রুইদাস ব্যান্ড পার্টি

অতনু প্রজ্ঞান বন্দ্যোপাধ্যায়

‘কী কাকা! বিচ্ছিরি গন্ধ লাগছে নাকি?’ঘেমোকালো মুখে হাসি হাসি ঠোঁটদুটো ফাঁক করে দাঁতের ঝিলিক দেখাল পিন্টু। আমি বেজায় বিরক্ত হলাম। এই রোদে, নর্দমার পাশে এভাবে বসা যায়! কিন্তু কী আর করা। সনাতন রুইদাসের দোকানটাই যে এখানে। দোকান আর কী, ওই একটা নেড়ামাথা জুবুথুবু চৌকি আর গোটা কয়েক বাক্স, এইই। ঠিক পেছনে কুল কুল করে বয়ে যাচ্ছে কালো নর্দমার জল। দুর্গন্ধের ঝলক ছড়াচ্ছে মাঝে মাঝেই। সারাক্ষণ মাছি ভন ভন করছে। এলাকার লোকজন মুচির কাজকম্মে এখানেই আসে। আজ অবশ্য সনাতন আসেনি দোকানে। বসে আছে ওর ফক্কর ছেলেটা, পিন্টু, খুব বকবক করে, তবে কাজের ব্যাপারে ঠিকঠাক। শুনেছি, ওর একটা আলাদা গুমটি আছে। বাপ না থাকলে, মাঝে মধ্যে এদিকে আসে...।
অনেকদিন পরে এলাম এখানে। সকাল সকাল বাজারের থলে বাড়িতে নামাতেই ব্যাগভর্তি ছেঁড়া চটিজুতো দৌড়ে এসেছিল। ব্যস, আবার বেরোও আর কী। অফিসে নামেই শনি রবি ছুটি । কোথায় পিঠ উলটে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোবো! তা নয়, যত রাজ্যের কাজ।
‘তা, তোরবাপের শরীর টরির ভালো আছে তো? কামাই কেন?’ জিজ্ঞাসা করলাম।
‘সেসবকিছুনয়কাকা। রিহার্সাল করাচ্ছে।’
‘রিহার্সাল! কিসের?’
‘যা ব্বাবা! আমাদের তো ব্যান্ড পার্টি আছে। বাবা তো ব্যান্ডমাষ্টার। জানো না?’
‘তাই নাকি! সনাতনের এসব গুণ আছে জানি না তো!’
জানবই বা কী করে! কতটুকুই বা কথা হয়েছে ওর সঙ্গে! সনাতন চুপচাপ মানুষ, একমনে কাজ করে, ছেলের মত এত বকে না। আর মুচির দোকানে এসে এত গল্প গুজবের সময় আছে আমার? এই ফাঁকে এদিক সেদিক ফোনগুলো সেরে নেওয়া যায়। এই ছোঁড়া বক বক করেই যাচ্ছে তখন থেকে। কী করে জানবে পাহাড়ের মতো বোঝা নিয়ে হাঁটছি, দিনরাত। আজেবাজে কথা শোনার সময়ই নেই! এমনি এমনিই তো হয়ে যায়না কোনোকিছু, রীতিমত লড়তে হয়! জন্মসূত্রে না পেয়েছি ঠাকুর্দার মত তুখড় উকিলে বুদ্ধি, না আমার মিলিটারি বাপের মত বুকের পাটা। অবশ্য এ জীবনে আমিও যে কম কিছু করেছি তা নয়। নাহলে কমার্স গ্র্যাজুয়েট হয়ে দু বছরের একটা কম্পিউটার কোর্স বগলে গুঁজে আইটি সেক্টরে ঢুকে পড়তে পারি! আর কম দৌড়লাম এই কুড়ি বছরে? তাবড় তাবড় ইঞ্জিনিয়ারদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তো আছি! আর কিছু না থাক অধ্যবসায় আর বাস্তববুদ্ধিটা ভালোমতোই আছে। এই দুটো না থাকলে ব্যাঙ্কে যা জমিয়েছি, তার কানাকড়িও হতো না। বাপ ঠাকুর্দা তো নিজেদের টাকা কোঁচরে গুঁজেই স্বর্গে গেলেন। আমার পোড়া কপাল আর কী। নাহলে বাপ ব্যাটার ক্যানসার এক বাড়িতেই ধরা পড়ে? জলের মতো টাকা বেরিয়ে গেছিল হুড়হুড় করে। রাতদিন খেটে ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্সটাক ভদ্রস্থ জায়গায় না আনলে সুজাতার এত ফুটুনির জো থাকত! নবদ্বীপের বিশ্বাস বাড়ির মেয়ে কোলকাতায় এসে এই যে কথায় কথায় শপিং মলে দৌড়োয়, ছেলে মেয়ের জন্মদিনের পার্টিতে দেদার পয়সাকড়ি খরচ করে, সব তো এই পল্লব সামন্তের কল্যাণেই। তাও আমায় নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোতে ওর বিরাম নেই। সুন্দরী স্ত্রী, মানুষটা ভালো, কী আর বলি! তাছাড়া ওদের ছাড়া আর আমার কী-ই বা আছে নিজের বলতে। সব তো ওদের জন্যই। ছেলেমেয়েদুটো ভালো করে মানুষ হোক, সুজাতা খুশী মনে থাকুক, এই তো চাওয়া।
‘জানেনকাকা, আমার বাবা হলো জাত শিল্পী। এমনিতে আমাদের রুইদাস জাতটাতেই শিল্পীর ছড়াছড়ি। ঢাক বাজানোয় খুব নাম গাঁয়ের দিকে। কিন্তু ঢাক বাজিয়ে তো আর পেট চলে না। তাই বেতের ঝুড়ি বানায় সারা বছর। কিন্তু গান-বাজনার নেশা বড় সাঙ্ঘাতিক কাকা। বাবা কাঁসর বাজানোতে হাত পাকিয়েছিল শুরুর দিকে। একটু বড় হতেই ঢাকে হাতেখড়ি। ও বয়সেই লোকে অবাক হয়ে শুনত বাবার বাজনা।’জুতোরসোল্‌-এ কড়া আঠার প্রলেপ লাগাতে লাগাতে বলছিল বেশ গর্ব গর্ব ভাব নিয়ে বলছিল পিন্টু।
‘বাহ।’ কথার পিঠে তাল দিলাম। কী আর করব। না শুনলে ছাড়বে ও!
