মানসী

মৌমিতা নাথ

"তাহলে আপনি বলছেন পাঠকের মর্জিমাফিক আমি ক্লাইম্যাক্স লিখব? আমার গল্পের সমালোচনা করে কটা চিঠি এসেছে ? দু'শটা? আপনার ম্যগাজিনের গ্রাহক সংখ্যা নিশ্চয় দু'শ নয়? আমার গল্পের চরিত্র চিত্রণের দায় শুধুমাত্র আমার। তেমন বুঝলে পরের মাসে আপনি আমার ধারাবাহিক উপন্যাসটি আর ছাপাবেন না।" কথাগুলো শেষ করেই ফোনটা টেবিলের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দেয় আত্মজা।চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে সে। হঠাৎ ভার সামলাতে না পেরে কাঠের চেয়ারটি যন্ত্রনায় ককিঁয়ে ওঠে। তখনো রাগে এবং উত্তেজনায় আত্মজার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। "পাবলিক যা খায়" কথাটা শুনলেই রাগে গা রি রি করে তার। সম্পাদকদের মধ্যে আজকাল আর সাহিত্যের মান নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই, যত চিন্তা আয়- ব্যায় সংক্রান্ত। প্রকাশকরাও বেশি মুনাফা করতে পারলে আর কিছুই চায় না।
--"দিদি চা দেব?" দরজার বাইরে থেকেই ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে কাজের মেয়ে চন্দ্রা। আত্মজা রেগে থাকলে ভালো কথা প্রচন্ড কুৎসিতভাবে বলে। এই সময় তাকে চন্দ্রা এড়িয়ে চলে। সন্ধ্যা হল, এই সময় চা-টা না দিলে আর কখন দেবে!
"দিয়ে যা, তবে শুধু চা, আর কিচ্ছু আনবি না", প্রায় হুঙ্কার দেয় আত্মজা। কনুই দুটি টেবিলের ওপর রেখে দুহাতে মাথাটা চেপে ধরে সে। বাইশ বছর হতে চলল সম্মোহন পত্রিকায় তার লেখা বেরোচ্ছে, এর মধ্যে কত সম্পাদক এল গেলো এমন ব্যাবসায়িক মনবৃত্তির পরিচয় কোনো সম্পাদক দেয়নি। এসবই ভাবছে আর উদ্দেশ্যহীনভাবে একটা বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছে আত্মজা। রাগ কিছুটা প্রশমিত হয়েছে তবে মেজাজটা বিগড়োচ্ছে ক্রমশ। হাতের বইটা সরিয়ে রাখতে গিয়ে রঙিন চেকবই চোখে পড়লো আত্মজার। এটা এখানে কেমন করে আসলো? একমুহুর্তের জন্য ভুলে গেলেও আত্মজার মনে পড়লো সুভাষের কথা। আজই তো এসেছিলো সে।
প্রায় বছর দুই আগে একটি সাহিত্য সভায় সুভাষের সঙ্গে পরিচয় হয় আত্মজার। একটি প্রকাশনা সংস্থায় চাকরি করে সে। তার পাশাপাশি কয়েকজন তরুন তরুনীকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছে একটি এন জি ও। রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে আশ্রয় নেওয়া কিংবা শহরের ফুটপাথের সংসার পেতে বসা মানুষগুলোর জন্য কীভাবে অন্ন- বস্ত্রের ব্যবস্থা করে তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা যায় তার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করছে সুভাষের দলটি। নিখাদ সহানুভূতিপরায়ণ মনটির জন্য আত্মজা তাকে স্নেহ করে। সুভাষদের আর্থিক সহযোগিতা দরকার। আত্মজা কোনো মাসে তিন তো কোনো মাসে চার হাজার টাকার চেক লিখে দেয়।
