চরিত্র যখন লেখক অথবা লেখক নিজেই যখন চরিত্র

মোজাফফর হোসেন

নতুন একটি গল্পের প্লট মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কথাসাহিত্যিক আফসার চৌধুরী বাস্তবে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে তিনি সাধারণত লেখেন না। তাঁর লেখার বিষয় হলো ঘটনার সম্ভাবনাময় দিকগুলো— কখনো মেটাফিজিক্যাল ওয়ার্ল্ড। ম্যাজিক রিয়ালিজম নিয়ে কাজ করেছেন বেশ কটি উপন্যাসে। তিনি ভীষণ ক্রিয়েটিভ মানুষ, কোনও সন্দেহ নেই তাতে। তবে সবকিছুরই একটা শেষ বলে কথা আছে। গত বছর পাঁচেক থেকে যা করছেন তা হলো চর্বিত চর্বণ। যে কারণে অনেকে বলছেন, চৌধুরী সাহেবের লেখালেখি বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ। বিষয়টি নিয়ে আফসার একেবারে যে ভাবছেন না তা নয়। তবে তিনি ঠিক করতে পারছেন না, লেখালেখির পাঠটাই চুকিয়ে দিবেন নাকি নতুনধারায় চেষ্টা করবেন।

বর্তমানে একটি রিয়েলিস্ট ধারার কাজ নিয়ে আছেন। এখানে তিনি বাস্তবে যা ঘটছে তা হুবহু তুলে ধরবেন, কোনো সম্ভাবনা বের করবেন না। এতে যে কাজটা হবে, যে সকল সমালোচক তাঁর লেখায় সমসাময়িক সময়ের অবক্ষয়, রূঢ়-কঠিন বাস্তবতার উপস্থিতি টের পাননি বলে এতদিন অভিযোগ করে এসেছেন, তাদের মুখটা বন্ধ করা যাবে।

আফসার ঐ গল্পের প্লট নিয়েই আছেন। বর্তমান গল্পের প্রধান-চরিত্র সমাজের বখে যাওয়া মাঝবয়স্ক এক লোক। আমাদের সমাজে উচ্ছন্নে যাওয়ার জন্যে যে বৈশিষ্ট্যগুলো অনিবার্য তার সবটাই ঐ চরিত্রের মধ্যে বিদ্যমান থাকা চাই। ইতোমধ্যে একটি নামও ঠিক করে ফেলেছেন ঐ চরিত্রের জন্যে—আক্কাস। সাথে একটা আলীও লাগানো যেতে পারে। এই নামে তার পরিচিত কেউ নেই। থাকলে যে সমস্যা বাঁধবে না সে-কথা বলা যাচ্ছে না। একবার এক উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের নাম ছিল বদরুল আলী মণ্ডল। আস্ত একটা বদ লোক। ঘুষখোর উচ্চপদস্থ আমলা। ব্যাস, হয়ে গেল মানহানির মামলা। সত্যি সত্যি বদরুল আলী মণ্ডল নামে একজন সচিব ছিলেন। তার চরিত্র ধরে টানাটানি করা হয়েছে বলে মানহানির মামলা ঠুকে দিলেন। এর আগে একবার সদরুল আলম বলে অসৎ পুলিশ অফিসারকে নিয়ে গল্প লিখলেন, তখন আল্লাহর কি ইচ্ছা সদরুল আলম নামের একজন আফসার চৌধুরী যে থানাভুক্ত সেই থানারই ওসি। না-হোক তিনি গল্পের সদরুল, কিন্তু অসৎ তো। ফলে হয়রানি কম হলো না। তাই এবার আক্কাস নামটা তিনি গুগল করে পরীক্ষা করে নিয়েছেন।

