মুঠোবন্দী প্রিয় আকাশ, তোমাকে

বৃতি হক

"নেক্সট স্টপ ফিঞ্চ-ড্নমিলস" ড্রাইভারের যান্ত্রিক গলা স্পিকারের মাধ্যমে বাসজুড়ে শোনা গেল।
কিছুটা ক্লান্তিবোধ করছে মিলি। আজ সকাল থেকে ট্রলি হাতে জেরার্ডের বিভিন্ন স্টোর ঘুরেছে সে। হাঁড়ি-পাতিলগুলো পুরনো হয়ে গেছে, অনেকদিন ধরে কিনব কিনব করে অবশেষে আজ টি-ফ্যাল কুকওয়্যার সেটটা কেনা হলো। নব্বই ডলার। মিলি মনে মনে হিসেব কষে। রাশেদ আর ইমরানের জন্য লিভাইসের দুটো জিন্স, পঁয়ষট্টি ডলার। ইন্ডিয়ান স্টোর থেকে ঐশী আর নিজের জন্য দুটো ফতুয়া দরদাম করে তিরিশ ডলারে, সেইসাথে আরিয়ানার একটা ফ্রক--তেইশ ডলার। মনটা খচখচ করছে, এতগুলো টাকা! কিছুক্ষণের ভেতর কেমন হু হু করে শেষ হয়ে গেল! এই এলাকার ইন্ডিয়ান কাপড়ের দোকানগুলোতে তাও কিছুটা দরদাম করা যায়, টরন্টোর অন্য সব স্টোরের মত ফিক্সড প্রাইস কথাটা তেমন প্রযোজ্য নয় এখানে। সবশেষে অল্প কিছু কাঁচাবাজার। বেলা তিনটায় বাচ্চাদের স্কুল ছুটি হয়ে যাবে, তার আগে বাসায় ফিরে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। লোকাল বাসে চড়ে পায়ের কাছে ট্রলি, কোলে বিশাল টোট ব্যাগটা নিয়ে হাঁপ ছেড়ে বসে মিলি। হাতে বাঁধা সোনালি ঘড়িটা দেখে পরবর্তী টু-ডু-লিস্ট ঠিক করে নেয়। টরন্টোর ঘড়ি বাঁধা জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। শাওয়ার, নামায শেষ করে ইটালিয়ান পাস্তা আর মিটবল তৈরি করে ফেলা যাবে। সাথে সিজার স্যালাড। বাড়ন্ত বয়সে, বিশেষ করে ছেলেটার তার একটু পর পর খিদে পায়।

"ব্যাথার্স্ট নর্থ"...
এক ষোলো-সতের বছরের মা তার ছোট বেবিকে নিয়ে উঠেছে আগের স্টপ থেকে, মেয়েটি এখন তার পাশে বসা। মিলি স্ট্রলারের দিকে হাত নাড়ে, "হাইইইই..." জ্যান্ত পুতুলটা চোখ মিটমিট করে হাসে। কিশোরী মা'ও হাতে ধরা ছোট আয়নায় ঠোঁটের লিপস্টিক আর সদ্য কার্ল করা সোনালী চুল ঠিক করার ফাঁকে মিলির দিকে ফিরে ছোট হাসি উপহার দেয়। এই মেয়েটি হয়ত আবার পড়াশুনায় ফিরবে, অথবা ফিরবে না; হয়ত কাজ শুরু করে দেবে অথবা গা ভাসিয়ে দেবে গড্ডালিকায়। কে জানে! জীবনের পথ বেছে নেয়ার দায়িত্বটুকু এখানে বয়স আঠারো হলেই যার যার, তার তার। মিলি আড়চোখে তাকিয়ে মেয়েটিকে বোঝার চেষ্টা করে। সে জানে, পশ্চিমারা প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। সহজে হাল ছেড়ে দেয় না, ন্যাকা কান্নাও কাঁদে না, নিজের দায়িত্ব পালনে এরা সক্ষম। নিজের তিন ছেলেমেয়ের সাথে মেয়েটিকে তুলনা করতে চেষ্টা করতে গিয়ে একসময় হাল ছেড়ে দেয় মিলি। তার বাচ্চারা এখনো পছন্দের খেলনা, জামা বা খাবারের জন্য মা’র গলা জড়িয়ে বায়না ধরে। হোমওয়ার্কের সময় মিলিকে পাশে থাকতেই হয়, নইলে পড়া শিকেয় ওঠে তাদের। গল্প শুরু করে দেয় অথবা মারামারি। বাবা-মা'র সাথে এক বিছানায় ঘুমাতে চায়, তাদের ছোটবেলার গল্প শুনতে চায়। তার বাচ্চারা এখনো ভীষণ ছেলেমানুষ, আদুরে রয়ে গেছে।

