শুধু গোরুর’ই জন্য

নীতা বিশ্বাস

নীতা বিশ্বাস।

পূজোয় আমাদের বাড়ি জমজমাট। এবছরের বিশেষ অতিথি মাসিমণি-মেসো আর পিসিমণি-পিসান। দুজোড়া দারুণ গপ্পবাজের সঙ্গে বাবা-মা আর আমরা তিনভাই তো আছিই। ছোটভাই টাবলু বেরিয়েছে ধুমধাম চায়ের সঙ্গে উপযুক্ত ‘টা’ জোগাড়ে। আড্ডা-মুখর ড্রইং রুম টাবলু কে আসতে দেখে খুশি হতে না হতেই, খালি হাত টাবলু দৌড়ক্লান্ত ডগি’র মত হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে, গোরু গোরু কলেজস্ট্রিট, মোড়ের কাছে...। মা ভয়ে দিশেহারা। ছেলেটার কী হোলো! বাবা ধমক দিতে ওঠবার আগেই টাবলু বল্লো, টি.ভি. টা অন করো, কুইক। এতক্ষণে বোধয় লাইভ টেলিকাস্ট শুরু হয়ে গেছে। আমরা সমস্বরে, কোন চ্যানেল, কোন্‌ চ্যানেল? আরে সেটা আমি জানবো কি করে! আগে টি.ভি. টা তো খোলো! আমি এইমাত্র নিজের কানে শুনে এসেছি।
খামোকা কলেজস্ট্রিট ব্রেকিং নিউজে চলে আসবে, তাও আবার গো-সন্তানের কল্যাণে! ভাবা যায়! কিন্তু গোরু আর কলেজস্ট্রিটের সমীকরণ কিছুতেই মেলাতে পারছিনা। গোরু, ধম্মের ষাঁড়—এদের তো সর্বত্র অবাধ গতিবিধি! দুর্দান্ত ব্যাস্ত রাস্তায় তাদের নিমিলিত চোখে নির্বিঘ্নে জাবর কাটতে প্রায়’ই দেখা যায়। আবার এ’ও দেখেছি, সন্তোষী মাতা’র পূজো সেরে ফুল-ফল যাবতীয় গোরুভক্ষ্য খাবার নিয়ে খাওয়াতে গেলে, কেউ কেউ লক্ষ্মী গোরুটি হয়ে খেয়ে নেয়। আবার কোনো গোরু প্রসাদের স্বল্পতার অভিযোগ এনে ভক্তিময়ী প্রসাদদাতৃকে সিং এর গুঁতোয় হাত-পা-কোমর ভেঙে কেলেঙ্কারিয়াস অবস্থায় ফেলে রেখে বীরদর্পে হাম্বারবে জানান দেয় যে কিপটে ভক্তিমতি দের অবস্থা এরকমই হবে। এ আমার নিজের চোখে দেখা।
গরুকে তো এভাবেই চিনি। আর নতুন কি করতে পারে সে! ভাই বললো চলনা ছোড়দা, যাবি? নিজের চোখে কানে দেখে শুনে আসবি।
-আরে সে তো সময় লাগবে। তুই আগে বলনা, গোরুটা করেছে কী?
-সে গোরু কলেজস্ট্রিটের মাঝরাস্তায় বসে গল্প বলছে রে
-গল্প বলছে! গোরু!
-তবে বলছি কি? কোনো রবিবাসরীয় তে বেরিয়েছিল মনেহয়। গল্পের নিচে যে পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপণ ছিল সেগুলোও, রীতিমত আবেগময় কন্ঠে মুখস্ত বলে যাচ্ছে। মানুষের ভীড়ে রাস্তায় গাড়ি জ্যাম। গাড়ি থেকে নেমে
লোকে শুনতে দৌড়োচ্ছে। ট্র্যাফিক পুলিশ লোক সরাবে কি, নিজেই হতভম্ব।
-সে কি কথারে??
-তবে আর বলছি কি!
-গল্পটা কি মানুষের গলায়...
