আবর্ত

মণিকা চক্রবর্তী

ড্রইং রুমের অভিজাত সাদা সোফাটায় হেলান দিয়ে বসে নিলুফারের শেষ বারের মতো চলে যাওয়ার দৃশ্যটা আচ্ছন্ন হয়ে দেখছিল মারুফ। নিলুফারের পরনে নীলরঙের ম্যাচিং শাড়ি ব্লাউজ, শ্যাম্পু করা ফাঁপানো চুল। নিলুফার চলে যাচ্ছে। গত কয়েকটা দিনই ছিল থমথমে। ওর চলে যাবার সিদ্ধান্তের পর। মারুফ জানে না এই সময় কী সে করতে পারতো, অথবা কী তার করণীয়। সে জানে নীলুফারকে সে ভালবাসে । তাকে না ভালবেসে সে থাকতে পারবে না। এই যে তার চলে যাবার দৃশ্যেও মারুফ তাকে ছুঁতে চাইছে তার দুটি হাতের প্রতিটি আঙুল দিয়ে, ঠোঁট দিয়ে, সমস্ত স্বপ্ন আর ক্ষুধা দিয়ে। তার বুকের ভিতরের আস্তরের পর আস্তর খুলে নিজের ভিতরের মানুষটিকে নিয়ে সে একাকার হয়ে ছুঁতে চাইছে নীলুফারকে। যদিও সে জেনে গেছে নীলুফারের এই চলে যাওয়া অনিবার্য। কারন যে আবর্তে সে বন্দি তা থেকে তার আর কোনো নিস্তার নেই। এক নিঃশব্দ মনের ভিতর আটকা পড়ে তার এই মুহূর্তে ইচ্ছে করে দুমদাম মাথাটা দেয়ালে ঠেকিয়ে ফাটিয়ে ফেলতে।
অতঃপর নিলুফার চলেই যায়। পড়ে থাকে শূন্যতার ধূ-ধূ মাঠ।ওর চলে যাবার গন্ধের অদ্ভুত পীড়াদায়ক গন্ধের ভিতর মারুফ একটা দামি সিগারেট ধরায়। তার টাকার কোন অভাব নেই। উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছে ঢাকায় তিনটি আলিশান বাড়ি , ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ,তিনটি গ্রোসারি শপ,আরও দু-চারটি বায়িং হাউস। ছোট ভাইটি আমেরিকায় সেটেল্ড। বছরে একবার বউ-বাচ্চা নিয়ে এসে বেড়িয়ে যায়। বাবার মৃত্যুর সময় মারুফ কথা দিয়েছিল বাবার প্রতিষ্ঠানগুলোর দেখাশোনা সেই করবে। কথা রেখেছিল । মায়ের সেবা করা , মায়ের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করা সবই করেছিল। এমনকি নীলুফারকে খুশী রাখার জন্য দেশে বিদেশে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া আর সকল রকম সুখের উপাচারে পূর্ণ করে দিয়েছিল সে। তবু নীলুফার থাকেনি। বিয়ের সময় মাকে খুশি করার জন্য সে বিয়েতে সায় দিয়েছিল , কিন্তু মনে মনে জেনেই নিয়েছিল নীলুফার থাকবে না। তারপর ভেবেছিল নীলুফার গরীব ঘরের সুন্দর সুশ্রী মেয়ে । হয়তো থেকেও যেতে পারে। তারপর দীর্ঘ পাঁচ বছরে নিঃসঙ্কোচে নীলুফারের সব ইচ্ছেকে মূল্য দিয়ে সে দত্তক এনছিল একটি শিশু । নীলুফারকে যথাসাধ্য সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু এসবের কিছুই নীলুফারকে শেষ পর্যন্ত