বাস রজার্স রোডের উদ্দেশ্যে ছুটছে। আজকাল এইসব দুপুরগুলো মিলির কাছে ভয়ংকর অলস মনে হয়। এই কিছুদিন আগেও দম ফেলার সুযোগ ছিল না, দস্যি ছেলে আর পিঠাপিঠি দু'মেয়েকে সামলে দশহাতে কাজ সারতে হতো। দিন আর রাতের হিসেব ছিল না। কানাডার হাড় কাঁপানো শীতের ভেতর তিন শিশু নিয়ে ছোটাছুটি-- বাজার, ডাক্তারের ভিজিট, রান্না, ইমরানকে স্কুলে দিয়ে আসা, নিয়ে আসা। নির্ঘুম রাত। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনিশেষে রাতে বাসায় ফিরতো রাশেদ। তার স্বল্প অথচ মহার্ঘ এই রাত্রিকালীন বিরতির সময়টুকু গার্হস্থ্য কাজে ব্যয় করাতে সত্যিই দ্বিধা হত মিলির। দিনের বেলা অ্যাপার্টমেন্টের বদ্ধ পরিসরে বাচ্চাদের হুল্লোড়ে কখনো মাথা ধরে যেত। সামারের স্কুলছুটির দিনগুলোতে তাই কোন ভাবীর সাথে পার্কে যাওয়া বা মলে ঘোরা। সারাদিন বাইরে কাটানো। ম্যাকডোনাল্ডস অথবা কেএফসি'র হ্যাপি মিল বা গ্রীল্ড চিকেন কিনে খাইয়ে দেয়া। রাতে গোসল করিয়ে বাচ্চাদেরকে বিছানায় পাঠানো। সেই অসম্ভব ব্যস্ত জীবনের কথা ভাবতে গেলেও কিছুটা শিহরিত হয় মিলি। ইমরান হাই স্কুলে যাচ্ছে। মেয়েরাও দেখতে দেখতে কিভাবে বড় হয়ে গেলো! এবছর আরিয়ানাও পুরোদস্তুর স্কুলে যাচ্ছে। রান্না, ঘর গোছানোর মত আটপৌরে কাজগুলো টিভি দেখার ফাঁকে অভ্যস্ত হাতে সেরে নেয়ার পর তাই অখন্ড অবসর। এই নিস্তব্ধতার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি এখনও সে। এই দিনগুলো আজকাল তার বড় বেশি দীর্ঘ; শূন্যতায় মাখা। মনে হয় জীবন থেকে তার প্রয়োজন হঠাৎ করেই যেন ফুরিয়ে গেছে।



