এক দীর্ঘায়িত মেলাঙ্কলি পর্ব-দুই

নীলাদ্রি বাগচী

কল্পমায়া ২



গ্রীষ্ম বিকেল। সারাদিনের তাপের হিসেব নিকেশ দিচ্ছে টিনের চাল, পীচ- কাঁকড়, মরা ঘাস। এই সবে জড়িয়ে সরিয়ে এক দৌড়ে মাঠে এসে পৌঁছেছি। আমাদের মাঠ পাটগোলার। দুটো লম্বা লম্বা টিনের ঘর, মাথায় টিন, টিনের বড় দরজায় মরচে ধরা ভারী তালা। এই হল গোলা। তার গা লাগোয়া খানিকটা জমি যার একদিক বসা। আল্প বর্ষাতেই সেখানে জল খলবল করে- ওইই আমাদের মাঠ। এই বসা জমির এক মাথায় আরও একটা লম্বা ঘর। তবে ইট সিমেন্টের, মাথায় এরও টিন। আর এর অনেক জানালা। দুটো দরজা মাঠের দিকে। দুটো ভেতর দিকে। এটা দমকল ব্যারাক। আমার শর্টকাট ছিল বাড়ি থেকে ছুটে ব্যারাকের বারান্দায় উঠে ভেতর দরজা দিয়ে ঢুকে ক্যারাম বোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে ওই দিকের দরজা দিয়ে মাঠে নেমে যাওয়া। বসা জমির ও পাশে ব্যারাকের সমকোণে ছিল আমার পাড়া; অনেক বাড়ির দেয়াল ছিল মাঠের ও ধারের সীমানা। আর বাকি দু দিকে পাটগোলা। এতক্ষণ ধরে, বরাদ্দ ছশো ( আনুমানিক) শব্দের একশত সাঁইত্রিশ খরচ করে আমি কেন যে আমার মাঠের কথা লিখলাম কে জানে! সে মাঠ এখন অনেক বাড়ির কব্জায় চলে গেছে। হয়তো তাই, হয়তো নয়। অন্য কোনও কি যেন হবে...

যা হোক। মাঠে পৌঁছে সোজা দৌড় মধ্যিখানে। লক্ষ্য- দল করে খেলা। আমি খুবই অপটু ও আনাড়ি। ফলে এলেবেলে। তবে নৈমিত্তিক হলেও নিত্য বলে আমায় যে কোনও এক দল নিয়ে নিত। তারপর বাকি বিকেল বলে কম একে ওকে লাথি বেশি মেরে বিস্তর গালাগাল খেয়ে সন্ধের মুখে বাড়ি ফিরতাম। আর সঙ্কল্প করতাম- কাল ঠিক ভালো খেলবো। সে কাল, বলাই বাহুল্য, আর আসে নি যদিও।

এই দিন অবশ্য আলাদা। বেশ মেলোড্রামাটিক। আমাদের এই ছোকরা ফুটবল দলের পাণ্ডা গছের যে দুজন ছিল, তাদের মধ্যে যে সুশ্রী ও ঢ্যাঙা এবং আড়ালে সবাই যাকে পাগলা বলতো, সে আমার সামনে এসে আমার দৌড় থামিয়ে দিল।
- তুই আমাকে পাগলা বলেছিস?
যা সর্বনাশ। আমি কি বলবো? হতভম্ব ও বিপর্যস্ত আমি নিশ্চুপ। ডান হাত তুলে সে কষে এক থাপ্পড় চাপাল আমার গালে।
- এই ই তুই শালা আর এখানে আসবি না... যাঃ...
ওই এক যার ধাক্কায় আমি সত্যিসত্যি মাঠ থেকে সটান ব্যারাকের সিঁড়ি ফিরে এলাম। সিঁড়িতে বসে আছি। গাল জ্বালা করছে। মনে মনে ওকে যত গাল দিচ্ছি তার চে কি যেন একটা বেশি টের পাচ্ছি। বুঝতে পারছি কান জ্বলছে। গলা শুকচ্ছে। জামার হাতা ক্রমে লম্বা হচ্ছে, বহর বাড়ছে। আমি গুটিয়ে ছোট থেকে ছোট্ট হয়ে গলে যাচ্ছি জামার ভিতর। আমার সমস্ত আমি এই পোশাক আশাকের ভেতর ঢুকে পড়ে আত্মসম্মান বাঁচাচ্ছে- বাঁচাতে চাইছে। মাঠে বলের ধুপধাপ আওয়াজ, বন্ধুদের হট্টগোলের সাথে দমকল কাকুদের নিজেদের নানান আলোচনার পাঁচমেশালি- সব শব্দ মাথায় ধাক্কা দিচ্ছে। কোনও কাকুর রেডিওয় সে সময়ই শুনি এই গান। এই গানই যে মনে ছিল না। কিন্তু ‘ এমন রাতে বেদরদি কেন চলে যাও’ এই পঙক্তি আমায় মনে করাল গান এইটাই। কেননা ওই চলে যাও শব্দের ওপর ভঁর করেই আমি চলে যাওয়া শুরু করেছিলাম আমার মাঠ থেকে, বন্ধুদের থেকে, প্রিয় ফুটবল থেকে। ব্যারাকের এ’পারের স্বল্প জমির মরা ঘাসে পা ঘষে ঘষে রওনা হয়েছিলাম বাড়ির দিকে। ঘুরে গিয়ে প্রতিবাদ করবো কি সেই সুশ্রী ঢ্যাঙার সাথে হাতাহাতি করবো- সেই মনের জোর পাই নি। শুধু দেখেছিলাম আকাশ আরও খানিক ভারী হয়ে এসেছে, দেবুদের বাড়ির বাতাবি লেবু গাছে অকারণ একটা কাক বসে ডাকছে। আর আমি ফিরে যাচ্ছি।

এই মেলোড্রামা আসলে সেদিন আমার বিধিলিপি লিখেছিল। ওই কবিগুরুর ‘ছোট প্রাণে’র বিধিলিপি। ইংরেজি also run-র বিধিলিপি। ঠিক সময়ে রুখে না দাঁড়িয়ে যে নির্বিচারে মেনে নেবে- তার বিধিলিপি।

‘দাদা চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে’, ভাগ্যিস যাচ্ছে। নইলে এক গানের ঠেলায় আমি পুরো ভসভস করে উঠেছিলাম। ছিপি খোলা আবেগে হাল্কা গরম চা দিলাম।

কি যেন কিন্তু রয়ে গেল। কানে- মাথায় ‘ব্যাথার বাতাস কেঁদে মরে/ আমার আঙ্গিনায়’র চরম অতিরঞ্জনও কিন্তু কি যেনই দিয়ে গেল আবার। ‘ভালোবাসার এমন আঁধার’ই হবে হয়তো। জানি না।

যুক্তিকে সময় দিয়েছি তিনদিন। দেখি ও কি ব্যখ্যা দেয়......

ক্রমশঃ