আব্দুল কাদেরের প্রতিশোধ

সাদিক হোসেন

মেঝেতে একফালি চাদরের উপর শুয়ে থাকা জোলেখা বিবির পিঠের দিকে তাকিয়ে আব্দুল কাদেরের মনে হয়, মাগিটার শিরদাঁড়াতে বুঝি বকরি ইদের জবাই করা ছাত্তার সাহেবের গরুর হাড্ডিহীন গোশ চাপানো। ফি বছর ঠিক চাঁদরাতের আগের দিন তামাম গেরামের লোক কে কিরকম গরু কিনেছে তা দেখবার পর খিদিরপুরের খাটাল থেকে তাঁর গরু আসে রাতের বেলায়। বিকেল থেকেই ছাত্তার সাহেবের ঘরের সামনে চারখানা বাঁশ পুঁতে, ত্রিপল খাটিয়ে, মিটারঘর থেকে লাইন টেনে বাল্ব জ্বালিয়ে গরুর ঘর বানানো হয়। ইস্টিশন থেকে ছাত্তার সাহেবের ঘরে যাবার রাস্তাটা সরু। তারওপর গেল বর্ষায় কালাম মোল্লার শান বাঁধানো পুকুরটা ডুবে গিয়ে রাস্তার এক অংশ খপ করে গিলে নিয়েছে। এখন ছাত্তার সাহেবের ঘর পর্যন্ত আর ট্রাক ঢোকে না। তবু সেই রাতে ইস্টিশনের মুখে গরুর ট্রাকটা থামতেই মহল্লার সব্বাই যেন কিভাবে জেনে যায় – হায় আল্লা, এ তো গরু নয়, ছাত্তার সাহেব তবে হাতি দিয়েছেন এবার!
ইস্টিশন থেকে ছাত্তার সাহেবের ঘর হাঁটা পথে ১০ মিনিট। তবু সেই পথটুকু হাঁটতে গিয়ে গরুটা কাহিল হয়ে পড়ে। কালাম মোল্লার পুকুরের সামনে এসে যেই পানি খাবে বলে থেমে গিয়ে পুকুরের দিকে গলা বাড়ায়, অমনি কসাইটা লাঠি দিয়ে পোঁদে দু’বার ঘা মারে। থলথলে গোশের উপর লাঠির ঘা খেয়েও গরুটার তাতে কোন হেলদোল নেই। তখন তার লেজ ধরে মোচর দিতেই সে আবার হাঁটা শুরু করে। কোনরকমে তাকে ত্রিপলের নিচে এনে, গলার দড়িটা খুঁটিতে বেঁধে এক বালতি পানি দেওয়া হয়। গরুটা পানি খায় আর ভোঁস ভোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। নিঃশ্বাসের তোড়ে অর্ধেক পানি বালতি উপচিয়ে বাইরে পড়ে। ছাত্তার সাহেবের চার মেয়ে ফ্রক পিঁদে আর বড় ছেলের মেয়েটা নাক অব্দি ঘোমটা টেনে জানলা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। ছাত্তার সাহেব বড় আর মেজো ছেলেকে নিয়ে গরুর পিঠে হাত বোলাতে গেলে কসাই বলে, বহুত আচ্ছা মাল আপকো মিল গায়ে বাবুজী, এয়সা মাল তো ইস মহল্ল মেঁ কিসিনে নেহি দেখা। কশাইয়ের তারিফ শুনে ছাত্তার সাহেব ফুলে ফুলে ওঠেন। গরুটা দুবার ঘাড় নেড়ে মাছি তাড়ায়। তারপর হাঁক ছাড়ে আর হাঁক ছারার সঙ্গে সঙ্গে লেজ উঁচু করে হাগতে শুরু করে। এতে ছাত্তার সাহেব যেন গরুটার সুস্থতার প্রমাণ পান। কোরবানির জিনিসে কোন খুঁত থাকতে নেই। খুঁত থাকলে আল্লা তা মনজুর করে না। ছাত্তার সাহেব আর একবার গরুটাকে নিরীক্ষণ করেন। এই প্রথম ছাত্তার সাহেবের মেহেদি লাগানো দাড়িটার সাথে গরুটার গায়ের রঙের সামঞ্জস্য টের পায় আব্দুল কাদের। সে আর একবার জোলেখা বিবির দিকে তাকায়। জোলেখাকে তার ছাত্তারের মাগ বলে মনে হয়।
তা এই জোলেখাকের তুমি এখন যেরম মেঝের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে ঘ্যাক ঘ্যাক করে নাক ডাকতে শুনতোছো আর মাঝে মধ্যে কোলের ছাবালটা কাঁদলি ফ্যারে নাক ডাকা থেম্মে মাইখানা ছাবালটার মুখে গুঁজে আবার যেই কী সেই উপুড় হতি দেখতোছো – তা এই মাগি সবসময় এইরম ছ্যালো না গো। জোলেখার যৌবনের কথা ভেবে আব্দুল কাদের জোলেখাকে একবার ডাকে। তাতে জোলেখার কোন নড়নচড়ন না দেখে সে আবার পাশ ফিরে গাল পাড়ে। তন্দ্রাকালে হাসরের ময়দানে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে নিজেকেও ছুটতে দেখে সে। হল্কা হাওয়ায় চারদিকে খালি ধুলোবালি উড়ছে। বালিকণা চোখে পড়ায় চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে। সে আর তাকাতে পারে না। যত চোখ রগড়ায় তত খালি চোখ দিয়ে পানি নাবে। এর মধ্যে কে একজন বদনায় করে অজুর পানি দিলে সে সেই পানিতে চোখ সাফ করে। তারপর তাকালে দেখে যতসব জাহেল মানুষ আর পরেজগার লোক সব একসাথে