হিপনোটাইজড করে রাখতে পারেনি। মারুফের ভিতর কোন ভন্ডামি বা শঠতা ছিলনা । বিয়ের রাতেই সে বলেছিল তার শিশ্ন হারানোর করূণ কাহিনী যা তার কামনাকে হত্যা করেছে। খনি-শ্রমিকের মতো সে পরিশ্রম করেছে নীলুফারের শরীরময় আনন্দের জোগান দিতে। মাঝে মাঝে এইসব টানাপোড়েন তাকে ক্লান্ত করেছে। তবু এই জীবনের প্রতিযোগীতায় যথার্থ মানবিক থাকার চেষ্টা করেছে অর্হনিশি।
বসে বসে তিনটি সিগারেট শেষ করার পর মারুফের মনে হল নিশ্চুপ বাড়িটা যেন এক উদ্ধারহীন গোলকধাঁধা। নিলুফার তার শেষ সিদ্ধান্তের আগেই বাচ্চাটিকে হোষ্টেলে রাখার ব্যবস্থা করেছে। সেবার মালয়েশিয়ায় বেড়াতে যাবার সময়ই নিলুফার ভিতরে ভিতরে পাকা সিদ্ধান্তটা নেয়। মারুফকে বলে ,‘ওকে মালয়েশিয়ায় রেখে পড়াও। ওর ক্লাশের অনেক বাচ্চারাই পড়ছে’। মারূফ অবাক হয়ে বলেছিল,‘এত ছোট বাচ্চা ! তাছাড়া তোমার একা লাগবে না! পারবে ওকে ছেড়ে থাকতে!’ উত্তরে মৃদু হেসেছিল নিলুফার। মারুফ খুঁজেই পায়নি এই হাসির পিছনে মৃদু স্যাটায়ার। সে নিলুফারের কথা অনুযায়ি কাজ করে গেছে। বোধহয় সে জীবনকে চিনতেই চায়নি। ব্যবসা আর টাকার এক অর্ন্তগত সিস্টেমের মধ্যে ঢুকে নিলুফার আর তার নিজের পারষ্পরিক সর্ম্পকটা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে ,তা ভেবে দেখারও সময় পায়নি সে।
কী করে যে টিভি পর্দায় দেখা দৃশ্যের মতো অতি দ্রƒত বদলে গেল নিলুফার! নতুন প্রেম ,নতুন বোধে ,নতুন শ্বাসÑপ্রশ্বাসে আলোড়িত হতে থাকে নিলুফার। তারই চোখের সামনে ! নিলুফার বদলে যেতে থাকে। বদলে যেতে থাকে তার গায়ের গন্ধ,পছন্দের সাবান,গয়নার মাপ, সদ্য কেনা ব্রায়ের ডিজাইন। নতুন আলোয় ঝিকমিক করে নিলুফার। মারুফ চেয়ে চেয়ে দেখেছে এই অন্ধবাসনার উল্লাস! একবারও ভাবেনি নিলুফার বিশ্বাসঘাতক! একবারও মনে করেনি নিলুফারের এই সঙ্গমস্পৃহা ঘৃণ্য,অনৈতিক! শোয়েব নামের নিলুফারের প্রেমিকের সাথে যেচে আলাপও করেছে মারুফ। শুধু একটা ভয়ই তাকে গ্রাস করেছে। নিজেকে মনে হয়েছে অস্তিত্বহীন। কেবলই মনে হয়েছে , ‘আমি কাকে ছুঁয়ে থাকব?’ একা একা এই নিঃশব্দ বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে অনেক স্মৃতি। নিলুফারকে সে অনুনয় করে বলেছিল ,সব কিছুর বিনিময়েও যেন সে এই বাড়িটাতে থাকে। নিলুফার চলে গেছে। আর এই মুহূর্তে তার নিজেকে মনে হচ্ছে উদ্বাস্তু।পুরো বাড়িটাতে যেন মৃতদের কন্ঠস্বর,অস্ফুট আবছা ফিশফিশ, যেন সমস্ত সময়টা ঝুলে আছে হাওয়ায়।


২.
