দেবী

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

নমো দেব্যৈ মহাদেব্যৈ শিবায়ৈ সততং নমঃ নমঃ প্রকৃত্যৈ ভদ্রায়ৈ...

পোড়ো মন্দিরের ভেতর থেকে সকাল সন্ধ্যেয় একটি মেয়ের গলায় স্তোত্রপাঠের সুর ভেসে আসে।
এই গ্রামটি এক প্রত্যন্ত মাও উপদ্রুত অঞ্চল নামে একসময় খুব খবরের কাগজের শিরোনামে থাকত। গ্রামের নাম জঙ্গলপাড়া। কালো মেয়েটির নাম দেবী। জংগলের এক ডাকাত কালীর পুজো করতে করতে সে নিজেই আজ মানবী থেকে দেবী। তার না আছে কোনও বংশ পরিচয় না আছে পরিবার। সে জানেনা নিজের জাতপাত। শেখেনি পড়াশুনো। শুধু মন্দিরের পুরোহিতের মুখ থেকে শুনে শুনে ঈশ্বর বন্দনা করে নিজের মনে। সে যে কেমন করে এই গ্রামে এসে পড়েছিল তা সে নিজেও জানেনা । শুধু মনে আছে ছোটবেলায় এক পরিবার তাকে কন্যাস্নেহে লালন করেছিল । এই গ্রামেই তার বড় হওয়া। তারপর পালিত বাবা, মা মারা গেছে অরণ্যের অধিকার নিয়ে লড়াই করতে করতে। জীবনের স্তরগুলো একে একে পেরিয়ে এখন সে উদ্ভিনযৌবনা। তবে জীবনের সাথে লড়াই করার শিক্ষা সে পেয়েছে জন্মাবাধি। তাই সে খুব দাপুটে আর ডাকাবুকো।