"লরেন্স-ডনওয়ে নেক্সট..."
এক হোমলেস ধরণের লোক উঠেছে রজার্স থেকে, বিশাল ব্যাগি প্যান্টস, কাঁধে ব্যাকপ্যাক। গা থেকে ভুরভুর করে মদের গন্ধ আসছে। মাথার স্কার্ফটা ঠিক করার অজুহাতে সবার অলক্ষ্যে আলগোছে নাক চেপে ধরে মিলি। দুর্গন্ধে বমি এসে যাচ্ছে কিন্তু কাউকে কিছু বলার জো নেই। পার্স থেকে ট্রপিক্যাল বডিমিস্ট বের করে দ্রুত স্প্রে করে সারা শরীরে, চারপাশে। সেইসাথে স্বামীর কথা ভাবল। রাশেদ প্রকৃত অর্থেই একজন ভদ্রলোক, সতের বছরের দাম্পত্য জীবনে এ নিয়ে মিলির মনে কোন দ্বিধা নেই। মাঝারিগোছের ছাত্র ছিল বরাবর, গাজিপুরের এক টানাটানির সংসারে একগাদা ভাইবোনের মাঝে থেকে স্রেফ অধ্যবসায়ের জোরে ঢাকা ইউনিভার্সিটির একাউন্টিংএ মাস্টার্স শেষ করে মিডল ইস্টের এক কোম্পানীতে যোগ দিয়েছিল রাশেদ। সম্বন্ধের বিয়ে তাদের। ছুটি নিয়ে দেশে দু'একবার এসেছিল সে, বউ- বাচ্চাকে একসময় নিয়ে যায় নিজের কাছে। মিডলইস্ট থেকে এরপর কানাডায় ইমিগ্রেশন নিয়ে চলে আসা। টরন্টোর চাকুরীর বাজার মন্দা। সাদাসিধে সার্টিফিকেট আর ইংরেজিতে কথা বলায় অস্বচ্ছন্দতায় তার পক্ষে কাজ জোটানো সহজ হয়নি মোটেও। সরকারী সাহায্য নিয়ে, পাশাপাশি এক ইরানিয়ান ফার্নিচার স্টোরে নগদ টাকায় বহুদিন গাধার খাটুনির পর "কানাডা পোস্ট" এ বছরচারেক হলো সে একটা কেরানীর কাজের বন্দোবস্ত করতে পেরেছে। পাঁচ ফিট সাত ইঞ্চির গতানুগতিক বাঙালি শরীরে তার ইতোমধ্যে মেদ জমেছে প্রচুর, একটা সুখি ভুঁড়ি সগৌরবে তার উপস্থিতি জানান দেয়। সরকারী চাকুরীতে স্বস্তি আছে বৈকি! তেরোবছরের পশ্চিমা জীবনের লাভ লোকসান কখনো সখনো কাগজে-কলমে হিসেব করে রাশেদ। চোখের চারপাশ জুড়ে ক্লান্তির ধূসর ছাপ আর নিয়মিত ইন্সুলিনের সিরিঞ্জ বনাম ছোটখাটো ঘরোয়া আড্ডায় কাচ্চি বিরিয়ানি আর গিন্নীর সুদক্ষ হাতে বানানো মিষ্টির সাথে অবসরে বন্ধুর আড্ডা, ছেলেমেয়েদের প্রাণবন্ত হাসি, মাসে-ছ’মাসে দেশের স্বজনদের কিছু আর্থিক সহায়তাপ্রদান-- নিজস্ব ডেবিট ক্রেডিটের খতিয়ানে প্রাপ্তির পাল্লাই ভারি বলে নিজেকে সান্তনা দেয়ার প্রয়াস পায় রাশেদ।

"নেক্সট স্টপ ওয়েস্টন রোড নর্থ..."
বাস মসৃণগতিতে চলছে। জানালায় বাইরের চলন্ত বাড়িঘর, চলন্ত গাছপালা, চলন্ত খোলা মাঠ, চলন্ত শপিং এরিয়া। সাথে ভাবনারাও ছুটে চলে। জীবনের অনেক চড়াই-উৎরাই পার হয়ে এসে মিলি এখন জেনেছে, একজন মেয়ের জীবনে "নিয়তি" শব্দটার মানে কি। এমনকি, হয়ত নিঃশব্দেই, নিজের জীবনে তাকে বরণও করে নিয়েছে। সুখ কাকে বলে, ঠিক বুঝতে পারে না সে। ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, ছোটখাটো গৃহস্থালি আনন্দ- এই-ই হয়ত সুখ। কোন একান্তক্ষণে নিজের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে মিলির ভেতর থেকে অপর এক মিলি বেরিয়ে আসে। সংসারের একপাশে দাঁড়িয়ে নির্মোহ একজন দর্শকের মত, তৃতীয়জনের মত, উৎসুকচোখে তাকিয়ে দেখে চলন্ত সিনেমার মত বয়ে চলা তাদের জীবন। বুঝে নিতে চেষ্টা করে সেখানে "মিলি" নামক ব্যক্তিটির নিজস্ব স্থানটুকু। একের পর এক ইট বসিয়ে ধীরেধীরে গড়ে তোলা এক সাধারণ স্থাপত্যের মতই, শুধু জেনেছে, এক অতিসাধারণ নারীজীবন তার। তিলে তিলে, সবার চোখের আড়ালে গড়ে ওঠা এক ভীষণ দৈনন্দিন জীবন।

"হানিংউড..."
"হানিংউড", প্রতিধ্বনি করে মাতাল হোমলেস লোকটা। মিলি চমকে ওঠে, লোকটার দিকে তাকায়। বাস-ড্রাইভারের প্রতিটা কথার সাথে গলা মেলাচ্ছে সে। অ্যাপার্টমেন্টের সুপারকে আজ ডাকতে হবে, ভাবল মিলি। বাথরুমের সিঙ্কের ফসেটে পানি ঠিকমত আসছে না। প্রায়ই ডেকে আনতে হয় সুপারকে। পুরনো বিল্ডিঙ, প্লাম্বিংএ প্রায়ই সমস্যা করে। ইলেকট্রিক স্টোভটাও মান্ধাতাকালের, মাঝেমাঝেই ভাল্ব না কি যেন নষ্ট হয়ে যায়। সুপার পোল্যান্ডের লোক, দশাসই শরীর নিয়ে ধুমধাম কাজ শেষ করে ভাঙা ভাঙা ইংলিশে যা বলে, খুব বেশি বুঝতে পারে না মিলি। ইংরেজিতে তার দক্ষতাও তথৈবচ, ফলতঃ যা হবার তাই-- ইশারা ইংগিতে বেশির ভাগ কথা সারতে হয়।

