেন? - পাপ ঢাকতে প্রশ্ন করি গৃহকর্ত্রীকে। উনি আজ সকালবেলায় কার্ডিফের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন, গতকাল দুপুরে একটা টেলিগ্রাম পান, কাজ সম্পর্কিত । ভেবেছিলাম একসাথে ছুটি কাটাব, সেটা এই মাসে আর হল না, মাস দুয়েক পর আবার আসব, আসলে জায়গাটা এত মনোরম...আমরা যখন বাড়িটা কেনার জন্যে এই জায়গাটা দেখতে এসেছিলাম, প্রথম দেখাতেই খুব ভালো লেগে গেছিল।



প্রথম দেখাতেই ভালো লাগা - তাহলে এইরকম কিছু একটা ব্যাপার হয়, আর সেটা শুধু আমার একার হয় না । তারপরেও প্রশ্ন থাকে, কতক্ষণ সাস্টেন করবে সেই ভালো লাগা ? সেটা কি আরো ভালো লাগাতে পরিণত হবে, নাকি কর্পূরের মতন উবে যাবে, নাকি বুকের কাছে খুব হাল্কা গোলাপি কোনো জন্মদাগের মতন থেকে যাবে চিরকাল ? আমার কোনটা হয়েছে, কোনটা হয়েছিল জানি না, যখন বম্বে থেকে জাহাজে চড়েছিলাম (নাম - অ্যাকোয়াপ্রিনসেস), ধূসর রঙের একটা সিঙ্গল-ব্রেস্টেড স্যুট পরে, টগবগ করছি বিলেতে যাওয়ার উত্তেজনায়, জাহাজ ছাড়ার আগেই ঠিক করে নিয়েছি কিরকম কী চিঠি লিখব বাড়ির সবাইকে, সবচেয়ে লম্বা চিঠিটা দিদিমাকে লিখব, বাবাকে একটা কলমের সেট পাঠাতে হবে, এদিকে বম্বের ডকইয়ার্ডে মেলা বসে গেছে, প্রচুর লোক, কেউ মাথার অপর বাঁইবাঁই গামছা ঘোরাচ্ছে, কেউ টুপি উড়িয়ে দিচ্ছে, অনেকে আবার নানারকম আলাদা গ্রুপ বানিয়ে কোরাসে গান গাইছে, চত্বরে বাদামভাজা আর বেলুন বিক্রী হচ্ছে, ডকের কাছে ছোট্ট কারেন্সি এক্সচেঞ্জ অফিসে ভীড় উপচে পড়েছে, আকাশে আঁকুবুকি মেঘ এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত আলপনা কেটে গেছে, অপূর্ব সুন্দর দিন, ততোধিক সুন্দর এই কোলাহল, সুন্দর আরেকজন, প্রথম দেখাতেই যাকে ভালো লেগে গেছিল - মনোরমা । পরে জেনেছিলাম পুরো নাম মনোরমা আইয়ার, কোয়েম্বাটরের মফস্‌সলে নিবাস, ওই অঞ্চলের এক ডাকাবুকো তহসীলদারের একমাত্র কন্যা । যাত্রার পরের দিন যখন জাহাজের ডেকে আমরা দু'জনেই সূর্যাস্ত উপভোগ করছিলাম, তখন আলাপ হয়েছিল । আমাদের জাহাজ সাদাম্পটানের বন্দরে নোঙর ফেলবে, যাত্রাপথ কেপ অফ গুড হোপ দিয়ে, তখনো যুগান্তকারী স্যুয়েজ কানাল কাটার কাজ চলছে, যা কয়েক বছরের মধ্যে সমুদ্রযাত্রার, যাকে বলে, jugular vein হয়ে যায় । অনেকে মধ্যপ্রাচ্যের বন্দরগুলোতে নেমে যাবে, তাদের কেউ কেউ রওনা হবে পূর্ব আফ্রিকার উদ্দেশ্যে । কিন্তু কথা হচ্ছিল মনোরমার, মনোরমা আইয়ার । কেশবতী, তন্বী, তার