দৌড়ে ময়দানের ওপারে চলে গেছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে লম্বা শ্বাস টানে। পেছনে কেউ যেন তাড়া করছে এমনভাবে ছোটে। খানিকটা দৌড়লে ভিড়টাকে ধরতে পারে বটে, তবে ভিড়ের ভেতর খালি হোঁচট খায়। লম্বা লম্বা মরদরা তাকে কনুই দিয়ে গুঁতো মারে। সে পিছিয়ে পড়ে। কোনরকমে টাল সামলে এদিক ওদিক তাকালে সেই ভিড়ের ভেতর আবার জোলেখাকে দেখে। জোলেখাকে দেখে সে এগোতে থাকে। সামনের মানুষটা তাকে ঠেললে, সেও লোকটাকে ঠেলে। কোমরে লুঙ্গির গিঁট শক্ত করে বেঁধে লাফ দিয়ে জোলেখার পেছনে এসে থামে। তাতেও জোলেখা পেছনে না ফিরলে সে ক্যাঁত করে লাথি কষায়। এতে জোলেখা বিবির ঘুম ভাঙে বটে। আব্দুল কাদেরকে ঠেলা মেরে খেঁকিয়ে উঠে বলে, এঁড়ে গরুর মত ল্যাঙ মারতোছো কাকে, অ্যা? বুড়োর সখ কম না! তন্দ্রা কেটে যাওয়ায় আব্দুল কাদের তখন ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থেকে খানিক। কোলের ছাবালটাকে নিয়ে পাশ ফিরতে ফিরতে জোলেখা বিবি তবু বিড়বিড় করে। তারপর কখন থেমে গিয়ে আবার নাক ডাকতে শুরু করলে আব্দুল কাদের হাসরের ময়দানে ছুটতে ছুটতে, কোন জাহেল মানুষের জোব্বার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেও পাশের মাগিটার পোঁদ তাক করে ডান পায়ে কষানো লাথিটার লেগে নিশপিশ করে। তারপর ঘুমে কখন চোখ মুদে এলে আবার হাসরের ময়দানের দরজা খুলে যায়। পরেজগার লোক আর জাহেল লোক তাকে সব হুসহুস করে ডাক পাড়ে। সে একবার ভাবে, যাই। এইসব ডাকে সাড়া না দেওয়া গোনার কাজ। হাসরের ময়দান তাকে ডাকছে আর সে যাবে না? কিন্তু কী কারণে সে নিজেও জানে না, সে খালি এক জায়গায় থির মেরে বসে থাকে। বসে থাকে আর তলিয়ে তলিয়ে যায়। যেতে যেতে আধলা ইটের মত কিছুতে ঠোক্কর লাগলে তার ঘুম কেটে যায়। চ্যাতনা হলে বুঝতে পারে ফজরের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। সে তড়াক করে লাফ মেরে নাপাক শরীরটাকে টেনে টেনে গোসল ঘরে নিয়ে যায়। অজু সেরে লুঙ্গির গিঁট বাঁধতে বাঁধতেই মসজিদে ছোটে।
গেল বছর বকরি ইদের আগের মাসে আব্দুল কাদেরকে মসজিদ কমিটি মুয়াজ্জিন হিসেবে নিযুক্ত করেছে। গত বছরই যখন প্রথম মসজিদটাতে জুম্মার নামাজ পড়ানো শুরু হল – সেই প্রথম নামাজটা কিন্তু পড়িয়েছিল আব্দুল কাদের। এখনও সেই দিনটার কথা মনে পড়লে আব্দুল কাদের মুচকি মুচকি হাসে।
অবশ্য মসজিদটার বয়স কম না। আব্দুল কাদের ন্যাংটো বয়স থেকে ফকির মোল্লার দু’নম্বর বউ জৈগুন বিবির খোয়াবের কথাটা শুনে আসছে। তখন কত সাল আব্দুল কাদের ঠিক হিসেব কষে বলতে পারে না। তার বাপ বলত বটে সেবছর তাদের গ্রামের একমাত্র প্রাইমারি ইস্কুলে সৈন্যরা সেবার ক’হপ্তার লেগে আস্তানা গেড়েছিল। তা সেই সৈন্যারা ছ্যালো ভাল মানুষ। কোন যুদ্ধটুদ্ধ করতে দেখেনি কেউ। তারা খালি কখনোসখনো ইস্কুল মাঠ পেরিয়ে এদিকটায় আসত দিশি মুরগীর সন্ধানে। কারো সঙ্গে তেমন মিশত না। একবার নাকি কেউ ঐ স্কুল ঘরের দিক থেকে গুলির আওয়াজ শুনেছিল। ব্যাস, আর ইছু না। তবে গ্রামের লোক ভয় পেত তাদের। এরা তো আর এমনিতেমনি মানুষ না। তারা টিনের খাবার খেত। টিনের দুধ, টিনের মাছ, টিনের মাখন। একদিন ফকির মোল্লা ইস্কুল ঘরের পেছন থেকে একখানা টিন কিভাবে যেন জোগাড় করতে পেরেছিল। আব্দুল কাদেরের বাপ আর ফকির মোল্লা হাসিম আলির ঘরের পেছনের পাকুড় গাছের তলায় বসে সেই টিন কুড়ে কুড়ে মাখন খেয়েছিল। আহ, সে যে কী স্বাদ! আব্দুল কাদেরের বাপ গল্পটা বলার সময় সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে থুতু টানত। এখনও আব্দুল কাদের স্মৃতিচারণের সময় সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে থুতু টানে। যেন সে নিজেই টিন থেকে মাখন খেয়েছিল!
