লাল বোতাম

অলোকপর্ণা

একটা ছাগল আরেকটা ছাগলের উপর চাপছে, রামা মন দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছে। মেয়ে ছাগলটা প্রথমে একটু এদিক ওদিক করে তারপর কেমন যেন হাল ছেড়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। রামা ছাগলদুটোর চোখের দিকে তাকায়, মরা মানুষের দৃষ্টিতে তারাও তখন রামার দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের চোখে চোখ পড়তে রামার গায়ে কাঁটা লেগে যায়। রামা উঠে পাথরের চাইয়ের উপর দাঁড়িয়ে পড়ে। ছাগলদের পার করে নদীর উপর দুটো একটা নৌকা তখন কুয়াশায় ঘুরপাক খাচ্ছে। রামা ফেরার পথ ধরে। একটু এগিয়ে রাস্তাটা দুইভাগ হয়ে ডান দিকে রামাকে ঘরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু রামা বাঁ দিকে হেঁটে যায়। যেদিকে তুলসি থাকে। যদি দেখা পায়, অন্তত একবার।

তুলসির বাড়ির সামনে দিয়ে বার তিনেক ঘুরে ফিরে আসে রামা। পাঁচিল আর পাঁচিলের বন্ধ দরজা রামাকে দেখে। হঠাৎ থেমে গিয়ে মাটি থেকে একটা লাল বোতাম সে তুলে নেয়, তুলসির জামা থেকে ঝরে পড়েছে হয়ত বা, এভাবে রাস্তায় গড়াগড়ি খাবে! চোখের কাছে এসে বোতামটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে রামা পকেটে ভরে রেখে হাঁটতে শুরু করে। ঘরের সামনে এসে কি মনে হতে সে পাঁচিল টপকে গৌতমদের বাড়িতে চলে আসে। রামা জানে গৌতমের দাদু দোতলার কোন ঘরে আছেন। পাইপ, কার্নিশ ইত্যাদি পার করে রামা দাদুর ঘরের জানালায় এসে টোকা মারে। একটু পরে জানালার পাল্লা খুলে যায়, চশমাহীন দাদুকে দেখতে পায় রামা, “দাদু, মাকে বলো না, তুলসির সাথে যেন আমার বিয়ে দেয়…”
“এত ভোরে তুই কি করছিস এখানে! যা বাড়ি যা!”
“দাদু, বলো না তুমি মাকে, না বললে আমি বাড়ি যাবো না।”
“আহা, এখন কি করে বলবো, এত ভোরে সবাই ঘুমাচ্ছে তো!”
“না, তুমি না বললে আমি বাড়ি যাবো না!”
“এখন যা রামা, সকাল হোক, আমি বলবো ছায়াকে”
“সত্যি বলবে তো?”
“সত্যি বলব”
“গোপালঠাকুরের দিব্যি?”
“গোপালঠাকুরের দিব্যি! যা বাড়ি গিয়ে ঘুমা!”
কার্নিশ থেকে একেবারে মাটিতে লাফিয়ে পড়ে রামা। দাদু উঁকি দিয়ে দেখেন সে ঠিক আছে কি না। হাত তুলে রামা দাদুকে জানায় তার ব্যথা লাগেনি, তারপর ঘরে এসে চুপচাপ মাকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ে। একটু পড়ে মা তার গায়ে চাদর টেনে দেন। ঘুমের মধ্যে রামা তা টের পায় না।