রাধিকাচঞ্চল নেত্রেও কম ঢেউ ছিল না, একটি গাঢ় সবুজ মাদ্রাজী সিল্কের শাড়ী পরে যখন অল্প হাত নেড়ে কথা বলছিল, তখন মনে হয়েছিল এনার শুধু একটা রাঙা, চকমেলানো ঝাঁপির প্রয়োজন । ইংল্যান্ডে যাচ্ছেন ঘুরতে, একা-একাই, যা অভাবনীয় । কোনো গার্জেন নেই সাথে । লন্ডনে ওনার বাবার এক অগ্রজ বন্ধুর বাসায় উঠবেন । ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করার বা ওখানে বসবাস করার কোনো ইচ্ছে নেই তার । শুধু ঘোরার ইচ্ছে, দেশ-বিদেশে একা-একা ঘুরে বেড়াতে চান । বর্মা, মলয়, সিংহল, এইসব দেশ দেখা হয়ে গেছে, পরের বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় যাবেন এমনটা ভেবে রেখেছেন । ঠিক এগারো দিনের মাথায় চোখ নামিয়ে কমলালেবুর রসে অর্ধেক ভর্তি গ্লাসে আঙুল বুলিয়ে আমাকে বললেন তুমি আলাদা, প্রত্যেকে ভালোবাসার কথা বলে, তুমি আমার হবি নিয়ে আলোচনা করেছো, উৎসাহ দেখিয়েছ; লন্ডনে ঘুরবে আমার সাথে ? হ্যাঁ ঘুরব, আমি ততক্ষনাৎ উত্তর দিয়েছিলাম । এর আড়াই মাস পর সান্নিপাতিকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় মনোরমা আমাকে একটা পকেটঘড়ি দিয়ে বলেছিল এই ঘড়িটা আমার বাবাকে দিয়ো, ঠিকানা আমার স্যুটকেসে একটি ডায়েরিতে পেয়ে যাবে, আর বলো যে তাকে আমি খুব ভালোবাসি ।



দুপুরবেলায় 'মুনলাইট সোনাটা ' শোনাচ্ছো কেন ? রিটা আমায় ভ্রু তুলে বলল । অনেকগুলো লিলিফুলের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, বাগানে । ক্যালকাটার একটা বড় দোকান থেকে এটা জেঠু কিনেছিলেন, তারপর আমাকে গিফ্‌ট করেন, আমি লিড বন্ধ করে বুকপকেটের বদলে ট্রাউজারের পকেটে ঢোকাতে-ঢোকাতে বলি । ওইটা কী ফুল বলো দেখি ? আমি জানি না কী ফুল, খুব সুন্দর, অন্যরকম, দেখিনি আগে । ওটা এ্যাডেনিয়াম । খামারবাড়ির সামনের দিকটায় বাগান, পশ্চিম দিকে একটা ফোয়ারাও আছে, সাধারণতঃ বাগানের মাঝখানেই ফোয়ারা থাকে এসব ক্ষেত্রে, এখানে অন্যথা । ফোয়ারাটা একটি মৎস্য কিন্নরী । তার দুই স্তন থেকে জল পড়ছে অবিরাম, এমন ভাবে পড়ছে যে দুটো বারিধারা এক অপরকে ইংরেজি 'X' অক্ষরের মতন খন্ডন করছে, তারপর নিচে পড়ে একই পাত্রে মিশে যাচ্ছে । এই সব ফোয়ারাবাগান নিয়ে আমাদেরো স্বপ্ন কম ছিল না । বাড়ি হোক না হোক, এমনকি বাগান হোক না হোক, ফোয়ারা থাকতে হবে একটা । একটা কপারের গেট থাকবে বড় আর ভারী, ঠেললে ক্যাঁচ করে আওয়াজ হবে । একজন দারোয়ান