জৈগুন বিবি যে সময় খোয়াবটা দেখেছিল – সেটা যে এই সময় তা আব্দুল কাদের জানবে কোন উপায়ে? তবু যেকোন পুরনো সময় মানেই তো যুদ্ধ আর সৈন্য আর খোয়াব। তাই সে ভাবে, এইরকমই এক রাতে চালকল মাঠের পাশের করমচা গাছটার তলায় জৈগুন বিবি একজন বুড়ো আদমিকে নামাজ পড়তে খোয়াবে দেখে। সেই বুড়োর সাদা ধবধবে দাড়ি আর গায়ে রসুনের খোলার মত পাতলা পাঞ্জাবি চাপানো। তিনি যতবারই সেজদায় যান ততবারই আসমান থেকে আল্লাতাল্লার তৈরি করা জ্যোতিষ্করা মাটিতে নেবে আসে। যেন তার জায়নামাজ আল্লা তারা আর মেঘ আর চাঁদ দিয়ে তৈরি করেছে।
ফকির মোল্লার প্রথম পক্ষের বউ-এর সাত ছেলেমেয়ে। দ্বিতীয়পক্ষ জ্জৈগুন বিবি নিঃসন্তান। তবে এই বাঁজা মেয়েছেলের খোয়াবে কে এসে নামাজ পড়ে গেল? ফকির মোল্লার বড় বিপদ! সে কোন কূলকিনারা খুঁজে পায় না। করমচা গাছ সংলগ্ন জমিটা ফকির মোল্লার নিজের। তাই করমচা গাছটার কাছে গেলেই তার গা ছমছম করে ওঠে। কে যেন তাকে কিছু বলতে চায়। সে কান পাতে। কান পাতলে চালকলের ঘড়ঘড় শব্দ কানে আসে।
এখন করমচা গাছটা কেটে সেই জায়গায় মসজিদ বানানো হয়েছে। তবে জুম্মার নামাজ শুরু হল সবে গত বছর। চন্দননগর মারকাজে আব্দুল কাদেরই প্রথম সুপারিস করেছিল যাতে মসজিদটাতে জুম্মার নামাজ পড়ানো চালু করা হয়। এই মহল্লায় লোকজন তো কম না। তারা কেন শুক্কুরবার শুক্কুরবার অতদূর গাজী পাড়ার মসজিদে নামাজ পড়তে যাবে? মহল্লায় মসজিদ রয়েছে। মসজিদটা সাইজেও ছোট না। ওটাকেই তবে জামে-মসজিদ করা হোক।
ছাত্তার সাহেব এই অঞ্চলের বড় ওস্তাগার। তার বড় ছেলে আবার ফেড মেশিন ফেলে ইদানিং বেশ পয়সাকড়ি করেছে। তাছাড়া ছাত্তার সাহেবের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কখনো ক্বাযা হয় না। এই ছাত্তার সাহেব মারকাজের ভেতর আব্দুল কাদেরকে সাপোর্ট দেয়। আব্দুল কাদেরের সুপারিসটা আরও জোর পায় তাতে। সেই বছরই, শেষের দিকে, মসজিদটার দেয়ালে সিমেন্ট দিয়ে নতুন নাম লেখা হল। নামে শেষে ‘জামে-মসজিদ’ শব্দটিও স্থান পেল।
এখন মসজিদটার ভেতরে আজান দিতে বড় ভাল লাগল আব্দুল কাদেরের। মসজিদে আসবার সময় মৃদু বাতাস বইছিল চারধারে। সেই বাতাস লেগে শরীরটা আচমকা চাঙ্গা হয়ে গেল। গতরাতে তেমন জাঁকিয়ে ঘুম আসেনি তার। তবু আজান দিতে দিতে সুরটা যত উপরে ওঠে, সে সুরের সঙ্গে মিশে যেতে থাকে। একবার সুরের সঙ্গে মিশে যেতে পারলে তার বাম হাতটা অনায়াসে বাম কানের উপর চলে আসে। চোখ আপনাআপনি বুজে যায়। সে নিজের গলার সুর নিজেই শোনে আর ভাবে চোখ খুললেই সে দেখবে জৈগুন বিবির খোয়াবে দেখা সেই বুড়ো আদমিটা আসমানের চাঁদ আর মেঘ আর হাওয়াকে জায়নামাজের মত বিছিয়ে নিয়েত বাঁধবে বলে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার সামনে। আজান শেষ হয়ে এলেও তাই খানিকক্ষণ সে চোখ বন্ধ করে থাকল।
কিন্তু আজ যে তার আজান দিতে এত ভাল লাগল তা কি শুধু শরীরটা চাঙ্গা হয়ে গেল বলে? আব্দুল আদের তলপেটে চাপ দেয়। চাপ দিতেই বেশ খানিকটা নিম্নবায়ু সশব্দে বেরিয়ে চলে। সে শব্দ শুনেই বুঝতে পারে এই বায়ুতে গন্ধ থাকবে না। তবে তার অজু ভেঙে গেছে। অজু ভেঙে যাওয়ায় নিজের উপরি রাগ হল আব্দুল কাদেরের। এখুনি নামাজ শুরু হবে। সে তাই মসজিদের পাশে, যেখানে অজু সারার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেখানে গিয়ে প্লাস্টিকের কল চালিয়ে ঠান্ডা পানিতে কনুই অব্দি পাঞ্জাবি তুলে অজু সারে। তারপর ডান পায়ের পাতাটা পানির তলায় ধরলে সে আসল কারণটা টের পায়।
ইলিয়াস মৌলনা এই অঞ্চলের কেউ না। সবে বছর দুই হল তিনি এখানে এসে বাসা গেড়েছেন। তবে কিনা মসজিদ কমিটি তাকেই এই মসজিদের ইমাম বানালো? আর আব্দুল কাদের হয়ে গেল মোয়াজ্জিন! নিজের উপরি থুতু দিতে ইচ্ছে করে আব্দুল কাদেরের। ছাত্তার সাহেবের সাথে ইলিয়াস মৌলনার কীসের এত ভাব? আব্দুল কাদের নিজের মনেই ছক কষে। ছক কষতে কষতেই সে নিয়েত বেঁধে নামাজে দাঁড়ায়।
নামজ শেষে আব্দুল কাদের খানিক হেঁটে রেললাইনের গুমটির কাছে ইয়াসিনের দোকানে চা খেতে ঢোকে। এই হয়েছে তার এক দোষ! ইয়াসিনের চা না খেলে তার আবার ঠিক মত পায়খানা হয়না। তখন সারাদিন পেটটা খলি চিনচিন করে। জিভটা টক হয়ে আসে। খালি থুতু ওঠে। রোজার মাসে ইয়াসিনের চায়ের লেগে মনটা তবু যা একটু খুঁত খুঁত করে। এমনিতে দুপুরের দিকে খিদেটিদে বা পানি খিসে পায়না তার।
ওদিকে হাঁটুতে বাতের ব্যথা নিয়েও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চা খেতে এসেছে হুজুর। ইলিয়াস মৌলনা ইমাম বনে যাবার পর থেকে সব্বাই তাকে হুজুর বলে ডাকে। কাদের হুজুরের দিকে তাকিয়ে সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে চা টানে।
হুজুর বলে, কাজটাজ কেমন চলতেছে কাদের ভাই?
- মোদের আবার কাজকাম। মোদের তো সেই কাজঘর সেলাইয়ের কাজ। কখন কাম এসবে সেই দিকে তাকিয়ে থাকা। এখন আবার কতকিসিমের মেশিন উঠেছে। মেশিন বসাতি পারলি লাভ আছে বটে। তবে আল্লাতাল্লা যাকে যেমন রেকেচে।
মসজিদের পাশে ইলিয়াস মৌলনার হেকিমির দোকান। তিনি রোজ সকাল দশটায় দোকান খুলে টুলের উপর বসে পেপার পড়েন। সামনের টেবিলে হরলিক্সের খালি বোতলে কতসব রোগের জন্য পান-পড়া রাখা। অসুখবিসুখ হলি, বউ পালালি, ছেলেপুলে হারাম কাজ করতি শুরু করলি তিনি এই পানি-পড়া দেন। হাওয়াবাতাস লাগলি অবশ্য তাবিজমাদলি করতি হয়। তাতে পয়সা আসে বেশী। তবে সবথেকে বেশী পয়সা কারো কিছু চুরি গেলে। তখন তিনি ভাত-পড়া করে সন্দেহভাজন সকলকে সেই ভাত খেতে দেন। সকলেই ঠিকঠাক গিলতে পারে। কিন্তু চোরের গলা দিয়ে সেই ভাত নাবে না। গলার ভেতর খালি জড়িয়ে জড়িয়ে যায়। জোর দিয়ে গিলতে গেলে মুখ দিয়ে রক্ত উঠে আসে।
আব্দুল কাদের বলে, বাতের ব্যথাটা বেড়েচে নাকি?
