কমলকলির ঠাকমা

অপর্ণা গাঙ্গুলী

সে অনেক অনেক দিন আগের কথা l কমলকলির ঠাক্মা এনা রাণী দেবী সেদিন সবে এই পেল্লায় পাঁচমহলা বিবেকানন্দ রোডে তার শ্বশুরের বসতবাটিতে পা রেখেছেন l ধনী পাট ব্যবসায়ী বাপের দুই মাত্র কন্যের এই বড়োটি l বেথুন স্কুল লালিতা মেয়ে l তখনকার ক্লাস আট পাশ l এই সবে তেরোতে পড়তেই ভালো পাত্র পাওয়া গেলো l এঁরা আবার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের দশ রাত্তিরের জ্ঞাতি l বংশ সম্পর্কে কিচ্ছু বলার নেই, তাই এই সম্পর্কটাই জ্যোতিষ মুখুজ্যে ওরফে এনা রাণীর বাবা মহাশয় শ্রেষ্ঠ বলে ভাবলেন l অতঃপর বিবাহ l সেই বিয়েতে নিমন্ত্রিত সব সাহেব সুবোর দল l এলাহী ডিনার ও শ্যাম্পেনের ফোয়ারা ছুটলো l সাহেব মেমরা খুশি খুশি ঘরে ফিরলেন l এনা রাণীর মা নেই, ছোটবেলাতে গত হয়েছেন l এনা এবং হেনা বাড়িতে কাজের লোকদের তত্ত্বাবধানে বড়ো হয়েছেন l সুন্দরী শিক্ষিতা দুই বোন, রূপে গুনে লক্ষ্মী সরস্বতী l তবে এনার একটি ভয়ঙ্কর আবদার ছিল বাবার কাছে l বাবা, ছেলের গলাটি যেন বেশ পুরুষালি হয় l ঠিক তোমার মতো l পাত্র অমিয়কে এক ঝলক দেখেছিলেন বাবা l গাত্রবর্ণে সাহেবদের হার মানায় l আর তেমনি ঝকঝকে চেহারা l ছেলে রাঁচির কোর্টে অধ্যাপক l শীঘ্রই কলকাতায় হাই কোর্টে বহাল হবে l তাই ছবিতে দেখেই পছন্দ কোর্টে হয়েছে l জ্যোতিষবাবু ভাবলেন, অমন যার চেহারা তার গলা স্বর নিশ্চই গুরুগম্ভীর হবে l ব্যাস আর কোনো অবধি রইলো না l বিবাহ সুসম্পন্ন হলো l ছেলে চুপচাপ l গলার স্বর শোনার সৌভাগ্য ফুলশয্যের আগে এনা রাণীর হলো না l এনা শ্বশুরবাড়িতে পা রাখলেন l আর এক গাদা লোকের মাঝে জড়োসড়ো হয়ে রইলেন ভারী l

ফুলশয্যে হতে হতে ঢের দেরী হলো l ত্রয়োদশী এনার চোখ ভেঙে ঘুম নেমে এলো l তিনি ফুল্লসুশোভিত পালঙ্কে শুয়ে নিদ্রা গেলেন l ঘুম ভাঙতে ধড়মড় করে উঠে বসলেন আর পলকের আড়াল থেকে দেখলেন তেনাকে l হালকা বেনিয়ানের তলা থেকে গায়ের গোলাপী আভা l পাঞ্জাবী হয়তো ঘরে এসে ছেড়ে দিয়েছেন l পরনে চুনোট করা ধুতি l চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা l তিনিই প্রথম মুখ খুললেন, আহা ক্লান্ত হয়ে পড়েছো, তা তো হবেই l কিন্তু একী কি শুনলেন তিনি l এ কি ময়দা খাওয়া গলা রে বাপু, কি মিহি, কি মেয়েলি l ছিঃ l বাবামহাশয়ের উপর রাগে দুঃখে চোখ ফেটে জল এলো l টপ টপ করে চোখের জল পড়ে বুক ভাসালো l অমিয় ততক্ষনে এগিয়ে এসেছেন l ছিঃ কাঁদে না, বাপের বাড়ি জন্য মন খারাপ হচ্ছে বুঝেছি l আচ্ছা আমি তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবো l থাক, আর কথা বোলো না তুমি, মনে মনে হিস্ হিস্ করে উঠলো এনা l এই বরে বাবা আমাকে বিয়ে দিলেন ? গলাই যদি না থাকলো তবে পুরুষ কি? ছিঃ ছিঃ ছিঃ হাত পা বেঁধে বাবা এমন করে এনা রাণীকে জলে ফেললেন? ফেলতে পারলেন ? এদ্দিন যাবৎ এনা রাণীর সুখের স্বপ্নের ঘরটি তাসের ঘরের মতোই ভেঙে পড়লো l

