সে

রুমা মোদক

খুনটা সে করেছে। নিশ্চিতভাবেই করেছে। এ ব্যাপারে সে নিজে নিঃসন্দেহ। কাজেই নীল পোশাক পড়া পুলিশের দলটি যখন গেট দিয়ে ঢুকে তখন নিজের নেয়া সিদ্ধান্তটির প্রতি সে অধিকতর আন্তরিক হয়। পাশের খালি চেয়ারটির দিকে তাকায় একনজর। এখানে বসতো মনোয়ারা। গত মাস দুয়েক ধরে সে অফিস করছে না। তার হাতেই টাকা গুনে বুঝিয়ে দেয়ার দায়িত্ব ছিল।গুনতে থাকা টাকাগুলো পাশের অন্য সহকর্মীর হাতে গুঁজে দিয়ে বাইরে আসে সে। আত্মসমর্পনের সিদ্ধান্ত তার আগেই নেয়া। আত্মগোপনের প্রশ্নই উঠেনা।
বাইরে বিকেলের পড়ন্ত উদোম রোদ। নিষ্কম্প পাতাদের গায়ে লেপ্টে থাকা অস্তাচলে যাওয়া রোদের নিষ্প্রভ আঁচ। একটা কালো কুচকুচে দাঁড়কাক নিমগাছের ডাল থেকে পেয়ারার ডালে যাবার আগে কর্কশ কা কা রবে তার মাথার উপর একটা বেহুদা চক্কর খায়। মাথার উপর সর্বাঙ্গ নীল আকাশে কিছু অকর্মন্য মেঘের দল।
যদিও তারা ঘন ঘন ঠিকানা বদলায় কিংবা বদলাতে বাধ্য হয, শহরের গলি ঘুপচি ঘুরে পাড়াটা সে ঠিকঠাক একদিনেই বের করে ফেলে।ঠিকানা নির্ভুল চিহ্নিত করার আশ্চর্য এই ক্ষমতাটা অবশ্য তার একদিনে হয়নি। খুঁজে বের করার প্রাথমিক কৃতিত্বটাও তার নয়। বন্ধু ইমতিয়াজের। কলেজের ক্যান্টিনে প্রথম বিড়ি ফোঁকা থেকে নারীদেহের ভাঁজসমেত গোপন বৃত্তান্ত জানা সবই বন্ধু ইমতিয়াজের কল্যাণে। ইমতিয়াজের প্ররোচনাতেই পৌরুষের পরীক্ষা দিতে রাজি হয়েছিল সে। সন্ধ্যার রহস্যময়তায় জীবন্ত শহরটা আধো চেনা আধো অচেনা হয়ে গেলে ইমতিয়াজ তার হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিলো অচেনা গলিপথ ধরে। দালালদের কাজটা যে ঠিক কী, তাও প্রথমটায় ভালোমতো আন্দাজ করতে পারেনি সে। সব দায়-দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিয়ে ব্যবস্থা করে দিয়েছিল ইমতিয়াজ।
পুলিশের দলটি গেটে দাঁড়িয়ে দারোয়ানের সাথে কথা বলছে। সে আন্দাজ করে তারই নাম-ঠিকানা-ঠিকুজি সন্ধান করছে। দারোয়ান বাবুল মিয়া একবার আঙুল তুলে তার দিকে কি যেন দেখায়ও। সে মনে মনে হাসে, আরে বাবা সে তো ধরা দেবার জন্য প্রস্তুত হয়েই আছে। পুলিশের দলটি বৃথাই কালক্ষেপন করছে।
ইমতিয়াজ এখন তাকে ডাকে গুরু। সন্ধ্যায় একেকদিন বাসুর চা স্টলের আড্ডায় গুরু....বলে রাজা-বাদশাদের মতো কুর্নিশ জানায়। সে হো হো করে হাসে। ইমতিয়াজ ও হাসে। তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা তার ক্ষয় কিংবা ক্ষরণ ইমতিয়াজ দেখে না। ইমতিয়াজের দৃষ্টি ততোটা গভীর-অতলে পৌঁছায় না। ইমতিয়াজ এখন ধোয়া তুলসীপাতা। রমরমা কন্ট্রাকটারি সাথে ট্রাভেলের ব্যবসা, এলাকার হজ্বগামী এবং বিদেশগামী সব ক্লায়েন্ট একচেটিয়া ইমতিয়াজের। ঘরে বাধ্য সুগৃহিনী সহধর্মিনী। ফুটফুটে দুটি বাচ্চা। সে যখন সকালে প্রতিদিন মাইক্রোক্রেডিট এর কিস্তি আদায়ে মোটরবাইকে চড়ে বের হয়, ইমতিয়াজও তখন মোটর বাইকের সামনে-পিছনে দু বাচ্চাকে বসিয়ে স্কুলে পৌঁছে দিতে যায়।
পুলিশের দলটির একজন গেটের পাশে টং দোকান থেকে পান কিনে খায়। পানের ডাটায় লাগানো চুন আঙুলের মাথায় করে নিয়ে জিবে লাগায়। আরেকজন ঠোঁটে সিগারেট নিয়ে পকেট হাতড়ায় বোধহয় ম্যাচের খুঁজে। না পেয়ে দোকানীর বাঁশের পাল্লায় বাঁধা দড়ির মাথায় জ্বলতে থাকা আগুন দিয়ে সিগারেটটা ধরিয়ে নেয়। পান খাওয়া পুলিশটির ছুঁড়ে মারা পানের পিক কিছুক্ষন শূন্যে লাফিয়ে রাস্তার উপর শুয়ে স্থির হয়ে যায়। আর আরেকজনের গালভর্তি ধোঁয়া ছেড়ে দিলে অর্থহীন কিছু আঁকিবুকি এঁকে এঁকে চলে যেতে থাকে অজানা গন্তব্যের দিকে।