থাকবে, ঢাউস টর্চ হাতে, আর চারিদিকে শুধু ঘাস আর ঘাস আর ঘাস, একটা নবীন চিতাবাঘ লুকিয়ে থাকার মতন উজ্জ্বল, যাবতীয় প্রশ্রয়সহ, ঘুমের দুলুনি নিয়ে । রিটা আমার হাত ধরে বলল চলো বাড়ির পেছন দিকটায় যাই, কয়েকটা ফলের গাছ আছে, তারপরে একটা ওক গাছের বন, পুকুর আছে দু'তিনটে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে । আমরা দু'জন একটা ঘোড়ার নালের বাঁক দিয়ে, কিছু ক্রিসেনথেমাম গাছের পাশ দিয়ে বাড়ির পেছনে এলাম । পথের একেবারে মাঝখানে একটা কমলালেবুর গাছে দেখে বললাম কিরকম বেখাপ্পা দেখ তুমি । বেখাপ্পা নয় - "The tree which moves some to tears of joy is in the eyes of others only a green thing that stands in the way..." তুমি কিন্তু আমাকে ব্লেক কোট করতে বাধ্য করলে । একটা নাশপাতি গাছের তলায় গিয়ে আমরা আয়েশ করে বসলাম । ঘুম-ঘুম ভাব এসে গেছে এই মেঘলা দুপুরে । ভাবছি কে গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে তন্দ্রায় যাবে, আর কে তার কোলে মাথা রেখে ঘুমোবে, এই নিয়ে একটা লটারি হোক । রিটা তোমার কি একটু ঘুম পাচ্ছে ? রিটা তোমার কি একটু ঘুম পাচ্ছে ? না, পাচ্ছে না । তোমার ফ্লোরাল হ্যাটের রিবনে ওটা কী পড়েছে ? তোমার ফ্লোরাল হ্যাটের রিবনে ওটা কী পড়েছে ? একই কথা দু'বার করে জিজ্ঞেস করছো কেন ? কই দেখি, ও টুপি খুলতেই এক ঢাল চুল নেমে আসে ওর মুখের আশে পাশে, কাঁধে ছড়িয়ে যায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে, ছুটির পর স্কুল গেট খুলে হাসিখুশি বাচ্চাদের ছোটাছুটির মতো । ও কিছু নয়, গাছের পাতা; তুমি কি ঢুলছো ? না ঢুলছি না । পরিষ্কার দেখছি ঢুলছো । রিটা, তুমি এখানে কখনো পিকনিক করেছো ? গাছের ঠান্ডা, নরম ছায়ায় ম্যাট বিছিয়ে, কোনো সুর গুনগুন করতে-করতে, একইসাথে কফি পান আর টোস্টে মার্জারিন লাগাতে-লাগাতে সময় কাটিয়েছ কখনো, এখানে ? না করিনি । তাহলে চলো একদিন তুমি আর আমি এখানে পিকনিক করি । না, পিকনিক করার আরো ভালো জায়গায় আছে , এখন ওঠো, চলো ওই ওকগাছের বনে একটু সময় কাটিয়ে আসি ।