এ সব গপ্পো কমলকলির অবশ্য জানার কথা নয় l ঠাক্মার কাছেই শোনা l গরমের ছুটির দুপুরে ঠাক্মার ঘরে দোর জানলা বন্ধ করে গপ্পো করে ঠাক্মা আর কমল l ঠাক্মার জাফরানি জর্দা পানের গন্ধ হাওয়ায় ভাসে l ঘর ঘর করে পুরোনো দিনের পাখা ঘোরে l দাদু অন্য ঘরে বিশ্রাম করছেন আর এই সুবাদে ঠাক্মা আর নাতনির এই প্রাণের সখ্য l আজ এতো দিন পরে ঠাক্মার ঘরে ফিরে এসে, কমলকলি তাই চারিদিকে চায় l সব ঠিক আছে, একই রকম l সেই অদ্ভুত ওল্ড কিউরিওসিটি মার্কা ঘরটি, লেসের পর্দা, বেলজিয়াম কাঁচের আয়না লাগানো দেরাজ, ড্রেসিং টেবিল l শুধু মানুষগুলো নেই l ফোঁস করে নিঃস্বাস ফেলে কমলকলি l দাদুর অসম্ভব পুরুষতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে ঠাক্মা কি ভাবে নিজের জীবন বাঁচতেন সেই সব কথা মনে আসে l আরো একবার ছবি দিকে তাকিয়ে নমো করে কমলকলি l এনা রাণীর উদ্দেশেই l

গলা না থাকলে কী হবে ! রোয়াব কিছু কম নেই অমিয়র l রেগে গেলে যেন পিনাকপাণি l অমন যে রাশভারী গৃহিনী এনার শাশুড়ি মহাশয়া, তিনি পর্যন্ত ছেলের ভয়ে কেঁচো l ঝি চাকরদের তো কথাই নেই l এনা বরাবর তার বাবার মতো শক্তিমান পুরুষমানুষই পছন্দ করেছে l তাই বলে এত্ত পৌরুষ ? রক্ষে করো মা l মাথা ঠান্ডা করো l কিন্তু তা বললে হবে কী l প্রমাদ গনলেন স্বয়ং জ্যোতিষবাবু l মেয়ের ভালো লাগবে বলে জহুরীকে দিয়ে হীরে পাঠালেন মেয়ের বাড়ি l কোনটা পছন্দ হয় মেয়ের l হীরের গহনা দেওয়া হয়নি বিবাহে l শাশুড়ি ভয় পেলেন বটে l এ সব শ্বশুরের কানে উঠলে দফা রফা l বড়লোকি দেখানো বেরিয়ে যাবে l এমনিতেই তিনি ভারী মেজাজি মানুষ l ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট l ইংরেজ সাহেবের মুখের উপর বলেছিলেন একবার -'হিয়ার মে আউট সার, এই এম নট আফ্রেড অফ ইউর রেড আইড ব্রাউ বিটিং - তোমার রক্তবর্ণ চোখরাঙানিকে আমি ভয় করি না l’ খুব জোর সামলায় সেবার l চাকরী যায় যায় হয়েছিল আর কী l তা এ হেনো পুরুষসিংহের পুত্রবধূর বাপ পয়সার গরম দেখালে উনি যে ব্রহ্মমূর্তি ধারণ করবেন না কে বলতে পারে l ভয়ে কাঁপেন প্রমদ্বরা দেবী l কিন্তু এনা নির্বিকার l সে বলে দেয় অবলীলাক্রমে l জহুরী মশাই, বাবা মহাশয়কে বলবেন তিনি যেন শরৎবাবুর সব উপন্যাস গুলি আমাকে পাঠিয়ে দেন, গহনা আমার চাইনে l

