প্রতিযাত্রা

গাজী তানজিয়া

কিছুদিন হলো রাত আটটা বাজলেই ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে ওঠেন ভুপেন ঠাকুর। যেন একটা চেনা আশঙ্কা ক্রমশ ডালপালা ছড়াতে থাকে। তীরতীর করে কাঁপে বুকের ভেতরটা। তিনি এর একটা ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন, ’বয়স হয়েছে তো তাই মৃত্যু ভয় হতে পারে’! কিন্তু মৃত্যুভয় তাকে ঠিক সেভাবে কাবু করতে পারে নাই এখনো। বলতে গেলে তিনি মনে মনে অপেক্ষা করেন মৃত্যুর জন্য। যার জন্য অপেক্ষা তাকে নিয়ে ভয়! ব্যাখ্যাটা যুতমতো হলো না। এ ভয় অন্য। ভয়টা ঠিক নিজের জন্য না, ভয়টা হয়ত রমির জন্য। এখনি মেয়েটা খাবার নিয়ে এসে যাবে। ওর মা যে কেন ওকে রাতের বেলা একলা ছাড়ে! ভাবতে ভাবতেই দড়াম করে কিছু একটা পড়ে যাবার শব্দ ভেসে আসে। সঙ্গে আর্তনাদ- উ-মা-গো-ও-ও! তারপর দুদ্দাড় দৌড়। গোটা ঘটনাটা এতো দ্রুত ঘটে যায় যে, ভূপেন বাবু এর মধ্যে শুধু রোমির গলাটাই ঠাহর করতে পারেন, যা তার উদ্বেগ উৎকন্ঠাকে আরো বাড়িয়ে দেয়।
হঠাৎ করে মেয়েটার চিৎকার শুনে ভুপেন বাবু ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠতে যাবেন- ঠিক এমন সময়ে সামনে এসে দাঁড়াল সে।
- কোথায় যাচ্ছ ভুপেন?
- মেয়েটা হঠাৎ চিৎকার করল কেন দেখে আসি।
- দেখতে হবে না।
- কেন?
- ও ভয় পেয়েছে।
- ভয় পাবার মেয়ে ও না। এই তিন বছর ধরে তো প্রতিদিনই ওকে দেখছি। এই তিন বছর ধরে প্রতিদিন তিন বেলা ও-ই তো আমার খাবার পৌছে দিয়ে যাচ্ছে। তার মানে আমি মাসকাবারী ওর মায়ের ভাত-ডালের হোটেল থেকে খাবার কিনে খাই আর কি। স্ত্রী বিয়োগের পর বাড়ি থেকে রান্নাবান্নার পাঠ তুলে দিয়েছি। ওর মা আমার জন্য আলাদা করে রান্না করে দেয় এই যা সুবিধা। কই তিন বছরে ও একদিনও তো ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠে নাই!
- তাহলে তোমার কি মনে হচ্ছে আজ কেন চিৎকার করে উঠল? এতোদিন যখন কিছুই ঘটে নাই তবে আজ চিৎকার করার কারণ কি?
- কারণতো কত থাকতে পারে, এমনিতে বর্ষাকাল তার ওপরে রাতের বেলা, ও আসবার পথে সাপকোপ কিছু দেখতে পারে বা পা পিছলে পড়েও যেতে পারে।
- ওহ্ তাহলে তো তোমার রাতের খাবারটাও নষ্ট হবে। ডালের সঙ্গে রুটি আর তরকারি, মাখন সব মিলে মিশে আলুর দম।
উত্তেজনায় এতোক্ষণ আগুন্তকের অস্তিত্ব সম্পর্কে ভুপেন বাবুর মনে কোনো প্রশ্নই জাগে নাই, এতক্ষণে তার সম্বিত ফিরল। আমার রাতের খাবার মেনু তুমি জানলে কি করে! তুমি কে?