অরণ্যে একদিন ভিন গাঁও থেকে আসা একদল যুবকের চোখে পড়েছিল দেবী। পাঁচযুবকের এই দলটির নাম দঙ্গল । ভুলিয়ে ভালিয়ে তারা তাকে নিয়ে গেছিল জঙ্গলের মধ্যে। স্পর্শ করেনি কেউ তার গা। শুধু বলেছিল
- আমাদের সঙ্গে পথ চলবি তুই? যাবি আমাদের সঙ্গে? কি রে যাবি তো?
দেবী বলেছিল
- যেতে পারি কিন্তু তাতে আমার লাভ? তোমরা আমায় কি দেবে? সুরক্ষা? শান্তি নাকি আমাকে কেজো গৃহস্থী করে বন্দী করে রেখে দেবে ?
সুঠাম, সুদর্শণ পুরুষের দল বলেছিল
- গেলে লাভই হবে তোর। আগে চল্‌ তো আমাদের ডেরায়। তারপর ভালো না লাগলে আবার না হয় ফিরে আসবি । তুই তো একাই বড় হয়েছিস। তোর সংসার বলতে কিছুই নেই । আর এ জায়গাও তেমন নিরাপদ নয়। তার ওপর তুই যেমন ডাগরডোগর। শয়তানের চোখ এড়িয়ে বাঁচতে পারবি?
দেবীর মনে সন্দেহ যে হলনা তা নয়। সে দুবার ভাবলে। তারপরেই মনে হল যে পুরুষের দল তাকে একা পেয়েও তার গা ছুঁয়ে দেখেনি তারা মহানুভব। এই ধর্ষণের বাজারে এতগুলো বলবান পুরুষ এখনো অবধি তাদের একফোঁটা ক্ষমতাও প্রদর্শন করেনি অতএব তাদের সাথে যাওয়া যেতেই পারে। দেবী চলল দঙ্গলের সাথে। সেই দঙ্গলের দলে ভদ্র পুরুষ পাঁচজন।
পথে যেতে যেতে দেবী পরীক্ষা করতে লাগল সেই পাঁচপুরুষকে। এই পাঁচ সুদর্শন, সুঠাম, পেশীবহুল পুরুষের নাম জিষ্ণু, ভিখু , অর্চি, নীল আর সবুজ।
কিছুদূর হেঁটেই তেষ্টা পেল। সেখানে গাছপালা, নদীনালা কিছুই নেই । ধূ ধূ দিগন্তে শুধুই রুক্ষ শুষ্ক মাটি । একফোঁটা জল নেই কোথাও।
দেবী বলল, জলতেষ্টা না মিটলে সে আর পথ চলতে পারবেনা। দঙ্গুলে ছেলের দলের ভীখু তার ভিস্তি কাঁধে ঝুলিয়ে জলের খোঁজে গেল। কিছুপরে জল নিয়ে ফিরে দেবীর তেষ্টা মেটাল । আবার পথ চলা । বহুক্ষণ চলার পর কাঁটাগাছের ঝোপে দেবীর পা কেটে রক্তারক্তি। এবার জিষ্ণু কি একটা বুনোগাছের পাতা এনে সেই রস থেঁতলে ক্ষতের ওপর লাগাতেই দেবীর খুব আরাম হল। হাসিঠাট্টা, হৈ হৈ মস্করা সবকিছু পাথেয় করে এগিয়ে চলল তারা। এবার দেবী ক্ষুধার্ত ।
সেই স্থানটি গহিন অরণ্য। হারানো একফালি তন্বী নদী সেখানে তিরতির করে বয়ে চলেছে । কিছুদূর গিয়েই নদীর শুকনো বালির চর। দূরে কিছু ফলের গাছ । অর্চি গাছে উঠে ফল পেড়ে কোঁচড় ভরে সেই ফল এনে দেবীকে দিল। দেবী মুগ্ধ হল অর্চির আপ্যায়নে। ফলমূল খেয়ে দেয়ে এবার ওরা ছায়ায় বিশ্রাম । পথশ্রমে ক্লান্ত দেবী ঘুম ভাঙতে উঠে দেখে বহুদিনের অনভ্যাসে তার পা ফুলে গেছে। সে হাঁটবে কি করে? যুবকেরা বলল, ঠিক আছে দেবীর পায়ের আরাম হলে তবেই তারা আবার রওনা দেবে। ততক্ষণ নাহয় অপেক্ষাই করবে তারা। তাড়ার তো কিছু নেই। নীল মহা উত্সাহে আকন্দগাছের পাতা এনে দিলে সবুজ শুকনো কাঠকুটো জ্বেলে বালির চরেই সেই পাতার সেঁক দিল দেবীর পায়ে।
দেবীর জন্য এই পাঁচ যুবক সবকিছু করতে প্রস্তুত। শুধু দেবীকে তাদের পাশে চাই ।
দেবী ভাবে পড়শীদের মুখে শুনেছে সে। যৌবনে নারী আর পুরুষ ঘি আর আগুণ। একসাথে থাকা নৈব চ । যৌবনের উত্তাপে উত্তাল ধর্মের অনুশাসন ।
জীষ্ণু, ভীখু, অর্চি, নীল আর সবুজের প্রতি সে এক অদ্ভূত আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করেছে । এরা প্রত্যেকেই যথার্থ পুরুষ । বিপদে এগিয়ে এসেছে। প্রাণ দিয়ে সেবা শুশ্রূষা করেছে। তবে সে কি করে ভুলে যাবে এদের সহমর্মিতা, বন্ধুত্ব? এরাই তো প্রকৃত বন্ধু তার। ভাবতে ভাবতে ঘুম এসে জুড়োয় তার শরীর জ্বালা। পরদিন ভোর হতেই সে ঠিক করে এদের সঙ্গেই থাকবে সে। দেবী আপাতত আপ্লুত এই দঙ্গলের সাথে পথ চলায় । কিন্তু এই পাঁচ জনের প্রত্যেকেই তো দেবীর দিকে ভালবাসার হাত বাড়িয়েছে। এবার?
দেবীর বুকের ভেতরে পাঁচটি প্রকোষ্ঠে এদের জন্য পৃথক পৃথক ভালবাসার একটা নরম জায়গা তৈরী হয়েছে। পাঁচজনেই বন্ধুসম, প্রেমিক সম। কিন্তু যদি সত্যি এদের সঙ্গে ভবিষ্যতে থাকতে হয় তবে স্বামীর অধিকার কার ওপরে ফলাবে সে? কাকে দেবে ওর কৌমার্য? সে তো তবে হয়ে যাবে বহু ভোগ্যা।
দেবী শুধুই একজনের হলে বাকী চারজন যে দুঃখ পাবে।