আজ যখন দুপুর ফিকে হয়ে বিকেল হচ্ছে এমন সময় সুভাষ একটি ১৩- ১৪ বছরের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হয়েছিল আত্মজার বাড়ি। মেয়েটির গায়ের রঙ পাকা তেঁতুলের শক্ত খোসার মতো । শীর্ণ শরীরের সবকটা হার যেন চামড়া ভেদ করে বাইরে আসতে চাইছে। মাথা ভর্তি অবিন্যস্ত চুল।
মেয়েটিকে দেখিয়ে সুভাষ বলেছিলো, "দিদি এই মেয়েটিকে দিব্যেন্দু ডলফিন হোটেলের সামনে থেকে তুলে এনেছে। বাড়ি কোথায়, এখানে কীভাবে এলো, কিছুই বলে না। চারদিন হলো হোমে নিয়ে আসা হয়েছে এখনো মুখ দিয়ে একটা শব্দও করেনি। বোবা না কালা বুঝতেই পারছি না। কথা বললে শুধু মুখ তুলে তাকায়। আমরা কেউ ওর সমস্যাটা ধরতে পারছি না বলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।" কথাগুলো শেষ করেই সুভাষ মেয়েটির দিকে ঝুঁকে নির্দেশ দিল, "এই প্রণাম কর দিদিকে।" মেয়েটি নিজের জায়গা থেকে এক চুলও না নড়ে ফ্যালফ্যাল করে আত্মজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
-- "আয়। এখানে এসে বোস।" হাতছানি দিয়ে মেয়েটিকে কাছে ডাকলো আত্মজা। " নাম কী তোর, নাম?
এবার মেয়েটি সরাসরি আত্মজার চোখে চোখ রাখলো। একটুও নড়লো না, একটি কথাও বলল না।
চমকে উঠলো আত্মজা। এ দৃষ্টি আত্মজার খুব চেনা। এই তো সেই চাহনি। এই চোখ জোড়া তাকে বহুদিন ধরে তাড়া করছে।
"সুভাষ তোমরা বসো আমি আসছি" কথাটা কোনোক্রমে শেষ করেই দ্রুত পা চালিয়ে আত্মজা সিড়ি বেয়ে দোতলায় স্টাডিরুমে ঢুকে গেল। এরপর একবারের জন্যেও আত্মজা সেই ঘর থেকে বের হয়নি। এমনকি ব্যালকনিতেও যায়নি। ঘরে ঢুকেই ড্রয়ার থেকে চেকবুকটা বার করে তাতে খসখস করে কলম চালাতে চালাতেই "চন্দ্রা?" বলে চিৎকার করে উঠেছিলো। আত্মজা যেন ভুলেই গেছিলো, নিচের ঘরে দুজন অতিথি রয়েছে।
চন্দ্রা ঘরে প্রবেশ করার জন্য পা বাড়াতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে তার হাতে চেকটা একপ্রকার গছিয়ে দিয়ে, "নিচে যে ভদ্রলোক বসে আছে তার হাতে এটা দিয়ে বলবি দিদির হঠাৎ শরীরটা খারাপ লাগছে, আপনারা পরে আর একদিন আসবেন "আদেশের সুরে কথাগুলো বলেই আত্মজা আবার চেয়ারে এসে বসে।
চন্দ্রা সুভাষকে সেই মতো বিদেয় করলো ঠিকই কিন্তুর আত্মজারএই অদভুত আচরণের কারণ চন্দ্রার বোধগম্য হল না।
কত যুগ আগের কথা! তবুও সব কিছু এখনো স্পষ্ট মনে আছে।
ক্লাস সিক্স, সেকসন্ বি। ক্লাসরুমে ঢুকেই সবথেকে পিছনের বেঞ্চেগুলির দিকে এগিয়ে গেল আত্মজা। শেষের দুটো বেঞ্চের একটাতেও জায়গা নেই। অগত্যা মাঝামাঝি একটা বেঞ্চের এক কোণে বইয়ের ব্যাগটি অবহেলায় ছুঁড়ে দেয় সে। প্রার্থণার ঘন্টা বাজতে এখনও বেশ কিছুটা সময় আছে।
