আমি কেন তিথিডোরে বাঁধা রে

অপরাহ্ণ সুসমিতো


তুমি আমি আমি তুমি জানিয়াছি মনে
বিচিতে জন্মিয়া গাছ বিচি ধরে কেমনে
এক হইতে দুই হইল প্রেমেরই কারণ
সেই অবধি আশিকের দিল করে উচাটন।

[পাগল আরকুম শাহ (১৮৭৭-১৯৪১)]

আমার নাম অনুক্ষী। আমাদের বাসা মুরাদপুর। বৃষ্টি হলেই কী যে ঢল শহরময়। কাপ্তাইমুখী বাসগুলো যেখানে সেখানে জমে থাকে পানির সাথে। রিক্সা আসতেই চায় না ষোলশহর থেকে এই মুরাদপুর। বাসার গেটে এসে দেখি তোমার একটা বৃষ্টি ভেজা চিরকুট। ভাগ্যিস বলপেনে লিখেছিলে। চিরকুটের লেখাটা পড়ে কান্না পেলো। ভাগ্যিস বৃষ্টির দাবদাহ ছিলো,না হলে চোখের পানি লুকানো কঠিন কর্ম।

অক্টোবরে তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছিল তখন বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। ছাত্র শিবিরের সাথে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাথে তুমুল মারামারি। গাছের পাতারা কেমন যেন হতে শুরু করে তখন অক্টোবরে। তুমি বললে গাছের পাতার চেয়েও সুন্দর তোমার চোখ। আমি হেসে দিলাম। তুমি রবীন্দ্রনাথের গান শোনালে আমাকে।
আমরা বুঝতে শুরু করলাম যে আমাদের সকাল একসাথে,দুপুর সন্ধ্যা রাত সব একসাথে। তোমার গলায় গান হয় না। তবু শোনালে;

It has snowed, oh, how it has snowed!
My window's blooming, a garden of frost.
It has snowed and it has snowed...
The spur of life seems all but lost
To this agony in me, in me...
( Emile Neligan)

আমরা বুঝতে শুরু করলাম যে আমাদের সকাল একসাথে হচ্ছে,আমাদের দুপুর একসাথে, রাত বিলীন হচ্ছে করবীতে।শনিবার সন্ধ্যায় আমি শিল্পকলা এক্ডেমিতে যাই, তুমি গল্প শুরু করো, আমাদের সমস্ত শহর, নাগরিক কোলাহল থমকে থাকে তোমার চেনা শোনার অজস্র গল্পের আমলকিতে। তোমার দুই হাত আঁকড়ে থাকি, আমরা দুজনে অর্কিড চাষ করি।
ভালোবাসা তবে কি হরিণের মত ধাবমান?
প্রণয় কি জাতীয় পতাকার মতো, ভিন গোলার্ধের মত পরিনীতা শোভন সুন্দর?
বোদলেয়ারের বর্ষা আজ নেই আমার শহরে। জাতীয় নেতা মরহুম তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে শারমিন আপা কী সুন্দর বক্তৃতা করলেন আজ।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিরকুটটা পড়ছি। কানের মাঝে বৃষ্টির চেনা শব্দ বাজছে,পড়ছি;

যে গাছটার ছায়ায় আমাদের বনবাস হতে পারত,সেখানে ভিড় রে। আবার যে রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটি,তার কাছে পড়ে থাকে দুটো ঘড়ি;সময় কাউকে কব্জিতে বেঁধে রাখে,কাউকে সেলফোনে।
নদীটার পাশে যে কোনো সকাল বা সন্ধ্যায় খালি পায়ে হাঁটতে পারতাম,ওখানে লোকজন থাকছে,সন্তান নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে। দেখতে পাই না আমাদের নদীটা মিশে যাচ্ছে ছবির মতো।
যে ট্রেনটায় ঝিকঝিক করতাম,জানালা দিয়ে মুখ বের করে দিই বৃষ্টির ছাট নিতে। দেখবার পলকে রাজত্ব না বিছাতেই মিলিয়ে যাচ্ছে কাবেরী নদী,বাউল করিমের মতো জনপদ।
ভেসে যেতে পারতাম,আমরা দুজন মিলে একটা সংসার নাটক হতে পারত,কতো মানুষ কতো কতো অভিনয় করে,গান গায়,পর্দা টানে সমাপ্তির। আমরা দুজনে আকাশের সাথে একটা সন্ধি করতে পারতাম যে চলো,সূর্যের রোদে এসে ডিম ভেজে খাই।