- আমি যেই হই সেটা এখন বলতে চাচ্ছি না। আগে বল তুমি মেয়েটার চিৎকার করে ওঠার পেছনে আর কি কি কারণ অনুমান করতে পারছ?
- মেয়েটা সদ্য কৈশোর পার হয়েছে, তাই গত দুবছরে ওকে নিয়ে যে ভয়টা ছিল না সেটা এই তৃতীয় বছরে এসে দেখা দিয়েছে। আমি ওর মাকে বলেওছি কয়েকদিন, সাবধান রমলা মেয়েকে এখন রাতের বেলা একা একা খাবার নিয়ে পাঠাবি না। বরং খাবারটা তুই দিয়ে যাস। কিন্তু রমলার ঐ এক বদ রোগ! সন্ধ্যাবেলায় নাকি তার বাতের ব্যথা শুরু হয়। তাই হাঁটাহাটি করতে পারে না। মেয়েকেই পাঠাবে। আসলে ব্যপার হলো সন্ধ্যা হলে আফিং খেয়ে পড়ে থাকে। মেয়ে মানুষ হয়েও কি বিদঘুটে নেশা একটা যে ধরল! সে যাই হোক; আমার অত দরকার কি বাপু! ওদের কাছ থেকে মাসকাবারী খাবার কিনে খাই। ওরা তিন বেলা আমার বাড়িতে খাবারটা পৌছে দিয়ে যায় এই তো ঢের। একা মানুষ স্ত্রী গত হয়েছেন, ছেলেরা সব বিদেশে। এক মেয়ে সে তো মুসলমানের সাথে বিয়ে হয়েছে তারটা তো আর খেতে পারি না। তাই রমলা যা করে তাই সই। ও খাবার ওর মেয়েকে দিয়ে পাঠাবে না কি মিনসে সেই খবর কতক্ষণ রাখতে পারি বল। আর যার মেয়ে তার চিন্তা নাই আমার অত চিন্তা কিসের? তারপরও বুঝেছো, বলছি ঠিকই কিন্তু চিন্তা একটা হয়ই। এখনতো আর চিন্তা করার জন্য হাতের কাছে ভালো কিছু উপকরণ পাই না, তাই যত চিন্তা ঐ রমলার মেয়ে রমিকে নিয়েই হয়। মেয়েটার যেমন ডাগর চেহারা হয়েছে ঠিক যেন রসাল কমলা লেবুর মতো। কোয়া খুলে খুলে কবে যে ভোগের প্রসাদে লেগে যায় সেটা নিয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয়।
- তাতে তোমার কি? তুমিতো বুড়ো হয়ে গেছ। তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে। ওই রমি রসাল কমলা লেবুই হোক আর আঠাল খেজুর। ভোগের প্রসাদেই লাগুক বা মিলাদের তবারক তাতে তোমার তো কোন লাভ বা লোকসান নেই। তুমি এত ভেবে মরছ কেন?
- তা যা বলেছ। পুরুষ জাতটাকেই তোমরা এতো সন্দেহের চোখে দেখো না, যে তোমাদের কাছে কিছু বলাই অনর্থক। আচ্ছা, তুমি পুরুষ না মহিলা? তোমাকে ঠিক মতো দেখতে পাচ্ছি না কেন? গলার স^রটাও এতো ক¤িপ¬কেটেড যে ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আচ্ছা, আমার চশমাটা কোথায় গেল? শিরা ওঠা রোগা কেঠো হাত দুটো দিয়ে বিছানায়, বালিশের পাশে ও খাটের পাশের সাইড টেবিলে হাতড়ে গেলেন একবার ভুপেন ঠাকুর। কিন্তু চশমাটা পেলেন না।
- থাক না, চশমা থাক। আমার পরিচয় দিলেই তো আমাকে চিনতে পারবা। তবে এতো খোঁজাখুজি করে চশমা বের করতে হবে কি জন্যে?
