তর্পণ

মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য

অনভ্যস্ত ধুতিতে দেবমাল্য হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে আছে। তার আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সার সার মানুষ। সকলে প্রায়শ্চিত্ত করার উদ্দেশ্যে এসেছে তার মতো। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র চণ্ডীপাঠ শুরু করার অনেক আগে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে করলা নদীর ঘাটে এসেছে দেবমাল্য। সঙ্গে এসেছে স্ত্রী আর পুত্র। কাকভোরে এই নদীর তীরে আসার পেছনে এই মানুষগুলোর সামাজিক দায় আছে নিশ্চয়ই। তবে দেবমাল্যর ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। তার ক্ষেত্রে সামাজিক দায়ের চাইতে বড় হয়ে উঠেছে অন্তরের তাগিদ।

বর্ষা বিদায় নিয়েছে। করলা নদীর জল এখানে হাঁটু ছুঁই ছুঁই। সেই হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে পুরুতমশাই অনেকক্ষণ ধরে শুদ্ধ-অশুদ্ধ উচ্চারণ করে চলেছেন। সে মন্ত্রের কিছু তার কানে আসছে, কিছু আসছে না। কাল রাতে ঈষৎ কৌতূহলবশত পুরোহিত দর্পণটা একবার উলটে দেখেছে দেবমাল্য। শাস্ত্রকারদের পান্ডিত্য অবাক করেছে তাকে। তাঁদের জ্ঞানের গভীরতা, তাঁদের কল্পনাশক্তি বিস্মিত করার মতো। একটু বড় হওয়ার পর ক্রিশ্চানদের অল সোলস ডে কিংবা সূক্ষ্ম শরীরের কথা শুনেছিল সে। এই বই যেন সে কথাই বলে।

পিতৃলোক থেকে পিতৃপুরুষেরা নেমে আসেন পুত্র বা পৌত্রের হাত থেকে শান্তিবারিটুকু গ্রহণ করবেন বলে। ঘোর অমাবস্যা তিথিতে প্রকৃতির এ এক মহালীলা। এই দিনে নাকি পূর্বপুরুষেরা প্রেতলোক থেকে মর্ত্যলোকে নেমে আসেন। যুগ যুগ ধরে চলে আসা একটা রীতি, এত এত বছরের পরম্পরাকে এভাবে উদ্‌যাপন করা হচ্ছে এই বিশেষ ক্ষণে শুধু সেই কারণেই মহালয়ার ভোর বোধ হয় ভিন্ন মাত্রা পায়।

অলৌকিক লাগছে এই আশ্চর্য প্রত্যুষ। অন্ধকার পুব আকাশে লালচে রং ধরতে শুরু করেছে। দেবমাল্যর গায়ে কাঁটা দিচ্ছে একটু একটু। অবিশ্বাস্য লাগছে ভাবতে। বাবা কি সত্যিই প্রেতলোক থেকে নেমে আসবে তার কাছে? সে-ও কি সম্ভব? আর মা? মা-ও কি নেমে আসবে বাবার সঙ্গে সঙ্গে? তার সামনে এসে দু’জনে হাত পেতে বলবে আমাদের একটু জল দে। একটু তিল দে। তৃপ্ত কর আমাদের। আমরা তৃপ্ত হলে তোরাও তৃপ্ত হবি। তোরা তৃপ্ত হলে উত্তর-প্রজন্মও সামনে পথ পথ চলার একটা দিশা খুঁজে পাবে। আসলে কী জানিস, এ হল একটা ক্রমবিকাশ। কেউ কারও জীবনকে গ্রাস করে নেয় না। সবাইকে সমাজে একটা শৃঙ্খলার অনুশাসন পার করে তবেই আপন আপন স্বাধীনতার ভূখণ্ডে এসে দাঁড়াতে হয়।

বাবার মুখটা মনে করার চেষ্টা করছিল দেবমাল্য। বাবার কম বয়সের রৃদ্র মূর্তির চেহারাটাই মনে পড়ছে বারবার। রোগব্যাধি জীর্ণ করার আগের বাবার সেই দীপ্ত চেহারাটা ঘাই মারছে মনের মধ্যে। ডুয়ার্সের একটা চা বাগানের বড়বাবু ছিলেন বাবা। ছ’ফিট লম্বা, গৌরবর্ণ, মিলিটারি মেজাজের মানুষ। গমগমে গলার স্বর। পান থেকে চুন খসলেই রাগে গনগনে হয়ে যেত মুখটা। পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ হলে দেবমাল্য বাড়ি ফিরতে ভয় পেত স্কুল থেকে। বাবা কাঠের স্কেল দিয়ে মেরে দাগ ফেলে দিত পিঠে। মা আটকাবার চেষ্টা করেও পারত না। একটা কথা বারবার বলত বাবা। স্পেয়ার দ্য রড স্পয়েল দ্য চাইল্ড। লাঠ্যৌষধি। যে কোনও রোগে লাঠিই হল একমাত্র ওষুধ। না হলে ছেলে মানুষ হয় না। লোকটার শরীরে আদৌ দয়া মায়া ছিল কি? জানে না দেবমাল্য।