দোতলার লম্বা করিডোর যেখানে শেষ হয় ঠিক তার নিচে স্কুলের মস্ত বড় দৈত্যাকার গেটটা হাঁ করে প্রবেশরত প্রত্যেকটা ছাত্রীকে যেন গিলে খাচ্ছে। বিকেল পাঁচটার আগে এই হাঁ আর খুলবে না। এই দৃশ্যটা আত্মজা চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার মতো তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে। রোজকার মতো আজও আত্মজা এই দৃশ্য দেখছে, এমন সময় গেটের বাইরে একটি ভ্যান এসে দাঁড়ালো।তাতে যাত্রী মাত্র একজন, মানসী।ভ্যানটির চালক তার দুর্বল শরীর নিয়ে চালকের আসন থেকে নামতে একটু সময় নিলো।মানসী নামলো না। চালকটি মানসীর হাত থেকে বইয়ের ব্যাগটি নিল, ভ্যানের ওপর খুলে রাখা চটি জোড়াও সযত্নে মাটিতে নামিয়ে রাখলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভ্যান থেকে অবশেষে নামল মানসী।
মানসীর এত বাবুয়ানি দেখে আত্মজা অবাক হয়ে গেল। রোজ টিফিনে শুকনো মুড়ি খায় যে, সে ভ্যান চড়ে স্কুলে আসে কেমন করে! প্রার্থনার সময় আত্মজা মানসীর গা ঘেষে দাঁড়ায়, ফিসফিস শব্দে প্রশ্ন করে, "তুই ভ্যান চড়ার টাকা কোথায় পাস রে?"
মানসী আত্মজার প্রশ্নের কোনও উত্তর দেয়না। সে যে উত্তর দেবে না তা জানে আত্মজা। এই দু বছরে কেউ কোনোদিন মানসীর কন্ঠস্বর শোনেনি। অথচ, মানসীর প্রতিবেশী কাবেরী বলে, মানসী নাকি শুধু বাড়িতে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে। ঠোঁটে ব্যঙ্গের হাসি ফুটিয়ে আত্মজা বলে, "তোর বাবা টিফিন খাওয়ার পয়সা দেয় আর তুই সেই টাকায় ভ্যান চড়িস?
"ওটা আমার বাবা।" আত্মজাকে অবাক করে মানসী মিনমিনে গলায় বলে ওঠে।
" কী? কী বললি আর একবার বল?" মানসীর ওপরে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করে আত্মজা।
এরপর মানসী আর কোনোদিন একটাও কথা বলেনি। এটা প্রথম এটাই শেষ। পরে কাবেরীর কাছ থেকে আত্মজা জানতে পারে সত্যিই ওই রোগা, তামাটে রঙের শীর্ণ ভ্যান চালকটিই মানসীর বাবা।
ক্লাসে কোনোদিন পড়া পারেনা মানসী। দিদিমণির কোনো প্রশ্নের উত্তরে সে কখনো এতটুকুও ঠোঁট ফাঁক করেনা, শুধু ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে থাকে দিদিমণির মুখের দিকে। ইংরেজির দিদিমণি হঠাৎ একদিন মানসীর কাছে এসে চোখ পাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, "এই তোর বই কই?" মানসী যথারীতি দিদিমণির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। উত্তর পাওয়ার আসা নেই বুঝে আত্মজার দিকে আঙুল তুলে আদেশ দেন, " তুই ওর ব্যাগটা খোল।"
আত্মজা মানসীর ব্যাগ হাতরে ইংরেজি বইয়ের কোনো হদিশ পেল না। দিদিমণি ক্লাস ত্যাগ করলে আত্মজা নিজের বইটা মানসীকে দিয়ে বলে," পোয়েমগুলো টুকে নিয়ে কাল আমাকে বইটা ফিরত দিস।"
