দ্য ডায়াল নাম্বার ডাজ নট একজিস্ট...

দীপ্তিপ্রকাশ দে


দুপুরের হাওয়া। বুকের বোতাম খুলে উড়ে যাচ্ছে একটা বিস্কুটের প্যাকেট। খালি। ভেতর থেকে সব বিস্কুট বের করে কেউ তাকে ফেলে দিয়েছে রাস্তায়। সে এখন উড়ছে। আমি তার গায়ে লেখা নামটা পড়ার চেষ্টা করছি বারবার। যদি সে আমারই হাতে খুন হয়ে থাকে কখনও! যদি আমিই তাকে উড়িয়ে দিয়ে থাকি কোনওদিন! হাতেও পারে। আবার নাও পারে। কতবার কত প্যাকেটই তো এভাবে ফেলে দিই। শুধু কি বিস্কুটের? চানাচুর, ছিঁড়েভাজা, গুঁড়ো দুধ, মশলামুড়ি...। খেতে ভালো লাগলে প্রতিবার ভাবি নামটা মনে রাখতে হবে। কিন্তু মন তো সদাই ভোলা ময়রা! বেমালুম ভুলে যাই তাই। পরের বার জামা পালটে অন্য স্বাদ নিয়ে ফিরে আসে অন্য কোনও শহরের ছিঁড়েভাজা কিংবা চানাচুর। খেতে বিশ্রী লাগে। আমি আমার শুকিয়ে যাওয়া, বিশ্বাসঘাতক স্মৃতির উদ্দেশে মনে মনে দু’মিনিট নীরবতা পালন করে গুম হয়ে বসে থাকি। সিদ্ধান্ত নিই, খালি প্যাকেটগুলো রেখে দেব এবার। তারপর আবার ভুলে যাই সে শপথের কথা। আর রাস্তায় উড়ে বেড়ানো বুকখোলা প্যাকেটগুলোর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি! যদি দ্যাখা হয়ে যায়! যদি দ্যাখা হয়ে যায় আবার সেই পুরনো মুখগুলোর সঙ্গে।
আসলে মাঝে মাঝেই মনে হয়, বোতাম খুলে হাওয়ায় উড়ে বেড়ানো ওই প্যাকেটগুলোর গায়ে, হয়তো লেখা আছে আমার বন্ধুদের নাম। আর তাদের নতুন টেলিফোন নম্বর। হারিয়ে যাওয়া বন্ধু সব! কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচব না- এই মিথ্যে আত্মপ্রত্যয়ের মধ্যে একসময় কেটে গেছে কত কত দিন! সকাল-দপুর-সন্ধে। সন্ধে গড়িয়ে রাত নেমেছে মফস্‌স঩লের ফুটপাতে। মাঝরাতে রাইস মিলের চিমনির মতো শূন্যে ধোঁয়া ছেড়ে ফিরে গেছি যে-যার ডেরায়। আবার অপেক্ষা পরের দিনের জন্য, কিংবা তারপরের দিনের জন্য! আর সেই যে দেখা না হওয়ার মুহূর্তগুলো আমাদের, তাদের বেঁধে রেখেছে ‘ল্যান্ড লাইন’ নামে একটা প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা। রেখেছে বলা ভুল। রাখত। শুধু কাছের না। দূরের বন্ধুদেরও। কেননা তাদের সঙ্গে তো দেখা হয় না রোজ রোজ। তাই ভরসা বলতে ওই কথা-পাচারের অলৌকিক যন্ত্রটা। আর একটা পুচকে ডায়েরি ওরফে ব্যক্তিগত টেলিফোন ডিরেক্টরি। দু’-এক পিস মাসি-পিসি বাদ দিয়ে যার অধিকাংশ পাতায় ছড়ানো নির্ভেজাল বন্ধুবৎসলতা। পাতা ওলটালেই চোখ যাবে মাথার উপর ইংরেজি বড় হরফের একটা করে অ্যালফাবেটের দিকে। কুমিরের দাঁতের মতো কাটা কাটা হয়ে নেমে গেছে পাতাগুলো। Y আর Z-এর মতো এক-দুটো অচ্ছুৎ অক্ষর ছাড়া বাকি সবার ঘরেই তিল ঠাঁই আর নাহিরে অবস্থা। নামের পাশে নানা সংকেত! এক দীপু আমার বন্ধু। আর এক দীপু ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। অতেব দ্বিতীয় দীপু হল গিয়ে ইলেকট্রিক-দীপু। কিংবা আমার বড় মামা। নাম শান্তি। আর এক শান্তি বাড়িতে দুধ দেয়। তার একটা ভালো নাম আছে। নামটা বলব বলব করে আর বলেনি। চালু নামটাই মনে থেকে গেছে। তাই S-এর পাতায় তার নামের আগে একটা কচি ড্যাস বসিয়ে লেখা ‘আপাতত’। মানে আপাতত-শান্তি। এরকম আরও আছে। যেমন ক্যাচ-বাপি। যে