- হুম।
- দাওয়াপানি কিছু খাওয়া না কেন?
হুজুর কথা ঘুরিয়ে বলেন, শুনেছো তো ছাত্তার সাহেব এবার হজে যাচ্ছে?
কাদের খবরটা শুনে চুপসে যায়।
সে আর কথা বাড়ায় না। চায়ের কাপটা ইয়াসিনের হাতে দিতে দিতেই পেটটা মোচড় দিয়ে ওঠে। পেটটা মোচড় দিতেই তার আবার মনটা ভাল হয়ে যায়। সে মৌলনাকে সালাম জানিয়ে ঘরের দিকে রওনা দেয়।
ওদিকে জোলেখা বিবি এই সাতসকালে চুলোয় আগুন ধরিয়েছে। চুলোর ধোঁয়ায় হাগতে হাগতে কাদেরের চোখ জ্বালা করে।
ভাতারের সুখ সহ্য হয়না! নিজের মনেই সে বিড়বিড় করে। তারপর পেট ঝেরে হাগার পর মনের প্রশান্তি নিয়ে বসে থাকে খানিক। ছাত্তার সাহেব তবে এই বুড়ো বয়েসে হজে চলেছে? সে মৌলনাকে নকল করে নিজের মনেই বলে, পলিটিক্স, সব পলিটিক্স!
আসলে আব্দুল কাদেরের সুপারিশে মসজিদটা যখন জামে মসজিদে উতরে গেল, সে-সময় সে নিজেই ভেবেছিল এবার তার ইমাম হওয়া কেউ রুখতে পারবে না। কতদিনের সখ সে জুম্মার নামাজ পড়াবে সকলকে। নামাজ শেষে মোনাজাত করানোর সময় তার গলা ভিজে যাবে। চোখের পানি চোখের কোলে এসে টলটল করবে। তখন চোখের পাতা ফেললেই গাল বেয়ে পানি সুড়ুত করে নেমে আসবে হাতের তালুতে। কিন্তু প্রথমবার নামাজ পড়ানোর সময় আয়াতগুলো খালি গালের ভেতর জড়িয়ে জড়িয়ে গেল। আবার যখন সে মেঝেয় কপাল ঠেকিয়ে সেজদায় গেল, মনে হল, পেছনের সারির লোকগুলো তাকে ঠিক দেখতে পাচ্ছে তো! কাদেরের উচ্চতা কম। এই সেদিনেও গ্রামের মুরুব্বিরা তাকে বাঁটু বাঁটু করে ডাক পাড়ত। আচমকা তার নিজের ছোট সাইজের লেগে দুঃখ লাগে। মোনাজাত করানোর সময় তার গলা মিনমিনে শোনায়।
ওদিকে ঠিক হয়েছে মগরেববাদ মসজিদ কমিটি মিটিঙে বসবে। মিটিঙে এই অঞ্চলের নামজাদা ওয়াহেদ মৌলানা আসবেন। তিনিই মিটিঙের সর্বময় কর্তা। জুম্মার নামাজ শেষে আব্দুল কাদের তাই ছাত্তার সাহেবকে হাতে রাখতে তার বাড়িতে যায়। এধারওধার কথা বলার পর ছাত্তার সাহেব তাকে কাজঘর সেলাইয়ের বরাত দেন। তারপর একখিলি পান মুখে দিয়ে বলেন, মোর তো বয়েস হইচে। দুঃখ লাগে খুব। মোর বুঝি হজে যাওয়া হল না।
কাদের ছাত্তার সাহেবের কাছে চিলিমচীটা এগিয়ে দেয়।
ছাত্তার সাহেব তাতে পানের পিক ফেলে বলেন, তোমার তো শরীল-স্বাস্থ্য ভাল। হ্যাগা, কাউকে বদলি হজে পাঠাতি গেলি কেতাবে কী নিয়ম আছে বল তো?
ছাত্তার সাহেব কাদেরকে বদলি হজে পাঠাবে? খুশিতে কাদেরের বুক দুকপুক করে। সে নিজের মনেই বলে, আল্লা যা করে ভালোর লেগেই করে। কিন্তু কিছু বলতে গেলেই কথা হারিয়ে ফেলে। ছাত্তার সাহেবের কাছে তার এখানে আসার আসল কারণটাই পাড়া হয় না।
মিটিঙে ওয়াহেদ মৌলনা ইমাম হিসাবে ইউনুস মৌলনার নাম প্রস্তাব করলেন। ছাত্তার সাহেব তাতে সম্মতি দিলেন। ওদিকে মসজিদের মোয়াজ্জিন বনে গেল আব্দুল কাদের! এখন সে নামাজের আগে মসজিদে গিয়ে আজান দেয়। তাই আব্দুল কাদের লোটা থেকে পানি ঢেলে ছুঁচতে ছুঁচতে আবার বলে, পলিটিক্স, সব পলিটিক্স!
