সমুদ্রের গোপন সেনাপতি

মাহবুব ময়ূখ রিশাদ

এও কি সম্ভব? এই ছোট জায়গায় যেখানে পুকুর পর্যন্ত নেই সেখানে জেগে উঠবে সমুদ্র? সমুদ্রই তো, সামনে যতদূর চোখ যায় কেবল পানি আর পানি। ফেনিল ঢেউ। ক্যাম্পাস সীমানার ভেতরেই ঘোরপাক খাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই দেয়ালের বাইরে কোনো কিছুর সঙ্গে তার সংযোগ নেই। কিছু পানি গিয়ে মূল সড়ক ভিজিয়ে দিচ্ছে বটে কিন্তু ভেতরের দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা করবার মতো নয়। হাসপাতাল ইমারতটিও নোঙর ফেলা জাহাজের মতো স্থির।

এদিকে শতবর্ষী মনসুর ভাইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মধ্যবয়সী মহিলা। শতবর্ষী মানে আক্ষরিক শতবর্ষী নয়। আবার সত্যি তাই হবার সম্ভাবনাও কেউ উড়িয়ে দিতে পারে না। তিনি বলেন, তার সামনেই গোড়াপত্তন হয়েছিল এই ক্যাম্পাসের। হাওয়া বইতে দেখলেই টের পেয়ে যান কোনদিকে তা বইবে। যদিও বিপুল জলরাশি এসে ভাসিয়ে নিতে চাইছে সব স্থাপনা, ছোট ছোট গাছ যেগুলো ছিল ফুটপাত ঘেঁষে সেগুলো তো ইতোমধ্যে বিলীন প্রায়, মাটি থেকে উপড়ে গিয়ে ভাসছে উদ্দেশ্যহীন, চেনা ভিক্ষুকদের করতে হয়েছে জায়গা বদল, রোগীরা যেতে পারছে না সহজে, একপাশে বসতে শুরু করেছে ডিঙ্গি নৌকার ঘাট- এতসব মহাযজ্ঞ কস্মিনকালেও আন্দাজ করতে পারেন নি মনসুর ভাই। যেমন তিনি বুঝতে পারেন না, যে এই মধ্যবয়সী মহিলাটি রঞ্জুর মা। এমনকি বুঝতে পারেননি, রঞ্জুর ঘটবে এমন পরিণতি। নিজেই এটি নিয়ে করছেন আহাজারি।

আর রঞ্জুর মা মনসুর ভাইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো ভাবছেন, এ সাগর পাড়ি দিয়ে তিনি কীভাবে পৌছাবেন রঞ্জুর কাছে? তাই তাকে দেখা যায় অস্থিরাবস্থায়, পুরোনো সুতির শাড়ি পরনে, হাতের মুঠিতে ধরা মোবাইল নিয়ে চারতলা ছদ্মবেশি জাহাজের দিকে তাকিয়ে থাকতে। তার ঠিক পেছনে দোকানের বহু পুরোনো আবরণবিহীন তুলা দেখা যাওয়া বালিশে বসা মনসুর ভাইয়ের চোখে পানি। আঙুলের আকার সমান যে সিঙ্গারা খেয়ে ক্যাম্পাসের প্রতিটি ছেলে- মেয়ে ডাক্তার হয়েছে, কেউ ডাক্তার হবার পথে সেই সিঙ্গারা বিক্রি করতেও আজ তাকে আগ্রহী দেখায় না। মনসুর ভাই মনে করতে পারেন, কথাটা তিনি বিড়বিড় করে বলছেন কিন্তু একটু তফাতে থাকা রঞ্জুর মায়ের শুনতে সমস্যা হয় না- স্যার, খুব ভালো মানুষ।
রঞ্জুর মা নিজ পায়ের দিকে তাকিয়ে কান খাড়া রাখেন যদি আরও কিছু শুনতে পান। শুনতে সুবিধা হবে ভেবে বামপাশে একটু সরে এসে ঠিক এমনভাবে ছোট্ট একটি লাফ দিলেন যেন ঢেউ এসে ভিজিয়ে যাচ্ছে ওনাকে। এতে তিনি কিছুটা নিকটবর্তীও হন দোকানের। ঝুলন্ত লাইটার ছুঁয়ে যায় খোঁপার ফুলে থাকা অংশের পাঞ্চক্লিপ লাগানোর জায়গাটি। তিনি টের পান কি পান না, তার আগেই দেখতে পেলেন পানির উচ্চতা যেন বাড়ছে। স্রোতের টানেই ওনার পায়ের কাছে এসে পড়ল চিপস এর সবুজ রঙয়ের প্যাকেটের ওপর শুয়ে থাকা আধখাওয়া সিগারেট।
দুদিন আগেও স্যারের সাথে দেখা হইসিল। সিগারেট নিল হাসিমুখে। আর আজ এই অবস্থা। হে আল্লাহ, তুমি আমাদের রঞ্জু ভাইকে একটু দয়া করো। মনসুর ভাই কথাটা বলেন, আরেকজন ছাত্রকে লক্ষ্য করে।