ওই অবস্থায় যা হয় দেবমাল্য মায়ের আড়াল খুঁজত। সেই কিশোর বয়সের চাপা অভিমান, রাগ আর কান্নাগুলো বুঝত একমাত্র মা। বুঝত দেবমাল্য আসলে কী চায়। এই ভয়াবহ পিতৃতান্ত্রিকতা, এই দমবন্ধ করে দেওয়া অধিকারবোধ যা ইট চাপা দেওয়া ঘাসের মতো দাবিয়ে রাখে মানুষকে তার বিরুদ্ধেই ছিল তার মৌন দ্রোহ। সেই সব মুহূর্তে মা দেবমাল্যর মাথার চুল ঘেঁটে দিয়ে বলত, তোর বাবার ওপরটাই ওরকম, শক্ত নারকোলের মতো। ভেতরটা একেবারে নরম। বিশ্বাস কর, আমার থেকেও কোমল তোর বাবার মন। এখন তুই রেগে আছিস বলে বুঝতে পারছিস না। যখন তুই নিজে বাবা হবি তখন বুঝতে পারবি মানুষটাকে।

এভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেল কয়েকটা বছর। দেবমাল্য মফস্‌সল শহরের স্কুল থেকে বেরিয়ে কলকাতায় গেল পড়তে। প্রথমে কলেজ। তারপর ইউনিভার্সিটি। স্বচ্ছল মেজোমাসির বাড়িতে থেকে পড়া। ততদিনে বাবা অবসর নিয়েছে চা বাগানের চাকরি থেকে। ঠাঁই নিয়েছে জলপাইগুড়ির বোসপাড়ার শরিকি বাড়িতে। বাবা সপরিবারে উড়ে এসে জুড়ে বসায় খুশি হতে পারেনি কেউ। দুটো ঘর হঠাৎ করে ছেড়ে দিতে হয়েছে কাকা জ্যাঠাদের। তাদের মুখ গোমড়া হয়েছে সে কারণে।

সে বছরই দেবমাল্য চাকরি পেয়ে গেল একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে। দু’বছরের মধ্যে দমদম মতিঝিলে টু বিএইচকে ফ্ল্যাট। তার পরের বছর রুকমার সঙ্গে বিয়ে। জলপাইগুড়ি ফিরতে বছরে একবার, পুজোর সময়। এসে দেখত বাবা কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। বয়স বাড়ছে, মুখের চামড়া ঝুলে পড়েছে, চুল সাদা হয়ে গেছে, ভুরুও পাকা। সব সময় বাবা কিছুটা উদাস উদাস থাকে। চা বাগান থেকে একটা চা গাছকে যেন শিকড় ছিঁড়ে তুলে এনে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্য কোথাও।
পরিতৃপ্ত দেবমাল্যর মনে হত শোধ নেওয়ার পালা এবার বুঝি শুরু হল। মুখের কথার দরকার হয় না। শরীরী ভাষাতেও দ্বৈরথ চালানো যায়। মা বুঝত সেটা। বলত, মানুষটাকে এমন আঘাত করে কথা বলিস কেন। দেবমাল্যর চোখ জ্বলত ছাইচাপা আগুনের মতো। মা-কে থামিয়ে দিয়ে হিসহিসে স্বরে বলত, জেনে রেখো মা, পৃথিবীর কোনও পিতাপুত্রই এক মেরুতে দাঁড়িয়ে একে অন্যের সঙ্গে হাত মেলাতে পারে না। সময়ের নিয়মেই আলাদা হয়ে যেতে হয়। তুমি ঠিক করে নাও তুমি কোন শিবিরে? মা হাঁ করে তাকিয়ে থাকত দেবমাল্যর দিকে। বুজে যাওয়া গলায় বলত, কী বকছিস পাগলের মতো!

পুরোনো ফ্ল্যাটটা বেচে হাউজ বিল্ডিং লোন নিয়ে নিউটাউনে নতুন একটা বড়সড় ফ্ল্যাট কিনেছিল দেবমাল্য। তারপর বিটু এল রুকমার কোল আলো করে। ততদিনে একটা চকচকে গাড়ি কিনে ফেলেছে দেবমাল্য। ক্লাব, লেটনাইট পার্টি, ঝাঁ চকচকে জীবনের আরামে তখন ডুবে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। জলপাইগুড়ির সঙ্গে আর যোগাযোগ নেই কোনও। ঠিক তখনই এল ঝটকাটা।