আফসার এবার লিখবেন এমন একটি চরিত্রকে নিয়ে যে কিনা মদ-নারী-জুয়া ছাড়া একটা দিনও কল্পনা করতে পারে না। অথচ তিনি নিজে এই জগতের বাইরের মানুষ। সমাজে ভদ্রলোক হিসেবেও উচ্চ-আসন তাঁর। যৌবনে বন্ধুমহল থেকে মাঝেমধ্যে মদের অফার এসেছে। তিনি গ্রহণ করেননি। এমন নয় যে কখনো ইচ্ছে করেনি। কিন্তু সমাজের কোড অব কন্ডাক্টকে তিনি ভাঙতে পারেন নি। এত সাহস তার কোনোদিনই ছিল না। নিতান্তই মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। অবস্থানগতভাবে বাবা মায়ের তিন সন্তানের দ্বিতীয়তম। বিয়ে করেছেন খুব সাধারণ নাদুস-নুদুস গড়নের এক নারীকে। বাঙালি মহিলারা টিপিক্যালি বিয়ের পর যেমন হয় তার বউ বিয়ের পূর্ব থেকেই তেমন। এখন তিনি তিন সন্তানের জনক—এক ছেলে, দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে তার খালাতো ভাইয়ের সাথে। ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবে বের হয়েছে। প্রেমের বিয়ে। ছোট মেয়েটা পড়াশুনায় খুব কাঁচা, সারাদিন টেলিভিশন দেখে আর এটা-ওটা মুখে পালিশ করে কাটিয়ে দেয়। কর্মজীবনে তিনি একটি কলেজে বাংলা পড়াতেন, বছর পাঁচেক হলো স্বেচ্ছায় অবসরে গেছেন। সুতরাং সবদিক থেকেই তিনি মধ্যবিত্ত। নির্ঘাত ভালো মানুষ হতে হলে আমাদের সমাজে যে যোগ্যতা লাগে তার সবটাই আছে তাঁর। এখন তিনি তাঁর জীবনের সমস্ত অবদমিত আকাঙ্ক্ষাকে রূপান্তর ঘটাতে চলেছেন তার এই নতুন লেখাটির মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ আফসার চৌধুরীকে এখন এমন এক জীবন নিয়ে লিখতে হবে যে জীবন তিনি যাপন করেননি কখনও। এমনকি যে জীবনটা তিনি আড়াল থেকেও দেখার চেষ্টা করেননি। এখন নানান প্রশ্ন এসে জমাট বেঁধেছে তাঁর মনে : কেমন লাগে মাতাল হতে? মাতাল হয়ে কি কবিতা লেখা কিংবা স্ত্রী-সন্তানকে ভালোবাসা যায়? ভাড়াটে নারীর ঐ এঁটো ঠোঁটে সুখ থাকে? বেশ্যারা কি বৌয়ের মতো জাপটে ধরে সুখে? জুয়া খেলায় কোন অনুভূতিটা বেশি তীব্র— হারের নাকি পরাজয়ের? আচ্ছা, একটা মানুষ নষ্ট হলে আর কী কী করতে পারে? নষ্ট হতে হলে আর কী কী করতে হয় তাকে? এরকম বিচিত্র ধরনের প্রশ্ন এসে ভাবিয়ে তুলেছে আফসারকে। এসব জানতে হলে অনেক দূর থেকে অনুমান করেই যে জীবন থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন এখন সেই জীবনের খুব কাছাকাছি যেতে হবে তাঁকে।


আজকাল বেশ নিয়ম করে আক্কাস আসে আফসার চৌধুরীর সাথে দেখা করতে। একবার তিনি ভেবেছিলেন, গল্পটি অসম্পূর্ণই রেখে দিবেন। কিন্তু আক্কাস এতটা নিয়মিত আসে আজকাল যে লেখাটা শেষ না করে আর মুক্তি নেই। আক্কাসকে এই প্রশ্রয়টা আফসারই দিয়েছে। আক্কাসকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যেন নিজেই দ্বৈত মানব হয়ে উঠেছেন। স্টিভেনসনের ‘ড. জেকিল অ্যান্ড মি. হাইড’ উপন্যাসের সারবস্তু ‘man is not truly onebut truly two’—কথাটা আফসারের ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থেই সত্য হয়ে উঠেছে।

আক্কাসের জোরাজুরিতে এক মধ্যরাতে ঘর ছাড়লেন তিনি। উদ্দেশ্য, যে জীবন নিয়ে গল্পটি লেখা হবে তার কিছুটা নিজেই যাপন করা—চেখে দেখা কল্পিত জীবনের কয়েকটি মুহূর্ত। বুদ্ধিটা অবশ্য আক্কাসের। এতে নাকি কাজ হবে। গল্পটি শেষ করার জন্যে আফসারের কাছে এর কোন বিকল্পও ছিল না।

আক্কাস আর আফসার যৌথভাবে গল্পটির পেছনে উঠেপড়ে লেগেছে। তারা এখন পরম বন্ধুর মতো অন্ধকারে হেঁটে বেড়াতে বেড়াতে অনায়াসে যে কোনো স্যাঁতসেঁতে গলিতে চাঁদের চিকন আলোর মতো পিছলে যেতে যেতে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। আক্কাসের বায়বীয় অস্তিত্ব আফসারের জীবনে আরও তীব্র ও ভীষণ হয়ে ওঠে। তিনি এখন মাতাল হয়ে সুখ পান, জমিয়ে জুয়া খেলে মজা লোটেন। ভাড়াটে নারীর উদোম শরীরে হারিয়ে যাওয়া মরীচিকার মতো ঝিলিক মেরে যায়।