‘বাবার বাজনা তো শোনেননি কাকা। ক্লারিওনেটে ফুঁ দিয়ে কী যে কিনকিনে সুর বের করে! মাতিয়ে রাখে লোকজনকে। আমি অবশ্য ট্রাম্পেট বাজাই।’
‘এগুলো কী বল দেখি?’
‘আরেকাকাক্লারিওনেট মানে... ওই যে কালো রঙের লম্বা বাঁশির মত, ব্যান্ডপার্টিতে সরু সুরে গান বাজায়। আর ট্র্যাম্পেট তো ওই ভেঁপুর মত। দেখেছেন তো!’
‘ওবুঝেছিবুঝেছি।দেখেছ িওসব।নাম-টামগুলো ভুলে গেছিলাম আর কী। তা তুইও এসব বাজাতে শিখে গেছিস? ভালো তো রে!’
‘সনাতনব্যান্ডমাষ্টার ের ছেলে হয়ে বাজাতে জানব না কাকা!’
‘বা! চাম্পিয়ানছেলেতো।’
হাসি হাসি মুখে সুর গুনগুনিয়ে ওঠে। হাতের চটিতে সেলাই করতে করতে ও গেয়ে ওঠে... ‘চুপকে, চুপকে, রাত দিন... আঁসু বাহানা ইয়াদ হ্যায়।’ আহা, গুলাম আলি। সেই মিহি সুরে ধ্রুপদী আবেশ। সেই শিরশিরানি বৃষ্টিছোঁয়া গজল নদী। আমার খুব প্রিয় গান। আর মধুসূদনেরও! দেখেছি, গানটা করতে করতে ছেলেটা আজও আবেগ-প্রবণ হয়ে ওঠে। চোখ বন্ধ করে দুকলি যখন গেয়ে ওঠে, তৃপ্তিতে ভরে যায় ওর মুখ। কী প্রশান্তি তখন ওই মুখে! ছেলেটার সব ভালো, কেবল চ্যাটাং চ্যাটাং কথা। মাথাটা গরম হয়ে যায় আমার। কেন যে আমাকে দেখলেই শুরু করে ও! বিরক্ত লাগে। ও ছাড়া স্কুলের আর কারো সঙ্গেই যোগাযোগ নেই আজকাল। কোথায় খানিক সুখদুঃখের কথা বলব, হাসি ঠাট্টা করব, তা নয়, ঠিক খোঁচা দিতে শুরু করে দেবে! হয়ত হিংসে করে মনে মনে। ফৌজদারি কোর্টে ওকালতি করলেও কত আর কামায় বেচারা! বাচ্চা কাচ্চাও হয়নি। বুঝতে পারি মন মেজাজ ভালো থাকে না হয়ত। তার ওপর ওর বউটাও কেমন কেমন! সংসারে মন নেই যেন। কোথায় কোথায় সব ঘুরে বেড়ায়! কী একটা স্কুলে দিদিমনিগিরি করে, গরীব ছেলেপুলেদের, ফ্রি-তে। কী হবে এসব করে? সংসারে দুটো পয়সা না এলে কী হবে এত খাটনি? এসব বললেই তেলেবেগুনে ক্ষেপে যায় মধূসুদন। বলে, আমি নাকি মেশিন হয়ে গেছি। টাকা টাকা করে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি! আমার এই যে এত টেনশন, হাই ব্লাড প্রেশার, সব কিছুর জন্য নাকি আমার অতিরিক্ত উচ্চাশা দায়ী! দিনরাত লাভ লোকসান ভাবতে গিয়ে আমি নাকি নিজের মনটাকেই ফাঁকি দিয়ে চলেছি! আরে বাবা সারাদিন এত যে খাটি, সবটাই তো নিজের জন্যেই। সংসারটাকে ভাল রাখা, ছেলেমেয়েকে মানুষ করা, ভবিষ্যতের জন্য টাকাপয়সা জমানো, এসব তো নিজের জন্যই করে মানুষ!
‘মনে আছে পল্লব, কী দারুণ তবলা বাজাতিস তুই! আমরা গান-বাজনা নিয়ে তখন কী পাগল ছিলাম, না? আমি কিন্তু এখনও গানবাজনার নেশাটা ছাড়তে পারিনি রে। নিয়মিত শুনি। মনটা ভালো থাকে। তুই কেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিস বলতো?’
