আগুনপাখি

ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়

সে ছিল এক আগুনপাখি। সোনালি ডানায় আগুন ছড়াতে ছড়াতে এক আকাশ থেকে আর এক আকাশে উড়ে বেড়াত। কখনও সে আগুনে আলোয় আলো হত রাতের আকাশ। কখনো তার স্ফুলিঙ্গ থেকে ছড়াত আগুন, ছারখার হত শান্তিকল্যাণ। আসলে সে ছিল এক আগুনে মেয়ে।
মেয়েটা আগুন বড় ভালোবাসতো। তার নিঃশ্বাসে আগুনের হলকা, চোখের দৃষ্টিতে আগুনে বিভা। কে জানে কোনো নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে ধেয়ে আসা আগুনের ফুলকি জন্মমুহূর্তে তার নাভিকুণ্ডলীতে মিশে গিয়েছিল কিনা, ছোটো থেকেই আগুন বড় টানত তাকে। আগুন হতে চাইত সে চিরকাল। আগুন খেতে, আগুনের বিছানায় ঘুমোতে, আগুন গায়ে মাখতে ইচ্ছে করত তার। লেখাপড়া, ঘরের কাজ ছেড়ে সে মায়ের ঘুঁটে-কয়লার উনুনের ধারে বসে থাকত। দেখত, আগুনের দাউদাউ হলুদ শিখা কেমন করে ধকধকে নীল হয়ে ওঠে। সেই নীলচে আগুন চোখে কাজল করে পড়তে সাধ জাগত তার।
আগুনের সেই নীল রঙও বড় প্রিয় ছিল সেই মেয়ের। আষাঢ়ের নীল মেঘে, জল নয়, আগুন দেখত সে। মেঘের ভিতরেও তো আগুন থাকে। শুধু সাধারণে তা দেখতে পায় না। টের পায় যখন বিদ্যুৎ হয়ে চলকে ওঠে, বজ্র হয়ে ফেটে পড়ে সে আগুন। মেয়েটা কিন্তু দেখতে পেত। তাই নীল রঙের মেঘের সঙ্গেও বড় ভাব ছিল তার। বিদ্যুৎ তার সখি, বজ্র তার প্রেমিক, মনে মনে এমনই ভাবত মেয়েটা। বজ্রের মত প্রেমিক বা বিদ্যুৎলতার মত সখি, কোনটাই মেলেনি তার। কজনেরই বা মনের মত সখি বা প্রেমিক জোটে! সেই নিয়ে কোনও দুঃখ বা অভিমান ছিল না তার মনে। শুধু ভাবতে ভালো লাগত, কোনও এক ঝড়ের রাতে সপ্ত-অশ্বের রথে চড়ে আসবে এক তেজোময় পুরুষ, আগুনের মত উজ্বল তার বিভা, বজ্রের মত দীপ্ত তার শরীরী বিভঙ্গ। ইহজন্মে মেটেনি সে সাধ।
নিজেকে একটা প্রজ্বলিত আগুনের শিখা ভাবতে ভালো লাগত তার। সকালের রোদ যখন জানলার ফাঁক দিয়ে আয়নায় এসে পড়ত, পড়ে ঝলকে উঠত দ্বিগুণ, সেই উজ্বল আলোয় সে নিজের ছায়া দেখত আয়নায়।
আগুন কে ভালবাসতে বাসতে সে কখন নিজেই একটা আগনের কুণ্ড হয়ে উঠেছিল, টের পায়নি নিজেই। জ্বলন্ত চুলার নীলচে আগুন ছিল তার চোখে। দৃষ্টি প্রখর। গাত্রবর্ণ উজ্বল, কেশ স্বর্ণাভ। তার রূপে আরও একটা কি যেন ছিল, যেটা ঠিক শরীরী নয়, একটা অদৃশ্য আগুনের বলয় যেন তাকে ঘিরে রাখত, কাছে এলে তার আঁচ টের পাওয়া যেত। এ রূপ সহ্য করার ক্ষমতাই বা থাকে কজনের। কাছেপিঠে তেমন কেউ তো ছিল না। যারা ছিল, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, ঈর্ষায়, ঘৃণায়, প্রতিহিংসায় কি যে করবে ভেবে উঠতে না পেরে নিজেরাই জ্বলেপুড়ে যেত।
মেয়েটা আগুন নিয়ে খেলতে চায় নি কখনও। আগুন কে সে খেলার জিনিস মনেই করে নি। তবু কি হাত পোড়েনি? আগুন নিয়ে ঘরবসত করতে চাইলে শুধু হাত কেন, হাত-পা-মাথা সবই পুড়বে। পুড়েছেও। সেই পোড়া দাগ সে যত্ন করে, ভালবেসে, উল্কির মত, মেহেদির আল্পনার মত ধারণ করেছে দেহে ও মনে।
সন্ধ্যাদীপের শিখার সঙ্গে সে মন খুলে যত কথা বলত, তেমন আর কারও সঙ্গে নয়। জ্বলন্ত ধুপের মুখে আগুনের বিন্দুটিও ছিল তার আপনজন। প্রাণীদের মধ্যে তার প্রিয় ছিল জোনাকি, কারণ তার শরীরে আগুন।
মা আদর করে বলতেন, পোড়ামুখি! শুধু মা নয়, অনেকেই বলত, তবে ঠিক আদরে নয়। আর সে ভাবত, মুখটা পোড়াবার আগে সেও যদি একটা লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দিতে পারত! একেবারে যে দেয় নি, তা হলফ করে বলা যাবে না। রামায়নে হনুমানের লঙ্কাকাণ্ডের দৃশ্যটি খুব পছন্দের ছিল তার। তারও মাঝে মাঝে ইচ্ছে হত, অমন জালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে এই সংসার!