চেরি স্ট্রিট দিয়ে বাস যাচ্ছে। চারপাশের বাংলো প্যাটার্নের ঝকঝকে বাড়িগুলোর দিকে বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে মিলি। একেকটা বাড়ি, শিল্পির আঁকা একেকটা ছবি যেন! হৃদয়ের গহীনে এক গোপন ইচ্ছে অনুভব করে খুব, প্রায়শই, নিজের একটা বাড়ি যদি তাদের থাকতো! সরকারী অফিসের প্রাক্তন কর্মকর্তা বাবা হয়ত কিছুটা বৈষয়িকই ছিলেন। স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে বাড়িকে সফল ইনভেস্টমেন্ট হিসেবে ভাবতে ভালবাসতেন বাবা, সৎ রোজগারের পয়সায় তিলে তিলে গড়া ঢাকা শহরে তাদের ছায়াঘেরা ছোট বাড়িটার কথা মনে পড়ে। একটা ছোট বাড়ি যদি হতো তার! ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় শুধু নয়, খোলা উঠোনে মুক্ত নিঃশ্বাস নেয়া যেত। সামনের ইয়ার্ডে সবুজ ঘাসের ফাঁকে কিছু ফুলের বেড, ব্যাক ইয়ার্ডে শাক-সবজির বাগান। প্রিয় অবসরে হ্যামোকে হাল্কা রোদ্দুরে গা এলিয়ে শীর্ষেন্দু কিংবা শক্তির বইতে চোখ বুলানো যেত, পাশে ছোট টিপয়ে থাকতো উষ্ণ এককাপ চা আর দুটো সামোসা। খালি পায়ে পরখ করা যেত মাটির সোঁদা স্বাদ। বন্ধুস্থানীয় ভাই-ভাবিদের নিয়ে কোন এক ছুটির দিনে পেছনের উঠোনে আড্ডা দিতে দিতে বার্বিকিউ করা যেত। গোপন ইচ্ছে, গোপনেই তাই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে মিলি। এখন আর সম্ভব নয়। পঁচিশ বছরের মর্টগেজের ভার চিন্তার বাইরে। মেনে নিয়েছে সে তার অ্যাপার্টমেন্টের বদ্ধ জীবন। বাকি দিনগুলো এভাবে, এতোটুকু স্বস্তিতেই কোনোভাবে কেটে যাক। পরম করুণাময়ের কাছে তার প্রার্থনা শুধু এতোটুকুই।

"স্কারবোরো সেন্টার নেক্সট..."
সুখী হওয়া ছাড়াও নিশ্চয়ই নিশ্চিন্তের একটা জীবন যাপন করা সম্ভব, ভাবে মিলি। অবশ্যই সম্ভব। নয়তলার তিন বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টের ছোট ব্যালকনিতে ঠাণ্ডা একগ্লাস ট্রপিকানা নিয়ে এসে দাঁড়াতে ভালো লাগে। ঝকঝকে নীল আকাশ। কিছু নাম না জানা পাখি। ছোট ব্যালকনিতে টবে গাছ। কাঁচামরিচ, স্ট্রবেরি, রোজমেরী, ব্যাসিল। নীচতলার খালাম্মা লাউয়ের কিছু বীজ দিয়েছিলেন, স্টিক দিয়ে মাচা বানিয়ে দিয়েছে মিলি, তার উপর তন্বী লাউগাছ সামারের প্রথম সজীব সবুজ পাতা মেলে ধরেছে। গতবছরও হয়েছিল, তবে গাছে লাউ ধরার আগেই শীত এসে গেল। পাতাগুলো মরে যাচ্ছিল দ্রুত, ইচ্ছের বিরুদ্ধে একদিন পুরো গাছটাকে তুলে মাছ দিয়ে রান্না করে ফেলতে হয়েছিল।

ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টপেজ থেকে বেশ ক'জন স্টুডেন্ট উঠল বাসে। সামনে বসার জায়গা নেই, ড্রাইভার সবাইকে পেছনে চাপতে বলছে। হোমলেস লোকটা যথারীতি ড্রাইভারের কথার প্রতিধ্বনি করছে, "মুভ ব্যাক, মুভ ব্যাক..."। ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েদের উচ্ছলতা দেখে ভাল লাগছে। কি ভীষণ মায়াবি ছিল তার জীবনের সেই সময়টা! লুনা, আবির, টুম্পা, মাসুদ, রুবাইয়াৎ আর মিলির ছোট গ্রুপটা। কে কোথায় আছে কে জানে! লুনার সাথেও কথা হয় না অনেকদিন। বাসায় ফিরতে দেরি হয়ে যাবে আজ, উৎকণ্ঠচোখে মিলি বাসের উচ্চতা থেকে জানালা দিয়ে বাইরে নিচে তাকিয়ে আনমনা হয় হঠাৎ। রাস্তার পাশে ছোট কাচঘেরা বাসস্টপ, ভেতরে এক অন্ধলোক, বসে ইউকেলেলে বাজাচ্ছে। পাশে উল্টে রাখা স্ট্রহ্যাটের ভেতর জমে যাচ্ছে ডাইম, নিকল, কোয়ার্টার আর লুনি- টুনি। দ্বিপ্রহরের হট্টগোলের ভেতরও সেই হাল্কা বাজনা শোনা যাচ্ছে। চারপাশের ব্যস্ততা উপচে কেন যেন মিলির চোখ আটকে গেল আবারো সেই মুখে। টাইফয়েড-আক্রান্ত মনিবিহীন চোখের স্থানদুটো চুপসে ছোট হয়ে আছে, পিঁচুটি আর পানিতে ভেজা। কি অদ্ভুত! কিছুটা সম্মোহিতের মতই, পাশ ফিরে জানালার দিকে কিছুটা ঝুঁকে এলো মিলি, তারপর চমকে গেলো! ষাট বছরের এক ককেশীয় অন্ধ, মুখজুড়ে তার আশ্চর্য নির্লিপ্তি! খোঁচাখোঁচা দাঁড়ি গোঁফের ভেতর আশ্চর্য প্রশান্তির এক মৃদুহাসি! মিলি স্তব্ধ হয়ে যায়! তার শ্বাস চেপে আসে। এক অন্ধের জীবনে কিসের এতো সুখ? কী তার প্রাপ্তি? এতো আনন্দের উৎস কোথায়? মিলি কী হিংসাবোধ করছে? কেন সে... বাস হঠাৎই ছেড়ে দিয়ে আবার থেমে গেল। "নাআআআআআ ..." চিৎকার করে উঠল মিলি। বেমক্কা ঝাঁকুনিতে তার হাতের টোট ব্যাগ পড়ে গেছে মেঝেতে, ভেতরের সদাই ছড়িয়ে গেছে এদিক সেদিক। আঠারো ডিমের কার্টন থেকে বেশ কিছু ডিম তাদের সাদা হলুদ থকথকে অংশ ইতস্ততঃ ছড়িয়ে দিয়েছে মেঝেতে, পায়ের কাছে মুখব্যাদান করে আছে যেন। বাসের সবার দৃষ্টি এখন মিলির দিকে। কারুর চোখে হাসির ঝিলিক, কারুর চোখে সমবেদনা। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই, সবার একঘেয়ে নিস্পন্দ জীবনে এ এক বহুপ্রতীক্ষিত আনন্দদায়ক যতি।

মিলির মুখ রক্তশূন্য। ড্রাইভার খানিকটা সময় দিল তাকে সামলে নেয়ার জন্য। তড়িঘড়ি করে ডিম, চেডার চীজ, আভেন-রোস্টেড ডেলি টার্কি আর মাশরুমের প্যাকেট ব্যাগে ঢুকিয়ে কিচেন টাওয়েলের র‍্যাপ খুলে মেঝের সিক্ত এলাকা ঢেকে দিলো। হাতে স্যানিটাইজার মাখল। বাস ছেড়ে দিয়েছে। চারপাশে দ্রুত তাকাল মিলি। বিনোদন শেষ, কেউ আর তার দিকে তাকিয়ে নেই এখন।