- তো সেই পরিচয়টা দাও বাপু! আগে বুঝি লোকটা কে? কার সাথে কথা বলছি। আরে, তুমি চোর-টোর নও তো! ঘরে ঢুকলে কী করে? দরজা খুলে দিল কে?
- না, চোর নই। তুমি অতো ভয় পেয় না। আর তোমার ঘরে আছেই বা কি যে চোর আসবে? কতগুলো পুরনো প্রায় ক্ষয়ে যাওয়া জবরজং ফার্নিসার ছাড়া। টাকা পয়সা সোনা-দানা কিছুইতো নেই দেখছি।
- তাহলে তুমি স্বীকার করছো, যে তুমি চোর।
- কী করে বুঝলা?
- বোঝাতো খুবই সোজা, নইলে তুমি জানলে কি করে যে আমার ঘরে নগদ টাকা বা সোনা-দানা কিছু নেই! হ্যাঁ আসলেই নেই। ওদের মায়ের যা গয়না ছিল ছেলেরা ওপার যাওয়ার সময় নিয়ে গেল। বলল, ‘এখানে তুমি একা থাকো নিরাপত্তা কি? তুমিতো আর বাপের ভিটে ছেড়ে যাবে না। যক্ষের ধনের মতো পাহারা দেবে। তা দাও, খালি ঘরে বসে দাও। আমরাও নিশ্চিন্ত থাকি।’ তবে কি জানো, জমির দলিল গুলোর জন্য বড় চিন্তা হয়। মেয়ে আর জামাই প্রায়ই আসে। এই দেখ, এখন আবার চোরও পাঠিয়ে দিল।
- যাহ্ বাবা! শেষ পর্যন্ত চোর অপবাদ দিয়েই ছাড়লা!
- আর তুমি যদি চোর না-ই হবে তবে রমলার মেয়ে রমি তোমাকে দেখে ভয় পেয়ে চিৎকার করল কেন?
- তুমি দেখি খুব কন্ট্রাডিক্টরি কথা বল, এই বললা রমি ভয় পায় না। এই আবার বললা ভয় পেয়ে চিৎকার করেছে।
- চিৎকার নিজ কানে শুনলাম যে! তবে ও কথাও ঠিক, এই মেয়েকে তো এর আগে কখনো ভয় পেতে দেখিনি! তবে ঐ যে বললাম না, ওকে নিয়ে এখন আমার একটু ভয় হয়।
- ভয়টা কিসের?
- শোনো গত কয়েক বছরে দেশে যা মহামারি আকার নিয়েছে তা হলো ধর্ষণ। বোরকা হিজাবে ঢেকেও মেযেরা নিজেদের বাঁচাতে পারছে কই! একটু নাগালের মধ্যে পেলো তো ধর্ষণ। তাই মেয়েটাকে নিয়ে যত দুশ্চিন্তা।
- গত কয়েক বছর ব্যপারটা কি?