পরদিন মানসী আত্মজাকে বইটা ফিরিয়ে দিলে আত্মজা জিজ্ঞেস করে, " কই কোথায় টুকেছিস দেখি?" মানসী যেন শুনতেই পায়নি এমনভাবে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকে।
টিফিনে রোজ মানসীকে শুকনো মুড়ি খেতে দেখে একদিন আত্মজা অতিরিক্ত এক ঠোঙা চানামটর কিনে এনে মানসীর সামনে রাখে। মানসী ঠোঙার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে সামান্য একটু তুলে নিয়ে বাকিটা ঠেলে সরিয়ে দেয় আত্মজার দিকে। এবার আত্মজা মানসীর দিকে ফ্যালফ্যালিয়ে তাকায়।
ক্রমশ ফাইনাল পরীক্ষার দিন এগিয়ে আসে এবং একমাস পর তার রেজাল্টও। মানসী সব বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে।
নতুন ক্লাসে উঠে আত্মজা মানসীকে ভুলে গেল। মানসী আর বোধ হয় ভ্যানে চড়ে আসে না।
তারপর কেটে গেছে ছ'টা বছর। ইতিমধ্যে আত্মজা পুরনো স্কুল ত্যাগ করে নতুন কো-এডুকেশনাল স্কুলে ভর্তি হয়েছে। স্কুলের শিক্ষকরা আত্মজাকে বেশ পছন্দ করে। যে আত্মজা কোনোদিন 'এ' সেকসনে পড়ার সুযোগ পায়নি সেই আত্মজা ক্লাসের প্রথম পাঁচ জনের একজন হয়ে ওঠে। একাধিক বন্ধু- বান্ধব নিয়ে নতুন জীবনে বুঁদ হয়ে যায় আত্মজা।
এবার স্কুল ফাইনালও শেষ। রেজাল্ট হাতে পেয়ে আত্মজা হঠাৎ ধার্মিক হয়ে গেল। কলকাতার একটা ভালো কলেজে তাকে ভর্তি হতেই হবে। এখন ঈশ্বরই অন্তিম ভরসা। সুতরাং, মোমবাতি,ধূপ,দেশলাই আর কিছু খুচরো টাকা নিয়ে নিয়ম করে আত্মজা মন্দিরে যাওয়া শুরু করলো। অঙ্কের দিদিমণি বলেন," ধন্বন্তরি কালীবাড়ির মা খুব জাগ্রত।"
শণি- মঙ্গলবার সন্ধ্যারতি দেখার জন্য মূল মন্দির এমনকি বিশাল আয়তকার দালান চত্ত্বরে মানুষের ঢল উপচে পড়ে। মঙ্গলবার আত্মজার জন্মবার। ওইদিন মা কালীর সামনে উপস্থিত হওয়াটা তার জন্য বাধ্যতামূলক। মায়ের আরতি শুরু হয়েছে। তীব্র কাঁসর ঘন্টার তালে তালে অসংখ্য মানুষ হাত তালি দিচ্ছে আর ঘাড় দোলাচ্ছে। কেউ কেউ হাত জড়ো করে একদৃষ্টে কালী মূর্তির আরতি দেখছে। কোনো কোনো ভক্তের চোখে জল। এত ভিড় ঠেলে সামনে যেতে ইচ্ছে হল না আত্মজার। সে দূর থেকে 'তবু তো এসেছি' ভাব দেখিয়ে মন্দিরের দালান সংলগ্ন সাদা রঙের ছোট্ট শিব মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালো। ট্র্যাক স্যুটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে খুচরো এক টাকার একটি কয়েন বার করলো। টাকাটা আত্মজা শিব লিঙ্গের দিকে ছুঁড়ে দিতে যাচ্ছে এমন সময় সে দেখল শিব মন্দিরের বারান্দায় বসে আছে মানসী।
মানসীর পরনে লম্বা একটি কামিজ। পুরোপুরি উলঙ্গ তার পা দু'খানি। মাথা ভর্তি উস্কোখুস্কো ছোট ছোট চুলে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ধূলো ময়লা। হাঁটু দু'টো কষ্ট করে ভাঁজ করা, তার ওপর হাতের চেটো রেখে ফ্যালফ্যাল করে মানসী তাকিয়ে রয়েছে ভিড়ের দিকে।