কে যেনো সারাক্ষণ বাঁশি ফুঁকে চলে,আমাদের মতো কতো মানুষ হুম হুম করে হাঁটে। কেউ কেউ খেতে পায় না,কেউ কেউ দমবন্ধ গাড়িতে বসে থাকে,আমরা তখন বসেও থাকতে পারি। বসে থাকার একটা অলস কাজ লগ্নি করা আছে।

*
উপস্থাপক মাইক্রোফোনে আমার নাম ঘোষনা করতেই দর্শক আসনের আলো নিভে গেল। এই জীবনে এত কবিতা পড়েছি অনুষ্ঠানে তবুও নাম ডাকবার আগে এক ধরণের টেনশন কাজ করে। বুকের কাছে জ্যোৎস্নার মতো হুহু শূন্যতা হয়। টের পাই। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াতেই বুঝতে পারি দর্শক আসনের সারি সারি অন্ধকার মুখ আর উৎকীর্ণ চোখ।

সন্ধ্যায় বাসা থেকে বেরুবার মুখে তোমার ছোট্ট ফুটফুটে টেক্সট এলো;

তুমি যখন কবিতা পড়বে,পাখি গাইবে অনুক্ষী গন্ধের বনে…

অফিসের গাড়িকে বলেছিলাম সন্ধ্যায় আমাকে ড্রপ করে দিতে। গাড়িতে ওঠার সময় এক উঠতি ছোকড়া আমাকে দেখে লারেলাপ্পা শিষ দিল। মিররে তাকিয়ে দেখি আমাকে সুন্দর দেখাচ্ছে। ড্রাইভার বলল : আপা,চলি ?

যখন চেয়ে মানুষ কিছু পায় না,তখন দেখা যায় না চাইলে সব পাওয়া যায়। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা ভাল.সেঁচে মরে লাভ নেই ।

গাড়ি চলতে শুরু হলো ঘন মিহি বৃষ্টি। মন দমে যায়। বৃষ্টি হলে দর্শক আসবে তো ?

তোমার টেক্সটটা আবার পড়ি। ধুলোর মতো সন্ধ্যা বৃষ্টি আরো জুড়ে বসে। আমার চায়ের তেষ্টাটা জেঁকে বসে। ইশ চা চাই চা ।

তোমাকে টেক্সট করতে লেগে যাই বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে :

বাপী চাস্মিন্ মরকতশিলাবদ্ধসোপানমার ্গা
হৈমৈশ্ছন্না বিকচকমলৈঃ স্নিগ্ধবৈদূর্যনালৈঃ
যস্যাস্তোযে কৃতবসতযো মানসং সংনিকৃষ্টং
ন ধ্যাস্যন্তি ব্যপগতশুচস্ত্বামপি প্রেক্ষ্য হংসাঃ

আমি জানি এটা পড়ে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে অর্থ না বোঝার কারণে। হিহিহিহি।

ভীরু পায়ে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াতে আবার তোমার কথা মনে হলো। আচ্ছা বলো তো এর কোনো মানে আছে ? কোনো মানে নেই। কী কাণ্ড!

যোজন দূরত্বে চাঁদ বসে থাকে আকাশ দিয়েছে মাধবী চন্দ্রদ্বীপ
আমি অনুক্ষী খোঁপা করা নবনীতা বেলী ফুল,এসো যাই সন্দীপ
বৃষ্টি তবু না থামুক আজ,দূরের টলটল মেঘদূত
শোনো তুমি অনুপম,সেই কবিতার রাজপুত।


আজ আমার সন্ধ্যার সাজ কী যে সুন্দর যামিনী রায়! চোখ বন্ধ করে আবৃত্তি শুরু করি। মনের গহীন থেকে উঠে আসা শব্দ। বাইরে কী এখনো মাধবী বৃষ্টির লোপামুদ্রা নাকি ধ্রুপদ কোনো খাঁ সাহেব ?

কে জানে !