মারুফ হেঁটে চলেছে। অথবা সে যানবাহনে , রাস্তার মোড়ে , ঝকঝকে রঙিন শোরুমের ভিতর, গাড়ির কাচের ভিতর দিয়ে সে যেন খুঁজতে বেরিয়েছে কোনো অতীত সম্পর্ককে। হতে পারে সে নিলুফার, অথবা নিলুফারের প্রেমিক শোয়েবকে, কিম্বা যে লোকটি কৈশোরে তার শিশ্ন কেটে নিয়ে গিয়েছিল তাকে অথবা তার নিজেকেই। একটা আপাদমস্তক নিঃসঙ্গ মানুষ ছুটছে তার অস্তিত্বের খোঁজেই। ভিতরে তার গুমরে উঠছে না পাওয়ার যন্ত্রণা। সে হেঁটে যাচ্ছে নিস্পৃহ আর রাজকীয় ভঙ্গিতে। এমন ভাবে হাঁটছে যেন এই শহরের কোন মানুষকেই সে চেনে না। সে হাঁটছে তার মরা অস্তিত্বের সাথে। নিলুফার চলে যাবার পর তার আইডেন্টটিটি নিয়ে সে আর ভাবে না। দত্তক ছেলেটির নামে তার সম্পত্তির অনেকটাই সে লিখে দিয়েছে। আজকাল অফিসেও সে কম মনোযোগী। উদাসীনভাবে সিগারেট টানতে টানতে অথবা অন্ধকারে সিগারেটের ধোঁয়ার রিং ওড়াতে ওড়াতে সে হাঁটতে থাকে। ঠিক বিকেল চারটার মধ্যেই সে অফিস শেষ করে হাঁটতে থাকে। তার ড্রাইভার প্রথম প্রথম কয়েকদিন অবাকই হয়েছে। তারপর একদিন বলেছে, ‘স্যার আপনি প্রতিষ্ঠানের প্রধান। গাড়ি ছাড়া এভাবে হাঁটাচলায় জীবনের রিস্ক আছে।’ সে নিরুত্তর ভাবে হেসে ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে বলেছিল, ‘বাড়িতে যাও। পরিবারকে সময় দাও।’ মনে মনে নিজেকেই সে বলেছে , ‘এই আমার অস্তিত্ব। আমার অন্ধ নিয়তি।’

মালিবাগ রেল ক্রসিংয়ের কাছে এসে দাঁড়ায় মারুফ। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে ক্রমেই এগিয়ে আসা ট্রেনের হুইসেল। ট্রেনটা এগিয়ে আসছে । বাড়ছে উপর্যুপুরি বজ্রপাতের শব্দ। সে দাঁড়িয়ে থেকে পুরোপুরি শব্দটা শুনে। আর প্রায় প্রতিদিনই সে একবার করে এখানে দাঁড়িয়ে পৃথিবী কাঁপিয়ে শব্দ করা ট্রেনের চলাচলের শব্দটি শোনে। তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেতে থাকে। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে লিটারেচারে পড়া আনা কারেনিনার ট্রেনের নিচে মাথা পেতে দেবার কথা। আর চারপাশে অসংখ্য চিৎকারের মধ্যে সে যেন দেখতে থাকে মাথা কাটা তার নিজের লাশ। তারপর সে তার পুরুষাঙ্গের স্থানটিতে হাত দিয়ে খোঁজে অতীতের ক্ষত। ক্ষতস্থানে থকথক করছে রক্ত। মনে পড়ে অতীতের সেই গলাচেরা আর্তচিৎকার। তার নিজের আতঙ্কিত চোখ। এর পরেই বোধহয় অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়েছিল সে। লোকজন ধরাধরি করে নাসিং হোমে পৌঁছে দেয়।

৩.