টলটলে ছায়ার ফাঁদ পাতা আছে সারা বনে । গাছগুলো লতা-পাতা ডালপালা নিয়ে বিশাল দৈত্যের মতন । এত বছর ইংল্যান্ডে আছি, মফস্‌সলেও কম ঘুরিনি, তবে ওকে গাছের বনে এই প্রথন পদার্পণ । এটা ঠিক বন-জঙ্গল বলতে যা বোঝায় তা নয়, কারণ দূরে দেখা যাচ্ছে কোথায় গাছগুলোর ঘনত্ব শেষ হচ্ছে । প্রচুর পাখি ডাকছে চারিদিকে, মিলেমিশে কিছুটা জলতরঙ্গের মতন শব্দ হচ্ছে চারিপাশে, তার সাথে আছে পাতার মর্মর । মাঝে-মাঝে ব্ল্যাকবার্ড আর কোকিলের ডাক চিনতে পারছি, আর ঘুঘুর, বাকি আর কোনো পাখির ডাক চিনি না । কিরকম একটা ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে, তাই না, রিটা আমাকে বলে, মনে হয় বৃষ্টি হবে, ছাতাটা নিয়ে এসে ভালো করেছি, এটা আমার এমনিতেও খুব প্রিয় । আমি তো অন্য কিছু ভেবেছিলাম । কী ? আমি ভেবেছিলাম তুমি ছাতাটা ব্যবহার করবে পাখিদের থেকে লুকিয়ে আমার ঠোঁটে তোমার ঠোঁট দিয়ে সনেট লেখার জন্যে । কোনো রুচি নেই আপাতত, রিটা হেসে বলে । তাহলে কি প্রবন্ধ ? তাও নয়, তুমি একটু আগে পিকনিকের কথা বলছিলে, বলো কেমন পিকনিকের ব্যবস্থা করবে আমার জন্যে, ইনটেরেসটিং কী-কী করবে। তাহলে শোনো, আমাদের দু'জনের পিকনিক একটা ঐতিহাসিক পিকনিক হবে, ইন দিস গার্ডেন, ইন দিস ফরেস্ট, বিসাইড দা moors, টানা হাতের লেখায় লেখা থাকবে এই উপাখ্যান, কবিতা লেখা হবে বেশ কিছু, কেউ-কেউ হয়ত সিম্ফনিও কম্পোজ করবে, ব্যাপারটা একটা ফোকলোরের মতন হবে, বুঝতে পারছো? হ্যাঁ, সাজ-সরঞ্জাম সাধারণ হবে, সেই একই ফল আর কেকের বাস্কেট, সেই একই ম্যাট পেতে বসা, সেই একইরকম চা-কফি পান, সেই একই...তা সত্ত্বেও অনেক কিছু আলাদা। আমাদের পিকনিক করতে কেউ দেখবেনা অথচ তাই নিয়ে চর্চা হবে যুগযুগ ধরে, বহু বছর পর, অন্য কোনো দেশে, হয়ত ফ্রান্সে, হয়ত অ্যামেরিকায়, কোনো বিশাল মাঠে হাজারে হাজারে যুবক যুবতী নেশাতুর হয়ে জড়ো হবে গান-বাজনার আসরে, রঙচঙে জামা পরা সব আধুনিক শিল্পীরা গাইবে নানারকম নতুন বাদ্যযন্ত্র নিয়ে, কয়েকদিন ধরে উৎসব চলবে, আমাদেরই পিকনিক, একটা অন্য স্তরে অন্য রূপে অন্য আঙ্গিকে খুবই অদ্ভুতভাবেএএএএএ....আ...আ ! একটা তীব্র, তীব্র, মাআআ, ব্যাথা, ঘাসপাতার ওপরে থুবড়ে পড়লাম । বাঁ কাঁধ দিয়ে, বাঁ হাত দিয়ে একটা অসহ্য রকম ব্যাথা, যেন কেউ শরীর থেকে হাতটা আলাদা করে দিতে চাইছে । দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেছে । রিটা, রিটা তুমি কোথায়, আমাকে দেখ, হেল্প মি মার্গারিটা, হেল্প মি, ও লর্ড প্লিজ হেল্প মি। আমি কোনোক্রমে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, ঘাড় ঘোরাতেও যন্ত্রনা, আমি দেখলাম একটা...একটা তির ! অ্যান অ্যারো ! তেরছা হয়ে আমার বাঁ কাঁধ দিয়ে ঢুকে, আমার বাঁ হাতের পেশী ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে, ফলাটায় আমার রক্তে ভিজে পলাশ ফুলের মতন লাগছে । পলাশ ফুল পলাশ ...