*
ভাবছি এই বৃষ্টিতে অরুষার্ক শুধু চিরকুটটাই দিতে এসেছিল? কেন দেখা করল না? মানুষ যখন যাবার তখন চলেই যায়,কোন অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে না,আসার বেলায়ও তাই। এতোদিনে এসে মনে হয়েছে অরুষার্কের জীবন তার ইচ্ছা অনিচ্ছা তার নিজস্ব। ওকে যেতে বলার আমি কে! হয়তো ওর সময় হয়েছে তাই চলে গেছে। দেখা করেনি।

ঝরণা কলম আজকাল হয়তো কেউ আর ব্যবহার করে না। কলমের নিব থেকে কালি লেগে যেতো হাতে,যেতে চাইতো না। সাদা শার্টের বুক পকেটেও অনেক সময় দেখা যেতো কালির কালো দাগ। মাস্টার আর কেরাণিদের বিশেষ করে। ৫৭০ সাবান বা জেট,কিছুতেই উঠতো না।হালকা হতো শুধু আর শার্ট হতো মলিন। আজকাল শার্টে বা হাতের ডগায় কালির দাগ লেগে থাকে না...অদৃশ্য সব দাগগুলো...

আমার ইচ্ছা করে একদিন একটা সাদা জামায় দোয়াত উপুড় করে কালি লাগাই।

অরুষার্ককে এ কথা বলার মতো কেউ নেই যে ও নিষ্ঠুর,হৃদয়হীন। আমি তো বলবই না। ওর সাথে ফোনে লাইন কেটে গেলেও খুঁজতে থাকে অনুরণন। উঠে আসে ওর যাবতীয় যাপনে। বরং আমিই অর্থহীন কথা বলি বেশি। ঠিক যখন সন্ধ্যাটা রাতের ঘরের নামতা পড়তে শুরু করে তখন আমি অরুষার্কের নাম ধরে ডাকি। ডাকতেই থাকি। আমি ওকে পরাণ ডাকি। ছদ্ম নয় ছল নয়,ভুল নয়। গহীন থেকে লুকিয়ে রেখে।

অরুষার্ককে টেক্সট করলাম;

আমাদের আজ অনুক্ষী বৃষ্টি। আমাকে দুই পেগ ব্লু লেবেল দাও তো।

*
মানুষের একটা জীবন এভাবেই কেটে যায় বিধান মেনে। পঙ্কে পড়া চরণের ছাপ বক্ষে ধারণ করে অগোচরে। যা ইচ্ছে যা কিছু ইচ্ছে ঐ বিধানের ঘেরাটোপে বিসর্জন দিয়ে,তবু মন ঘুলঘুলির ফাঁকের আলো দেখে,ঝুল বারান্দায় দাঁড়ায় ঘরের দরোজা বন্ধ করে। মন নির্ভরতা চায়। নির্ভার হতে চায়। আশ্রয় চায়।এক আকাশের নীচে হয়তোবা আর দেখা হবে না তবুও সেই একজনই আরাধ্য থাকে! তাকে উজাড় করে মন দেয় সব। কোন ফাঁকি রাখে না,প্রেম দেয়,অভিমান দেয়। না ছুঁয়েও শরীর এক হতে পারে।

সেই একজন আমার জীবনে অরুষার্ক। বড় দেরিতে হলেও ওর কাছে কিছুতো চাই না..
শুধু মনে অন্তরে শরীরে চাই।

দুই দিন কোথাও বের হচ্ছি না। সারাটা দিন অপেক্ষায় করি সন্ধ্যার। অরুষার্ক এই সময়টায় ফোন করে। রাতে ভালো ঘুম হয় না। প্রায় রাত জেগে থাকি। সারা দিন ঘুমু ঘুমু ড্রাউজি।
অনেক আগে একটা মুভি দেখেছিলাম,ছবি জুড়ে সবাই পিছনের দিকে হাঁটছে। বর্তমান থেকে অতীতে চলে যাচ্ছে। শামুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছি ধীরে ধীরে।
বহদ্দার হাটে নির্মীয়মান ফ্লাই ওভারের পিলার ভেঙ্গে পড়েছে। মানুষের জীবনের দাম এতো অল্প,এতো সহজ..
বৃষ্টির ছাট কমলো,মা ডাকল,চা পানাবো কিনা..পানাবো বলার পরই মনে হলো পেটে খিদে আছে,এখন চা পানালে ঠিক হবে না। পেট মোচড়াবে। মায়ের কিছু অদ্ভুত শব্দ আছে;এই যেমন পানাবো। উনি কখনো চা খাবো বলবেন না। বলবেন চা পানাবো। মানে হলো চা পান করবেন।
*
এই অরুষার্ক তুমি এরকম জঙ্গী টাইপ কেন বলো তো? দেখে তো মনে হয় না। সারাক্ষণ মাস্টার মশাই টাইপ। আরে বাবা বানান একটু ভুল হলেই বা কী! কতো মানুষ কতো বানান ভুল করে। আমি বানান ভুল করলেই তুমি পন্ডিত অরুষার্ক হরলাল রায়। ভাবখানা বেত নিয়ে আমাকে ধেয়ে আসছো। আমি বড় হয়েছি না? ছি:
ইশ কী যে সুন্দর কবিতা করো তুমি। অন্যদিন তোমাকে বলে কয়ে এক লাইন কবিতা বের করতে পারি না। আজ তুমি অমল বাধুক বালক। কোথাকার কোন নরোম আলো তোমার মুখে এসে পড়লে আমি আচানক দেখি তোমার চোখ ভেজা! এই অরুষার্ক তুমি এমন কেন?

