ছ’ ইয়ারি গল্প – দ্বিতীয় পর্ব

বারীন ঘোষাল

বিড়ির গন্ধ নাকে আসতেই বিরিঞ্চিবাবা সোমা রায়ের উরুসন্ধিতে নাকটা গুঁজে দিলেন আবার। বিড়ির চেয়ে এই বোঁটকা গন্ধই তার মাস্ক মনে হয়, মস্ত লাগে। সোমা রায় বিরিঞ্চিবাবার পুনরুৎসাহে পুলকিত হয়ে তার মাথাটি চেপে ধরে ঘষে দিতে বাবার নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম। ছটফট করে উঠলেন তিনি। ঠেলে উঠে বিছানায় বসেই কিছুক্ষণ রামদেবের কায়দায় নিঃশ্বাস নিলেন। বললেন – পেছনের জানালা দুটো বন্ধ করে দাও তো।
সোমা রায় উঠে জামা কাপড় পড়ার উপক্রম করলে বিরিঞ্চিবাবা বলে ওঠেন – থাক না ওসব। তোমার বাবাই তো হন রবিবাবু। মেয়েকে কি আর দেখেননি কখনো ?
সোমা রায় মুখ বেঁকিয়ে জামা কাপড় পরে গিয়ে পিছনের জানালাটা বন্ধ করার আগে উঁকি মেরে দেখে তার বাবা রবি রায় বাগানে বসে একটা মুখোশ আঁটা বাচ্চা ছেলের সাথে গল্পে মশগুল। কত ছেলেপুলে বুড়ো হাবড়া আসে বকবক করতে বাবার কাছে। মানুষের কত কথা জমে যায় দিনের পর দিন। বলার ফুরসৎ আর শোনার কানের বড্ড অভাব। রাজ্যের লোকজন এসে কথা বলে আর বাবা মন দিয়ে শোনে সবার কথা। জবাব দেয়। হাসে। কাঁদে। চা খায়। বিড়ি খায়। এবার বাবার চায়ের সময় হয়েছে। সন্ধ্যা হবে। কে আর দেবে ? দু নম্বর বাগানের গাছে জল দিচ্ছে। ছ’ নম্বর বাজার থেকে ফিরল। কারো হুঁশ নেই। তাকেই যেতে হবে। বিরিঞ্চিবাবার কাছে সে এর মধ্যেই ৫৪ বার শুয়েছে। আর ৫৪ বাকি। ১০৮ পূর্ণ হলেই তার গর্ভ হবে। সন্তানের মা হতে পারবে সে। বাবার অসীম দয়া। প্রেমের শরীর। তার নিজের বাবার মতো নয়।
বিরিঞ্চিবাবার তোয়ালে আর তেল সাবান বাথরুমে রেখে, কোষাকুষি জল ধুপকাঠি দেশলাই ঘন্টা আসন জায়গামতো রেখে, শয়নক্রিয়ার জন্য এসব সরানো হয়েছিল, সোমা রায় – যাই – বলে নেমে গেল। বিরিঞ্চি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল কিছুক্ষণ। মুখময় ছাঁটা দাড়ি গোঁপ, গায়ে সাদা কাপড় পরনে, ঘর থেকে বেরোতে হলে কপালের সিঁদুর-লেপ মুছলেই সুপুরুষ লাগে। বাবা সুন্দর নাম রেখেছিল – বিরিঞ্চি। কি ফিটিং মাইরি। বিরিঞ্চিবাবা কী সুন্দর মানিয়েছে তাকে ! আর ওই মর্কট রবিকান্ত রায় তাকে ডাকে মধুসূদন বলে ! কে মধুসূদন ? সে বিরিঞ্চিবাবা। সে ত্রিকালদর্শী। চৌষট্টি নাগিনী তার বশ। তাকে মধুসূদন ! অসহ্য। পাশের বাড়িতে বাগানে বসা রবিকান্তকেই কেবল দেখা যায়। আর কেউ চোখে পড়ে না। কে বাজার করে, কে রাঁধে, কে বাগানে জল দেয়, কে তালা লাগায়, কে যে চা দিয়ে যায়, কাউকে দেখেনি কেউ। বিরিঞ্চির মতো দিগ্‌গজ পর্যন্ত কাউকে দেখতে পায় না। শুধু বাগানে একটা চেয়ারে বসা রবিকান্ত রায় মাস্টার আর সামনে এক আধজন মুখোশধারী। আজ পুঁচকেটা বাঘের মুখোশ পরে এসেছে। বাঘ না, বাঁদর।
সন্ধ্যা হব হব। বিরিঞ্চি জুতো পায়ে নেমে এসে বেরোতে যাবেন, অমনি ক্যাঁক করে ধরলেন রবিকান্ত রায়। --- চুপি চুপি কোথায় চললে গো মধুসূদন ?
কী জ্বালা ! উনি পেছনের বাগান থেকে কখন উঠে সামনের দিকে গেটের কাছে এসে পড়েছেন। থতমত খেয়ে বিরিঞ্চি বললেন --- আজ্ঞে, এই শান্তিপুর যাচ্ছি।
--- শান্তিপুর ? হাঃ হাঃ হাঃ বিকট শব্দে হেসে ফেটে পড়লেন রবিকান্ত রায়।
সোমা চায়ের কাপ হাতে আসতে আসতে বাবাকে অত জোরে হাসতে দেখে স্ট্যাচু হয়ে গেল।