কিনা একবার স্কুলমাঠের ক্রিকেট ম্যাচে দুর্দান্ত ক্যাচ লুফেছিল একটা। হাড়ুদা মাসে একবার বাথরুম পরিষ্কার করতে আসে। তার হাতে লম্বা একটা নারকেল ঝাঁটা। ডিরেক্টরিতে সে ঝাঁটা-হাড়ু। রাঙাপিসি মাঝেমধ্যেই গ্রাম থেকে হাঁসের ডিম এনে দেয়। অতএব মনে রাখার সুবিধাহেতু রাঙাপিসির পাশে ব্র্যাকেট দিয়ে ‘হাঁসের ডিম’। একবার কবি জয় গোস্বামী ল্যান্ড লাইন নম্বর জোগাড় করেছিলাম কোথাও থেকে! তাঁর নামের পাশে কী জানি কেন লিখে রেখেছিলাম ‘আমি চিনি, আমাকে চেনে না’। দু’পাশে ব্র্যাকেট।
নামের শেষে এক বা দু’নম্বর বসানো, কিংবা ‘ছোট’-‘বড়’ লিখে রাখা ছিল টেলিফোন ডিরেক্টরির অতি পরিচিত দৃশ্য। সে-সব ঘটনাবহুল ইতিহাসের এক একটা চরিত্র আজও হয়তো রয়ে গেছে মোবাইল-কনট্যাক্টসের গোপন গলিঘুঁজিতে। কিন্তু অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। এই শতকের শুরুতে আমরা যখন কলেজে পড়ছি, তখনও পর্যন্ত ল্যান্ড-লাইনই ছিল আভিজাত্যের শেষ কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন গেলাম, তখনও তার সমান দাপট। মোবাইল সবে থাবা বসাতে শুরু করেছে শহর, আধা-শহরগুলোতে। বড়লোক বাবার ‘প্রেমিক’ ছেলেমেয়েদের হাতে দু’একটা করে দেখাও যাচ্ছে তাদের। আর আমরা তখনও কয়েন বুথে দাঁড়িয়ে হাতখরচের টাকায় ফোন করছি বনগাঁর বান্ধবী কিংবা বিরাটির বন্ধুকে। এক চোখ মিনিট গুনছে। আর অন্য চোখ লেখা পড়ছে কয়েনের। বাইরে তুমুল ছুটছে শহর। বড় রাস্তার দু’পাশের পুরনো দেওয়াল দুড়দাড় করে ভেঙে দিচ্ছে নতুন যন্ত্রদানব। আর কদিন পরেই গড়ে উঠবে মস্ত উপনগরী। ফোনের ক্রিং ক্রিং শব্দ পেলে কেউ আর কেঁপে উঠবে না তখন। ওরই কি ফোন এল!-এই সংশয়াকূল হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে কেউ আর ছুটে যাবে না টেপ রেকর্ডারের পজ্‌ বোটম দাবিয়ে! বিশেষ কারও সঙ্গে কথা বলার জন্য কেউ আর ভাড়াটে বন্ধু দিয়ে ডাকাবে না কাউকে! কথোপকথনের সব সংকেতগুলোও হারিয়ে যাবে টেলিফোন-ঘর থেকে! যেমন মেয়েটি বলত ‘থ্রি’। আর ছেলটি বুঝে যেত থ্রি মানে MAN। অর্থাৎ টেলিফোনের পাশে কেউ একজন আছে! নিশ্চিত আছে! মূর্তিমান সেই বিভীষিকা কথা বলার স্বাধীনতা দিচ্ছে না মেয়েটিকে। অতেব জরুরি তথ্যগুলো শুধু জানিয়ে দাও তাকে। কবে, কখন, কোথায়...
এবং সেই ব্যক্তিগত টেলিফোন ডিরেক্টরি। সেও তো আদরহীন হয়ে পড়বে তখন! ল্যান্ড লাইনের পাশে যে একসময় শুয়ে থাকত চুপচাপ, পরাজয় মেনে নিয়ে সেও সরে যাবে নিঃশব্দে! বাতিল খাতাপত্র আর ফাইলবন্দি ড্রয়ারের গোপন ফাঁকে মাঝেমাঝে খুঁজে পাওয়া যাবে তাকে। পাতায় পাতায় কত নাম। কত মুখ!
দেখা না হলেও যোগাযোগ থেকে যাবে- এই অলীক প্রতিশ্রুতির মধ্যেই একদিন লেখা হয়ে গিয়েছিল কত কত নম্বর। ল্যান্ড নম্বর। যারা ততদিনে ঘুমন্ত, অচল, অবসৃত। আঙুলগুলোর মনখারাপ মাঝেমাঝেই ছুঁয়ে দেখতে চাইবে তাদের। কখনও সখনও আনমনে বোতামও টেপা হয়ে যাবে মুঠোফোনের। আর তখন, ঠিক তখনই, অদৃশ্য একটা কণ্ঠ কোনও এক অগমপার থেকে ভেসে এসে সজোরে ধাক্কা মারবে বুকে। কান যদিও শুনবে অন্য কথা- দ্য ডায়াল নাম্বার ডাজ নট একজিস্ট। প্লিজ চেক দ্য নাম্বার অ্যান্ড ডায়াল এগেন...