*
অরুষার্কের সরবতা,নীরবতা,ওর জীবন ঘিরে প্রণয় এই বুকের ভেতর এমন এক মমতা চোখে জল,কাজ করে চলেছে নিরলস। ওকে টেনে নিতে চায় মন কোলে,ঘাম মুছিয়ে। মন বলে পরাণ তোমার জন্য আমি আছি। এই জীবনে এই সমাজে এই পৃথিবীতে আমি মরে আছি।

এই জগতে কাউকে একান্ত নিজের ভাবতে নেই। যে ভাবে সে বোকা। কাউকে সব দিয়ে কেউ শূন্য হয়,নিজের কাছে কিছু না রেখে.মনের বাইরের ভেতরের সব অন্য কেউ বর্ণমালার মতো মুখস্থ পড়ে ফেলে। এই নি:স্ব ঠকে। সব দিয়েছি এই তৃপ্তি নিয়ে আসলে ঠকেই যায়। অপর এক বিন্দুও মনের নাগাল দেয় না।
অবশ্য আমাদের এরকম হবার চাইতে অনেক ভালো হয়েছে।
*
পরদিন ক্লাস থেকে বেরুতেই দেখি হাওয়ায় তুমি চঞ্চল। মেঘেদের বাড়ি থেকে তুমি হেঁটে এলে পাহাড়ের সানুতলে। তুমি ক্লাস করছো না। কর্মবিরতির প্রভা তোমার নন্দন কাননে।

তোমার পায়ের পাতা ভেজা কেন? খালি পায়ে হাঁটছো কেনো তুমি? বৃষ্টিগুলো ডাকাত জল হয়ে ভেজালো বুঝি! চোখের পাতায় এতো কদমের রেণু মাখো,আমি ভাবি আজ এ মেঘের অঞ্চল তোমার মতো এতো নিপুণ চঞ্চল।

আমি কি তবে এই জনপদে একাকী ইবনে বতুতা? নি:সঙ্গ পরিব্রাজক? সব বোঝ,আর নিরিবিলি বর্ষণ বোঝো না? জল ডাকাতের মতো নিষ্ঠুর বল্লম নিয়ে কোন কোন দেশে তোমার আক্রমণ বলো তো?

হাসপাতাল থেকে চিঠি এসেছিল আমাকে লেখা সঘন করুণ। হাহাকার করে উঠেছিলে বুঝি? এতো হারানোর ভয়? কত কী হারায় এক ইবনে বতুতা জীবনে! ট্রেন থেকে বাতাসে উড্ডীন পতাকার মতো তোমার অন্ত:নীল পতাকা ভেসে বেড়ায়,আমি উবু হয়ে তোমাকে ডাকি,পৃথক পালংকের মতো তুমি বনে চলে যাও।

আমি ডাকি আমি ডাকি। আমার ডাক কান্নায় দ্রুতগামী ঢালু ব্রীজ বেয়ে নেমে যায় শংখ শালিকের মতো একা। আমি রাজা মাইডাসের মতো তৃষ্ণার্ত ডাকি :

অরুষার্ক,আমার ইচ্ছা করে,অনুক্ষী মনের কথা কই।

হাসপাতালে সারি সারি মানুষ শুয়ে থাকে রাখাইন শিশুর মতো। আমার মতো তীব্র বেদনায় চিৎকার করে মা: ও আমার জবা কুসুম শিশু ফিরে আয় ফিরে আয়। মধ্য রাত কেঁপে ওঠে আর্তনাদ করে নাফ নদীর পাড়ে। বাড়ি থেকে হুমহুম করে ফিরে যায় জল ডাকাত,তুমুল শংখ নিনাদ,আমাদের মেঘের কান্না। আজ তুমি কি আসিবে না?