-এক্কেবারে। মাঝে অবশ্য সুযোগমতো একবার ‘হাম্বা’ বলে ডেকে নিচ্ছে। কি সুন্দর কন্ঠস্বর, ভয়েসমডিউলেসন, থ্রোইং, ক্যাচিং। গোরুটা আগের জন্মে নিশ্চয়ই বাচিক-শিল্পী ছিলো।
#
জমাটি আড্ডায় টাবলুর এই বিষ্ফোরণকারী সংবাদ একেবারে লোপ্পা ক্যাচের মত তুলেনিয়ে মেশোমশাই ঝপ করে ভাইকে থামিয়ে খপ করে ওর কাঁধটা চেপে ধরে বিষ্ফারিত চোখে বল্লো, হ্যাঁ রে, গরূটার রঙটা কি সাদা, আর শুধু ঘাড়ের কাছে কালো ছোপ আর কপালে একটা কালো চাঁদের মতো...
-হ্যাঁ হ্যাঁ মেশো..
-একটা সিং কি ভাঙা?
-হ্যাঁ , ঠিক বলেছো
উত্তেজিত মেশো বললো আর একটা কান
-হ্যাঁ হ্যাঁ, ভাই চেঁচিয়ে বলে, গোরুটার একটা কান খানিকটা কাটা। কিন্তু তুমি কি করে জানলে মেশো?
এতক্ষণের চেপেরাখা শ্বাস ছেড়ে মেশো বললো, আমি ব্যালকনির রোদে দাঁড়িয়ে রবিবাসরীয় গল্পটা পড়ছিলাম রে। একটা উটকো বাতাস আমার হাতের থেকে কাগজটা ফস্কিয়ে নিয়ে উড়ে গেলো। ভাবছি কাগজ আর কত ওপরে উঠবে! ওতে কি গ্যাস পোরা আছে? নেমে তো আসতেই হবে ব্যাটাকে। তখন ধরবো। লিফ্‌ট ধরে নেমেছি আমি, কাগজটাও নামছে। আমি ওপরের দিকে তাকিয়ে দৌড়োচ্ছি, গোরুটার সঙ্গে আমার সরাসরি এনকাউন্টার। কানকাটা চাঁদকপালি সাদা গোরুটা গলা বাড়িয়ে শূন্য থেকে খপাৎ করে কাগজটা মুখে লুফে কচকচ চিবিয়ে খেতে লাগলো। তোর কথা শুনে বুঝতে পারছি টাবলু, এ নিশ্চই ওই গরূটারই কীর্তি। এত ট্যালেন্টেড গোরুর কথা আমি কোনোদিন শুনিনি। এইজন্যই ছোটবেলায় মা বলতো বইখান জলে গুলে খা। সব পড়া মুখস্থ হয়ে যাবে। তখন মায়ের কথা শুনিনি। গরূ শিক্ষা দিলো। এবার আমার অঙ্কে ফেল্টুস মেয়টাকে বইয়ের পাতা গুলো ছিঁড়ে জলে গুলে গেলাবো, যদি শূন্য’র আগে একটা ৫ অন্তত বসাতে পারে! ফিফটি পারসেন্ট পেলেই আমি খুশি। বাবা গম্ভীর গলায় বললো, তাই খাইও হে। মেয়ে এবার সেণ্ট পার্সেন্ট পাবে অঙ্কে।
সমস্যা সমাধানের আনন্দে মেশো খুশি খুশি মুখে তাকাতেই ‘গুল্পে’ ওস্তাদ আমাদের পিশে কম্বুকন্ঠে বলে উঠলেন, এই একটা গোরুই তাহলে গোত্রছাড়া। পিসিমণি বললো, গোরুর আবার গোত্র হয় নাকি গো!
পিশে বললো আলবাৎ হয়। আমাকে ক’য়েকটা গোরু চিরজীবনের মতো কিভাবে নাজেহাল আর হতাশ করেছে শুনলে তোমরা আর গোরু গোরু করে মুগ্ধ হবেনা। আমরা সমস্বরে—কিরকম? কিরকম?
পিশে সলজ্জে – আমি তখন সবে গল্প টল্প লেখা শুরু করেছি। অফিসে বসে দারুণ একটা প্লট মাথায় এসেছে। বাড়ি ফিরেই গল্পটা নিয়ে বসবো। ড্রাইভ করছি বটে, কিন্তু মন পড়ে আছে গল্পে। তন্ময় হয়ে গল্পটা মস্কো করতে করতে......