আজকাল অপস্রিয়মাণ ছায়ামূর্তির মত তার মাথায় কেবলই সেই লোকটির মুখ এসে হানা দেয়। সে ওই মুখটিকে চিনতে চেষ্টা করে। স্মৃতির ভিতর থেকে হাতড়ে বেড়ায় ওই খুনীর জ্বলন্ত চোখ। অনেক দিন আগের ব্যাপারটা। তাই অনেক কুয়াশার ভিতর থেকে সে শনাক্ত করতে চায় ওই নির্দিষ্ট লোকটিকে। যে লোকটি প্রচন্ড আক্রোশে ভয়ঙ্করভাবে তার শিশ্নটিকে কেটে নিয়েছিল।
সে তখন যুবক ষোলো-সতেরো বয়সের। দাদির অসুখের সময়টায় ওরা পরিবারের সবাই মিলে গ্রামে গিয়েছিল। দাদির অসুখ আর সাওে না। মৃত্যুপথযাত্রী। দাদির শেষ ইচ্ছে তাকে এই শেষসময়ে গ্রামেই রাখা হউক। শেষ মুহূর্তে শহরে নিয়ে টানা হেঁচড়ায় তার দারুণ আপত্তি। এদিকে মারুফের ও লেভেল পরীক্ষা মাত্র শেষ হয়েছে। ছোট ভাইটি ক্লাশ এইটে পড়ছে। মারুফের মায়ের ভীষণ আপত্তি সত্ত্বেও ওরা প্রায় একমাসের মত লম্বা সময়টা গ্রামেই কাটাল। মারুফের সময় কাটেনা। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ানোর জন্য ওর বাবা একটি নির্দিষ্ট রিকশা ঠিক করে দিল। রিকশায় চড়ে বেড়াতে তার এমনিই খুব ভাল লাগে। সে ঘুরে ঘুরে অনেক কিছু দেখতে যায় । তার দামী ক্যামেরাটি সর্বক্ষণের সঙ্গী। সে ফটো তোলে মাছরাঙার ,নদীর, কাশবনের, উড়ে যাওয়া জলপোকার, কালো রেললইনের। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন চেয়ারম্যান বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। অপূর্ব সুন্দরী একটা মেয়েকে ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে রিকশায় চড়ে স্কুলে যেতে দেখে। মেয়েটা একেবারেই অন্যরকম। শহরে একসঙ্গে পড়া মেয়েদের মত নয়। সে কয়েকদিন তাকে স্কুলে যাবার পথে ঝুঁকে দেখে। কয়েকদিন নিজের মনের ঘোরেই মেয়েটির পিছন পিছন স্কুলে যায়। মারুফ কল্পনাও করেনি ,মেয়েটির প্রেমিক তারই পিছন পিছন হোন্ডা নিয়ে এসে তাকে ফলো করছে। মেয়েটিকে একটু একটু দেখার ফাঁকে সে কয়েকটি টুকরো টুকরো ছবিও তোলে। এটি ছিল তার নিবিড় ও একাগ্র হয়ে কোন কিছুকে দেখবার ইচ্ছে। হয়তো এখানে ছিল তার অবচেতনের গভীর থেকে উঠে আসা নিজস্ব কোন অনুভব। এসব কথা মেয়েটিও জানতো না। কিন্তু মেয়েটির প্রেমিক ছিল কোন এক রাজনৈতিক পার্টির সদস্য। সে হোন্ডায় প্রতিদিন মারুফকে ফলো করতে থাকে। মারুফ টেরই পায়না। সে থাকে নিজের ঘোরে। একদিন রিকশায় চড়ে বেড়াবার সময় জোরে টান দিয়ে ওরা ওর ক্যামেরাটা ছিনতাই করে। মারুফ রিকশা থেকে পড়ে যেতে যেতে উঠে বসে। সে দেখে চারটি ছেলে হোন্ডায় বসা। ওর ক্যামেরাটা নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টাকে সে হাল্কা ভাবেই দেখেছে। ভেবেছে