হ্যা, মনসুর ভাই। আপনি তো দেখেছেন সে চুপচাপ থাকত, একা থাকত, ওভাবে যে আমাদের সঙ্গে মিশত তাও কিন্তু না। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি আসলে সে থাকত অনেকটা জায়গা জুড়েই। তার না থাকার মাঝেও সে ছিল। নাহয়, এভাবে ক্যাম্পাস ভেঙে পড়ত? সবাই কাঁদছে। ছাত্ররা তো আছেই, বাদ যায় নি হোস্টেল ক্যান্টিনের বয় থেকে শুরু করে আপনারা পর্যন্ত কেউই।

তাদের দুজনের কেউ খেয়াল করে না রঞ্জুর মা'কে। আঞ্চলিক ভাষায় বলা কথাগুলো বুঝতে ওনার অসুবিধে হয় না। একটু ঝুঁকেছিলেন সামনের দিকে। আর চোখ থেকে কয়েক -ফোঁটা জল আধখাওয়া সিগারেট বহনকারী চিপসের নৌকায় গিয়ে পড়ল। হালকা বাতাস বইতে শুরু করলে প্যাকেটটি যে পথে এসেছিল সেই পথে ফিরে যেতে শুরু করল। রঞ্জুর মা'র শোক প্রকাশে কিঞ্চিত আড়াল রাখছেন। যেভাবে কাঁদার কথা পারছেন না সেভাবে নিজেকে উন্মুক্ত করতে। যে কথাগুলো বুদবুদ তুলছে ভেতরে তা যেন মুখে আসার আগেই হারিয়ে যাচ্ছে। ঝাপসাভাবে ওনার মনে পড়ল ছোট মেয়ে অঞ্জনার কথাও।

এদিকে কোথা থেকে ছুটে এসে যেন ক্যাম্পাসের গায়ে লোম ওঠা দু'টো কুকুর রঞ্জুর মা'কে ঘিরে একটা বলয় তৈরি করল। কখনো উঁচু শব্দে, কখনো ক্ষীণ শব্দে কুকুর দুটো বিনিময় করল পারস্পরিক ঘেউ ঘেউ, যেন তারা আলাপ করছে কোনো বিষয়ে।
মনসুর ভাইয়ের দোকানে আসা ছাত্রটি জানায়, প্রিন্সিপাল স্যারকে তারা আলটিমেটাম দিয়ে এসেছে। শুরু হয়েছে ক্লাস বিরতি। সিনিয়র- জুনিয়র সবাই সঙ্গে আছে। হোস্টেলের ছাদ ভেঙে ছাত্র মারা যাবে, আর বাকিরা নিশ্চিন্তে ক্লাস করবে এ হতে পারে না। রঞ্জুর কিছু হলে দায়ী কেউ ছাড় পাবে না। এতক্ষণ মনসুর ভাইয়ের দু একটি কথা শুনে রঞ্জুর মা চুপ করেও থাকলেও এবার আর থাকলেন না। ছেলেটির উদ্দেশে বললেন, বেঁচে আছে আমার রঞ্জু এখনো? ছেলেটি জবাব দেয়ার আগেই কুকুর দুটো একসাথে ঘেউ বলে যেন জানান দিতে চাইল, হ্যা বেঁচে আছে।