সেসব দিনের কথা আমারও মনে পড়ে মাঝে মাঝে। প্রাগৈতিহাসিক সেসব সুরেলা মুহূর্ত যেন। গানবাজনার আসরে যাওয়ার খুব ঝোঁক ছিল। কোলকাতায় তখন সারারাত জলসার রেওয়াজ। কী দারুণ সব কালোয়াতি গানের আসর। নেশার মত টানত। বাড়িতে তবলা ছিল। ঠাকুর্দার আমলের। আমার তীব্র আকর্ষণ ছিল ওটায়। তবলায় চাঁটি পড়লে মনটা খুশি খুশি হয়ে উঠত। অবশ্য বাবা ছুটিছাটাতে বাড়িতে থাকলে এসবের জো ছিল না। গানবাজনা একদম অ্যালাউ করতেন না উনি। ওসবে নাকি মন চঞ্চল হয়!
চাকরি পাওয়ার পরে এসবে আরো ভাঁটা পড়ল। জলসায় যাওয়া বন্ধ হলো। বাবা রিটায়ারের পরে কোলকাতায় ফিরে এলেন। ওঁর সামনে তবলা বাজিয়ে বাড়িতে অশান্তি করার ইচ্ছে হয়নি আর। তাছাড়া কাজের চাপও ভীষণই বেড়ে গেল। দিনরাত কাজ না করলে এই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ওপরে ওঠা যাবে না, হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলাম।
‘আচ্ছা কাকা, দেখুন তো, ঠিক আছে?’
পিন্টুর কাছ থেকে সুজাতার চটিদুটো নিয়ে উলটে পালটে দেখে নিই খানিক। নাহ, ছেলেটার হাতের কাজ ভালো। ওর বাপের মতই।
‘যে হাতে ভেঁপু বাজাস, সে হাত দিয়েই জুতো সেলাই! আজব কাণ্ড বাপু।’
‘গানবাজনায়যেপয়সানেইক াকা। খেতে তো হবে।’
‘তা এসব চটি জুতোর কাজই বা কেন? শিল্পী মানুষ, অন্য কোনো ভদ্রস্থ কাজও তো নিতে পারতিস!’
‘আমাদের তো জাতব্যবসা এই মুচিগিরিই। ফালতু কাজ হতে যাবে কেন কাকা! গাঁয়ের দিকে ঝুড়ি বিক্রি চলে তাও। শহরে ওতে পয়সা নেই। ভাগ্য খারাপ বলে শহরে আসতে হয়েছিল কাকা। আত্মীয়রা বেঘর করে দিয়েছিল। কোলকাতা চলে এসেছিলাম সবাই মিলে। গাঁয়ের এক জ্যেঠার জুতো সেলাই এর দোকান ছিল শিয়ালদা ষ্টেশনের কাছে। বাবা ওখানেই কাজ পেল। হয়ত সবকিছুরই একটা ভালো দিক থাকে কাকা। বাবা কোলকাতায় না এলে কোনোদিনই ব্যান্ডমাষ্টার হতে পারত না।’
‘তা, কী করে হল?’জিজ্ঞাসাকরিখানিক কৌতূহলে।
‘সে এক গপ্পো কাকা। এক ড্রাম বাজনাওয়ালা জুতো সারাতে এসেছিল। তাগড়াই গোঁফ, জরির টুপী, সাদা জামা প্যান্ট। বেশ জমকালো। কাদের একটা বিয়ে। হঠাৎ জুতো ছিঁড়ে গেছে। তাই আর্জেন্ট কাজ। সেই আলাপ। বাবার কাজে মহাখুশি। ব্যস, বাবাকে পায় কে। ঢাকের হাত তো ছিলই। ড্রাম বাজানো শিখতে দেরী হয়নি। ওই ব্যান্ডপার্টিতেই জায়গা পেয়ে গেল। জ্যাঠার জুতোর দোকান আর ব্যান্ডপার্টি, দুইই চলল। তবে ওই ব্যান্ড মালিকের সঙ্গে বেশিদিন পোষায়নি বাবার। আমাদের বাড়িতেই তৈরী হলো রুইদাস ব্যান্ড পার্টি।’
‘সত্যি, তোদেরক্ষমতাআছে বটে। সারাদিন গরমে বসে কাজ করে আবার রাতে এত রিহার্সাল! পারিস কী করে! আচ্ছা, তোদের এই ব্যান্ডপার্টির জন্যে এত যে খাটাখাটনি করিস, তা কত টাকা পাস? পোষায়?’