ফুল, বহুদিন পর এই ফুল, বহুদিন বহুবছর পর এই ফুলের নাম, আমি জানিনা কেন এমন হল কোথা থেকে , কী, কেন, রিটা জানে ? না জানে না, কেউ জানে না , কে জানে , কে কী, আমার ব্যাথা, আমার কষ্ট , কোনো গাছ থেকে ছুঁড়েছে, পলাশ ফুল পলাশ ফুল পলাশ, গাছ থেকেই ছুঁড়েছে কেউ, মারার জন্যে নয়, কষ্ট দেওয়ার জন্যে, রিটা তুমি দেখ আমার কষ্ট, কোথায় চলে গেছ, আমার কষ্ট না দেখে তুমি কোথায় চলে গেছ, এই তির আমার চেনা, এই ফুল, এই রক্ত, আমি জানি আমার হাত আমার কাঁধ আমার সাথে অভিশাপের মতন এই তির ডগায় পলাশ, পাপড়িতে রক্ত, পাপ করেছি পাপ সেই পাপের রক্ত আমি ভুল করেছি আমি সেই পাথর বুকে নিয়ে চলেছি আজ সেই পাথর পলাশ হয়ে গেছে আজ সেই পাথর ছেনে একটা তির বেরিয়েছে কষ্ট কষ্ট কষ্ট পলাশ ফুল পলাশ মহুয়ার বন মহুয়ার বন ওকে গাছের বন নয় মহুয়া মহুয়া শুধু শালের জঙ্গল কত বছর হল কত বছর আমি লিখে রাখিনি আমি জানি না আমি বলে দিয়েছি ওই সেই ভীল যুবক যে নিজের দলবল নিয়ে তোমাদের ছাউনিতে হামলা করবে আমায় তোবড়ানো ভাঁড়ে মহুয়া খাওয়াতো আগে ওই সেই যুবক তামা ঝরছে যার সারা শরীরে চোখে চন্দ্র সূর্য সব এক হয়ে গেছে বুকের লোহা গলে ঘাম হয়ে যায় যার ওই সেই ওই সেই ভীল যুবক তোমরা মারো ওকে আপনারা মারুন আপনারা মারুন আমি চিনিয়ে দিচ্ছি কিল হিম জাস্ট কিল দা মেন রেবেল সার ইয়োর হাইনেস আর্নেস্ট সার্ভিস টু ইয়ু ফর দা কোম্পানি ফর দা ক্যুইন শ্যুট হিম ডাউন অই উজ্জ্বল যুবক নক্ষত্রসম অই ভীল বনানীবাতাসে শৈলের প্রভাব ওর পিঠে ডাহুক খেলে বেড়ায় নিশ্চিন্তে পায়ের দাগে বীজ ফেললে গাছ বেড়ে ওঠে দ্রুত বাহুর ধমনীতে বজ্র শলাকা তার ভ্রুভঙ্গিমা বাতাসের দিক নির্ধারণ করে দু'চোখে তরল বারুদের ঢেউ চোখ বুজে থাকলেও নরম লেবুরঙ ফোঁটা-ফোঁটা লেগে থাকে পাতায় পেশিতে বাঘডোরার মতন পুরু খনিজ মাটি সবকটা শুয়োরেরবাচ্চাকে চাপা দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট অই যুবক অই ভীল যুবকের তির চালনায় ঝর্ণার সুর আছে গোখরোর ছোবল আছে ফলায় ওকে এক্ষুনি এক্ষুনি এক্ষুনি মেরে ফেলতে হবে ইয়ু নিড টু কিল হিম স্যার ইয়ু নিড টু দেখুন ওকে গুলি করুন একাধিক গুলি সবচেয়ে ভালো বন্দুকবাজদের জড়ো করুন ওকে গুলি করুন কিল হিম কিল হিম আমি জানিনা আমি পারছি না কিল হিম জাস্ট কিল হিম......