ছিনতাইকারি। দাদিকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত বলে ক্যামেরা ছিনতাই হবার ব্যাপারটা সে বাড়ির কাউকেই বলতে চায়নি। যদিও ঘটনাটি ঘটার পর চরম বিষাদময়তায় ঝিম ধরে কাটিয়েছিল দু-চারটি দিন। দুদিন পর সে আবার বেরুল নিজস্ব মেজাজে। একটা ফুটফুটে রোদেলা সকালে নাস্তা সারার পর বাগানের জমির উপর অনেকগুলো শিউলি ফুল ঝরে পরা জায়গাটি পা দিয়ে না মাড়িয়ে ,আর সেই ফুলগুলোর গন্ধ আর সৌন্দর্যের ঘোরের মধ্যে দিয়ে সে আনমনে বের হল গেট পেরিয়ে রাস্তায়। না ,আজ তার নির্দিষ্ট রিকশাটি আসেনি। কিন্তু গেটের বাইরে অন্য একটি রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। সে একটু ইতস্তত বোধ করতেই রিকশা চালকটি এগিয়ে এসে বলল ,আইজকা আমার রিকশায় লন। ওই ভাই জ্বর হইয়া বিছনায় পড়া। মারুফ আর কোনো কথা না বলে উঠে বসে রিকশায়। রিকশাচালকটি বলে , চলেন রেললাইনের দিকে একটা ব্রিজ আছে। ওই জায়গায় নিয়া যাই।
মারুফ নিজের ভাবনার সাথে চলতে চলতে এগোতে থাকে। রেললাইনের চারপাশটা ভীষণ ফাঁকা। একটু দূরেই একটা কালভার্ট আর তার নীচে ফুটেছে অজস্র কাশফুল। সে মুগ্ধ হয়ে দেখছিল এইসব। হঠাৎ হোন্ডার শব্দে চমকে উঠে মারুফ। সে আচানক চারটি লোককে হোন্ডা থেকে নামতে দেখে। তারপর একজন রিকশা থেকে তাকে নামতে বলে। সে নেমে দাঁড়াতেই একজন রিকশাচালকটির সিটের নিচ থেকে বের করে একটা চাকু । ভয়ে বিস্ফারিত হয়ে যায় মারুফের চোখ। ওরা ওর গায়ের শার্ট টেনে ছিড়ে ফেলে। বের হয়ে আসে পেশীবহুল ফর্সা শরীর। একজন লাথি মেরে ওকে মাটিতে ফেলে দেয়। আর একজন তার মাথায় পা দিয়ে আঘাত করে। চ্যাটচ্যাটে রক্ত বেরুতে থাকে। একজন ওর তোলা ছবিগুলোর মধ্যে মেয়েটির ছবি বের করে বলে ,‘এই মাইয়ারে আমি সাদী করুম। তুই হের দিকে চোখ দিছস। তোর চোখ এহনই উপরাই ফেলুম । জানস ্ আমরা ক্যাডা! এই এলাকার ক্যাডার। আমাগো হুকুম ছাড়া এই এলাকার একটা গাছের পাতারও নড়নের ক্ষ্যামতা নাই।’ মারুফ চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে। এরকম জিঘাংসার মোকাবিলা করার কোন অভিজ্ঞতাই তার নেই। সে যে উঠে পালাবে ,তা-ও পারছে না। চারজনই ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার গায়ে। যেহেতু সে মেয়েটির দু-চারটি ছবি তুলে ফেলেছে,এখন তারা কিছুতেই বিশ্বাস করবেনা বিষয়টি শুধুই ছবি তোলা ছাড়া আর কিছুই নয়। সে চুপচাপ শুয়েই থাকল আর চোখ বন্ধ করে ভাবছিল মৃত্যুর রঙ। এসব বিভ্রমের মতো সময়ে তার কাছে মৃত্যুর রঙ অনেকটা রঙধনুর মতোও মনে হল। তারপর সে নিজেকে দেখল পিঠে ছুড়ি বিঁধানো মৃতদেহের মধ্যে। এসব মৃত্যুদৃশ্যের মধ্যে হঠাৎ তার কানে আসল একজন বলছে , ‘ভাইজান চোখ তুইলেন না। জন্মের মতো খত্না করাইয়া দেন। এই জীবনে আর মাইয়াপাইনের দিকে চোখ তুইলব না।’ আর একজন বলল, ‘আইডিয়াটা ভালাই। তয় বেশি সময় লওন যাইবো না। তাড়াতাড়ি কাম সারতে হইব।’ তারপর সে চোখ খুলেছিল আর চোখ খোলার পর যে মুখটি সে দেখেছিল এই দীর্ঘ জীবনে এই মুখটিকে সে ভোলেনি। তখন গলগল করে রক্ত ঝরছিল তার কাটা অঙ্গের জায়গা থেকে।একসময় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল যন্ত্রনায় আর আর্ত চিৎকারে।
রেললাইনের পাশে ওরা ওকে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল।

সম্ভবত দু-দিন পর হাসপাতালে সে চোখ খুলে দেখেছিল মা আর ভাইয়ের মুখ। অতি দ্রুত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে গিয়েছিল তার বাবা। শারিরিক চিকিৎসার পাশাপাশি দেয়া হয়েছিল অনেক মেন্টাল থেরাপী। তারপর সুস্থ হবার পর সিঙ্গাপুরেই পড়াশোনা আর জীবনের অবিরাম স্রোতের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল সে। যতদিন বাবা-মা বেঁচে ছিল তার শারীরিক অসম্পূর্ণতাকে তারা টের পেতেই দেয়নি। জীবনের ইচ্ছেগুলোর প্রকাশ ঘটিয়েছে সে অনেক টাকার আরাম আর আয়েশের মধ্যে দিয়ে।

নিলুফারের এই অনিবার্যভাবে চলে যাওয়াটাই আজ তাকে দিশেহারা করে তুলেছে। আজকাল ওই স্মৃতিটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতেই তার ভাল লাগে। ভিতরে ভিতরে এক আক্রোশে সে ফুঁসতে থাকে। ওই লোকটির মুখ সে কোনোদিন ভুলেনি। এখন যেন একটাই তার লক্ষ্য ওই লোকটিকে বাগে পাওয়া। তার এই স্বাস্থ্যসবল দেহের ভিতরের পচে যাওয়া অংশটি তাকে আর কোনো কিছুতেই ধৈর্য ধরতে দিচ্ছিল না। সে হাঁটে আর সারাক্ষণ খোঁজ করে ওই লোকটির। গ্রামে খোঁজ-খবর নিয়ে জেনেছে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ওরা কোথায় আছে কেউ জানে না। দীর্ঘদিন আগেই ওরা ছাড়া পেয়েছিল। রিকশাচালকটি এখনও কারাগারে। সে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে হাঁটে । জীবন এত শ্লথ আর উগ্র হতে পারে ,সে ভাবেনি। মাঝে মাঝে হাঁটতে হাঁটতে থমকে থেমে যায় মাঝপথে। ধূসর,আবছায়া স্মৃতির ভিতর সেই হিংস্র,ভয়ঙ্কর মুখকে মনে করে। শোকে ,আতঙ্কে ভরে থাকে তার অন্তর্জগৎ।

৪.
দীর্ঘদিন এই বিষণ্ণ ভ্রমণের পর একদিন মারুফ সেই লোকটিকে আবিষ্কার করে কাওরান বাজারে। রাত তখন প্রায় দশটা । সব্জীর বাজার প্রায় খালি । অনেকগুলি ঝুপরির পাশে একটা ভিজা বস্তার উপর শুয়ে লোকটি কাতরাচ্ছে। তার দুই হাত , দুই পা কাটা। একটা মাংসের পিন্ডের মতো লোকটি গোঙাচ্ছিল। মারুফ মোবাইলের টর্চ জ্বেলে মুখটিকে শেষবারের মত দ্যাখে।