‘এটাকী বলছেন কাকা! আপনি কি ভাবলেন শুধু টাকার জন্য গানবাজনা করি?’কাজ থামিয়ে ঘুরে তাকাল পিন্টু।
খানিক থতমত খেয়ে গেলাম। ব্যাপারটা এমনভাবে ধেয়ে আসবে বুঝিনি।
‘এই, না না, আমি তা বলিনি। তবে ব্যান্ডের পেছনে যে এত পরিশ্রম করছিস, রিটার্ণ কিছু না পেলে করবিই বা কেন?’ খানিক মোলায়েম করার চেষ্টা করলাম।
‘কত কী যে পাই, কী আর বলব কাকা!’মুচকিহেসেকাজেম দিল আবার। ‘কোনো কোনো দিন দোকান বন্ধ থাকলেও রিহার্সাল বন্ধ থাকে না। সকাল নটা থেকে বিকেল চারটে দোকান। ব্যস, তারপরই বাড়ি যাবার জন্য মন কেমন করে। সন্ধ্যের ওই রিহার্সালের যা সুখ আর মাঝে মধ্যে ব্যান্ডপার্টির প্রোগ্রাম হলে সকলের সামনে মাথা উঁচু করে বাজানোর যে আনন্দ, এর চেয়ে বড় রিটার্ণ কিছু আছে কাকা? লোকে যখন মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে শোনে, তাল দেয়, কী যে তৃপ্তি পাই ... কী আর বলব।’
এই সব শুনলেই মাথাটা গরম হয়ে যায় আমার। রোজগারের তোয়াক্কা না করে শুধু তৃপ্তি নিয়ে কী হবে কী! সেদিন অফিসেও তালুকদার ছেলেটা বকর বকর করছিল এসব নিয়ে। রীতিমত জার্মানি থেকে পাশ করা এঞ্জিনিয়ার। চাকরি বাকরি সংসারধম্মো করে সুখে আছে। অথচ প্রতি বছর পাহাড়ে অ্যাডভেঞ্চার না করলে নাকি বেঁচে থাকার মানেই নেই ওর কাছে! ওটাই নাকি ওর প্যাশন! আরে ধুর, প্যাশনের নিকুচি করেছে। ওই যে মেয়েটা, কী যেন নাম, পাহাড়ে গিয়ে বরফ চাপা পড়ল, ওরও তো প্যাশন ছিল এসব। কী হল? সব গেল তো! যে প্যাশনে মালকড়ি তেমন কিছু আসেনা, উপরন্তু জীবনের ভয় থাকে, কী দরকার ওসবে? যতটুকু সময় পাওয়া যায় টাকা পয়সা রোজগার করাই তো বুদ্ধিমানের কাজ, নাকি!
এই নিয়ে মধুসূদনের সঙ্গেও খিটির মিটির লাগে আমার। ওর আবার সবকিছুতেই বড় বড় কথা। বলে আমরা নাকি নিজেদের অতৃপ্তিকে চাপা দিতেই সফল হবার নাটক করি! কখনও স্কুলে ভালো রেজাল্ট করে, কখনও চাকরিতে উন্নতি করে, কখনও সংসারকে স্বাচ্ছন্দ্যে মুড়ে রেখে, এই নাটকই করে চলি। আসলে আমরা নাকি প্রকৃত তৃপ্তিকে খুঁজতেই চাই না। সত্যকে এড়িয়ে যেতে চাই। তৃপ্ত হবার ফর্মূলা খুঁজি নিজের বাইরে। সমাজ যেমন যেমন বলে দেয়, আমরা চোখ বন্ধ করে অনুসরণ করি!
‘এআবারকী বলছিস তুই? ওইভাবেই তো সবাই সুখী হয়!’আমিবিরক্তহই।
‘সেতোএকটাধারণা। সেইমতো কল্পনা করছিস। আমরা বেশিরভাগ মানুষ এইসব কল্পনাতেই জীবন কাটাই। আমরা ধরে নিই এই এই ভাবেই তৃপ্তি পাবো, সুখ পাবো জীবনে!’
‘তাহলেকিবলতেচাস অ্যামবিশন থাকাই উচিৎ নয়!’
‘আমি তো তা বলিনি বন্ধু। ওটা না থাকলে জীবনের কোনও মানেই নেই। কিন্তু সমস্যাটা হল এর ঠিকঠাক ব্যবহার।’
‘মানে?’আমিখানিকঅধৈর্ ্যহই।
‘দেখ, আমাদের রোজকার জীবনে আগুনের অবশ্যই দরকার। রান্না করতে, সিগারেট ধরাতে, ধূপকাঠি জ্বালাতে... আগুন লাগবেই। কিন্তু আগুনের ব্যবহারটা ঠিকমত না জানলে ঘরে আগুন লেগে যেতে পারে কিন্তু! তখন দাউ দাউ করে জ্বলে যাবে সবকিছু।’
‘তোর সব কিছুতেই হেঁয়ালি। বিশ্বশুদ্ধ লোকে যেন ভুল!’
‘আহা, তা কেন! কিন্তু ভেবে দেখ, রসগোল্লায় যেমন মিষ্টি আছে, শুকনো লঙ্কায় যেমন ঝাল আছে, ঠিক তেমন কোনো নির্দিষ্ট জিনিষে সুখ আছে কি? মনের বাইরের কোনো জিনিষে জীবনের তৃপ্তি কি সত্যিই আসে? এটা তো প্রত্যেকের একটা সাবজেক্টিভ অভিজ্ঞতা। নিজের নিজের।’
‘যাবাবা! আমরাসুখেরজন্যইবেঁচেথ াকি।এতখাটছিকিসেরজন্য ?’
