ছুটির ঘন্টা

মৃন্ময় চক্রবর্তী


নামের কী ছিরি--ঘন্টাপদ! রাগ ধরেনা কার? মাঝেমাঝেই তাই ঘন্টা আকাশের দিকে তাকিয়ে ঠাকুদ্দাকে গাল দেয়, ওলাউটো বুড়ো, শালা খচ্চর, আর নাম খুঁজে পাসনি?
ঘন্টার ঠাকুদ্দার উপর রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক, কারণ নামটা তারই দেওয়া। চব্বিশ ঘন্টা সবাই যদি তার ঘন্টা ধরে নাড়ায় অর্থাৎ নাম ধরে খচায়, টিটকিরি করে তবে সে না চটে থাকে কী করে!
ভোলারহাটে পালানের মুদির গুদোমে কাজ করে ঘন্টাপদ। সেখানে তো চব্বিশঘণ্টাই সে শুনছে--- ঘন্টা এই ঘন্টা, এই শালা ঘন্টা, ঘন্টাটা নেড়ে নেড়ে নেতিয়ে ফেলবি দেখছি বাঞ্চোত!
মাঝে মাঝে তার এত দুঃখ হয় যে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। এত খাটে সে অথচ তার নাম নেই? নাম থাকলেও ভাল একটা নাম নেই ডাকার মত? গাঁয়ের ছেলে বুড়ো, মেয়ে মদ্দ সবাই তার নাম তুলে কথা বলে, ভ্যাঙায়। তার মা নেই, বাপ থেকেও নেই। কোথায় সে পালাবে, কার কাছে গিয়ে কাঁদবে?
তবে একজন আছে যে তাকে খুব ভালবাসে, সে হল রতন মাস্টার। লোকটা খুব ভাল। কিন্তু সারাবছর কোথায় যে থাকে কেউ তা বলতে পারেনা। তবে শীত পড়লেই ধূমকেতুর মত আসে, আর ঘন্টার মন ভাল হয়ে যায়।
রতন মাস্টার ঘন্টাকে খোকা বলে ডাকে, ঘন্টা বলেনা। খুব খুশী হয় ঘন্টা, সাড়াদেয়, বলো মাশটারবাবু!
রতন মাস্টার কোথায় থাকে তা জানেনা ঘন্টা, সবাই বলে লোকটা নাকি পাগল। লোকের কথায় ঘন্টার একফোঁটা বিশ্বাস নেই। শীতের বিকেল এলেই মাস্টার চলে আসে পালানের মুদি দোকানে। এসে হাঁকে, কই হে খোকা! ঘন্টা সাড়া দেয়, যাই মাশটারবাবু। পালান বলে, হেই ঘন্টা, কাজে ফাঁকি দিয়ে কোতায় যাচ্চিস? মাস্টার বলে, পালান আজকের ওর রোজের টাকাটা কেটে নিও আমি দিয়ে দেব। ঘন্টার মুখে তখন কান এঁটো করা হাসি।