এর কয়দিন পর, ইয়াসিনের দোকানে চা খেতে গেলে আব্দুল কাদের শোনে, ছাত্তার সাহেব হজে যাবার লেগে কলকাতায় গে’ ট্রেনিং নিচ্ছে। পাসপোর্ট-টাসপোর্ট সব রেডি।
ছাত্তার সাহেব হজে চলেছেন – কথাটা লোকমুখে চাউর হয়ে যায়। কত লোক তাঁর ঘরে গিয়ে দেখা করে আসে। ওখেনে গে’ মোর জন্যি দোয়া কোরো – এই অনুরোধ প্রায় সকলেই করে। ছাত্তার সাহেব মুচকি হেসে তাদের আশ্বাস দেন। বয়স কম নয় ছাত্তার সাহেবের। সত্তর তো হবেই। জ্যান্ত শরীরে তিনি এখানে আর ফিরবেন কিনা – সকলেরই সন্দেহ জাগে। ভাগ্যি বটে ছাত্তার সাহেবের। কত না নেকীর কাজ করলে তবে ওখানে গিয়ে মরবার স্বাদ পাওয়া যায়! হয়ত অনেকেই, নিজেদের অজান্তে, ছাত্তার সাহেবের মৃত্যুকে কল্পনা করে। হজের দিন যত নিকটে আসে, ছাত্তার সাহেবও তাই বুঝি তত সরল হয়ে যান।
ছাত্তার সাহেব হজে চলেছেন – এতে জোলেখার এত খুশি হবার কী! সে সকালবেলাতেই কোনরকমে রান্না সেরে কোলের ছাবালটাকে নিয়ে ছাত্তার সাহেবের ঘরে ঢোকে। এখন খালি সারাদিন কুটুম আসে সেখানে। ছাত্তার সাহেবের বউ, ছেলের বউ, চার মেয়ে মিলেও সব ঝক্কি সামলাতে পারেনা। তাই জোলেখার ডাক আসে রোজ। এমনিতে ছাত্তার সাহেবের বউ মানুষটা খারাপ না। এই তো সেদিন, তাঁর বড় মেয়েকে বটতলা থেকে দেখতে এল। মেয়েকে দেখতে এলে কত কিসিমের কাজ। পোলাও-পরোটা করো রে, ঘর সাফ করো রে, মেয়েকে সাজাও রে, তারপর ঘরের রোজকার কাজ তো আছেই। সেইসময় জোলেখাকে ডাকতে ছাত্তার সাহেবের বউ নিজে কাদেরের ঘরে আসে। আবার সব কাজ মিটে গেলে কেদেরের জন্য পোলাও-পরোটা দিতেও ভোলে না।
এখন জোলেখা সাঁঝেরবেলা ফিরে এসেই ছাত্তার সাহবের গল্প বলে। ছাত্তারের ছেলেই নাকি বাপের হজে যাবার সব খরচ দিচ্ছে। একদিন ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকেও লোকজন এসেছিল। ছাত্তার সাহেব মগজ ভাজা খেতে বড় ভালবাসেন। তারা তাই বেয়ানের জন্য গরুর মগজ ভেজে এনেছিল।
আব্দুল কাদেরের এইসব গল্প শুনতে একদম ভাল লাগে না। তবু সে জোলেখার মুখে এইসব গল্প শুনতে একপ্রকার বাধ্যই থাকে। তাই রাতের বেলা জোলাখা ঘুমিয়ে গেলে পর সে জেগে ওঠে। তখনি জোলেখার পোঁদ তাগ করে লাথি কষাবার লেগে তাঁর ডান পা’টা নিশপিশ করে!
এমনিতে ফজরের নামাজ ছাত্তার সাহেব নিজের ঘরেই পড়তেন। কিন্তু এখন ভোরবেলাতেও মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে শুরু করে দিয়েছেন। নামাজের শেষে তিনি ইয়াসিনের দোকানে গিয়ে চা খান। সেখানে কাদেরের সঙ্গে তাঁর কথালাপ চলেঃ
ছাত্তার সাহেব বলেন, বড় মেয়ের বে’টা দে’ দিতি পারলি খোলা হাতপায়ে যেতি পারতুম।
- তা ঠিক।
- তবে মোর ছেলেটা হইছে পুরো মোর মতন। কোন বদ নেশা নাই। দুনিয়ার সব দিকে তার নজর। কাল দেখি মোর লেগে একটা বাটার চপ্পল কিনে এনেচে। বলে কী না, হজে গে’ সাতপাক ঘোরবার সময় পায়ে নরম জুতো পেলি আরাম পাবে।
আব্দুল কাদের চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, তা আপনার যাবার ডেট পড়েছে কবে?
- পরের হপ্তায়। শুক্কুরবার। প্রথম প্লেনটা যাবে বুধবার। মোরটা থার্ড প্লেন। শুক্কুরবার একদম আঁধার থাকতি থাকতি যেতি হবে।
- ভাল দিনেই আল্লার ডাক এইচে।
ছাত্তার সাহেব আবার মুচকি হেসে ছেলের গাওনা গায়, তা ছেলে বলতে ছ্যালো বুধবার তো হপ্তার দিন, ঐ দিনেই মহল্লার সব্বাইকে দাউত দেবে। মুই বারণ করে দিচি। একে তো মোকে হজে পাঠাচ্চে, তাঁর উপর আবার খানা করলি ওর উপর চাপ বাড়বে না? বলিচি ঐ টাকা বেঁইচে রাখ। তোর বোনের বে’তে সক্কলকে খাওয়াবি। কী বল?
আব্দুল কাদেরের পেট মোচর দিচ্ছিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, হুম।
শুক্রুবার ভোরবেলা ছাত্তার সাহেব এয়ারপোর্টে রওনা দেবেন। ছাত্তার সাহেবকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিতে আরও তিরিশ জন সঙ্গে যাবে। জোলখা বিবির খুব সখ যাতে আব্দুল কাদেরও এয়ারপোর্টে ছাত্তার সাহেবকে এগিয়ে দিতে যায়। কিন্তু কাদের, মোর শরীলটা ভাল না গো। খালি হাগা হগা পাচ্চে – এই বলে কাটিয়ে দেয়। আবার জোলেখার মান রাখতে আগের দিন এশার নামাজ পড়ে ছাত্তার সাহেবের সঙ্গে মোলাকাত করে আসে।
ছাত্তার সাহেবের বড় ছেলে চারটে টাটা সুমো ভাড়া করেছে। গাড়ি চারটে রেল লাইনের ধারে শফিকের ফেড কারখানার সামনের জমিতে রাতেই পৌঁছে গেছিল। ইউনুস মৌলানা চারটে কাগজে ‘হজ যাত্রী’ ছেপে ইয়াসিনকে দিয়ে এসেছিল। ইয়াসিন রাতের দিকে চায়ের দোকান বন্ধ করে ঘরে ফেরার পথে কাগজগুলো গাড়ির কাচে সেঁটে দিল।