- ও বাদ দাও। তখন ও গায়ে গতরে এমন বড় হয়নি।
- তুমি যেন কি বলতে গিয়ে এড়িয়ে গেলে।
- সে শুনে তোমার কাজ নেই, রাজনীতির কথা।
- তুমি আবার এখন এর মধ্যে রাজনীতি টেনে আনতেছ কেন? এই তোমরা বাঙালি এক জাতি রাজনীতি ছাড়া কোন কথা বলতে পার না।
- এটা ছেড়ে কথা বলব কি করে! এই ব্যপারটা যে আমাদের প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কানে ধরে ওঠ-বস করিয়ে ছাড়ে। শুনতে চাইলে বলতে আমার কোনো অসুবিধা নেই। এমনিতে আমি কথা বলার লোকজনও পাই না। বুড়ো হয়ে গেলে তাদের কথা কেউ শুনতে চায় না। চাও তো বলি।
আগন্তুক যেন বুঝে গেছে এবার একটা নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা শুনতে হবে, তাই অনেকটা হাল ছেড়ে দেয়া ভঙ্গিতে একটা কটনবাট কানে ঢুকিয়ে চুলকাতে চুলকাতে কালো আবলুশ কাঠের হাতাওয়ালা চেয়ারটাতে পা তুলে বসে; আবেশে চোখ বুজে বলল, তো বল কি বলতেছিলা।
- বলছিলাম, এখন মেয়েটাকে নিয়ে ভয় পাবার কারণ। তুমি নিউজ টিউজ কিছু দেখো না? দিনকাল তো ভালো না! যেদিকে তাকাবা দেখবা চারপাশে ঘুর ঘুর করে ক্ষমতাবানের রঙিন জামা গায়ে কিছু পোলাপাইন। কখন যে মেয়েটার ওপর হামলে পড়ে! আর ওদের হত্তা কর্তারাতো আবার এর কোনো দায় দায়িত্ব নেবে না। বলবে, ‘ওদের দায় আমরা নেব না, ওরা ছাড়া গরু যা ইচ্ছে করবে।’
- মেয়েটার পরে দরদ দেখি ভালই আছে।
- থাকবে না! মনুষ্যত্ব জিনিসটা এখনো আছে যে। এই যে দেখো, আমার শরীরে কেমন মানুষ মানুষ গন্ধ। কিন্তু কেউ সেটা বুঝতেই পারল না। আজন্মকাল শুনে আসছি ‘মালাউন’। সবাই শুধু সন্দেহের চোখেই দেখল। ছেলেগুলো একে একে তাই সবাই চলে গেল বিদেশে। শেষে যে ছিল সেও গেল ওপার।
- চলে না গেলেই হতো। ওসব গায়ে না মাখলেই হতো। অনেকেইতো আছে। দিব্যি আছে স^াধীন দেশের স^াধীন নাগরিক হয়ে। তোমার ছেলেদেরই যতো ঢং! গায়ে লাগে। আরে সব কিছু অতো গায়ে লাগাতে গেলে যে ফোস্কা পড়বে। তোমার ছেলেদের হয়েছে তাই। কী, অন্যরা কি নাই? আর যে সব দেশে গেছে তারা কি মাথায় তুলে নাচতেছে নাকি?
- সে কথা কি আমি বলিনি ভাবছ।
- কি বলে তারা শুনে?
- বলে, ’ওটাতো পরের দেশ বাবা, নিজের দেশ তো না! নিজের দেশে বড় লাগে। তোমার নিজের ঘরে যদি কেউ তোমাকে উঠতে বসতে খোটা দেয়, ইনফিরিয়র ভাবে তাহলে তোমার কষ্ট হবে না!’
- বল কি ? একটা স^ধীন দেশে বাস করে এতটা ইনফিরিয়রিটি কমপে¬ক্স ধারণ কর মনে!
ওটা কমপ্লেক্স না,ওটা হলো ভয়। এখানে আমি ধর্মের কোনো দোষ দেই না। যেখানে যে সংখ্যাগুরু সে-ই নিপীড়ক! আর দ্বিজাতিতত্বের রাজনীতিতে পড়ে আমাদের নাকানি চোবানি তো কম হয় নাই। একবার ৪৭শে একবার ৭১-এ।
৪৭শে তো ছোট ছিলাম, আর এই যে ৭১ সে তো আমার প্রাণের ওপর দিয়েই গেল বলতে গেলে, শুনতে চাও?