আত্মজা মুঠোর মধ্যে একটাকার কয়েনটা শক্ত করে চেপে ধরলো। কয়েনের কাণার ধারে হাতের তালুতে ব্যাথার উদ্রেক হতেই আত্মজার সম্বিত ফিরলো। স্বপ্ন নয়, এ দৃশ্যের সবটা কঠিন বাস্তব। "মানসী?" অস্ফুটে নিজের অজান্তেই আত্মজার মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো। মানসী মুখ তুলে আত্মজার চোখে চোখ রাখলো। মানসীর সেই চোখের প্রতিবিম্বে আত্মজা একটা হাত দেখতে পেল কি! ঠিক বুঝলো না সে।
আত্মজা কী করবে স্থীর করতে পারছে না। তার চোখ পরলো একটু দূরে ধন্বন্তরির নামে ওষুধ বিতরনের ঘরের সামনে একজন মাঝ বয়সী পুরোহিত ধবধবে সাদা ধূতি পরে বসে আছে। এক হাতে বুকের কাছের পৈতেটা টেনে ধরে আর এক হাতে আঙুলের ফাঁকে গুজে রাখা বিড়িতে ঘনঘন টান দিচ্ছে।
আত্মজার তখনো সন্দেহ মুক্ত নয়। মেয়েটি আদৌ মানসী কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য ঝুঁকে "এ মানসী?" বলে ডাক দিতেই পুরোহিতটি হাতের জ্বলন্ত বিড়ি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মারমুখী হয়ে মানসীর দিকে তেড়ে এসে বলল, " এই যা ভাগ এখান থেকে। যা পালা। ওঠ ওঠ যা বলছি।"

উঠে দাঁড়ালো মানসী। ধীরে সুস্থে মন্দিরের পৈঠা বেয়ে নিচে নামল সে। পরিস্কার আলোয় আত্মজা দেখতে পেল শুকিয়ে যাওয়া মানসীর শরীরে একটি গোলাকার ভারি তলপেট। বাকরুদ্ধ, নিশ্চল আত্মজা যেন মানসীর তলপেট নয়, দেখতে পেল একটা গোটা পৃথিবী। যেখানে এক আকাশ মিটমিটে তারা পাহারা দিচ্ছে পৃথিবীর ওপর ঝুলে থাকা চকচকে চাঁদটিকে। যেখানে শরতের মেঘে এই মাত্র এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। লাল থোকা থোকা রঙ্গন ফুল থেকে স্বচ্ছ জল গড়িয়ে পড়ছে সবুজ পাতায়। এই গ্রহের যা কিছু ভালো সব রয়েছে মানসীর ওই তলপেটের ভিতর। আর যা কিছু খারাপ তা হিংস্র হায়নার নখের মতো ধারালো, নোংরা, বিষাক্ত পুরুষাঙ্গ উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মানসীর তলপেটটার খুব কাছে।
ধীরে ধীরে মন্দিরের পিছনে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল মানসী।
তিরিশ বছর কেটে গেছে। মানসী কি আত্মজাকে ক্ষমা করতে পেরেছে?
ঘোর কাটলো আত্মজার। মাথা তুলে সোজা হয়ে বসল সে। আত্মজার মনে হলো যেন সামনে রাখা ডেস্ক ক্যালেন্ডারটা বাঁকা হেসে ঘৃনায় মুখ ফেরালো।

আত্মজা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। কিছুক্ষন পায়চারি করার পর আবার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল সে। নোটবুকটা খুলে সুভাষের ঠিকানা লেখা পাতাটা ছিঁড়ে পার্সে ঢোকালো আত্মজা। ড্রয়ার খুলে গাড়ির চাবিটা তুলে নিয়ে হাতঘড়িতে দেখলো, আটটা। দেরী হয়ে গেছে। তবে এমন কিছুই রাত হয়নি।
এখনো সময় আছে।