পরের দিন ফজরের আজান দেবে বলে উঠলে আব্দুল কাদের দেখে গ্রামটা আর অন্যসব দিনের মত ঘুমিয়ে নেই। জোয়ানমরদরা ছাত্তার সাহেবকে বিদায় জানাতে বেরিয়ে পড়েছে। যারা ছাত্তার সাহেবের সঙ্গে গাড়িতে যাবে, তারা সব গা ধুয়ে পাঞ্জাবি পরে মাথায় টুপি লাগিয়ে ঘোরাফেরা করছে।
ইয়াসিন পাকা দোকানদার। সে আজান দেবার আগেই দু’ কেটলি চা তৈরি করে রেখেছিল। তার দোকানে এখন বেশ ভিড়।
আব্দুল কাদের মসজিদে এসে মাইকের সামনে দাঁড়ায়। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে দু’দন্ড থামে। এদিকওদিক তাকায়। তারপর ‘আল্লা’ বলে সুর টেনে আজান দিতে শুরু করে। যেন যারা এই ভোরবেলাতেই সেজেগুজে ছাত্তার সাহেবের সঙ্গে এয়ারপোর্টে যাবে বলে তৈরি হয়েছে তাদেরকে আরও বেশী করে আজান শোনানোই তার উদ্দেশ্য। সে আরও জোরে সুর চড়ায়। সুর আরও উপরে উঠলে সে আর কন্ঠ বেঁধে রাখতে পারেনা। তার দম বুঝি শেষ হয়ে যায়। তবু সে থামে না। তার গলা থেকে কফ বেরিয়ে এসে মাইকে ছিটকয়। সে আজান দিতে দিতে কফটুকু সাফ করে। এক সময় সে নিজেই বুঝতে পারে তার সুরটা চেঁচামিচির মত শোনাচ্ছে। আব্দুল কাদেরের মন খারাপ হয়ে যায়।

ছাত্তার সাহেবের হজে ছলে যাবার কয়দিন পরেই গ্রামে বকরি ইদের মরসুম লেগে গেল।
শুরুটা করল আবশ্য কালাম মোল্লা।
একদিন দুপুরে পাড়াতে আচমকা হৈ হৈ ব্যাপার। ছেলেছাবালরা সব দৌড়ে কালাম মোল্লার পুকুরের দিকে চলেছে। কী হয়েছে? আব্দুল কাদের কাকে যেন জিজ্ঞেস করে। সে কোন জবাব না দিয়ে ঐদিকেই চলে যায়। শেষে আব্দুল কাদের নিজে গিয়ে দেখে – কালাম মোল্লার পুকুরের পাশের কাঁঠাল গাছটার গোড়ায় একটা ছোটখাটো, গোলগাল গরু বাঁধা। গরুটার কুঁজটা বেশ উঁচু, শিংটা ভাঙা। কাদের বলে, তা মিয়া এই গরুর গোস্তয় টেস্ট ভাল। কালাম মোল্লা তা শুনে খুশি হয়।
আবশ্য ছাত্তার সাহেব গ্রামে না থাকায় ইদটা ম্যাড়ম্যাড়ে ঠেকছে। সকলই তাকিয়ে এখন ছাত্তার সাহেবের বড় ছেলের দিকে। চাঁদরাতের আগের দিন সে কিরম গরু কিনে আনে সেটাই দেখার। তবে জামাল ওস্তাগার এবার বেশ দামী গরু দিয়েছে। ইয়াসিনের চায়ের দোকানে গেলেই কাদের খালি এখন জামাল ওস্তাগারের গরুটার নাম করে। বুঝি কেউ একজন ছাত্তার সাহেবের থেকে ভাল গরু দিক – এই তার ইচ্ছা।
হজ থেকে ছাত্তার সাহেব ছেলের সঙ্গে প্রায়ই ফোনে কথা বলেন। কথাগুলো এ-ওর মারফত ইয়াসিনের দোকানে এসে পৌঁছুলে গল্পের আকার নেয় যেন। বদরুদ্দিন জানলেঅলা লোক। তারওপর সে আবার ছাত্তারের বড় ছেলের দোস্ত। সে বলে, ওখেনে পানি কিনে খেতি হয়। কিন্তু পেট্রোল ফাউ। ধরো তুমি পাম্পে গে’ ট্যাঙ্কি ফুল করলে, এতে তোমার পয়সা লাগবে না।
আব্দুল কাদের বলে, তাহলে তো ট্যাস্কিও ফাউ? ট্রেনে চড়ার থেকি ট্যাস্কি চড়লি লাভ।
বদরুদ্দিন চায়ে চুমুক দিয়ে হাসতে হাসতে বলে, দু’ চাকার গাড়ি ফ্রি হলি কী হবে, চার চাকার গাড়ির জন্যি তেল কিনতি হবে। ওখেনে পানির থেকি তেল সস্তা। ধরো এক কিলো তেলের দাম বারো-তেরো টাকা হবে।
কাদের তাও বলে, তালে তো একই হল। মোরা পানি কিনি না তেল কিনি, আর ওনারা তেল কেনে না পানি কেনে।
বদরুদ্দিন আরও বলে, লাখ লাখ লোক যাচ্ছে প্রতি বছর। কিন্তু রাস্তাঘাট সব ঝকঝক ঝকঝক করতেছে। যেন ঐ রাস্তায় বসেই ভাত খাওয়া যাবে। বাসুন লাগবে না।
ভাত খাবার প্রসঙ্গে সে আবার বলে, হজের শেষ দিনে ঐ দেশের রাজা সবকটা হাজিকে বিরিয়ানি খাওয়ায়। সেই বিরিয়ানির যে কী স্বাদ!
সে থেমে গিয়ে সেই স্বাদের বিশেষণ খোঁজে।
সেই সুযোগে কাদের বলে, তা বদুভাই তুমি কতসব জানো। তোমার পরিবারের কেউ হজে গেচে কোনদিন?
বদরুদ্দিন চুপ মেরে যায়। বদরুদ্দিনকে চুপসে যেতে দেখে আব্দুল কাদের হাল্কা মনে ঘরে ফেরে।
বকরি ইদের কয়দিন বাকি থাকতে গ্রামে গ্রামে সাইকেল করে ছুরিতে ধার দেবার লোক আসে। তারা গৃহস্থের ঘরের সামনে সাইকেলকে স্ট্যান্ড করিয়ে সিটের উপর উঠে প্যাডেল ঘোরায়। প্যাডেল ঘোরালে সাইকেলের সামনের রডে জোড়া চাকতিটাও ঘোরে। তখন ঐ চাকতির উপর ছুরিটা ছোঁয়ালেই আগুনের ফুলকি ছিটয়।
আব্দুল কাদের ঘরে ফেরার পথে দেখে – ছাত্তার সাহেবের বড় ছেলে ছুরিতে ধার দেওয়াচ্ছে।তার মনে খটকা লাগে। তবু সে ঘরে ফিরে জোলেখার কোল থেকে ছাবালটাকে নিয়ে মেতে ওঠে, আসাদুজ্জামান বলতো বিসমিল্লা।
আসাদুজ্জামান বাপের দাড়িতে হাত বুলায়। তা দেখে জোলেখাও হাসে।
কিন্তু আব্দুল কাদেরের আনন্দবোধ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না। দুপুরের দিকে খবর আসে ছাত্তার সাহেবের বড় ছেলে নাকি জামাল ওস্তাগারকেও টেক্কা দিয়েছে।
জোলেখা বলে, মুই তো দেখে এলুম। ঐ গরুর পোঁদে রুটি ঘষলি রুটিটা পারাটা হয়ে যাবে। এত চর্বি!