কাল রাতে শেফালির ঘরে ঢুকতেই শেফালি তার কাছে হাত পাতে। একশ নয়, এক হাজার নয়, ছয় হাজার টাকা চাই। সে প্রথমটায় বুঝে উঠতে পারেনি, শেফালি আসলেই টাকা চাইছে, নাকি পুরোটাই তার অভ্যাসমাফিক রঙ্গরস। রঙ্গরসের জন্য লাইনে তার বিশেষ খ্যাতি। ঘটনা কী জানতে চায় সে, স্বাভাবিক রহস্য করে শেফালি- আছে, আছে, কমু। এ রহস্য তার খুব চেনা। গায়ে না মাখলেও চলে। গায়ের কাঁথাখানা টেনে তুলে আধশোয়া থেকে পুরো গা টা এলিয়ে দেয় বিছানায়। বলে- লগে থাকলে টেকাডা দিয়া আইজকা যানগা। শইরলডা বালা না। আচ্ছা তা না হয় যাবে। কিন্তু এতো টাকা কেন? বারবার জানতে চায় সে। শেফালির রহস্য ফুরায় না। শেফালির বান্ধা কাস্টমার সে। বোধকরি মনোয়ারার সাথে অসুখী দাম্পত্যের কিচ্ছার কোনো ফাঁক দিয়ে পেশাগত প্রয়োজনের উর্দ্ধে কিছুটা মায়াও ঢুকে পড়েছে সম্পর্কে। শেফালির কাছে নিজের এই অবস্থানটুকু বুঝা সত্ত্বেও আজ চিড়চিড় করে রাগ বেড়ে যায়। টাকার প্রসঙ্গ অগ্রাহ্য করে বেরিয়ে যেতে চায় সে। ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তির টাকা সংগ্রহের জন্য ভ্যারাইটিজ মানুষের সাথে দেন-দরবার করে এমনিতেই মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে সারাদিন। তার উপর সামান্য আনন্দের খোঁজে এসে এই ঢং! চলে যেতে উদ্যত হলে শেফালি এক লাফে নীচে নেমে শার্ট টেনে ধর পিছন থেকে- হাতঅ একডা টেহাঅ নাই। হাজারখানেক অইলেও দিয়া যান। যান কই?
পুলিশের দলটি সামনের দিকে আগায়। তাদের নীল পোশাকে ধাক্কা খেয়ে দিনের রোদ খুব দ্রুত সন্ধ্যা অতিক্রম করে রাতকে ডাকতে যায়। রাস্তার দুপাশে নিম-পেয়ারা-আম-জাম-গন্ধ াজ ইত্যাদি নানা প্রজাতির ফুলজ-ফলজ-বনজ গাছের মাথায় দ্রুতই নামতে থাকে অন্ধকার, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে নীড়ে ফেরা পাখিদের কিচমিচ। অফিস শেষ করে গৃহমুখী স্টাফরা এ অসময়ে অফিস প্রাঙ্গনে পুলিশের দল দেখে কেউ ভ্রু কুঁচকে তাকায় মূহুর্তমাত্র, কেউ বা পাশ কাটিয়ে চলে যায়। দিনের দুঃসহ ক্লান্তি কৌতুহল কিংবা আগ্রহকে হত্যা করে এই পড়ন্ত বেলায়।
পাড়ায় ঢোকার মুখে মনোয়ারাকে দেখেছিলো সে দূর থেকে। মধ্যপ্রাচ্য ফেরত মামাতো ভাইএর সাথে ঢলতে-ঢলতে, গলতে-গলতে নামছিলো রিক্সা থেকে। শহরতলীর নির্জনে ধানক্ষেতের আড়ালে-আবডালে জড়াজড়ি করে সেলফি তুলে দুজন। বিয়ের পরপর কোথাও বেড়াতে গেলে তাকেও এভাবে জড়িয়ে ধরতো মনোয়ারা। পাশাপাশি চেয়ারের সহকর্মী থেকে স্ত্রী করে ঘরে তোলার সময় কানাঘুষা শুনেছিলো সে এই মামাতো ভাইয়ের সাথে সম্পর্কের। মনোয়ারা যখন অস্বীকার করে, নিজে পাত্তা দেয়নি। এখনো মনোয়ারা তার আইনত স্ত্রী। গতমাসে পুরুষত্বহীনতার দায় চাপিয়ে তালাকের নোটিশ পাঠালেও এখনো আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি। রাগে-ক্ষোভে ইচ্ছে করে কাছে গিয়ে মনোয়ারার গলা টিপে ধরে। মামাতো ভাইএর সাথে ঢলাঢলির সাধতো তার উপর এই দুঃসহ দায় চাপানো কেন?