‘সেতোআমাদেরভাবনা। এই যেমন ধর আমরা ভাবি বিয়ে করে সুখ পাবো। পঁচিশ থেকে ত্রিশ হলেই বিয়ে করে নিই। কিন্তু বল তো, এই নিয়ম মেনে, খুব তৃপ্তি কি পেয়ে গেছি আমরা? ভেবে দেখ এরকম নানা উদাহরণ আমাদের হাতের কাছেই আছে। আসলে গোড়াতেই গলদ। এসব যেকোনো কিছু তো বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া ধারণা। শেখানো হয়েছে বাড়িতে। আমরা ভেবেছি এসবেই বুঝি সুখ আছে। অথচ সত্য হলো সুখ তো আছে আমাদের নিজেদের মধ্যেই। সেসব না খুঁড়ে আমরা কেবল বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি সারাক্ষণ। কিছু না কিছু একটা খুঁজে যাচ্ছি তৃপ্তির সোর্স হিসেবে! ব্যাপারটা অদ্ভুত না?’
‘তুই তো সাধু-সন্ন্যাসীদের মতো কথা বলছিস মধুসূদন। ওসব বইপত্র আমিও কিছু পড়েছি। টিভিতেও দেখি মাঝে মধ্যে। সুজাতা বলে এসব দেখে শুনে ও নাকি শান্তি পায়। কী এক গুরুদেবের কাছে যায় ও। আমার আবার ওসব পোষায় না। লজিক খুঁজে পাই না। কেন জানিনা মনে হয়, বড় বড় কথা বলে রিয়েলিটিকে এড়িয়ে যাচ্ছে এরা।’
‘কী মুশকিল! এখনও তুই সত্যকে সরাসরি দেখার কথা বললি না কিন্তু। সেই একই কথা, অন্যে কে কী বলেছে তার সেকেন্ড হ্যান্ড নলেজ! ভেবে দেখ, এসব বাছাবাছি আমরা তখনই করি, যখন মনোমত কিছু একটা খুঁজতে চাই বাইরের জগৎ থেকে। অথচ বন্ধু, সত্য খুঁজতে গেলে তো পছন্দ অপছন্দ চলে না! নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে সত্যকে তার মতো করে বুঝে নিতে হয়। আচ্ছা একটা কথা বল, তুই কি জীবনে খুব স্যাটিস্ফায়েড ফিল্‌ করিস?’
‘সত্যি বলতে কি, বুঝতে পারিনা। তবে আমি কিন্তু যথেষ্ট সাকসেস পেয়েছি এ জীবনে। এই ধর, সামন্ত বাড়ির ঠাটবাট বজায় রাখতে পেরেছি, অফিসেও লোকে সম্মান করে, দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পেয়েছি, কম কিছু তো করিনি! হ্যাঁ, জীবনে কোথাও যেন একটা বিশাল ফাঁক আছে, এটা মানি। পুরোপুরি তৃপ্তি কিছুতেই যেন পাই না, এও সত্যি।’
‘সমস্যাটাকী জানিস পল্লব, আমরা জীবনে যেগুলো চাই, সেগুলো নিয়ে বেসিক্যালী কনফিউজড থাকি। কিন্তু মানসিক তৃপ্তি এভাবে আসে না রে। আসে নিজস্বতার মধ্যে দিয়ে। আমরা যা নিয়ে জন্মেছি, যা আমাদের মনের স্বরূপ, তার প্রকৃত প্রকাশেই এই তৃপ্তি। অথচ আমরা সেটা এড়িয়ে সমাজের হাততালি পেতে চাই। সমাজ স্বীকৃতি দিলে তবেই আমরা ভাবি মানসিকভাবে তৃপ্ত হচ্ছি। আর মজার ব্যাপার হল, বড় কেউকেটা হলে তবেই সমাজ স্বীকৃতি দেয়। আর তখনই আমরা বিশাল কিছু অ্যাচিভ করলাম ভেবে ফেলি। অন্যের হাততালিকে আমাদের মনের দাবীর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভেবে ফেলি।’
‘তাহলেতোজীবনেশান্তিপ াওয়াইযাবেনা।মৃত্যুইভ ালো।’
‘ওইযে।আবারতোর পছন্দ অপছন্দের ফাঁদে পড়ে গেলি। এবারে তুই মৃত্যুর মধ্যে শান্তি খোঁজার কথা বলছিস!সুখ কিন্তু খোঁজার বিষয় নয় বন্ধু। এ তো নিজের মনে অনুভবের জায়গা, বোঝবার বিষয়। আন্ডারষ্ট্যান্ডিং। নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া! সেসব না করে, আমরা বাইরের জগতে খুঁজে খুঁজে হয়রান হই আর কী!’