রাজনীতি বড় বিষম বস্তু। তার ঘটনাপ্রবাহ যে কোন নিয়মে ঘটে সেটা দেবতাও জানতে পারে না, মানুষ তো দূরের কথা। যুযুধান দুই রাজনৈতিক দলের দাবা খেলার আঁচ এসে পড়ল দেবমাল্যদের অফিসেও। আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠল তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে। বসল এনকোয়ারি কমিটি। দু’মাসের মাথায় তদন্ত কমিশন স্যাক করল দেবমাল্যসহ কয়েকজনকে। রুকমা বিটুকে নিয়ে দেবমাল্য তখন একেবারে ফুটপাথে। স্ত্রী-পুত্রের হাত ধরে শুকরো মুখে বেচারি ফিরে এসেছিল জলপাইগুড়ির বাড়িতে।

জয় পরাজয়ের সংজ্ঞা যে কী সেটা কে বলবে! সে হিসেব বোঝা দুস্কর। পুরনো শহর থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাওয়া যদি জয় হয় তবে মাথা নিচু করে বউ বাচ্চার হাত ধরে ভিটেমাটিতে ফিরে আসা তাহলে কী! হ্যাঁ পরাজয়, চূড়ান্ত পরাজয়। কিন্তু তার থেকেও বেশি যন্ত্রণার যখন দেবমাল্য এসে দেখলো বাবা-মায়ের দুটো ফটো ঝুলছে সাদা দেওয়ালে। দু’জনেই চলে গেছে পরপারে। নিজেদের অসুখের বিবর্ণ খবরাখবর দিয়ে তারা চায়নি দেবমাল্যকে বিরক্ত ও বিব্রত করতে। এমনকী, নিজেদের মৃত্যু সংবাদটুকুও জানাতে বারণ করেছিল বাড়ির লোকেদের। দেবমাল্য মাটিতে থেবড়ে বসে পড়েছিল। আজ যখন মন চাইছে দু’জনকে একটিবার দেখার, তখন চার দেওয়ালের গায়ে অদ্ভুত এক নীরবতা ধাক্কা মারছে। অসহনীয় চাবুকের মতো সেই নীরবতা।
আলমারি হাতড়ে দেবমাল্য আরও অবাক। দেখতে পেল বাবা-মায়ের স্থাবর আর অস্থাবর সম্পত্তিতে দেবমাল্য রুকমা আর বিটুর নাম। ছোটকাকার মুখে জানা গেল, বাবা চলে গেছে দুরারোগ্য কর্কট রোগে। মা মৃত্যুকে জড়িয়ে নিয়েছে বাবা চোখ বোঁজার ঠিক দু’মাসের মধ্যেই। হার্ট অ্যাটাক। অথচ নিজেদের চিকিৎসায় একটা পয়সাও ব্যয় করেনি বাবা। এরপর মাথার চুল ছেঁড়া ছাড়া আর কী করা যায়!
আকাশ আলো আলো হয়ে উঠছে। পুব আকাশের লালিমা ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত আকাশে। সেদিকে তাকিয়ে একটা শ্বাস ফেলল দেবমাল্য। এখন সে বুঝতে পারে, মানুষ বড় ভ্রমের মধ্যে বাস করে। পূর্বজরা ভাবেন উত্তর-প্রজন্ম আমাদের চিনল না। উত্তর-প্রজন্ম ভাবে পূর্বজরা আমাদের বুঝল না। বছরের একটা দিন এইভাবে পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যদি ভুল বোঝাবুঝির পালা মিটিয়ে নেওয়া যায় তাহলে ক্ষতি কী?
একটু আগে সর্বজ্ঞ পুরুতমশাই একটা অদ্ভুত কথা শুনিয়েছেন তাকে। বলেছেন, আর কিছুক্ষণ পর যমলোক থেকে নেমে আসবে তার বাবা-মা। তর্পণ জলের শ্রাদ্ধীয় দ্রব্যের সূক্ষ্মতম অংশ পরমাণু রূপে গ্রহণ করবে। তারপর তুষ্ট হলে ভূতচতুর্দশীতে আবার আশীর্বাদ করতে করতে ফিরে যাবে স্বলোকে। শুনে আনখশির চমকে উঠেছিল দেবমাল্য। জিজ্ঞেস করেছিল, তাদের দেখতে পাওয়া যাবে? পুরুতমশাই বলেছিলেন, না। তবে পঞ্চেন্দ্রিয়েকে সজাগ রাখলে তাদের ছায়াময় অস্তিত্ব অনুভব করা যেতে পারে।

আলোয় উদ্ভাসিত হল পূর্বদিক। লালচে আলোর রেণু লেগে যেন শিহরিত হয়ে উঠল বহতা নদীর জল। শিহরিত হল দেবমাল্যও। এক অজানা অনুভূতির স্পর্শে। কিংসাহেবের ঘাটে করলার হাঁটু ছুঁই ছুঁই জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা দেবমাল্য উপলব্ধি করল, যা এতদিন করেনি, মানুষের প্রীতি বা ভালবাসা, আবেগ বা সংবেগ যা-ই বলা যাক না কেন, কোনও অনুভূতিই আসলে পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। এক একটা মানুষ বোধ হয় আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে এই পৃথিবী থেকে অপ্রকট হয়ে যাওয়ার পরেই। যেমন হয়েছে তার মা আর বাবা।