ছেলেটি বলল, অবস্থা ভালো নয়। ব্রেনে রক্তক্ষরণ হয়েছিল, অপারেশন হয়েছে। এখন আইসিউতে। তবে, আপনার রঞ্জু কেন বললেন? ওকে চেনেন?
চুপ হয়ে গেলেন রঞ্জুর মা। হয়তো ভাবছেন, আমার রঞ্জু এই কথাটি বলার অধিকার আছে কিনা তার যেখানে পাঁচটি বছর পার হয়ে গেছে বিচ্ছেদের পর। রঞ্জুর বন্ধু তাকিয়ে আছে কৌতূহলী দৃষ্টিতে।
মনসুর ভাই বলে উঠলেন, রাজু ভাই ওনার সাথে রঞ্জু ভাইয়ের চেহারায় ভীষণ মিল। ঝুলতে থাকা বিস্কুট- ব্রেডের প্যাকেটের ফাঁক দিয়ে মনসুর ভাই গলা বের করে কথাটি বললে, রঞ্জুর মা সেদিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে মুখে খানিকটা হাসি আনতে চেষ্টা করলেন। ছেলেটি কিংবা মনসুর ভাইয়ের কাছে অবশ্য তা অনেকটা জোর করে কান্না আটকানোর চেষ্টা হিসেবেই মনে হলো।
আপনি কি তাহলে রঞ্জুর মা?
হ্যা, বাবা।
শোনামাত্র ছেলেটি পা ছুঁয়ে সালাম করল। বলল, আন্টি আপনাকে পৌছে দেবার ব্যবস্থা করছি। আংকেল এসেছেন, উনিও ভেতরে আছেন। আমরাও ভাবছিলাম আপনি কোথায়। রঞ্জু নিশ্চয় চোখ মেলার পর আপনাকেই দেখতে চাইবে। এসেছেন, তাই খুব ভালো হলো।
কিন্তু বাবা, হাসপাতালের এই অবস্থা কেন? দেখে মনে হচ্ছে সী-বিচে দাঁড়িয়ে আছি।
কি বলব আন্টি, আমরাও বুঝতে পারছি না। এমন ঘটনা এবারই প্রথম। বাইরে থেকেও আসেনি পানি। যা ঢেউ, যা পানি সব ভেতরেই। বৃষ্টি হয়েছিল বটে। হালকা পানিও জমেছিল। কিন্তু এই মুমূর্ষ অবস্থা রঞ্জু হাসপাতালে ভর্তি হবার পর থেকেই।
মনসুর ভাই বলল, ম্যাডাম কিছু খাবেন?
রঞ্জুর মা, দুপাশে একবার করে মাথা নাড়িয়ে নিজের অসম্মতি জানান।
ছেলেটি অর্থাৎ রাজু ফোনে ব্যবস্থা করল নৌকার। অস্থায়ী ঘাট এখান থেকে একটু দূরে।
রাজু জানাল,হাসপাতাল যেখানে সেখানে এতটাই গভীর পানি যে রিকশা যাবার কোনো উপায় নেই।
কী হয়েছিল, আসলে? ভেজা কণ্ঠে শোনা গেল রঞ্জুর মা’র প্রশ্ন।
কুকুর দুটো সমসুরে আবার আওয়াজ শুরু করল। কুকুরের ভাষা বোঝার মতো দক্ষ কেউ আছে কিনা এই মুহূর্তে এই প্রসংগটি মনে হলো না কারও। তাই রাজু যখন বলল, ছাদ ভেঙে পড়েছে তখন রঞ্জুর ওষধ খাবার ঘটনাটি নির্বাক থেকে গেল। অপারেশনের কথা সে জানায় ঠিকই কিন্তু আড়ালে থেকে যায় আচমকা কেন তার লিভার কাজ করছে না তার কারণ। কুকুরগুলোকে খাওয়াত রঞ্জু। তাই তারা ভীষণ পছন্দ করত তাকে। ঘুরঘুর করত পায়ের কাছে। ওষুধগুলো রঞ্জু কিনেছিল দূরের এক ফার্মেসি থেকে। স্বভাবতই পাশে ছিল এই লোম ওঠা দুটো কুকুর। তারপর হোস্টেলে ফিরে যখন রঞ্জু স্বেচ্ছামৃত্যুর বাস্তবিক প্রয়োগ ঘটানোর জন্য একসাথে গিলে ফেলেছিল বিশটি ট্যাবলেট তা দেখেও প্রাণীটি বুঝতে পারেনি কিছুই। ছাদ যে ধসে পড়েছিল, অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিল কুকুর দুটো। সত্যটা জেনেও ঘেউ শব্দের অর্থ তারা প্রকাশ করতে পারছে না দেখে এক পর্যায়ে চুপচাপ বসে পড়ল দোকান থেকে দূরে মূল সড়কের আরেকপাশে গিয়ে। সেখানে বাড়ছে মানুষের ভিড়। হাসপাতাল অচল হয়ে যাবার দশা তাও এমন আচমকা জল আক্রমনে, খবরটি ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।