আগন্তুক এবার ট্রেন মিস হয়ে যাওয়া ভঙ্গিতে বলে, এই যাও! বাকি ছিল এটা - সেটাও খুলে বসলা; হায়রে বাঙালি! ইতিহাস ঘাটতে পারলে আর কিছু চায় না। ঠিক আছে বল, তোমার জাপিত জীবনের গল্প পুরোটাই বলে যাও। হাতে সময় কম, তারপরও বলতে চাও যখন শুনেই যাই।
ভূপেন বাবু এবার আক্ষরিক অর্থেই বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, মানুষ গল্পটাকে এতো ছোট করে দেখে কেন বলত? মানুষের জীবনটাই তো একটা গল্প।
-আরে তুমি রেগে যাচ্ছ নাকি! আমার তো আরো কাজ আছে, সারা রাত তোমার এখানে বসে থাকলে চলবে? একে তো তুমি আমাকে দেরি করিয়ে দিচ্ছ তার ওপরে আবার রাগও দেখাচ্ছ। বল, বলছিতো বল।
- তুমি যাবে তো চুরি করতে, সেটা রাত আর একটু গভীর হলেই ভালো। আর আমার গল্পটাকে তুমি যতো হালকা করে ভাবছ তা কিন্তু না। এর সাথে আমার জীবনের এক বিশেষ অধ্যায় জড়িত। আর সেটা যদি তুমি অলরেডি জেনে থাকো তাহলে আর বলব না।
- না না বল, শুনতেই তো চাচ্ছি। তবে কি জানো, আমার একটু ঘুম ঘুম পাচ্ছে। যদিও আমার আহার নিদ্রা এই জাতীয় কোনো দুর্বলতা থাকার কথা না, তারপরও। বল, ভুপেন বল।
ভুপেন বাবু এবার একটু নড়ে চড়ে বসলেন। মনে মনে যেন বিষয়টা একটু সাজিয়ে নিলেন। তারপর সাইড টেবিলের ওপর রাখা পানির বোতল থেকে এক ঢোক পানি ঢেলে দিলেন গলায়। একটু চা খেতে পারলে ভাল হতো। তুমি খাবে?
- যদিও আমার চায়ের নেশা টেশা নেই তবুও তুমি বলছ যখন- পেলে মন্দ হয় না।
ভুপেন বাবু কারুকাজ করা পালঙ্কে হেলান দেয়া তার পিঠটাকে একটু আলগা করলেন, তারপর ঠিক ওখানে, ওই একই জায়গায় বসে হাত চালিয়ে নিপুন দক্ষতায় ফ্লাক্সটা তুলে নিলেন। একটা চায়ের কাপ ও ফ্লাসকের মুখটা পর পর সাজালেন দুজনের জন্য। কিন্তু ফ্লাস্ক খুলে দেখলেন চা ঠান্ডা হয়ে জল। লজ্জিত ভঙ্গিতে বললেন, দুঃিখত! মেয়েটা রাতের চা নিয়ে এখনো আসতে পারল না!
- ঠিক আছে, না হলেও চলবে।
- কিছু ঠিক নেই। কিছু ঠিক থাকেনা শেষ পর্যন্ত। বিরক্ত হয়ে বললেন তিনি।
- জানি, তুমি বল।
- কি?
- তোমার ঐ সময়কার কথাটা বলবা না?
- ওহ্ হ্যাঁ।
অগত্যা আর এক ঢোক পানি গলায় ঢেলে দিয়ে বলতে শুরু করলেন। তা হলো কি- ৭১ এ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কাতারে কাতারে মানুষ বর্ডার পার হতে শুরু করেছে । এমন সময় আমি পড়লাম বিপাকে। বাজারে আমার বড় আড়ৎ। লাখ লাখ টাকার ব্যবসা। এ সব ফেলে কি করে যাই! আবার যদি যাইও তাহলে নিশ্চিত জানি ফিরে এসে আর কিছুই পাব না। আর আদৌ কোনোদিন ফিরে আসতে পারব কি না কে জানে? দেশ যে স^াধীন হবে, কবে হবে তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমার ছেলেরা তখন ছোট, খুবই ছোট। মেয়েটা সবার বড়। তার বয়স তখন কত হবে ষোল/ সতের। কলেজে ফার্স্ট ইয়ার। তাই মেয়েকে নিয়েও চিন্তা খুব। তারপরও টাকা-পয়সা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পৈত্রিক ভিটে এই সব জাগতিক টান কিছুতেই এড়াতে পারি না। এসব ছেড়ে যেতে মন কিছুতেই সাড়া দেয় না। ভাবলাম মহাকুমা শহর এখানে আর