ছেলেটা গুনগুন করে সুর ভাঁজছে। হাত চলছে তড়তড়িয়ে। চড়া রোদ মাথার ওপরে। ঘেমে যাচ্ছি। খুব গরম লাগছে। অথচ পিন্টুর যেন ভ্রুক্ষেপই নেই এসবে! এত কষ্টের মধ্যে কী করে এত তৃপ্তি আসে! অথচ আমি তো সারাদিনের এক মুহূর্তও টেনশন ছাড়া থাকি না। সেন্ট্রাল এসিওয়ালা অফিসে বসেও মাথা গরম থাকে। সারাদিন মিটিং আর মিটিং। উফফ। শুধু একে অন্যের গোলে বল ঠেলে দিচ্ছে। দোষারোপ আর পলিটিক্স। আমিও কম যাই না যদিও। এসব না করে টিকতে পারব না, অনেক আগেই বুঝে গেছিলাম। কাজেকম্মে ভালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঁকাল মাছ হওয়া রপ্ত করেছিলাম। তবে মাথায় অনিরূদ্ধদার হাত ছিল বলে বাঁচোয়া। ওপরে ওঠাটা অনেক সহজ হয়েছে। তবে অনিরূদ্ধদার মতো পাওয়ারফুল বড়কর্তার নজরে থাকতে কম লেগে থাকতে হয়! রাত বিরেতে যখন তখন ফোন করেন। কোনো কাজ করানোর দরকার থাকলে আমার সুবিধে অসুবিধের পরোয়াই করেন না। ওঁর ওপরে কোনো ব্যাপারে চাপ পড়লে টুক করে আমার ঘাড়ে চালান করে দেন। রাতদিন খেটে আমায় সামলাতে হয়। কিন্তু এসব ভাবা ছেড়ে দিয়েছি। লোকটাকে হাতে রাখতে গেলে এসব তো করতেই হবে। তার বদলে টপাটপ প্রোমোশনগুলো হয় যে! মাঝে মাঝেই নানা দেশ ঘুরে বেড়াই যে! লোকে বলে আমি নাকি চূড়ান্ত তেলবাজ। হিংসে হিংসে। কিছু পেতে গেলে অনেক কিছু ছাড়তে হয়। এমনি এমনি কিছুই হয়না!
কিন্তু মনের তৃপ্তি কিছুতেই আসেনা তাও! অসহ্য মনে হয় এত চাপ। হতাশ লাগে। মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হয় এসব না হয়ে ছোটখাটো একটা সরকারি চাকরি হলেই বেশ হতো। বা স্কুলের মাষ্টারমশাই। কিংবা মধুসূদনের মতো কালো কোর্ট গায়ে সাইকেলে চেপে কোর্টে যেতাম না হয়। এত চাপ তো থাকত না! ও এখনও কেমন গানবাজনা শোনে। অন্তত চর্চাটা তো রেখে দিয়েছে। এদিক ওদিক ছোটে কত্তাগিন্নিতে, এসব অনুষ্ঠান হলেই। পাড়াপড়শির বিপদে আপদেও পাশে থাকতে পারে। পাড়ার লোকে ওদের ভালোবাসে।
আমারও জীবনটা ঠিক চলে যেত। নিজের জন্য অনেকটা সময় পেতাম। পরিবারের লোকজনেদের আরো সময় দিতে পারতাম। ওরা তো সারাক্ষণই অভিযোগ করে এ নিয়ে। কিন্তু আর উপায় নেই। হাত থেকে তীর বেরিয়ে গেছে। এভাবেই কাটাতে হবে বাকি জীবন!
‘নিন কাকা, আপনার সব কাজ শেষ। অনেক কাজ হয়ে গেল আজ। খুব খিদেও পেয়ে গেল। বাড়ি যাই এবার।’
‘খাবার সঙ্গে আনিস না? এই রোদে বাড়ি গিয়ে আবার ফিরে আসবি?’
‘নানা, এলে খাবার নিয়েই আসি। আজ ঠিক করেছিলাম দুপুরের মধ্যে একেবারেই চলে যাব। সন্ধ্যেবেলায় পারফরমেন্স আছে তো।’
‘কিসেরপারফরমেন্স?’
‘আরেআমাদেরব্যান্ডপার ্টির বুকিং আছে। মাঝেরপাড়াতে বিয়ে লেগেছে। ওই যে চক্রবর্তীদের বাড়িতে। মেয়ের বিয়ে। আজ বরযাত্রী আসবে। আমরা বাজনা বাজিয়ে বরকে নিয়ে যাব মেয়ের বাড়িতে।’
। ২ ।
খাওয়া দাওয়ার পরে বিছানায় খানিক এলিয়ে দিয়েছিলাম শরীরটা। সবে চোখটা লেগে এসেছে, ওমনি কচি কচি হাতের ধাক্কা, ‘বাবাযাবেনা?’ মেয়ে, গানের স্কুলে নিয়ে যেতে হবে ওকে, অগত্যা, উঠে পড়লাম! অনেকদিন মধুসূদনের ওদিকে যাওয়া হয়নি। প্রায় মাসখানেক। আমি না গেলে তো খবরও পাইনা ওর। একটা ফোনও করেনা। আমাকে বলে, আমার নাকি বড় বড় ব্যাপার, ওর মতো ছোটখাটো উকিলের ফোন এলে যদি বিরক্ত হই! আমাকে খোঁচা মেরেই ও আনন্দ পায় বোধহয়!