বাস ছুটছে। সজোরে হাতের ব্যাগটা পাশের খালি সিটে রাখল সে। শক্ত, কঠিন আর ভীষণ বেয়াদব, ফাজিল মনে হচ্ছে ব্যাগটাকে। এই ব্যাগের থাকা, না থাকা একই কথা। কোন মানে হয় না এর-- কিছু ধরে রাখতে পারে না ভেতরে। অর্থহীন এই ব্যাগ! অর্থহীন এই বাজার সদাই! জীবনটাকেও অর্থহীন লাগছে! মিলি কাঁদছে। সবকিছু দুঃস্বপ্নের মত লাগছে। সে তো তার জীবনকে মেনেই নিয়েছিল! চোখ মুছে দুই হাতে দু'পাশের সীট শক্ত হাতে চেপে ধরে মিলি। কোন মানেই হয় না এসবের।

"ভিক্টোরিয়া পার্ক নর্থ নেক্সট..." ড্রাইভারের ভরাট গলা শোনা গেল।
পার্সটা সীটের উপর রেখে বাসের স্ট্রিং ধরে টানল। টুং। ড্রাইভারের সামনের ডিসপ্লেতে লেখা ভাসলো, "স্টপ রিকুয়েস্টেড"। বাসায় যেতে সাত মিনিটের মত পথ হাঁটতে হবে। মিলির পা কাঁপছে। স্টপেজের ধাতব চেয়ারে বসে সামলে নিলো নিজেকে। ইমরান স্কুলের বাসে ফিরবে। মেয়েদের স্কুল খুব কাছে, নিজেরাই চলে আসতে পারে অন্য বাচ্চাদের সাথে, দরজার চাবিও আছে তাদের কাছে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মিলি। চারপাশে বাচ্চাদের হুল্লোড়। কাজ থেকে ফেরা কিছু ক্লান্ত ঘর্মাক্ত মুখ। বাড়ি ফেরার তাড়া সবার। মুখটা মুছে ফের উঠে দাঁড়ায় সে। কলিংবেলের শব্দে দরজা খুলে দিল আরিয়ানা। চিৎকার করে হেসে মা'কে জড়িয়ে ধরল। "আমাকে হারিয়ে যেতে দিও না, মা"- ছোট মেয়েকে বুকে ধরে ফিসফিস করল মিলি।

রাত এগারটা বেজে গেছে, বাচ্চারা এখন যে যার ঘরে। কাল শনিবার। ছুটির দুটো দিনে ভোরে অফিস আর স্কুলের তাড়া নেই। রাশেদ কিচেনে গেছে চা আর কুকিস আনতে। কাউচে আধশোয়া হয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে মিলি, বাংলা নাটকে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করছে। গান গাইছে নায়ক নিবিড়ভাবে, "মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে, জাদুধন..." কিচেনে হঠাৎ ধুম করে শব্দ হলো, আপাদমস্তক কেঁপে উঠলো মিলি। কী হলো? স্টোভটা কী বিস্ফোরিত হয়ে গেছে? আততায়ীর পুঁতে রাখা অদৃশ্য বোমার মত? রাশেদ কী বেঁচে আছে?

-কী হয়েছে? দৌড়ে কিচেনে গিয়ে ভাঙা গলায় আর্তচিৎকার করে মিলি।
-তেমন কিছু না ম্যাডাম। চা'র কেটলিটা হাত থেকে পড়ে গেছে। তোমার স্বামী রান্নাবান্নায় অপটু, জানোই তো।
কৌতুক করার চেষ্টা করে রাশেদ। তারপর মিলির মুখে চেয়ে কিছুটা অবাকই হয়।
“তোমার খারাপ কিছু হোক, আমি চাই না... কখনো চাই না...” ফুঁপিয়ে রাশেদকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরে মিলি।
ভয়ে-বিস্ফারিত, শাদা হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে রাশেদ কি বুঝলো, কে জানে! মেঝেতে উল্টে থাকা কেটলিটাকে আড়াল করে দাঁড়ায় সে।
-মিলি, চলো ঘুমাতে যাই। রাত অনেক হলো।

কাঁধে হাত রেখে মিলিকে কাছে টানার চেষ্টা করল রাশেদ। শক্ত হয়ে আছে মিলি, ঈষৎ পাশফেরানো মু্‌খ। জানালা দিয়ে একদৃষ্টে বাইরে তাকিয়ে আছে। নয়তলার সুপরিসর বদ্ধ জানালার বাইরে নিশ্চুপ টরন্টো। নীল চাঁদোয়া, জোনাকজ্বলা কাচের দেয়াল, লাস্যময়ী গাঢ় রাত। প্রলুব্ধ করার মত অনেক কিছু আছে এই শহরের।