আজ কি তবে তুমি আমি সেই ছবিটা দেখে মন খারাপ করে বসে থাকব? নাফ নদীতে মৃত মা ভাসছে,ছোট্ট বাচ্চাটা মায়ের বুকের দুধ খাবার জন্য আকুল হয়ে মায়ের বুক ঘষছে। আজকাল টিভি খুলতেই ভয় করে। টিভি খুললেই সারি সারি রোহিঙ্গা লাশ।

আমাদের বাড়িতে আবারো নেমেছে রৌদ্র হানাহানি করতালি মেঘেদের পালক। আমি কান্না করি অক্ষমতার সবুজের করতলে। তিতির ডাকাডাকি করি যেমন ডাকাডাকি করে ফেরিওয়ালাকে একাকী চামেলী হাতে আবুল হাসান ।

ওলো অরুষার্ক এসো কেঁদে ভিজে দেখি আমাদের দু:খের প্রবাল কই!

*
কাল সারা সন্ধ্যা তোমার অপেক্ষায় ছিলাম আমি চাতক তৃষ্ণার ঠোঁটে। তুমি এলে না,ফোন করলে না। আমি ফোনে ট্যাঙ্গোর দিকে লাল হয়ে তাকিয়ে ছিলাম।
অপেক্ষার রাজকন্যা হয়ে একাকী গান গাইছিলাম তোমার বাস কোথা যে পথিক..
তুমি ভালো লেখো জানি। বৃষ্টি নিয়ে তোমার লেখা পড়লে মনে হয় কাগজের পাতায়,চোখের পাতায় বৃষ্টির নূপুর নামছে। সেদিন তোমার লেখায় সকালের নাস্তার বর্ণনা পড়ছিলাম,আশ্চর্য এতো সুনিপুণ করে বর্ণনা যে প্রতিটা লাইন যেন আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম মুচমুচে পরোটা,সামনের বাটিতে সদ্য রান্না ভুনা মাংস,ধোঁয়া উড়ছে পতাকার মতো,আরেক পাশের পিরিচে দুটো লাজ লজ্জাহীন গুলটু টুবলু রসগোল্লা।

রান্না ঘরে চায়ের কাপে পিয়ানোর শব্দের মতো টুংটাং আওয়াজ । চা হচ্ছে...

তুমি এতো নিখুঁত বর্ণনা করো যে লেখা পড়লেই আমার খিদে পায়। এমনিতে আমার খাবার দাবার রুচিতে চৈত্র খরা,খিদে পায় না। মা বাবা যেমন ছোট বাচ্চাদের খাবার সময় কতো কি বাহানা করে,টিভিতে কার্টুন ছেড়ে দেয়,বাবাগো,মাগো,সোনারে ,যাদুরে কতো কি বলে। আমারও তেমনি। খাবার সময় তোমার সেই যাদুকরী লেখাটা পড়তে শুরু করি। সামন্ত প্রভুর মতো খিদে এসে হানা দেয়,খেতে শুরু করি।
একবার তোমার লেখায় নায়িকাটা ডলসি গাবানা চশমা পরে উবু হয়ে সম্পাদককে টেক্সট করে । আমি কতো দিন টিভির একদম সামনে চোখ বড় বড় করে বসে থেকেছি যাতে আমার চোখ খারাপ হয়,যেন আমি ওরকম ঝকঝকে চশমা পরি। ঘোড়াড্ডিম আমার চোখ একদম ৬/৬....