গানের স্কুলে মেয়েকে নামিয়ে মধুসূদনের গলিতে গাড়িটা যখন পার্ক করছি, দেখলাম ওদের দরজা খোলা, লোকজনের ভিড়। কী হল! ঘরে ঢুকে দেখলাম, ও শুয়ে আছে, বিছানায়, অক্সিজেন চলছে, চোখ বন্ধ। বুকটা ওঠানামা করছে, বালিশের পাশে ওষুধপত্র, সারাঘরে লোকজন, ঘিরে আছে ওকে। বিছানায় ওর স্ত্রী, চোখ কালো করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে চলেছে। কী হয়েছে? কবে থেকে? এসব জিজ্ঞাসা করতেই উত্তর পেলাম, আজ সকাল থেকেই হাঁপানি খুব বেড়েছে। ডাক্তার এসেছিল। মেডিসিন চলছে। বলেছে, অবস্থা আরো খারাপ হলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে বিকেলে।
দেখছিলাম, কী নির্লিপ্ত হয়ে শুয়ে আছে আমার বন্ধু। যেন টেরই পাচ্ছেনা কিছু। মেলাতেই পারা যাবেনা, এই মানুষটাই কোর্টে গিয়ে যখন গলা তোলে যুক্তি সাজিয়ে কিংবা আমার সঙ্গে যখন তর্ক করে। আমাদের বয়েস বাড়ছে। মধ্যচল্লিশ পেরোচ্ছে। শরীরটা জবাব দিয়ে দিচ্ছে এবার। কোনদিন হুট করে আমিও হয়ত...।
ঘড়িতে চোখ চলে গেল। মেয়েটার গানের ক্লাস শেষের দিকে। ওবাড়ি থেকে বিদায় নিতে হল। ছোটবেলাকার বন্ধুর মাথার কাছে সারাদিন বসে থাকার মতো ফুরসতও আমার নেই!
মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল পেরিয়ে গেল। তবলার আওয়াজ কানে এল, ছেলেটার ঘর থেকে। ওর মাষ্টারমশাই এসেছে। মাঝবয়েসী মানুষ। হাত খুব ভালো। ছেলেটাকে যত্ন নিয়ে শেখায়। বাড়িতে থাকলে এইসময়টা খুব ভালো লাগে আমার। ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। বৈঠকখানা ঘরে তবলাজোড়া রাখা থাকত। চারুমাষ্টার আসত। কী যে ভালো লাগত বাজাতে! এখনও ইচ্ছে করে তবলায় বসে পড়তে। হয়ে ওঠে না। আড়ষ্ট হয়ে গেছে হাত। তবলা সাড়া দেবে না আর। জানি।
পকেটে রাখা মোবাইল ফোনটা কাঁপছে। ভাইব্রেশন মোডে রাখা। দেখলাম অনিরূদ্ধদা! উফফ, প্রতিটা উইকেন্ডে একবার না একবার ফোন করবেই লোকটা। তাড়াহুড়ো গলায় বলবে, একটা হেল্প দরকার। ছুটির দিনে কাজকম্মো করা নিয়ে বউ ছেলেমেয়েরা বিরক্ত হয়েছে। কিন্তু আমার কিছুই করার নেই। এই জীবনটা দেওয়া নেওয়ার খেলা। অনিরূদ্ধদার জন্য নিজেকে নিংড়ে দিই বলেই মানুষটা আমাকে দেখেন। এইটাকে তো হেলায় হারানো যায় না!
‘শোনো, একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। ক্লায়েন্ট টপ্‌-ম্যানেজমেন্টকে একটা বড়সড় চিঠি পাঠিয়েছে কয়েকটা কমপ্লেইন নিয়ে। এখুনি একটা আর্জেন্ট কল্‌ ছিল এ নিয়ে। সোমবারের মধ্যে ক্লায়েন্টকে ডিটেইলড একটা রিপোর্ট পাঠাতে হবে আমায়। বুঝতেই পারছ। তোমাকে এর ডিটেইলস মেল করে দিচ্ছি। দেখে নাও কি কি পয়েন্ট হতে পারে। কাল সকালের মধ্যে রিপ্লাই করে দাও আমাকে। কেমন? আমি তাহলে একটু চেক করে নেবো কাল। ইটস্‌ রিয়েলী আর্জেন্ট পল্লব! অসুবিধেয় ফেললাম না তো?’অনিরূদ্ধদাস্বভাব িদ্ধ ব্যস্তবাগীশ কন্ঠে বললেন।
অসুবিধে হলেও উপায় আছে? করতে তো হবেই! মনে মনে বললাম।
অনিরূদ্ধদা যখন ক্লায়েন্টের ঝামেলাটা নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত ভাবে বলতে শুরু করেছেন, দেখলাম মধুসূদনের নম্বর থেকে ফোন আসছে! সেকী! ওর জ্ঞান ফিরে এল! নাকি ওর স্ত্রী করছে?
অনিরুদ্ধদার সঙ্গে কথা শেষ করেই রিং ব্যাক করলাম। কেউ ফোন ধরছেনা। আবার রিং করলাম। না, কেউ নেই। কী হল কী! মোবাইলের নোটিফিকেশন বলছিল অনিরুদ্ধদার মেইলগুলো ঢুকছে একের পর এক। এখনই কাজ না শুরু করলে কাল সকালে মধ্যে দেওয়া যাবে না, কিন্তু মধুসূদনের কী হল! একবার যেতেই হবে ও বাড়ি।

গাড়িটা খানিক এগোতেই দেখতে পেলাম ওদের। মাঝেরপাড়ার মুখে জমকালো শোভাযাত্রা। বরের গাড়ির সামনে সামনে চলেছে ওরা। রুইদাস ব্যান্ডপার্টি, এই নামটা লেখা আছে জরির কাজে, লাল কাপড়ে। ওই তো সনাতন রুইদাস। লুঙ্গিপড়া নোংরা জামার রোগাসোগা মানুষটাকে চেনাই যাচ্ছে না! ধপধপে সাদা জামা প্যান্ট, কোমরে জরির বেড়, মাথায় জরির বাহারে লাল টুপিতে এক্কেবারে অন্যরকম। ঠোঁটে লেগে থাকা বাঁশির মত বাদ্যযন্ত্রে ঝরে পড়ছে আনন্দের সুর। ওই তো পিন্টু রুইদাস, ট্রাম্পেট বাজাচ্ছে। গাল ফুলিয়ে সুর মেলাচ্ছে বাবার সঙ্গে। ওদের কেউ ড্রাম পেটাচ্ছে। কেউ ঝুমঝুমি। কী দারুণ ছন্দ সেসব বাজনায়, ওদের হাঁটায়। কী দাপটের সঙ্গে বাজাতে বাজাতে চলেছে রাস্তা ধরে!