দিন যায় মাস যায়, অষ্টম শ্রেণী অবধি পড়া এনা রাণী আরও আরও পড়বার ইচ্ছে প্রকাশ করেন l তাও আবার স্বামীর কাছে l ইংরিজিতে এম এ পাশ অমিয় পড়াশোনা করেছেন ঠিকই তবে গোঁড়া মানসিকতায় মানুষ তিনি l তাছাড়া দোর্দন্ডপ্রতাপ বাবামশাই কী বলবেন l
খ্যাসখ্যাসে গলায় ঘোষণা করেন l না না বেশ আছো খাচ্ছ যাচ্ছ, সেলাই ফোঁড়াই অবধি ঠিক আছে l
তোমার বাবার দেওয়া পিয়ানো বাজাতে যেও না l অর্গান ও নয় l
ওসব আমাদের বাড়িতে চলে না l নাটক নভেল পড়ে কী এমন দিগ্গজ হবে শুনি ?
ঘোমটার আড়ালে চোখের জল ফেলেন এনা দেবী l

তা একদিন দুপুরে শাশুড়িকে গান শোনাবার বুঝি অবকাশ মিললো l
ছোট দেবর আলোক বৌদিদির গানের প্রশংসা করেছে মায়ের কাছে, সেই সুবাদেই l
অমনি প্রমদ্বরা দেবী, পিয়ানোর ঘরে বসলেন গিয়ে l এ সময়টা এদিকটায় কেউ বড়ো একটা থাকে না l কর্তারা সব আপিস কাছারিতে l এনা পর পর মিস রাইটের কাছে শেখা পিয়ানোর সুর শোনালেন আর অর্গান বাজিয়ে গান l প্রমদ্বরা খুশী হয়ে বৌমাকে এক ছড়া বসরাই মুক্তোর মালা উপহার দিলেন l আর বললেন, বৌমা, তুমি পিয়ানোতে নতুন নতুন সুর শিখবে l বাবাকে বোলো মিস রাইটকে পাঠিয়ে দিতে এখানে l আমি কর্তার সাথে কথা বলবো l

আনন্দ আর আনন্দ l আর কে পায় এনাকে l সেদিন বিকেলের সূর্য্যটা অন্যরকমের এক আলো জ্বেলে অস্ত গেলো এনার জন্য l সেই শুরু l রাতে অমিয় বাবু বেশ শ্লেষ টেনেই বললেন, মা কে হাত করেছো দেখছি গান শুনিয়ে l যাক আমাকে পারবে না l আমি সে বান্দাই নই l চাটুজ্জ্যেদের আর কিছু না থাকলেই ওরকম মেনিমুখো স্ত্রৈণ ভাবটি নেই, বলে দিলুম l অমিয় ভুলে গেলেন, মা কিন্তু বাবামশাইয়ের থেকেই মেম টিচারের কাছে এনার গান শেখবার অনুমতি বাগিয়েছেন l একেই বলে নিয়তির পরিহাস l ঘোমটার আড়ালে এনা ফিকফিকিয়ে হাসলেন l

কমলকলি জানে যে সময়ের কথাবার্তা এসব, সেই সময়টি মেয়েদের পক্ষে খুব পর্দানসীন এক সময় ছিল l বিদ্যাসাগর রামমোহনদের দৌলতে মেয়েরা সবে একটু একটু করে ইস্কুল কলেজ যাচ্ছে, কিন্তু সংখ্যায় নগন্য l এনা রাণীর বাবার মতো মানুষরা যারা টাকার গরমে সমাজকে তোয়াক্কা করেন না, তাঁরাই এসব করতে পারেন l আর টাকা থাকলেও মানসিকতা থাকে না অনেকেরই l এই অবধি শুনে সে ঠাম্মির গালে চকাৎ করে এক চুম খায় l ঠাম্মি, ইউ আর এ জিনিয়াস l কী ভাবে যে এতো সব সম্ভব করলে তুমি ! ঠাম্মি আদোরের নাতনির গালে গাল রাখেন l বলেন, শোন তবে আরও বলি l ওই বাড়িতে তখন অনেক লোক l আমার জায়েরা ননদরা শাশুড়ির এই আমার প্রতি অবিরাম স্নেহবর্ষণ হয়তো পছন্দ করেন নি l তাই অনেক কথা উঠতে থাকে l ছোট দেওর আলোকের সাথে জড়িয়ে আমাকে নিয়ে অনেক গপ্পো চলতে থাকে আড়ালে আবডালে l তারপর? চোখ গোল গোল করে কমল - তুমি কি করলে ঠাম্মি ?