পাকিস্তানি আর্মিরা কত উৎপাত করবে। কিন্তু করল জানো, ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। দোকান পাঠ সব বন্ধ রেখে আমি লুকিয়ে থাকি। আমার বড় বড় দুটো চালের অড়ত, কেরশিনের গুদাম আবার কাপড়ের ব্যবসাও আছে তখন। পালিয়ে থাকতে চাইলেও পারি না। কিসের এক টানে মাঝে মাঝে এসে ঘুরে দেখে যাই লুট-পাট হয়ে গেলো কি না। তখন দেশি কিছু লোক যারা রাজাকার হয়ে গিয়েছিল তারা আমাকে দিয়ে জোর করে দোকান খোলায়। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেয়া ছাড়াও সব কিছু স্বাভাবিক আছে এটা দেখানোও ওদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে গেল। তাই সব মিলিয়ে আমাকে ওদের তখন দরকার। আর সেজন্যে ওরা যেসব ব্যবসয়ী ও দোকানদার ওদের দরকার তাদের জন্য পৌরসভা থেকে একটা ব্যাচ বের করল। রক্ষা কবচ আর কি। আর ঠিক হলো সেই লাল রঙের ব্যাচ যার বাহুতে জড়ানো থাকবে তাকে ওরা হত্যা করবে না। সেই ব্যাচ কে কে পেল জানো?
- কে কে?
- সুইপার, নাপিত, মিষ্টির দোকানদার আর পেলাম আমি। আমরা ঐ লাল ব্যাচ হাতে জড়িয়ে প্রতিদিন ভয়ে ভয়ে জীবন হাতে নিয়ে ভোরবেলা কাজে বেরই। আর হয়তো ফিরে যাবো না এই আশঙ্কা বুকে নিয়েই রাজ্যের মন্ত্র পাঠ করে গিন্নী চোখ মুছতে মুছতে বিদায় জানান। তবে ঐ ব্যাচ পরার পরিবর্তে জীবন রক্ষা পেল ঠিকই কিন্তু পরাণের টুকরা হাতছাড়া হয়ে গেল।
- তার মানে?
- ঐ যারা আমাকে ব্যাচ পাইয়ে দিয়েছিল জীবন রক্ষাকারী তাদেরই একজনের ছেলে এসে একদিন আমাকে বলল, আমার মেয়েকে তার সাথে বিয়ে দিতে হবে। ছেলেটাকে আমি চিনি। আমার বাড়ির খুব কাছেই ওদের বাড়ি। ছোট বেলায় আমার মেয়ে ওদের বাড়িতে কতো গিয়েছে। ওর বোনেদের সাথে খেলেছে। তাই মেয়েও যে ওর অচেনা তাও তো নয়। সেই জামিল যখন এসে অনেকটা আদেশের সুরে বলল, আপনার মেয়েকে আমি ভালোবাসি- তাকে আমি বিয়ে করতে চাই।’ তখন আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। বলে কি হরামজাদা! তুই যে মুসলমান, তোর সাথে সেধে সেধে আমি মেয়ের বিয়ে দেব! আমার জাত কুল সব খোয়াতে? কিন্তু মুখে কিছুই বললাম না। শুধু বললাম, তোমার কথাতো শুনলাম- একবার আমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করে দেখি, সে তোমাকে ভালোবাসে কি না।
- জিজ্ঞেস করাকরির আবার দরকার কি কাকু, আপনি জিজ্ঞেস করলেই আপনার মেয়ে মুখ ফুটে বলবে নাকি যে আমাকে ভালোবাসে। এই কথা কেউ কোনোদিন বাবাকে বলে? হেনা রাজি আছে। আপনি ব্যবস্থা করেন। পাকিস্তানি আর্মির ক্যাপ্টেন সাহেবও এই বিয়েতে উপস্থিত থাকতে রাজি হয়েছেন। একজন হিন্দু রমণীকে মুসলমান বানানো হবে, এই সওয়াবের কাজে শামিল হতে তিনি খুবই আগ্রহ দেখিয়েছেন।
- বুঝলাম তোমার কথা সবই, তারপরও পিতা হিসেবে মেয়েকে কথাটা জিজ্ঞেস করা আমার কর্তব্য।
- ঠি-ক আছে করেন! গলায় বাঁধা লাল সিল্কের রুমালটা ঝটিতে ঘুরিয়ে নিয়ে খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল কথাটা।
- তারপর তোমার মেয়ে, তোমার মেয়ে রাজি হলো?