নৌকাটি চলে এলে তাতে চড়ে বসলেন রঞ্জুর মা। সাথে রাজু। একতলা স্থাপনাগুলো ডুবে গেছে প্রায়। ক্লাস বন্ধের ঘোষণা না দিলেও যে ক্লাস করা যে আদৌ সম্ভব হতো না বিষয়টি বুঝেও ছাত্ররা তাদের কর্মসূচি থেকে বিরত থাকে নি। হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত থাকা পানিও তাদের মিছিল করা থামিয়ে রাখতে পারেনি। এসেছিল মেয়েরাও। যেতে যেতে রাজু এসব কথা বিস্তারিত জানায় রঞ্জুর মা'কে। রঞ্জুর মা'র গর্ব হয়। তার ছেলে তো চিরকাল চুপচাপ। বন্ধু-বান্ধবহীন দেখে এসেছেন। ছেলের জন্য সবার এমন ভালোবাসা দেখে এতক্ষণ ধরে আটকে থাকা কান্নাটি বের হয়ে আসতে নিলেও সামলে ফেলেন তিনি। তিনিও তো কাঁদেননি বহুদিন। সেই কবে অঞ্জনা ছেড়ে গিয়েছিল তাদেরকে, এরপর থেকে তো কেবল যন্ত্রের মতো জীবন। বিচ্ছেদের পরেও কি মিলেছে শান্তি? আগেরবার নাহয় দোষারোপ করেছিলেন রঞ্জুর বাবাকে। এবার কাকে করবেন? একটু পরেই দেখা হবে, রঞ্জুর বাবার সাথে। এটা ভেবে কুঁকড়ে যেতে থাকেন। আন্টি, শরীর খারাপ লাগছে? না। এই বলতে বলতে নৌকাটি চলে আসে হাসপাতাল জাহাজের ভেতরে। এসে থামে সিড়ির গোড়ায়। নিচের ছ থেকে সাতটি ধাপ ডুবে গেছে। এখানেই এসে থামছে অনেকেই। রয়েছে এই নৌকাটি ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি নৌকা। সবচেয়ে বেশি ভিড় জরুরি বিভাগের সামনে। সেখানে পানিও কিছুটা কম। সিএনজি, রিকশার জায়গা নিয়েছে নৌকা। দু দিন আগেও এই দৃশ্য অভাবিত ছিল বটে। কাজ চালানোর জন্য জরুরি বিভাগ নিয়ে যাওয়া হয়েছে দোতলায়। রাজু তথ্যটা জানায় রঞ্জুর মা'কে। নৌকা থেকে নেমে সিড়িতে ওঠেন তিনি। রঞ্জুর যত নিকটে যাচ্ছেন তত যেন বিষাদবায়ু তাকে আঁকড়ে ধরছে। উঠতে উঠতে খেয়াল করলেন পানির সরু ধারা ঠিক একেবারে মানুষের মতো দিক মেনে নেমে যাচ্ছে নিচে, মিশে যাচ্ছে মূল প্রবাহের সাথে। ধারাটি সরু হলেও তাতে গতি আছে বেশ। রঞ্জুর মা সেদিকে তাকিয়ে উঠতে থাকলেন ওপরে। রাজু কিছু বলছিল, তিনি শুনতে পারছেন না। অনেক শব্দের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে রাজুর বাক্য।
চারতলায় উঠে আসার পর একটি করিডোর দেখতে পেলেন। ছোট করিডোর। স্বাভাবিক অবস্থায় দশ থেকে বারোজনের বেশি একসাথে দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ না থাকলেও কি অবলীলায় মনে হচ্ছে ক্যাম্পাসের সব ছাত্র-ছাত্রী জমাট বেঁধে আছে সেখানে। কেবল তাই নয়, করিডোর থেকে বের হয়ে খোলামতন জায়গায় আছে বসে আছে অনেকেই দেয়ালে হেলান দিয়ে হতবিহবল অবস্থায়। তাদের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল। সবার জলের ধারা একীভূত হয়ে তৈরি করছে একক একটি মিছিলের যা গড়িয়ে পড়ছে নিচে, মিশে যাচ্ছে, বাড়াচ্ছে উচ্চতা, বড় হচ্ছে ঢেউ। অশ্রু যেন সমুদ্রের সেনাপতি। বাড়াচ্ছে তার বিস্তার।