মাস্টারের সাথে সে হাড়ি পাড়ায় নলেনগুড় আনতে গিয়েছিল একবার। সে-ই নিয়ে গিয়েছিল আরকি। পথে ধানকাটা মাঠের ভেতর, নদীর ঢালে, সে মাস্টারকে বুনো গাছ আর ফুল চিনিয়েছিল কত! সে গাঁয়ের ছেলে সে তো সব চেনে। কোনটা ভাঁট, কোনটা ধুতরো, কোনটা দাদমর্দন, কোনটা শিয়ালকাঁটা, কোনটা পুটুস, কোনটা পটপটি, কোনটা ওকড়া, সব তো তার মুখস্থ। মাস্টার এসব জানেনা দেখে সে খুব অবাক হয়েছিল। সেই থেকেই তাদের আলাপ, ভাবভালবাসা।
মাস্টার আসলেই ঘন্টা তাকে নিয়ে চলে যায় ফুলি নদীর চরে। এখানে শিশু গাছের নিচে ভ্যারেন্ডার বনে নানারঙের প্রজাপতি ওড়ে। কী আনন্দ যে পায় ঘন্টা। মাস্টার বলে আজ তোমার ছুটি খোকা, ওই দেখো পাকাধানের গান শোনা যাচ্ছে হাওয়ায়--ঝুমঝুম ঝুমঝুম! দেখো ঢোলকলমির ডালে কেমন ফিঙে দুলছে। ঘন্টা হাসে, হাসতে হাসতে ছুটে বেড়ায় মাঠে। ধানের উপর পাখিদের চক্কর খাওয়া দেখে আনন্দে ডিগবাজি খায়। মাস্টার হাততালি দেয়। তারপর ওরা অনেক দূর চলে যায় নদীর সঙ্গে। ঘন্টা বলে মাশটারবাবু তুমি রোজ রোজ আসোনা কেন? আমার যে ভাললাগেনা! তুমি রোজ আসবে কিন্তু! মাস্টার হাসে, পিঠে হাত রেখে বলে, আজ পূর্ণিমা বুঝলে খোকা, দেখবে কেমন চাঁদ ওঠে।
সত্যি সত্যিই সূর্য ডুবে যায় একসময়। অন্ধকার নেমে আসে, ধূসর কুয়াশায় ঢেকে যায় নদী আর শস্যের বুক। মাঠের রঙ তখন আকন্দপাতার মত।
তারপর ধীরে ধীরে হলুদ চাঁদ উঠে আসে ফুলি নদীর বাঁকে। সেখানে জলের ভেতর হোগলার বন থেকে হাঁস উড়ে যায়। সাঁইবাবলার ডালে উড়ে এসে বসে লক্ষীপেঁচা। মাস্টার কবিতা বলে----
"পেঁচার ধূসর পাখা উড়ে যায় নক্ষত্রের পানে-
জলা মাঠ ছেড়ে দিয়ে চাঁদের আহ্বানে
বুনো হাঁস পাখা মেলে, শাঁই-শাঁই শব্দ শুনি তার;
এক-দুই-তিন-চার অজস্র-অপার

রাত্রির কিনার দিয়ে তাহাদের ক্ষিপ্র ডানা ঝাড়া
এঞ্জিনের মতো শব্দে ছুটিতেছে- ছুটিতেছে তারা!
তারপর প’ড়ে থাকে, নক্ষত্রের বিশাল আকাশ,
হাঁসের গায়ের ঘ্রাণ-দু-একটা কল্পনার হাঁস;
মনে প’ড়ে কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা সান্যালের মুখ;
উড়ুক উড়ুক তারা পউষের জ্যোৎস্নায় নীরবে উড়ুক...."
ঘন্টা মুগ্ধ হয়ে কবিতা শোনে। কিছুই বুঝতে পারেনা তবু তার ভাল লাগে।
তাদের মাথার উপর দিয়ে সাঁই সাঁই উড়ে যায় রাতপাখি। ঘন্টার তখন মরে যাওয়া মায়ের কথা মনে পড়ে। মাস্টার বলে কি হল খোকা? ঘন্টা বলে, মাশটারবাবু তুমি রোজ আসবে তো?

এই শালা ঘন্টা, এখনো নাড়চিস? শালা বিকেল হয়ে গেল ঝাঁপ কে তুলবে, জল আনবে কে, তোর বাপ? পালান তাকে কষিয়ে লাথি মারে, ঘুমন্ত ঘন্টা খোলের বস্তার উপর থেকে ছড়িয়ে থাকা খারের সাবানগুঁড়ো, মোদোগুড়ের দলা, খোলের কুচি মাখা তেলচিটে বস্তার উপর আছড়ে পড়ে। পাঁচমেশালি গন্ধে ভরা গুমোট গুদোম তার অচেনা লাগে ঘুম চোখে।পালানের লাথিটা তার পিঠে লেগেছে খুব। তার দম চেপে যায়, চোখ ফেটে ছিটকে আসে জল। পিঠে হাত বাঁকিয়ে বুলোতে বুলোতে বাইরে আসে সে।
বাইরে এসে বেশ ঠান্ডা অনুভব করে ঘন্টা। এবছর কি রতন মাস্টার আসবে না? প্রতিবার তো শীত পড়তেই চলে আসে। ও এবার বেশ কিছু রঙিন পালক কুড়িয়ে রেখেছে মাস্টারকে দেবে বলে। কিন্তু ভাবছে দেবে না। যে তার কথা ভুলে যায় তাকে কেন দেবে সে? তার চোখ বর্ষার ফুলী নদী হয়ে যায় ব্যাথায় অভিমানে।

________