আঠারো বছর বয়স হতেই রামা টের পেল তার বিয়ে করা একান্তই প্রয়োজন। মাকে সেকথা বলতে বিশেষ পাত্তা পেল না সে। গৌতমের দাদুকে সবাই খুব মানে। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা নাগাদ গৌতমদের বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে সোজা দোতলায় দাদুর ঘরে চলে এসে রামা দাদুর পায়ের কাছে বসে পড়ল।
“দাদু, ও দাদু…”
চমকে উঠে পঞ্জিকা থেকে মুখ সরিয়ে দাদু দেখলেন সারা গায়ে ধুলো মেখে রামা তাঁর পায়ের কাছে বসা। “কি হয়েছে রে?”
“দাদু, আমার শরীর আনচান করে”
“কেন রে, পেট গরম না কি?”
“না দাদু…”
“তালে কি? ডাক্তার দেখাবি?”
অধীর হয়ে মাথা নাড়ে রামা, বলে, “আমার বিয়ে দিয়ে দাও দাদু, আমার শরীর আনচান করে”
“বিয়ে করবি! বউকে খাওয়াবি কি?!”
“বিজনেস করবো, কাল থেকে পল্টুর কাছে কেবিল টিভির কাজ শিখতে যাবো”
“আচ্ছা, কাজ শেখ তারপর বিয়ে করবি”
“দাদু আমার শরীর আনচান করে, সারারাত। সারাদিন। রাতে মায়ের হাত গায়ে লাগলে সরিয়ে দিই।”
“ঠিক হয়ে যাবে, রোজ সকালে মা কালীকে একটা করে জবা ফুল দে, শরীর আনচান করবে না আর।”
“সত্যি ঠিক হয়ে যাবে তো?”
“সত্যি ঠিক হয়ে যাবে”
“গোপালঠাকুরের দিব্যি?”

সেদিন রাতে রুটি কিনে ফেরার পথে তুলসিকে দেখে ফেলেছিল রামা।


বোতামটা পকেটে নিয়ে রামা বিকেল বিকেল নদীর পারে এসে বসে। ছাগল দুটো কাছে দূরে ঘাস খাচ্ছে। একটু পরে সবুজ সাথীতে করে তুলসি নদীর পার দিয়ে টিউশন পড়তে যাবে। রামা পকেট থেকে লাল বোতামটা বের করে চোখের কাছে এনে ধরে। একটা চোখ বন্ধ করে বোতামের ফুটোর মধ্যে দিয়ে রামা নদীর দিকে তাকায়। বোতামের ফুটো দিয়ে সে নদীর জল, বক, জলা ঘাস দেখতে পায়। অতদূরের কতখানি জল বোতামের ওইটুকু ফুটো দিয়ে তার চোখে এসে পড়ছে! রামা বোতাম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পৃথিবী দেখতে থাকে। রাস্তার দিকে বোতামটা রাখতে রামা দেখে ফুটোর মধ্যে দিয়ে সাইকেলে করে পড়তে চলে যাচ্ছে তুলসি। রামা বোতামটা পকেটে ভরে ফেলে। পাথরের উপর উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে তুলসির চলে যাওয়া দেখে সে। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করে বাঁ দিকের রাস্তা দিয়ে। তুলসি না থাকলে তুলসির বাড়িটা কেমন দেখায় তা দেখার জন্য।

তুলসিদের বাড়ির পিছনের গলিতে এসে দাঁড়ায় রামা। এখান থেকে তুলসিদের রান্নাঘর দেখা যায়। রান্নাঘর থেকে ভাতের গন্ধ আসছে। পেচ্ছাপ করতে করতে সেই গন্ধ শোঁকে রামা। এই ভাত রাতের বেলায় তুলসি খাবে। রামার খুব ইচ্ছে হয় ওই সাদা সাদা ভাত হয়ে যেতে। তারপর তুলসির মুখ দিয়ে গলা দিয়ে বুক দিয়ে পেট দিয়ে নিচে নেমে গিয়ে পরদিন সকালবেলায় কলঘরের পায়খানায় বেরিয়ে আসতে। ভেবেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে রামার। আর সারা শরীর আনচান করে ওঠে। গলিতে ড্রেনের পাশে বসে পড়ে রামা। একটা ঘেয়ো কুকুর এসে রামার গায়ের গন্ধ শোঁকে, তারপর রামার গায়ে হেলান দিয়ে বসে পড়ে।
রামা বলে, “খিদে পেয়েছে তোর?”
কুকুরটা ভ্রূ তুলে তাকায় রামার দিকে।
“ভাতের গন্ধে ভাত হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে তোরও?”
মুখ দিয়ে কুঁই আওয়াজ করে কুকুরটা।
“তোর শরীর আনচান করে? খিদে পেলে?”
কুকুরটা চুপ করে তাকিয়ে থাকে রামার দিকে।
একটা ঢিল তুলে রামা কুকুরটাকে খেঁদিয়ে দেয়। রামার দিকে তাকাতে তাকাতে কুকুরটা গলি থেকে বেরিয়ে যায়।