এই কথার যাদুকর,লেখার যাদুকর শোনো না,সেদিন এক সম্পাদককে তোমার লেখার প্রশংসা করাতে সম্পাদক সাহারা খাতুন ম্যাডামের মতো মুখ গোমড়া করে রইলেন। আশ্চর্য ব্যাটা ছেলেরা এরকম ঈর্ষাক্রান্ত হয়!
এবারে ঈদ সংখ্যায় কোথায় কোথায় তুমি লিখছো বলো তো ? আমি সবগুলো সংখ্যা কিনব উথাল।

গত মাসে অফিসের কাজে মানিকগঞ্জ গিয়েছিলাম। তীব্র গরম। একটা পুরোনো চায়ের স্টল দেখে চা খেতে ইচ্ছা করল। চায়ের স্টলে আচানক চোখ পড়ে একটা কিশোর ছেলের দিকে,গভীর যত্নে চায়ে পাউরুটি ডুবিয়ে খাচ্ছে। আমার চট করে তোমার ‘শালিক যখন হলুদ ঠোঁটে সুষমা খায়’ গল্পটার কথা মনে পড়ল। আমিও চা পাউরুটি অর্ডার করলাম। এতো গরমে,ভিড়ে সেই কাজল কিশোরের মতো আমিও চায়ে পাউরুটি ডুবিয়ে খেতে শুরু করলাম।

পাউরুটিতে চা ভিজে গেলে কী যে নরম আর পেলব হয়,টুপ করে গিলে ফেললেই হয়। আহ অমৃত। মুখে চায়ের ঘন দুধের স্বাদ লেগে রইল।
কাল খবরের কাগজে পড়লাম,তোমার স্ত্রী দিনাজপুরে বেড়াতে যেয়ে একটা হোটেলে উঠে আত্মহত্যা করেছে। পুলিশ চিরকুট থেকে সব জানতে পেরেছে। তোমার স্ত্রী নামী অভিনেত্রী ছিলেন। কী চমৎকার তার ক্যারিয়ার! সমস্ত বাংলাদেশ তোমাদের জুটির কতো প্রশংসা করত,মানিকজোড় তোমরা।
এক সময় তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করত,লেখার সময় তোমার মুখ, চোখ কেমন হয়;জানতে ইচ্ছা করত খুব। এখন আর দেখতে ইচ্ছা করে না। অদেখাই থাক সব। কতো কী অদেখা থাকে এক জীবনে!
নিয়ম করেই হয়তো আবার রোদ পড়বে হাঁসের ডানায়,নদী ঘাটে একাকী মাঝি বিমর্ষ বসে থাকবে আসন্ন ঝড় উপেক্ষা করে। ধারালো শাবলের মতো বিক্রম ঢেউ হানা দেবে অভয়মিত্রের ঘাটে। ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা আমার মালবিকা বোন গান করবে চোখের জলে;

তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়...

চোখের জল আড়াল করব আমিও ভেসে আসা গানের মুকুলে,টেবিলের উপর ধুলো পড়বে তোমার বইয়ের ধূসর মলাটে। তুমি হয়তো শূন্য ছবির হাট ঘুরে আসবে চোখের কোণায় ঈগলের পায়ের ছাপের মতো বেড়ে যাওয়া একেকটি বয়সী দিনের মতো,নিশির মতো।

হয়তো মানিকগঞ্জে আবারও যাব রোদ রঙ শাড়ি পরে। সেই কাজল কিশোর বা তোমাকে আর দেখব না।

*
( আমার নিতাইচন্দ্রের দরবারে
গৌরচন্দ্রের বাজারে
এক মন যার সেই যেতে পারে
ক্ষ্যাপা সেই যেতে পারে। )
[ ভবা পাগলা ]

তুমি কথা বলার সময় মাঝে মাঝে নাক টানো,ভালো লাগে। আমরা তোমার রুমে টিউটোরিয়ালের কাজে গেলে সবাইকে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বলতে : অনুক্ষী,কি খাবে?
তুমি সুযোগ পেলেই আমার নামের প্রশংসা করতে। সেদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন প্রভাষক তোমার কাছে বেড়াতে এলে তুমি আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে;
: অনির্বাণ,এ হচ্ছে অনুক্ষী। অনুক্ষী অরুণিমা। নামটা খুব সুন্দর না? আমাদের ডিপার্টমেন্টের খুব ব্রাইট মেয়ে। গণনাট্য সংস্থায় অভিনয় করে। গান লেখে,ছবি আঁকে। ফুলকিতে বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখায়।
আরে বাবা আমি জানি তো আমার নামটা আনকমন। বাবা এই নামটা রেখে কী যে ঝামেলায় ফেলে গেছেন! আমার নামটা শুনলেই লোকজন আকাশ থেকে পড়ে,কেউ কেউ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। একবার নাটক নিয়ে কোলকাতায় গেলাম নাট্য উৎসবে। একজন উদ্যোক্তা সিগারেট খেতে খেতে বললেন;
: আপনার নামটা ভারী সুন্দর ।
: ধন্যবাদ।
: কিছু মনে করবেন না,আপনার টাইটেলটা যেন কি?
শুনে খুব রাগ হলো। গ্রুপ থিয়েটার করা লোক,আমার পদবী জানতে চাইছেন,বুঝতে চেষ্টা করছেন আমি হিন্দু নাকি মুসলমান।