গলিটায় ঢুকে, খানিক এগিয়েই দেখলাম, মধুসূদনের দরজার মুখে বহু মানুষের জটলা। মধুসূদনকে বহু মানুষ খুব ভালোবাসে। ওর চেম্বারে সারা সন্ধ্যেতে লোকজনের ভিড়। না, মক্কেল নয় শুধু, পাড়া বেপাড়ার লোকেরা। সব ব্যাপারেই উকিলি পরামর্শ যখন হাতের কাছেই মজুত, আর কী চিন্তা!
ঘরে ঢুকতেই ওষুধের গন্ধ। মৃত্যুরও! মধুসূদন শুয়ে আছে, একটু আগের মতই। অক্সিজেনের নল নেই নাকে। দেখে মনে হচ্ছে, আশপাশের এই ভিড়ে ভ্রুক্ষেপ নেই, আরাম করে ঘুমোচ্ছে। শুনলাম, হার্ট অ্যাটাক। হঠাৎই। আধো-অচেতন অবস্থাতেই সব শেষ। সুগারের রোগীদের হয় এমন। ওর সামনে এগিয়ে গেলাম। পা টলমল করছিল। ওর স্ত্রী বসে আছে পাশে। চোখ ছলছল করছে। কী বলব ভেবে পেলাম না। মধুসূদনের দিকে তাকালাম। কী শান্ত, কী সমাহিত লাগছে ওর মুখটা। এখুনি যেন চোখ খুলে বলে উঠবে, ‘এলি?’
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। উফফ, আবার অনিরূদ্ধদা! জানি, জিজ্ঞাসা করবে, ‘কতদূরহল?’ এইই স্বভাব ওঁর। একটা কাজ দিয়ে ক্রমাগত খোঁচা মেরে যাওয়া। থামাতে পারিনি আমি। গন্ডী কেটে রাখতে পারিনি আমার ব্যক্তিগত জীবনে। জানি, উত্তর না দিলে রেগে যাবেন। তাও ইচ্ছে করল না কথা বলতে। ফোনটা কেটে সুইচ অফ করে দিলাম। খানিক অস্বস্তির পরে কী শান্তি। কী তৃপ্তি বুক জুড়ে! মধুসূদনের পাশে গিয়ে বসলাম। ওর দিকে তাকালাম।
ও কি এখন সেই গভীরতর চেতন স্তরকে ছুঁয়ে ফেলেছে, যার কথা বলত প্রায়ই! বাহ্যিক ইমেজের মুখোশ ছাড়িয়ে যে প্রকৃত আমিকে খোঁজার আকুতিতে বাঁচতে চাইত, ও কি মিশে যেতে পেরেছে এখন? হয়ত পেরেছে, তাই এত প্রশান্তি ওর মুখ জুড়ে। আমার চোখদুটো জলে ভরে যাচ্ছিল। ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল আশপাশটা। আশপাশের মৃদু গুঞ্জন দূরে সরে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এই বিশ্বচরাচরের মাঝে আমি আর আমার বন্ধু এই শেষবারের মত মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি। হঠাৎ অনুভব করলাম, আশপাশের এই ঝাপসা পৃথিবীটায় কারা যেন মধুসূদনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। একী! রুইদাস ব্যান্ডপার্টি, এখানে! ওই তো বাপ ব্যাটা দাঁড়িয়ে। ওই তো বাকিরা। ওরা সবাই বাজাতে শুরু করল। আমার বন্ধুর প্রিয় গান। চুপকে চুপকে রাত দিন, আঁসু বাহানা..। মৃত্যুকরুন সে সুর। হৃদয় নিংড়ে নেওয়া যন্ত্রণার অনুভূতি।
মধুসূদন চিরদিনই আমায় অতিরিক্ত বাস্তববাদী বলে গালাগাল দিত। আবেগ কম বলে স্ত্রীর কাছেও কথা শুনেছি কত। কিন্তু আজ এই অযাচিত আবেগে ভেসে যাচ্ছি কেন? নিজেকে এত অগোছালো লাগছে কেন? চিনতে পারছিলাম না নিজেকে। ঝরঝর করে কেঁদে চলেছিলাম। বুকের মধ্যে জমাট হয়ে থাকা কষ্টগুলো গলে গলে ঝরে পড়ছিল যেন। এই দুঃখের মুহূর্তেও মনে হচ্ছিল, কী শান্তি, বুকজুড়ে। কাঁদলেও এত তৃপ্তি পাওয়া যায়, জানতাম না এতদিন!

সমাপ্ত