এনা রাণী বাড়িতে আলোকের কাছে পড়াশোনা শিখতে থাকেন দিব্য শাশুড়ির প্রশ্রয়ে l আর তারপর আলোক তাকে এক দুপুরে বাড়ির পেছনের শিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে নিয়ে যায় এক জায়গায় l প্রমদ্বরা দেবী ছাড়া এ কথা কেউ জানে না l তিনি পই পই করে বলে দিয়েছেন l দেরি করবি না, তাহলে আমি আর সামলাতে পারবো না l কর্তা বাড়ি ফিরলে অনর্থ ঘটবে l পাড়ায় একটি ছোট স্কুল l সেখানে অসচ্ছল অবস্থার মা বাবার ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে l এনা সেখানে বহাল হলেন l শুধু কোনো একটু কাজ করবার জন্যেই l আর কিচ্ছু না l যা পড়েছেন এতদিন, সেই বিদ্যে যদি অন্যদের দান করা যায় কিছুটা l সময়টাও যাতে ননদদের সাথে কূটকচালি না করে বেশ ভালো কাটে l ঘরে দুই ছেলেমেয়েকে খাইয়ে ধুইয়ে শাশুড়ির তত্বাবধানে রেখে এনা যেতে লাগলেন ওই কাজে l তখন তার বুকে এক টগবগে আনন্দ l আমিও পারি l এই ভেবে তার বুকটা ভরে ওঠে l ওদিকে কি ভাবে যেন এই কথা জানাজানি হয়ে যায় l

একদিন অমিয় কোর্ট থেকে হঠাৎ তাড়াতাড়ি ফিরলেন l এসে হাঁক পাড়লেন – মা, মেজো বৌ কোথায় ? মা ইতস্তত করেই বললেন - এই তো বাবা, আলোকের সাথে বৌমার কোন এক বন্ধুর বাড়ি গেছে, এই ফিরলো বলে l অমিয় সব খবর নিয়েই এসেছিলেন l রাগ চেপেই রইলেন তখনকার মতো l আর পরদিন এনা বাড়ি থেকে বেরোতেই পিছু নিলেন ওঁর l গিয়ে যা দেখলেন, তাতে চমকে গেলেন নিজেই l এক দল ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এনার চতুর্দিকে l আর এনা পরমানন্দে তাদের মাঝে বসে পড়াশুনো করাচ্ছেন l কেউ কোলে, কেউ কাঁখে l অমিয় বাড়ি ফিরলেন l এ ব্যাপারে তার মনের অবস্থা কী হলো বলা যায় না l তবে এর পর থেকে এনা কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা অবশ্যই কমে গেলো অনেক l

এর মাঝে হলো কী, আলোক প্রেমে পড়লেন এক সিনেমার অভিনেত্রীর l তখন শ্বশুর গত হয়েছেন l ছোট ছেলের এই কাজে শাশুড়িও অখুশী l অমিয় জানলে কী বলবেন, এই ভেবেই l এবার এনা এগিয়ে এলেন l স্বামীর সাথে কথা বলে বিয়েও দিলেন ওঁদের l অমিয় ও অন্য ভাইয়েরা বেঁকে বসেছিলেন l আলোককে ত্যাজ্য করবেন ভেবেওছিলেন হয়তো l সেদিন সন্ধ্যেবেলাতে স্বামীর মুখোমুখি হলেন এনা রাণী l বললেন, সিনেমা থিয়েটারের মেয়ে বলে তারা কী মানুষ নয়? অভিনয় একটি শিল্প, ক'জন পারে তা করতে ? তা ছাড়া তার স্বভাব খুব ভালো আমার জানা হয়ে গেছে l অমিয় চুপ করে রইলেন l চোখ বড়ো করে তাকালেন শুধুই l পরের দিন মা কে বললেন, আলোকের এ বিয়েতে আমার মত আছে l

শাশুড়ি শত হস্তে আশীর্বাদ করেছিলেন এনাকে l বলেছিলেন, মা তুমি অসম্ভবকে সম্ভব করেছো, এ সংসার কে ধরে রাখতে তুমি পারবে l আমি এখন নিশ্চিন্তে মরতেও পারি l
আলোক বৌমণির পায়ে মাথা রেখেছিলেন - বৌমণি, তুমি দেবী l
এনা হেসেছিলেন, বিজয়ীনির হাসি l

না ভাই দেবী হয়ে কাজ নেই l আমি নারী, আমি মানবী l মানবিকতা যেন কক্ষনো না হারাই l
কমলকলি ঠাম্মির ঘরে দাঁড়িয়ে এই সব ভাবছিলো l এবারে যখন স্টেটস এ ফিরবে, ঠাম্মির ছবিখানা সাথে নিয়ে যাবে l রোজ দেখবে আর জীবন সম্পর্কে আরো বেশি বেশি করে প্রাণিত হবে রোজ রোজ l