শিশির মঞ্চের বাইরে এসে খোলা হাওয়ায় দম নিলাম জোরে জোরে। মনে মনে বাবাকে ধন্যবাদ জানালাম; বাবা তুমি একটা অসাধারণ কাজ করেছো।

তোমার রুমে ঢুকে বললাম;
: জ্বর হয়েছে। মোগলাই পরোটা খাব।
তোমাকে প্রথমে খুব গম্ভীর লাগছিল তারপরেও টিচার্চ ক্যাফেটরিয়া থেকে আনিয়ে দিলে মোগলাই পরোটা। অর্ধেক খাওয়ার পর আমার নিজেরই আর খেতে ইচ্ছা করছিল না। শুধুশুধু পয়সা খরচ হলো তোমার। লজ্জা লাগছিল নিজের।
গটগট করে চলে আসি। তুমি কিছুই বলোনি।
কয়েকদিন আগে মারিয়া রিলকের একটা বই ধরিয়ে দিয়ে বললে;
: অনুক্ষী,ব্রিটিশ কাউন্সিলে আবৃত্তি অনুষ্ঠানে তুমি এখান থেকে পড়বে।
আমার ইংরেজী আবৃত্তি তুমি খুব পছন্দ করো,আমি রাত জেগে জেগে রিলকে পড়ছি;

Marveling he stands on the cathedral's
Steep ascent, close to the rose window,
As though frightened at the apotheosis
Which grew and all at once

কবিতা পড়তে পড়তে কী জানি কি মনে হলো। তোমাকে ধুম করে ফোন করে বসলাম;

: রিলকে পড়বো না।
: কেন অনুক্ষী?
: ভালো লাগছে না।
: ওহ
আর কিছু বলোনি। বুঝতে পারি তুমি কষ্ট পেয়েছো।
পরদিন ডিপার্টমেন্টে দেখা হলো। তুমি খুব এলোমেলো ছিলে। আমি শুভ সকাল বললাম,তুমি মুখ শুকনো করে হাসলে। প্রাণ নেই কেন তোমার ?

দুপুরের খাবার বিরতিতে তোমার রুমে পর্দা সরিয়ে উঁকি দিতেই দেখি,তুমি চোখ বন্ধ করে গুনগুন করছে;

আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়..

তোমাকে আর বিরক্ত করতে ইচ্ছা করলো না। আস্তে করে চলে আসি যাতে তোমার ধ্যান না ভাঙ্গে।

সংসারে কতো কী যে হয়,রোদ নামলে জোৎস্না পড়ে গেলে অলক্ষ্যে কতো কী যে ঘটে কে জানে!

থানকুনি পাতার মতো কতো যে পাতা নিজেকে বিলিয়ে দেয় ..

রোদের বল্লমটা আর তীক্ষ্ণ লাগছে না। আর্টস ফ্যাকাল্টির করিডোর ধরে হাঁটছি। ক্লান্ত লাগছে চারপাশের ক্লাসরুম। কী আশ্চর্য আমিও গান শুরু করেছি একাকী নিভৃতে বিক্রম সিং এর মতো…

চোখের জলের লাগলো জোয়ার,দু:খের পারাবারে,ও চাঁদ

*
কতো মানুষ রাস্তার দুধারে অলস রোদে কেউ সিগারেট ফুঁকছে,কোথাও কোন কুকুর কি যেন খাবার খুঁজছে,তার পাশে শহরের কাক। কেউ রিক্সার দরদাম করছে,কেউ সাইকেল নিয়ে। কেউ বোঝা হাতে। কেউ বাচ্চার আঙ্গুল ধরে,কেউ মোবাইলে ফোনে…

কোথাও আমার অরুষার্ক নেই।