তুলসির বিয়ে হয়ে যেতে রামার পাগলামি বাড়তে থাকে। গরম রোদের দিনে ঘেয়ো কুকুরটাকে কোলে করে সে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বেরায়। নদী অবধি গিয়ে আবার বাঁ দিকের রাস্তা দিয়ে তুলসিদের বাড়ির সামনে এসে ঘুরপাক খায়। বর্ষার রাতে সেই বাড়ির সামনে গিয়ে “তুলসি তুলসি” বলে হাঁক পেড়ে কাঁদতে থাকে। গৌতমের দাদু ও অন্যান্য মানুষেরা রামার মাকে ছেলের জন্য মেয়ে ঠিক করতে বলেন।
রামার বিয়ে হয়ে যায়। বউয়ের বাড়ি গঞ্জে। মা বাপ নেই। মামার বাড়ি মানুষ বা মেয়েমানুষ। বিয়ের রাতে বউয়ের শাড়ি খুলে উপরে উঠে আসে রামা। খুব চাপতে চাপতে হঠাৎ করে বউয়ের মুখে চোখ পড়ে তার। সে দেখে সেই ছাগলগুলোর মত মরা মানুষের চোখ নিয়ে বউ তার দিকে তাকিয়ে আছে। রামা ছিটকে সরে যায়।
সে রাতে আর কিছু হয় না। পরদিন সকালে খুব থালা বাসন পড়ার আওয়াজ আসে রামাদের ঘর থেকে। গৌতমের দাদু চিন্তিত হন। বেলা বাড়তে রামা সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসে। গৌতমের দাদু তখন বুকের উপর পঞ্জিকা ফেলে ঘুমোচ্ছেন।
“দাদু…”
“কে? রামা! কিরে, সব ঠিক আছে তো?”
“বউ চলে গেল…”
“চলে গেল মানে?! কোথায় গেল?!”
“ওর কোন দাদা, মামার বাড়ির পাড়ার, সে এসে একটু আগে মোটর সাইকেলে করে নিয়ে চলে গেল।”
“কেন! সে কি! আমায় ডাকবি তো!”
“সকালে উঠে বউ বলল বিষ খাবে, ওর না কি পাগলের সাথে বিয়ে হয়েছে, দাদু আমি কি পাগল?”
গৌতমের দাদু রামার দিকে তাকায়। লাল ভাঁটার মত চোখ নিয়ে সে উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে।
“তোর শরীর ঠিক আছে তো? আনচান করে আর?”
“আনচান করে না, মাকালীকে ফুল দিই তো রোজ”
“আচ্ছা, আমি দেখছি কি করা যায়, তুই ঘরে যা, চান, খাওয়া করে ঘুমা, আমি তোর বউয়ের খোঁজ নিচ্ছি।”
“দাদু, আমি কি পাগল?”
“আহা, পাগল কেন হবি?!”
“সেই যে তুলসির বিয়ে হল, তারপর থেকে আমার গলা থেকে বুক পর্যন্ত ব্যথায় টনটন করে দাদু। রাতে ঘুমোতে পারিনা। মা বলেছে মনের ভুল। তাই কি?”
গৌতমের দাদু রামার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
মাথা নিচু করে রামা কি যেন ভাবে। তারপর পকেট থেকে কিছু একটা বের করে বলে, “দাদু হাত পাতো।”
“কি দিবি?”
“আরে হাত পাতো না!”
ভয়ে ভয়ে রামার মুখের সামনে হাত পাতেন গৌতমের দাদু।
দাদুর হাতে একটা লাল বোতাম রেখে রামা বলে, “খুব ভারি লাগছে এটা, না? আগে এমন ছিল না। তুলসির জামার, আমার পকেটে ছিল এতদিন, মনেই ছিল না। বোধ হয় এজন্যই বুক টনটন করত, তাই না দাদু?”
হাতের পাতায় পড়ে থাকা লাল বোতামটার দিকে তাকিয়ে গৌতমের দাদু ধীরে ধীরে বলেন, “হ্যাঁ, ঠিক তাই।”