- এতোগুলো মানুষের জীবন মরণের প্রশ্ন যেখানে জড়িত সেখানে রাজি অরাজির কোনো ব্যপার থাকে না। মেয়ে চোখের জল মুছে খুব দৃঢ় ভঙ্গিতে শুধু আমাকে বলল, ‘ বাবা ধরে নাও এই যুদ্ধে তোমার মেয়ে শহীদ হয়েছে।’
এই মেয়ে কি এখনো সেই স^ামীর ঘর করছে?
- হ্যাঁ করছে। কী আর করবে? হিন্দু ঘরের মেয়ে ফিরে তো আর আসতে পারবে না। তাহলে যে আর আমার জাত থাকবে না। তবে মেয়েটা আমার সাবলম্বী, অনেক কষ্টে লেখাপড়া শেষ করেছে, একটা ভালো চাকরি করে। চাকরি আর সন্তানরাই ওর সব। আমি তো বাবা- সব বুঝতে পারি। অনেক দিন যোগাযোগ ছিল না, চাকরিটা পাওয়ার পর থেকে আবার আসতে শুরু করল মাঝেমধ্যে। আর বললাম না- এখন আসে, প্রায়ই আসে। মেয়ে জামাই দুজনেই এসে আমাকে দেখে যায়। জামাইর অবশ্য আমাকে দেখার চেয়ে আমার আলমারির দিকেই আগ্রহ বেশি। কারণ জমি জমার দলিলপত্র তো সব ওখানেই। এই রে দেখ, তোমার সাথে এতো কথা বলে যাচ্ছি কিন্তু তুমি কে সেই কথাটাইতো বললা না। তুমি আবার আমার জামাইর পাঠানো কোনো লোক না তো?
- না।
- তবে কে তুমি?
- আমি মৃত্যু।
মৃত্যু! কথাটা শুনেই ভুপেন বাবু যেন একটু চমকে উঠলেন, তার শীরদাড়া বেয়ে একটা বরফের বল গড়িয়ে গেল। তারপর একটু কম্পিত স্বরে বললেন, তার মানে যম!
- যা খুশি বলতে পার।
ভুপেন বাবু মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে স^াভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, ওহ্ তাই বুঝি রমি মেয়েটা তোমাকে দেখে ভয় পেয়েছিল?
- হ্যাঁ তুমি ঠিকই ধরেছ। ও মেয়ে ভয় পাওয়ার মেয়ে না। তাই আমি এতো বিকট মূর্তিতে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম যে ও ভয় পেয়ে ছুটে পালাল।
- হা ভগবান! আমি কি বোকা দেখো- মৃত্যু এসে ঘাপটি মেরে বসে আছে আর আমি ভাবছি চোর!
- স্বাভাবিক মৃত্যু তো চোরের মতোই আসে, ডাকাতের মতো আসে তো..! যমের কথা শেষ হওয়ার আগেই ভূপেন বাবু অস্থির ভঙ্গিতে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, কিন্তু তুমি হঠাৎ! আমার জন্য এসেছ?