আব্দুল কাদের খালি ‘অ’ বলে আবার কাজঘর সেলাইয়ে মন দেয়। সে প্রায় ভুলেই যায় যে আজকে চাঁদরাত।
ছাত্তার সাহেবের বড় ছেলে কিন্তু বাপকেই কৃতিত্ব দেয়। বলে, আব্বার নজরই আলাদা। আব্বাই তো গরুটা চয়েস করে কিনে খাটালে রেখে দে’ গ্যাছিলো। অদ্দিন আগে আনলি ঝক্কি তো কম হত না। তাই আজকে আনলুম।
ওদিকে হয়েছে এক বিপদ! সকাল থেকে ইউসুফ মৌলনার খবর নেই। বিকেলের দিকে জানা গেল তাঁর নাকি বসন্তের গুটি বেরিয়েছে। গা বেশ গরম। উঠে দাঁড়াতে পারছেন না। একদিনেই শরীরটা কাহিল হয়ে গিয়েছে।
বকরি ইদে যারা গরু দেয় তাদের প্রচুর কাজ। নামাজের শেষে গরু জবাই শুরু হয়। তাই বকরি ইদের নামাজ আরম্ভ হয় রোজার ইদের থেকে তাড়াতাড়ি।
ইউসুফ মৌলানা এবার নামাজ পড়াতে পারবেন না। মগরিফের নামাজের পর মিটিং-এ ঠিক হল – কবীর গাজীই এবার নামাজ পড়াবেন। কিন্তু তিনি বুড়ো মানুষ। তিনি তো আর এই মহল্লার সবকটা গরু জবাই করতে পারবেন না – তাই একাজে তাকে সাহায্য করবে, আর কেউ না, আব্দুল কাদের।
ফজরের নামাজের পর আব্দুল কাদের আবার বিছানায় গড়িয়ে নিচ্ছিল। শুয়ে শুয়েই সে জোলেখাকে খুঁজল। বউটা গেল কই? আজকে ইদের দিন। কোথায় আঁধার থাকতে থাকতে উঠে চুলো জ্বালিয়ে সিমুই পারাটা বানাবে, তা না, মাগী আবার বাইরে বেরিয়েছে। সে আবার জোলেখাকে ডাকে। কিন্তু সাড়াশব্দ পায়না। তারপর ঘড়ির দিকে তাকালে বুঝতে পারে সাড়ে ছটা বেজে গেছে। সাড়ে সাতটায় ইদের নামাজ শুরু হবে। সে তাড়াতাড়ি উঠে গা ধুয়ে নেয়। গা ধুয়ে নতুন লুঙ্গিটা পরে গায়ে পাঞ্জাবী চাপায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আঙুল মটকায়। গরুর সাঁকি কাটবার লেগে তার হাতটা নিশপিশ করে ওঠে।
কবির গাজী বুড়ো লোক হলে কী হবে, মানুষটার গলায় জোর আছে এখনও। তিনি নামাজের আগে বয়ান শুরু করলেন। বয়ানের ভেতর নবী মুসার কাহিনীটাও জুড়ে দিলেন। তারপর নামাজের পূর্বে নামাজের নিয়মাবলী সকলকে স্মরণ করিয়ে দিলেন।
নামাজের পরেই ছেলেছোকরারা সব গরু ফেলা দেখতে কালাম মোল্লার পুকুরপাড়ে ছুটলো। কালাম মোল্লার গরু ছোটখাটো হলে কী হবে এতদিনে কেউ গরুটার গা ঘেষতে পারেনি। সকলেই ভাবে এই গরু খেল দেখাবে। কিন্তু বিহারী কসাইগুলো অযথা সময় নষ্ট করে না। একজন এসেই গরুটার মুখের দড়ি চেপে ধরে। তাতে গরুটা আর ঘাড় ঘোরাতে পারে না। অপরদিকে অন্য দু’জন কসাই পেটে দড়ি বেঁধে আড়াআড়ি টান মারে। এতে গরুটা ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। মাটিতে পড়ে গেলেই কসাইরা চারটে পা আর লেজ একসঙ্গে বেঁধে দেয়।
কবির গাজী কালাম মোল্লার গরু জবাই করতে চলেছে। এদিকে ছাত্তার সাহেবের বড় ছেলে কাদেরকে গতকালই বুক করে এসেছিল।
এবার ছাত্তার সাহেবের গরু ফেলা হবে। পাড়ার সবাই তাই সেদিকে চলেছে।
ছাত্তার সাহেবের গরু যেখানটায় বাঁধা – তার পাশে মাটি খুঁড়ে ছোট মত গর্ত করা হয়েছে। গরু কাটার পর রক্ত গর্তে ফেলে মাটি দিয়ে চাপা দেওয়া হবে।
গরুটা ভিড় দেখে খালি চোখ বড় বড় করে তাকায়। একবার অঁঅঁও করে ডাক ছাড়ে। লেজ উঁচু করে ছড়ছড় করে মুততে শুর করে।
ছাত্তার সাহেবের বাড়িটা দোতলা। গ্রামের মেয়েরা ছাদে উঠে এই দিকে ঝুঁকে আছে। পাশের আঁশফল গাছটায় উঠেও কেউ কেউ পজিশন নিয়েছে। বাকীরা ঠেলাঠেলি করে গরুটাকে ঘিরে কোনরকমে দাঁড়িয়ে।
আব্দুল কাদের নামাজের পর পাঞ্জাবীটা ঘরে খুলে আসতে ভুলে গেছিল। সে ভিড়ের ভেতর ইয়াসিনকে দেখে পাঞ্জাবিটা তার হাতে খুলে দেয়। এরই মধ্যে একজন কসাই গরুটার মুখে হাত বোলাতে বোলাতে মুখোশের দড়িটা শক্ত করে ধরে নেয়। গরুটা ঘাড় ঘোরাতে যায়। অন্য দুজন পেটে দড়ি বাঁধতে গেলে ল্যাঙ ছোড়ে। একটা পানি ভর্তি বালতি রাখা ছিল পেছনে। পায়ের ধাক্কায় সেটি ছিটকে পড়লে ছেলেছোকরারা চেঁচিয়ে ওঠে। আব্দুল কাদের আবার হাতের ছুরিটার দিকে তাকায়। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরে। মুহুর্তের জন্য সবকিছু যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। সেই সুযোগে অন্য দুজন কসাই পেটের দড়িতে টান দিতেই গরুটা ধপাস করে মাটিতে পড়ে।