বনজমি পেরিয়ে আরো দক্ষিণে আস্তে-আস্তে হেঁটে চলেছি ।বহু, বহুদিন হাঁটার মতন হেঁটে চলেছি । ব্যাথাটা কমেছে, কষ্টটা নয় । হাঃ ব্যাথা ! কিসের যেন ? হ্যাঁ, কষ্ট । শিরা থেকে মাংস থেকে হাড়, সর্বত্র পয়সা ফেলে যাচ্ছে, যেন আমোদ । কোট, জামা কোনোক্রমে গা থেকে খুলে-ছিঁড়ে জঙ্গলেই ফেলে এসেছি । নিজেরই আরেকটা শরীর ফেলে এসেছি জঙ্গলে । আমি আমার ক্ষতের দিকে, তিরটার দিকে তাকাচ্ছি না আর । তাকালে ব্যাথা বেড়ে যাবে ।ব্যাথা...বেড়ে যাবে । একটা পুকুর দেখতে পাচ্ছি কাছেই, পদ্ম আর শাপলায় শান্ত, আর...রিটাকে । পেছন ফিরে বসে আছে, কী করছে এখানে, বসে আছে কিরকম... আমি পাগলের মতন খুঁজেও ওর দেখা পাইনি । কিন্তু...রিটা ? আমি পুকুরটার আরো কাছে গেলাম, জলে ক্ষতটা ধোব ভালো করে । রিটা ? এ তো রিটা নয় । বাচ্চা মেয়ে, পনেরো-ষোলো বছর বয়েস হবে বড়োজোর । মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসল, আমাকে চেনে ? মাথার চুলে সোনালী আভা, আর আখরোটের বাদাম রঙ । চোখ দু'টো টানা-টানা, ভীষণ মায়াবী । গায়ের রঙ ব্রিটিশদের মতন নয়, কিছুটা চাপা । কী নাম তোমার ? রুবি, মেয়েটি আস্তে করে উত্তর দিল, অবাক ভাবে তাকিয়ে । এখানে বসে কী করছো, তোমার বাবার নাম কী, তোমার মায়ের নাম কী ? তুমি কি আমার সাথে মজা করছো, বাবা ? আমি তোমার বাবা কেমন করে হলাম ! আমি কিছু ভেবে উঠতে পারিনা, আমি তো এইমাত্র, ওই বনে, রিটা, আমি...তোমার মায়ের নাম কী ? লুসি । লুসি ? অ্যাল্ড্রিন পরিবারের লুসি ? হ্যাঁ, তাই তো । তুমি আমার আর লুসির মেয়ে ? হ্যাঁ । এখন কটা বাজে, কী ডেট আজকে, কটা বাজে, তুমি কী বলতে চাইছো ? রুবি আমায় কিছু না বলা মুখ ঘুরিয়ে যেমন জলে পা ডুবিয়ে বসে ছিল তেমন বসে থাকে চুপচাপ, নিরুত্তাপ । আমি, আমি কিছু, আমি জানিনা, আমার কষ্ট আমার ব্যাথা আমার, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি আমার কাঁধে, আমার হাতে, দাগ আছে, স্টিচের, পুরনো ক্ষতের । আমি বুঝতে পারি আমাকে কিছু গুছিয়ে নিতে হবে, অনেক কিছু নতুন করে বুঝতে হবে, নতুন করে শুরু করতে হবে । পকেট হাতড়াই, হাতে কিছু একটা অনুভব করি । পকেটঘড়ি, আমার ট্রাউজারে ছিল । লিড খুলে দেখি ওটা বন্ধ হয়ে গেছে, দুপুর দু'টো সাতাশে । দুপুর ? মুনলাইট সোনাটা তখনো বেজে চলেছে । আমি ওই বাজনা শুদ্ধু ঘড়িটাকে মুঠো করে পুকুরে ছুঁড়ে ফেলেদি । ওটা ডুবে যাওয়ার পর পুকুরের জল জোছনায় ভরে যায় ।