মেজ ভাই ভেবলু বললো, মস্কো? সে তো রাশিয়ায়! রাশিয়ার গপ্প বুঝি? আরে সে মস্কো নয়রে গাধা, পিশে গলা চড়ালো, স্ট্রাকচার, গল্পের স্ট্রাকচার। বাংলায় লাড্ডু পাওয়া ছেলে সব। টাবলু মেনে নিয়ে বললো, ক্যারিঅন পিশে। পিশেমশাই শুরু করলো,- বেখেয়ালে গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে মাঝরাস্তায় বসে থাকা চারটে গোরুর এক্কেবারে সামনে পড়ে আমি ব্রেকে ঘ্যাঁচ দিয়েছি। ওমা! ঘ্যাঁচ আওয়াজেও ওদের তন্দ্রাচ্যুতি নেই! উঠে দাঁড়াবার কোনো লক্ষ্মণও নেই। আমি গাড়ি থেকে নেমে ওদের পেছন দিকে গিয়ে জোড়হাতে বলছি, হে গোমাতা, ষন্ডমহাশয়, গো-যুবা-যুবতী, দয়া করে রাস্তা ছাড়ুন। দেখুন রাস্তা জুড়ে জ্যামের নমুনা। আমার গাড়ি না সরালে পাবলিক প্যাঁদাবে। বলতেই ঝ্যাঁৎ করে এক ন্যাজের বাড়ি আমার মুখে। জ্বালাধরা মুখ চেপে আমি ওদের সামনে এসে নতজানু হব কিনা ভাবতে ভাবতেই আচমকা সবগুলো নিজেদের মধ্যে ঠ্যালাঠেলি করে দাঁড়িয়ে মস্তানের মতো আমায় ঘিরে নিলো। এখন প্রথম আক্রমণ কে করবে ভেবে শিউরে উঠে আমি পপাতধরণীতলে। এবং ডান হাতটায় দারুণ চোট। দৃশ্যটা কল্পনা করো একবার। মাঝখানে আমি চিৎপটাং আর চার গোরু কে আগে আমার পেট ফাঁসাবে বা চোখ কানা করে দেবে এই নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করেছে। এই সুযোগে আমি সামনের যুবতী গোরুটার চার পায়ের ফাঁক গলে পিঠ ঘসটে সামনে রাখা আমার গাড়ির তলায় ঢুকে শয্যা নিয়েছি।
ভাই আর সহ্য করতে না পেরে ফ্যাক করে হেসে উঠতেই পিশে একপিস দাবড়ানি দিয়ে বললো, এটা শুনতে যত হাসির আসলে তা নয় হে ছোকরা। রেগে উঠলে পিশে এসব ছোকরা টোকরা শ্ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করে ফেলে। মা মেসো মাসি সহ আমরা দু ভাই তখন উদ্বিগ্ন স্বরে ‘তারপর’ ‘তারপর’ করে চিৎকার।
পিশেমশাই খুশি হয়ে ধরতাই ধরলেন। সামনে পেছনে ট্রাক-ট্রলার-কার-মোটরব াইক-অটো-রিকশা’র মোটা-মাঝারি-মিহি হর্নের শব্দে ভীত গো-পরিবার হঠাৎ দিকবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে ভীড়ে ধাক্কা মেরে ছুটতে শুরু করেছে। চারিদিকে হৈ-হৈ রৈ রৈ। আমি গাড়ির নিচে আপাত-নিরাপদ আশ্রয়ে থাকলেও ভয়ে সেঁধিয়ে আমার গাড়ির যথেচ্ছো কাঁচ ভাঙাভাঙির শব্দের অপেক্ষায়। তো গোরুকুল চলে যেতে কিছু শুভ-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, কিছু দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন লোক আমার গাড়ি ঘিরে দাঁড়িয়েছে। বহুকষ্টে ঘসটে ঘসটে আমি গাড়ির তলা থেকে বেরিয়েছি। জনগন আমায় দেখে অবাক। খনেকের স্তব্ধতা এবার দ্বিগুণ হল্লাতে পরিণত। ডানহাতটা বাঁ হাত দিয়ে চেপে ধরে আমি কোনোরকমে দাঁড়াবার চেষ্টা করছি, ভীড় এসে পাঁজাকোলা করে তুলে আমায় দাঁড় করিয়ে দিলো। চাবিলাগানো গাড়ির ইঞ্জিন তখনো চলছে পেট্রলের বারোটা বাজিয়ে। ইতিমধ্যে কেউ দরজা খুলে মিউজিক-সিসটেমটা লোপাট করেছে। প্রশ্নে প্রশ্নে আমি জেরবার – গাড়ির নিচে কিকরে শেলটার নিলেন মশাই? কয়েকটা উঠতিযুবক আমার ব্যথাভরা ডান হাতটা খপ করে ধরে, চলুন চলুন থানায় চলুন।
-থানায় কেন?