পুলিশের দলটি সামনে দাঁড়ায়। অপেক্ষাকৃত মোটা পুলিশটি জানতে চায়, আপনাদের ম্যানেজার সাহেব কই? আঙুল তুলে ম্যানেজারের রুম দেখিয়ে দিলে মোটা পুলিশটি বাকি পুলিশদের- আপনারা এখানে ওয়েট করুন বলে ভিতরে যায়। তার মনে মনে হাসি পায়। পুলিশের দলটিকে কী তার পাহাড়ায় দাঁড়িয়ে রাখা হয়েছে? কিন্তু তারা তো জানে না, সে পালাবে না। খুব কাছ থেকে পুলিশের দলটিকে দেখে সে। এখানে দাঁড়ানো চারজন। একেকজন একেক বয়সী। কারো দৃষ্টিতেই খুনীর আসামী ধরার কোনো রোমাঞ্চ নেই। সে ভাবে মনে মনে, এসব হয়তো এদের কাছে ডালভাত।
গলা টিপে ধরে সে শেফালির। গায়ের জোরে। শেফালি এক ঝটকায় তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে ছাড়িয়ে নেয় নিজেকে। দ্রুতগতিতে আবার শেফালিকে জাপটে ধরে সে। বলিষ্ঠ বাহুবন্ধনে ছটফট করে শেফালি। চিৎকার দিতে চায়, ছুটে পালাতে চায় দরজার দিকে। এবার একহাতে মুখ চাপা দিতে হয়। ধস্তাধস্তি করে বিছানায় ফেলে সে শেফালিকে। বালিশ চাপা দেয় মুখে। দু হাতে চেপে ধরে সমস্ত আক্রোশের শক্তি একত্র করে। শেফালি পা দাপায়, দু হাতে বালিশখানা সরাতে চেষ্টা করে প্রাণপনে। এবারে দু হাঁটু চেপে ধরে সে বালিশের উপরে। কী কইলি, কী কইলি তুই, আমার বাচ্চা খালাস কইরা আইছস? শালী তুই জানছ পুরুষত্বহীনতার কলঙ্ক লইয়া, পাঁচ লাখ কাবিনের টাকা যোগাড়ের লাইগ্যা দরজায় দরজায় ভিক্ষা করতে নামছি আমি। একসময় শেফালি নিশ্চল স্থির হয়ে যায়।
পিয়ন তবারক আলী বাইরে এসে বাকি পুলিশের দলটিকে ভিতরে ডেকে নেয়। তাকেও ডাকে। ম্যানেজার স্যারের ডানপাশে তার মেয়ের মুখটা হাসছে কম্পিউটারের স্কিনজুড়ে। সবাই চেয়ার নিয়ে বসলে সেও বসে এককোনে। ম্যানেজার সবাইকে চা দেয়ার নির্দেশ দেয় তবারক আলীকে। সারাদিনের কর্মব্যস্ততায় ঘর্মাক্ত ক্লান্ত পিয়নটির মুখে প্রচন্ড বিরক্তি। অফিসটাইম যদিওবা এই শ্রমের অত্যাচার সহ্য করা যায়, অফিস টাইমের পর এসব মরার উপর খাড়ার ঘা মনে হয়।
এক দরজা দিয়ে পিয়ন চা আনতে বের হয়ে গেলে, অন্য দরজা দিয়ে ঢুকে শেফালি। সে চমকে উঠে হেঁচকি খায়। কাল না সে শেফালিকে খুন করল! তবে কী শেফালি মরেনি? পুলিশ কেন তবে? শেফালি সবার অলক্ষ্যে একটা দুষ্ট ইশারা তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে, ম্যানেজারের নির্দেশমতো কম্পিউটারের স্কিনে দৃষ্টি দেয়- হ, হ। কাল এই মাইয়াডাই মইরা আমরার পাড়ার সামনের রাস্তাত পইড়া আছিলো। ম্যানেজার নিশ্চিত করে সে এই ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ছিল এবং তার দিকে আঙুল তুলে জানায় বছরখানেক আগে তার সাথে বিয়েও হয়েছিলো, যদিও এখন তা ভাংগনের পথে। পিয়ন চা দিয়ে গেলে পুলিশের দল থেকে মোটা পুলিশটিও নিশ্চিত করে, যেহেতু পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, এখন সঙ্গে থাকা লোকটিকে খুঁজে বের করে গ্রেফতার করতে হবে।মৃতের হাতের মোবাইলে মৃত্যুর কিছুক্ষন আগে যার সাথে উঠানো বেশ কিছু সেলফি পাওয়া গেছে।