কথাসাহিত্যিক আফসার চৌধুরী তাঁর গল্পের চরিত্র আক্কাসকে এক্সপ্লোর করতে করতে কবে যেন নিজেই আক্কাস হয়ে উঠেছেন! নষ্ট জীবনে নেশা ধরে গেছে তাঁর। শেষ লেখাটা কবে লিখেছিলেন তা আর মনে করতে পারেন না। পত্রিকাগুলো যাচ্ছেতাই লিখে ইতোমধ্যে তাঁর ক্যারিয়ারের বারোটা বাজিয়েছে। ছোটমেয়েটা মায়ের গয়নাগাটি নিয়ে ভেগে গেছে ড্রাইভারের সঙ্গে। শেষপর্যন্ত স্ত্রীও গেছেন, স্ট্রোক করে।

গ.
একদিন মধ্যরাতে, জুয়ার আসর থেকে টলতে টলতে রাস্তার মাঝখানে নেমে আসেন একসময়ের প্রখ্যাত এই কথাশিল্পী, সঙ্গে আক্কাস আলী। এ-কথায় সে-কথায় কথার বোমাটা প্রথম ফাটায় আক্কাসই।
‘আজ তুমি সম্পূর্ণ নিঃস্ব। সম্মান নেই, অর্থ নেই, সম্পর্ক নেই; আছে শুধু অভাব আর নেশা। নষ্ট হওয়ার নেশা। কাল থেকে আমি গল্পটি লেখা শুরু করবো। তোমার গল্প। একজন লেখকের চরিত্র হয়ে ওঠা, আর চরিত্রের লেখক।’

আফসার চৌধুরী চিৎকার করে ফেটে পড়েন— ‘তুই না, শুয়ারের বাচ্চা, গল্প লিখবো আমি। আমিই এখন তোকে নিয়ে লিখব। কোন শ্যালারা বলে, আমি অবক্ষয় নিয়ে লিখতে পারি না? এখন আমি টাটকা অবক্ষয় নিয়ে লিখব, ফ্রেশ অবক্ষয়!’ মাতলামি করতে করতে রাস্তায় ঢলে পড়ে আফসার চৌধুরী। আক্কাস তাঁকে উঠানোর চেষ্টা না করে পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ‘পারবে না। কারণ তুমি শুধুই আমার গল্পে বাস করো। বাস্তবে তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই। তোমার জগতটা আমি তৈরি করেছি। প্রথমে আদর্শিক মানুষ। এরপর সার্থক লেখক। তারপর আস্তে আস্তে নষ্ট করেছি তোমাকে। একজন লেখক তার গল্পের কারণে তার কল্পিত চরিত্রের সাথে মিশতে মিশতে কী করে সে নিজেই একসময় ঐ গল্পের চরিত্র হয়ে ওঠে, তাই দেখাবো আমি এই গল্পে। তোমাকে আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে।’ তাচ্ছিল্যের সাথে কথাগুলো বলে হনহন করে ল্যাম্পপোস্টের আলোর ওপাশে অন্ধকারে মিলে যায় আক্কাস আলী।

আফসার চৌধুরীর বিশ্বাস হয় না কিছুই। আমি কি আজ বেশিই পান করেছি?—মনে মনে ভাবেন তিনি। নিজের শরীরের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখেন—আমার কি তবে সত্যিই কোন অস্তিত্ব নেই? আমার বৌ-সন্তান, এত এত পুরস্কার, এসবই অন্য কারও কল্পনা? আমার গল্প-উপন্যাসগুলোও কি অন্য কারও লেখা কিংবা আদৌ লেখা হয়নি ওগুলো? নাকি আক্কাস ফাঁদে ফেলে বেরিয়ে যেতে চাইছে আমার গল্প থেকে? ঘোরের ভেতর প্রলাপ বকতে থাকেন আফসার। না, এ হতে পারে না। টলতে টলতে পথের মাঝখানে এসে দাঁড়ান তিনি। একটা গাড়ি আসছে। দু চোখ জ্বলজ্বল করছে দূর থেকে। অস্তিত্বের পরীক্ষাটা তাকে দিতেই হবে।