-এটেম্পট টু মার্ডার চার্জে আপনার নামে FIR করা হবে। তাও আবার পরমপূজ্য গোমাতা কে। মানুষকে হলে নাহয় একটা কথা ছিলো। টাকা ফাকা পেলে ম্যানেজ করে দিতাম।
আমার তখন মাথায় রক্ত চড়ে গেছে। বললাম, কী? মূর্খ অসভ্য জানোয়ার মাঝরাস্তায় বসে চর্বিত-চর্বণ করছে, তাতে কিছু না?
-করতে দিন! আপনার কি তাতে? গোরুকে জানোয়ার বলে গাল দিলেন, এত স্পর্ধা আপনার? জানিয়ে দিচ্ছি গো-বলয়ে, দেখুন আপনার কেমন ধোলাই হয়। হ্যালো মোদিজী, ইধর এক আদমী গোমাতা কো জানোয়ার বোলকে গালি দে রহা হ্যায়।
-আরে জানোয়ার’ই তো!আমরা গোরুর রচনায় লিখি তো, ‘কাউ ইজ আ কোয়াড্রুপেড এ্যানিমেল’, লিখিনা?
-আবার ইংরাজিতে গালাগাল! কিছুতেই সইবোনা। হ্যালো...
-আরে শোনো শোনো, ইংরাজি কোথায়? এ তো গোদা বাংলা।
এমত কথাকাটাকাটির সময়ে পোস্টার হাতে একদল ছেলে মেয়ে মার্চ করে এসে সমবেত সামগানের সুরে—গোরু কে ইংরাজিতে গাল দেওয়া চলবেনা চলবেনা। ‘ডিকশনারিতে’ বাংলা ‘ওয়ার্ড’ কি কম পড়িয়াছে? বাংলাভাষাবাঁচাও সমিতি জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।
সামনে থেকে আরেক দল পোস্টারধারী—গো-যুবতী কি শ্লীলতাহানী, নেহি চলেগি নেহি চলেগি। ভারতীয় গো-রকছক তথা গো-যুবতী কি ইজ্জৎ বাঁচাও কমিটি, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।
আর সভয়ে দেখি, দুপাশ থেকে দলে দলে লোক ছুটে আসছে,-- গায় কো বঙ্গালি আউর ইংলিশ মে গালি দেনা পাপ হ্যায় পাপ হ্যায়। অভিয়ুক্ত ব্যক্তি কো কাউডাং খানা আউর গোমুত্র পিনা পড়েগা হি পড়েগা। হিন্দিভাষা সংরকছন সমিতি যুগ যুগ জিও, আগে বাঢো...
সর্বনাশ! চতুর্দিকে মিডিয়ার ভিডিও ক্যামেরার তীব্র আলো, ঘন ঘন ফ্ল্যাশ। আমি আমার মুখ লুকোতে ব্যাস্ত আর জনগন তাদের মুখ দেখাতে উন্মুখ।
-তারপর! তারপর!
-তারপর আর কি? সর্বনাশ যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।
খানিক ‘পজ’ দিয়ে পিশেমশাই সর্বস্বান্ত’র মতো মুখ করে বললো, এজীবনে আমার লেখক হবার স্বপ্ন মাঠে, না না, রাস্তায়, উহুঁ গাড়ির নিচে মারা পড়লো শুধু গোরুর জন্যই...