তবে রামায়নে সীতার অগ্নিপরীক্ষার ছবিটা সে সহ্য করতে পারতো না একেবারেই। সতীদাহর কথা শুনে বিবমিষা জাগত তার। আগুন সংক্রান্ত এই একটি বিষয়ই তার না-পসন্দ ছিল।
আগুন কি শুধুই পোড়ায়? তার দাহিকা শক্তি কি শুধুই বিনাশ কারক? আগুন কে গ্রহণ করতে, ধারণ করতেও যোগ্যতা থাকা দরকার। আগুনের সাথে সহাবস্থানে আসতে পারে যে, তার হাতে আগুন পোষ মানে, বশ হয়। সভ্যতার মূলেই তো এই আগুনকে বশ করার কাহিনি। মেয়েটিও চেয়েছিল এমন কাউকে, যার বশ হতে মন চায়। কিন্তু বেচারি সেরকম কাউকে পায়নি জীবনে। ফলে তার ভিতরের উদ্দাম আগুন কোন সংহত রূপ পেল না। পেলে, বলা কি যায়, সেও হয়ত একজন ক্লিওপাত্রা, মাদাম কুরি, রানি লক্ষ্মীবাই বা সিমন দ্য বোভোয়ার হতে পারতো! ফল্গু ধারার মত জল আনতে পারত উষর মরুভূমিতে, কিম্বা, অমারাত্রি আলোকিত করতে পারত! কিন্তু সেসব কিছুই হল না। সে একটা দাবানল হয়ে, অগ্নুৎপাত হয়ে ফেটে পড়লো, ছড়িয়ে পড়ল সারাজীবন।
তবে আগুন কিন্তু তাকে চিরকাল ভালবেসেছে একনিষ্ঠ প্রেমিকের মত। আগুনই তাকে ঠিক চিনেছিল, আর কেউ নয়। এমনকি সে নিজেও কখনও কখনও নিভে যেতে চেয়েছে, ফুরিয়ে যেতে চেয়েছে, আগুনই তাকে ফিরিয়ে এনেছে বারবার, খাদের কিনার থেকে। আগুন ছাড়া আর কেউ কখনও ভালোই বাসল না তাকে।
সেই আগুনই তাকে আশ্রয় দিয়েছিল শেষ পর্যন্ত। সারাটা জীবন ধরে আগুনে রূপকথা লেখার পর সে যখন শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে ঢলে পড়ল শেষবারের মত, তখন, আগুনই কোল দিয়েছিল তাকে। আগুনের লেলিহান শিখা তাকে আদর করতে করতে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে বিনা আগুনে সে যতটা পুড়েছিল, চিতার আগুন তাকে ততটা পোড়াতে পারেনি।
সে যে আসলে কেমন ছিল, আগুনই তা জেনেছিল ঠিকঠাক। সেই আগুনে মেয়ের দেহাবশেষ, একমুঠো ছাই, নীলচে রঙ! আসলে যা অগ্নিগর্ভ! সে ছাই ভাসিয়ে দেওয়া হল নদীতে। যতদূর ভেসে গেল, ছড়াতে ছড়াতে গেল অগ্নিবীজ। সেই বীজ থেকে জন্ম নিয়েছে এমনতর অনেক আগুনে মেয়ে। যদিও তাদের আলাদা করে চেনার উপায় নেই।
তবু যদি কোনও মেয়ের চোখে দেখ আগুনে প্রত্যয়, যদি দেখ কোনও মেয়ে লক্ষ্যে স্থির, ঘাড় সোজা, চোখেমুখে আগুনের আঁচ, পুজোর মণ্ডপে যদি দেখ কোনও মেয়ে একদৃষ্টে চেয়ে আছে পঞ্চপ্রদীপের আগুনের দিকে, একাগ্র, তন্ময়, জানবে এরা সেই আগুনপিয়াসী মেয়ে। আগুনপাখি। অগ্নিবীজ থেকে জন্ম। ডানায় লুকনো গোপন আগুন। এদের মৃত্যু নেই। জ্বলে ওঠা আছে। আর আছে অগ্নিবীজ ছড়িয়ে দেওয়া মর পৃথিবীর বুকে। অগ্নিযুগের সূচনা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।