পড়ে যাবার শব্দে আব্দুল কাদের একতলার জানলার দিকে তাকায়। ছাত্তার সাহেবের বউ-মেয়েরা সেই জানলা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে তখনও। তারা তবে গরু জবাই দেখতে চায়? আব্দুল কাদের কী ভেবে ভেতর ভেতর মুচকি হাসে।
কসাইরা ততক্ষণে গরুটার পা চারখানা বেঁধে টানতে টানতে ছোটমত গর্তটার কাছে নিয়ে গেছে। গরুটা গর্তটার উপর গলা বাড়িয়ে হাম্বা হাম্বা ডাক ছাড়ছে। আব্দুল কাদের লুঙ্গিটা হাঁটু অব্দি তুলে, কাছা বেঁধে, ছুরিটা লুঙ্গির উপর বোলাতে বোলাতে এগিয়ে আসে। তারপর উবু হয়ে বসে গরুটার গলার উপর ছুরিটা একবার ছোঁয়ায়। কিন্তু তখনি জবাই শুরু করেনা। কসাইগুলোকে গরুটাকে খানিক ডানদিকে সরাতে বলে যাতে জেনানারা তার জবাই ঠিক মত দেখতে পায়।
কসাইরা আবার গরুটাকে সরাতে গেলে আব্দুল কাদের চারদিকে নজর ঘোরায়। ছোকরারা এখন চুপ মেরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যারা গাছের ডালে উঠে দেখছিল তারা আবার অন্য কোথায় গরু ফেলা দেখতে যাবে কিনা ঠিক করতে না পেরে অর্ধেক নেমে আবার ঐদিকে তাকিয়ে। ছাত্তার সাহেবের বড় ছেলে একটা গামছা পিঠে নিয়ে কাদেরের থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে।
গরুটা আবার অঁঅঁও করে ডাক ছাড়ল। সেই ডাক শুনে আব্দুল কাদের দোয়াদরুদ পড়তে শুরু করল। তারপর একনজর একতলার জানলার দিকে তাকিয়ে ছুরি চালিয়ে দিল।
গলগল করে রক্ত বেরচ্ছে। রক্তে আব্দুল কাদেরের বুক অব্দি ভিজে গেছে। সারা গায়ে রক্ত মেখে সে উঠে দাঁড়াল। দাঁড়াতে দাঁড়াতে রক্ত মাখা ছুরিটা লুঙ্গিতে মুছে ছাত্তার সাহেবের বড় ছেলেকে দিয়ে দিল। ছাত্তার সাহেবের বড় ছেলের দিকে তাকালে তার বেশ মজা লাগল। একতলায় নজর দিলে দেখল ওখানে এখন আর কেউ নেই!
চারদিকের ভিড় আচমকা ফাঁকা হয়ে গেল। তারা সব অন্য গরু জবাই দেখতে চলেছে। আব্দুল কাদের তবু সেখানে খানিক থেকে গরুটার মরে যাওয়া দেখে। গরুটা তখনও মরেনি। কিন্তু কসাইরা ছাল ছাড়ানো শুরু করে দিয়েছে। পেটের কাছটা তাই মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠছে।
এবার সে কাছাটা খুলে কোমরে শক্ত করে গিঁট বাঁধে। সকাল দশটা বেজে গেছে। চারদিকে রোদ ঝকঝক করছে। এরই মধ্যে তার বুকে গরুটার রক্ত শুকিয়ে গেছে। কব্জির দিকটায় বসা-রক্ত চামড়া কুঁচকিয়ে দিয়ে চামড়ায় টান ফেলেছে। সে পুকুরে গিয়ে গা-হাত-পা সাফ করে না। বুড়ো আঙুলটা নাকের কাছে এনে জোরে জোরে নিঃশ্বাস টানে। রক্তের ঘ্রাণ নিলে তার বুক চিতিয়ে ওঠে। সে ঘরের দিকে হাঁটা লাগায়।
ঘরের দিকে আসতেই তার সন্দেহ জাগে। ভেতর থেকে কে যে কেঁদে চলেছে!
সে ঘরে ঢুকে ‘জোলেখা, ও জোলেখা’ বলে ডাক ছাড়ে। কাদেরের ডাক শুনেই জোলেখা আরও জোরে জোরে কেঁদে ওঠে। তারপর কাদেরকে দেখে ফুঁপিয়ে বলে, ওগো মোর একী হল গো?
কাদের আসাদুজ্জামানকে খোঁজে। সেও জোলেখার কোলে শুয়ে মায়ের সঙ্গে কাঁদছে।
কাদেরের আর ধৈর্য্য ধরে না। হল কী?
জোলেখা তবু কান্না থামাতে পারে না। কোনরকমে বলে, মোর খোয়াবে দেখি কী...
- কী দ্যাখো কী?
- দেখি উনি মোর খোয়াবের ভেতর নামাজ পড়তেছে। ওগো কী যে রূপ যে তানার! সারা শরীল দে’ শুধু নূর বেরচ্ছে গো?
- কোথায় নামাজ পড়তে ছ্যালো?
- জায়গাটা ঠিক ঠাওর করতে পারিনি। জোলেখা আবার কাঁদতে শুরু করে।
কাদের এগিয়ে এসে জোলেখার পিঠে হাত বোলায়, কোথায় চিনতি পারো নি?
জোলেখা কাদেরের কাঁধে মুখ গোঁজে।
কাদের আবার জিজ্ঞেস করে, কোথায়?
- বাঁশ দে’ ঘেরা যেন। ওপরে ত্রিপল খাটালি যেরম হলদেটে আলো পড়ে, সেইরকম আলো চাদ্দিকে।
- আর কেউ ছ্যালো না?
- না গো না। আর কেউ নেই। উনি একলাই নামাজ পড়তি ছ্যালেন। কী যে রূপ ওনার। উনি সেজদা দিলি দেখি সামনের দোতলা ঘরটাও সেজদা দিচ্ছে।
- সামনে দোতলা ঘর ছ্যালো? হলুদ রঙের ঘর?
জোলেখা আর কথা বলতে পারে না। কাদের নিজের মনে কীসের যেন হিসেব কষে। জোলেখাকে জড়িয়ে ধরলে শুকনো রক্তের গন্ধে জোলেখার বমি বমি পায়। কোলের ছাবালটা আবার কেঁদে ওঠে। কাদের তবু জোলেখাকে ছাড়ে না।