পুজোর পায়ের ছাপ

অর্ক চট্টোপাধ্যায়


পুজো প্রায় চলেই এলো। নতুন রাস্তা ঢালাই হয়েছে। এদিক ওদিক নগরোন্নয়নের কাজ লেগেই আছে। এদেশে রাতের বেলা কাজ হয়না। সারাদিন রাস্তা নর্দমা ইত্যাদি নানা কিছুর হিতার্থে ট্র্যাফিক জ্যাম বাড়তে থাকে। যাতায়াত করা দুস্কর হয়ে যায়। মানুষ কেন, রাস্তার কালু, ভুলু, শামলু টাইপের নেড়িগুলোও বুঝে উঠতে পারেনা নগরোন্নয়নের কাজের সময় যাবেটা কোথা, শোবেটাই বা কোথায়? এদিক ওদিক মু কিম্বা মুত যে কোনো একটা মারলেই বাড়ি থেকে, সেলুন থেকে, বোতল বোতল জল এসে পড়ে গায়ে। একে এই প্যাচপ্যাচে গরম, তার মধ্যে রাস্তা সিমেন্ট করছে বলে হাঁটা তথা দৌড়ে বেড়ানোরও জো নেই। নেড়িরা কিন্তু পুজোর জন্য এক পা তুলেই আছে। পুজোর সময় রাস্তায় রাস্তায় খাবার। কত কত এঁটোকাঁটা! বিনগুলো উপচে গেলে নেড়িদের তো পোয়া বারো। এবছর পুজো একটু আগে। এখনো ভাদ্র মাস। বৃষ্টিও হচ্ছে টুকটাক, তবে দিন সাতেক একটু কম। গোটা বর্ষাকাল জুড়ে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির টাইমলি কাজ চলছে।

সেদিন সকাল ১১টা নাগাদ শামলু চুপচাপ গুটলি পাকিয়ে শুয়েছিল রাকেশদার সেলুনের বাইরে। ইতিমধ্যে একটা বাচ্চা ছেলে এলো চুল কাটতে। সে আর তার বাবা কুকুর দেখে এমন কাইমাই শুরু করে দিল যে শামলু তো ভ্যাবাচ্যাকা। মানুষ বড়োই বিচিত্র জীব। ও পাড়ার শান্তিবৌদি তো ডেকে ডেকে বাটি করে দুধ ভাত খাওয়ায় আর এই দুই ফুটিয়া বাচ্চা আর তার পাঁচ ফুটিয়া বাপ দেখেই ভয়ে অস্থির! কোথায় বুড়ো দুর্বল শামলু ওদের দেখে ভয় পাবে তা নয়...রাকেশ নাপিত এমনিতে লোক ভালো, মাঝে মধ্যে শামলু, ভুলু কালুকে দু-চারটে বিস্কুটও দেয়। কিন্তু এটা খদ্দেরের ব্যাপার। রাকেশও তাই বেরিয়ে এসে শামলুকে খেদিয়ে দিলো। শামলু লেজ তুলে খানিক এগোতেই খেয়াল হলো এদিকটায় রাস্তার সিমেন্ট এখনো নরম। আবার কেলো। যারা রাস্তা সারাচ্ছে তারা খিস্তি করবে, ক্যালানে কুকুর বলে। যদিও শামলু জানে, মানুষ কম ক্যালানে নয়। কাল রাতেই ফুটপাথ দিয়ে যেতে যেতে ও পরিষ্কার দেখেছে, নরম সিমেন্টে ইয়া বড়বড় পায়ের ছাপ। ইয়েতি-প্রমাণ ক্যালানে লোক যাকে বলে। কিন্তু তাও ও ইয়েতিটা তো মানুষ আর শামলু হলো গিয়ে কুকুরের জাত। মিনমিন। ঘেউঘেউ। এখনো মানুষের গাল দেওয়ার পাত্র-পাত্রী। যেই লোকে দেখবে নরম সিমেন্টের ঢালাইয়ে কুকুরের ছোট ছোট পায়ের ছাপ, ব্যাস, শুরু হয়ে যাবে। যত দোষ কুতু ঘোষ।

এইসব আট-ছয় ভাবতে ভাবতে শামলুর মনে হল, নরম সিমেন্টে পায়ের ছাপটার থেকে যাওয়ার কথা। রাস্তার এই অংশের কাজ শেষ। আর মেক আপ হবে না। অতয়েব পায়ের ছাপের নামে এই ছোটবড় গর্তগুলোও রয়ে যাবে। এতো মাতামাতি হয় যে দুগ্গা ঠাকুরকে নিয়ে তিনিও চার পাঁচ দিনের বেশি থাকেন কই? সেই জায়গায় এই রাস্তাটা যতদিন না আবার নতুন করে সারাই হবে, ততদিন পর্যন্ত এই পায়ের ছাপ রয়ে যাবে। আর নতুন করে সারাই হতে অন্তত আরো চার-পাঁচ বছর। ততদিনে আবার নতুন ভোট, নতুন ওয়ার্ল্ড কাপ, নতুন নতুন একাধিক পুজো। কোন মানুষের, কোন কুকুরের পায়ের ছাপ কেউ জানবে না, তাও ততদিন ছাপগুলো রয়ে যাবে। নয় নয় করে শামলুর এ ধরাধামে বছর দশেক হয়ে গেলো। সে অলরেডি যাকে বলে, এক দাদু কুকুর। আরো পাঁচ বছরের আশা তাই বৃথা। যাক কিছু একটা অন্তত রয়ে যাবে--এটা ভেবে মনটা ভালোই হয়ে গেল শামলুর। নরম সিমেন্ট থেকে সরে গিয়ে ফুটপাথে উঠে একবার প্রাণ খুলে ঘেউউউউউউ করে উঠলো।

১২ টা বাজতে চললো। পুরোনো ঘড়িবাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট হয়ে গেছে বলে আর ঘন্টা বাজে না। সময়েরও ঠিক হদিশ থাকে না। নাহ, এবার না গেলে বোধ হয় শান্তিবৌদির ভাতটা মিস হয়ে যাবে। কালু ভুলুও এতক্ষণে নিশ্চই ওপাড়ায় ঘুরঘুর শুরু করে দিয়েছে। আজ শামলু মনের আনন্দে ভাত খাবে। রাস্তায় তার পায়ের ছাপ রেখে আসতে পেরেছে যা তার মৃত্যুর পরেও বেশ কয়েক বছর রয়ে যেতে পারে। কটা মানুষ পাবে গো যারা এমনটা করে উঠতে পারে? ওরা তো আবার কত্ত বছর বাঁচে! আজ শান্তিবৌদির ভাতে যদি এক-দুটো মাংসের হাড় জুটে যায় তবে আর চাই কি। পুজো তো প্রায় চলেই এলো।