এইসব ভাবছিল দেবী। হঠাত অরণ্যে একদল মানুষ এসে তার সমস্ত চিন্তা লন্ডভন্ড করে দিল। কুখ্যাত ডাকাতদল তারা । নাম তাণ্ডব। তাণ্ডবের দল বহুদিন ধরে খুঁজছিল ঐ পাঁচ যুবকের দলকে। দেবীর কাছে এসে তাণ্ডব দলের প্রধান জানতে চাইল তাদের কথা। দেবীর উভয়সংকট। একদিকে সেই পাঁচযুবকের সহমর্মিতা ও বন্ধুতার ভালোলাগায় সে আপ্লুত তখন। তাদের যেমন করেই হোক সে বাঁচাবে তান্ডবদের হাত থেকে।
তান্ডব প্রধানকে দেবী জানালো, তাদের দলের মধ্যমণি স্বয়ং আমি। আমার নাম দেবী।
বিশালাকায় ডাকাত সর্দার বলল, তোমার পরিচয় কি? দর্পের সাথে দেবী বলল, আমি মেয়ে, সেটাই আমার একমাত্র পরিচয়।
তান্ডবদল সেই শুনে আরো রেগে গিয়ে অরণ্য লন্ডভন্ড করে দেবীর সামনে এসে বলল,
- কোথায় সেই পাঁচ যুবক? আজ এই অরণ্যে দাবানল জ্বলবে। আমাদের অরণ্যে আর কারো কোনও অধিকার নেই । এই অরণ্যের প্রত্যেকটা সবুজ আর সজীব আমাদের। কেউ এখানকার একটা গাছ, জীবজন্তু, পাখী এমনকি পোকামাকড়েও হাত ছোঁয়াবে না। আমাদের অঙ্গুলি হেলনে এই অরণ্যের একটি পাতাও নড়েনা একটা সামান্য মেয়েতো কোন ছার! বেশী নারীত্ব দেখালে সব লণ্ডভণ্ড করে দেব।
তান্ডবদের সামনে দেবী বাবলাগাছের কাঁটা দিয়ে নিজের বুকের বিভাজিকায় আঁচড় কেটে বলল, এই দ্যাখো নারীর রক্ত আমার শরীরে। আমার নাম দেবী। এ অরণ্য আমার অধীনে। আমায় একদিন রক্ষা করেছে ঐ পাঁচ যুবক। তাই যতক্ষণ আমার শরীরে এই রক্ত বহমান ততক্ষণ তাদের কোনো ক্ষতি হতে দেবনা। এবার দেখি তোমরা তাদের কি ক্ষতি করো?
- মেয়েমানুষ নিজের বুক চিরে রক্ত বের করে দাপট দেখায়? অরণ্য বুকে করে আগলে রাখা একা মেয়ে মানুষ, এমন অভয়া মহিয়সী নারী তারা স্বচক্ষে কখনো দেখেনি। তান্ডবপ্রধান দেবীর পায়ে পড়ে তখন ক্ষমা চাইছে এমন সময় সেই পাঁচযুবকের অগ্রজ জীষ্ণু সেখানে হাজির। দেবীকে ছুঁয়ে এই মানুষটি কি বলছে জানার আগ্রহে সামনে এসে দাঁড়াল সে। তান্ডবেরা চুপচাপ প্রস্থান করলে দঙ্গলের বাকী চার যুবকের সামনে জীষ্ণু জানাল দেবীকে তারা আর সঙ্গে নেবেনা। কারণ তারা যেমন করেই হোক বুঝেছে যে, দেবীর সঙ্গে নিশ্চয়ই তান্ডবদের যোগসাজস আছে। মাও অধ্যুষিত প্রত্যন্তগ্রামের বাসিন্দা দেবী। কে জানে সে হয়ত মাওবাদীদের চর? সে হয়ত তাণ্ডবদের সর্দারনী। গোপন করেছে সেসব তাদের কাছে। তান্ডবরা হয়ত এই পাঁচযুবককে তাদের দলে টানবে বলেই এসেছিল সেখানে। আর এ ঘটনায় নিশ্চয় দেবীর হাত রয়েছে। নয়ত অজানা, অচেনা একপাল যুবকের সঙ্গে একা একজন মেয়ে কি করে পথ চলতে চায়? দেবী ঐ জন্যেই নির্বিবাদে তাদের সঙ্গে যেতে রাজী হয়েছে। নিশ্চয়‌ই তার কোনো উদ্দেশ্য ছিল।
প্রকাণ্ড এক মনসাগাছের দিকে চেয়ে, দুটো হাত জোড় করে, চোখ বুঁজে দেবী তখন বলে চলেছে,
"হে ঈশ্বর আমার ওদের সঙ্গে ঘর বাঁধা হল না যে । অনেকদিন বাদে আমার জীবনে একফোঁটা সুখ এসেই আমাকে ছেড়ে চলে গেল । আমি এখন ওদের সঙ্গ, বন্ধুতার কাঙালিনী। ওরা আমাকে অবিশ্বাস করল? তুমি আমায় শক্তি দাও। আমি যেন এই পাঁচ যুবককে চিরদিনের মত ভুলে যেতে পারি। এই নিবিড় অরণ্যে একলা এসেছি আমি, একলা যাব ফিরে। "
সেই থেকেই অরণ্যের সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছে দেবী। আগলে রেখেছে এই অরণ্যকে। অরণ্যের প্রতিটি ডালপালা, ফল ফুল, কীট পতঙ্গ, পাখপাখালী সবকিছুর সংরক্ষণের অধিকার দেবীর। মানুষ আর নয়। এরাই দেবীর পরিবার, এরাই দেবীর আপনার জন। এরাই দেবীর অতিথি। নিজের ইহকাল, পরকাল সব দিয়েছে দেবী এদের ভালবেসে। আর যাই হোক অবিশ্বাস করবেনা এরা ।
পোড়ো মন্দিরের ভেতর থেকে আবারো ভেসে আসে দেবীর মন্ত্রোচ্চারণ...

নমো দেব্যৈ মহাদেব্যৈ শিবায়ৈ সততং নমঃ নমঃ...