- হঠাৎ কি ভুপেন? আমি তো অনেক কাল ধরেই তোমার পাশে পাশে হাঁটছি।
- তা আমি জানি। তবে বুঝতেই পারছ খুব অপ্রস্তুত হয়ে গেছি - তাই এলোমেলো প্রশ্ন করছি।
- তুমি কি এখন প্রস্তুত ভুপেন? ভয় করছে খুব?
- না, আমার ভয় করছে না, তবে আমার শরীরটা ভয় পাচ্ছে।
- তাতে তোমার বিব্রত হওয়ার কিছু নেই।
- একটু দাঁড়াও।
- হো- হো- হো! হেসে উঠল যম।
- হাসলে কেন?
- সবাই তাই বলে, ‘একটু দাড়াও’। কিন্তু আমি কাউকে কোনো সময় দেই না। তারপরও তোমাকে অনেকটা দিলাম। কেন জানো?
- কেন?
- কারণ আমি তোমাকে নিয়ে একটা খেলা খেলতে চাই।
- কী খেলা?
- তুমি চাওনা ভুপেন তোমার মৃত্যুটা খুব ঘটনাবহুল হোক? সবাই তোমাকে নিয়ে কৌতুহলী হয়ে উঠুক, কিছু অজানা প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে আসুক, কি চাও না?
- হ্যাঁ চাই।
- তাহলে চলো।
- কোথায়?
- এই কাছেই , তোমার বাড়ির পেছনের খালের পাড়ে। যেখানে সান বাঁধানো ঘাটে বসে তুমি দূর দূরান্ত থেকে আসা সওদাগরী নৌকার অপেক্ষায় থাকতে, সেখানে। চলো।
- কিন্তু ও ঘাটটা তো এখন ভেঙ্গে গেছে। পলেস্তরা খসে যাওয়া, শ্যাওলা জমা ইটের দাঁত বের হওয়া, ভেঙ্গে অর্ধেক নেমে গেছে জলে। ঠিক আমার মতো অবস্থা ওর।
- সেটাই তো আরো ভাল হলো, গল্পটা জমে যাবে।
- দাঁড়াও আমি আমার লাঠিটা নিয়ে আসি।
- দরকার নেই, তুমি এমনিতেই হাঁটতে পারবা।
- “O captain! my Captain! Our
fearful trip is done….” হোয়াইটম্যানের কবিতা, আজ কেমন খেটে গেল!
চলো, জলদি চলো আর কবিতা আওড়াতে হবে না। একালের বাঙালি বরং ভালো- কি বলো, কবিতা-টবিতা পড়ে না!
যম আরো কি কি যেন বলছিল, ভূপেন বাবুর কানে কিছুই ঢুকছিল না, এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে হেঁটে চলেছেন তিনি।
দুদিন পর ভূপেন ঠাকুরের লাশ ভেসে উঠল কচুয়া নদীর পানিতে। উপুড় হয়ে ভাসছেন তিনি। তার গলায় পেচানো লাল গামছা। স্থানীয় থানায় লাশ রাখা হয়েছে। চারিদিকে কানাকানি..., ‘ ঘরে সবকিছু ঠিক ঠাকই আছে। খাটের নীচে স্যান্ডেল জোড়া একই রকম আছে, খাটের সাইড টেবিলে চশমা, লাঠিটা টেবিল ঘেঁসে ঠায় দাড়িয়ে। চায়ের পেয়ালা সাজানো। তাহলে কি হলো? তিনি তো লাঠি ছাড়া, চশমা ছাড়া হাঁটতে পারতেন না! তাহলে? নদীর ঘাটে গেলেন কী করে? কে নিয়ে গেল? গলায় গামছা কেন? তবে কি শ্বাস রোধ করে..!’
এটা কি হত্যা? না আত্মহত্যা? কে করল? কার স্বার্থ জড়িত? এমন অসংখ্য প্রশ্ন এখন আকাশে বাতাশে ভেসে বেড়াচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।
আর ক্রমে সন্দেহের দৃষ্টিগুলো সব একই জায়গায় কেন্দ্রিভূত হচ্ছে।