স্নায়ু দিয়ে চেনা

নাসরীন জাহান

একটানা রিং বেজে যাচ্ছে। ওপারে কেউ তুলছে না। অথচ এমন হওয়ার কথা না। এতো বড় বাড়ি, কেউ না কেউতো থাকবে। হতাশ সোনালি বিছানার ওপর টেলিফোন আছড়ে মাথা চেপে বসে থাকে।

তিনদিন ধরে এই হচ্ছে, অফিস থেকে, বাসায় বসে ক্রমাগত ঘুরিয়ে যাচ্ছে। একদিন বাস রিকশা করে তাঁর বাসায় গেছেও, দারোয়ান বলেছে, তিনি গভীর রাত্তিরে বাড়ি ফেরেন।

এই রকম একজন চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত জাঁহাবাজ লেখককে কত রাতে পাকড়াও করতে পারে সোনালির মতো মেয়ে? রীতিমতো কান্না পেয়ে যায় । সবে ইন্টারমিডিয়েট করে ফার্স্ট ইয়ার অনার্সে ঢুকেছে সে। এর মধ্যে সম্পাদকের সাথে আত্মীয়তার সূত্র ধরে সে একটা সাপ্তাহিকে পার্ট টাইম কাজ নিয়েছে। বাসার সবাই বলছে, এ কাজ সোনালির পক্ষে করা কঠিন, সম্পাদক আত্মীয় স্বয়ং প্রথম চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন, সোনালির দিকে, এদেশের জাঁহাবাজ রাজনীতিক প্লাস কবি খান মুনতাসীরের সাক্ষাৎকারের বিষয়ে সোনালি যদি তাকে রাজি করাতে পারে, তবে চাকরির ক্ষেত্রে সোনালির স্থায়িত্বের বিষয়ে আর কোনো প্রশ্ন তোলা হবে না।ভদ্রলোক এককালে প্রচণ্ড সরব ছিলেন। এখন নিভৃতচারী হয়ে উঠেছেন- কাউকে সাক্ষাৎকার দিতে চান না। সোনালি অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পনেরদিন আগে তাকে ফোনে পেয়েছিলো। ভদ্রলোক সম্পর্কে যা সে শুনেছে তাতে ওপাশে তাঁর কন্ঠ শুনে এদিকে সোনালির থর কাঁপুনি বেগে যায়,সে মুখস্থের মতোন আউড়ে যেতে থাকে, দেখুন আমি নতুন, এটাই আমার প্রথম কাজ,
আপনি যদি রাজি হন...

তুমি আমার কোনো লেখা পড়েছো?

এই প্রশ্নে সোনালির দম আটকে মরার দশা হয়, সে টলে পড়তে পড়তেও গভীর খাদ থেকে নিজেকে টেনে তোলে, জ্বি, বিচ্ছিন্নভাবে, কিছু কিছু পড়েছি...

তোমার সাহস তো কম নয় মেয়ে, একজন মানুষ সম্পর্কে সার্বিক কোনো ধারণা না নিয়েই তার সাক্ষাৎকার নিতে চাও?

মানে আমি ঠিক একা নেবো না, আপনি রাজি হলে আমাদের অফিসের কৌশিক ভাই তিনি ... তিনি... বুঝলেন, আপনাকে তাঁর মুখস্থ...

তাহলে তিনি ফোন না করে তুমি করছো কেন?

জ্বি কাজটা আসলে আমার...

কোন ক্লাসে পড় তুমি?

ক্লাসে না, অনার্স...।

স্কুল পেরিয়েই সাংবাদিক হতে চাইছো? এতো সোজা এই কাজ? যাও, এই কাজ রেখে ঠিকমতো আগে পাসটা দাও। পরে আমার সাক্ষাৎকার নিও।

সোনালি চারপাশে ধাঁধাঁ অন্ধকার দেখে। এ তার বয়সের কারণে ব্যক্তিত্বের অবমূল্যায়ন! জীবনের প্রথম চ্যালেঞ্জিং কাজ, এরকম আনাড়িভাবে নেমে পড়াটা তার জন্য প্রচণ্ড ঝুঁকির হয়ে গেলো।

তার কন্ঠ শুকিয়ে খাক হয়ে আসে।

রিসিভারে শিথিল হাত বরফের মতোন ঠেসে যেতে থাকে। ফোন রাখার আগে, স্রেফ মুখ ফসকে অজান্তেই বেরিয়ে আসে ক’টি শব্দ- ততোদিনে যদি আপনি না বাঁচেন?

বলেই টের পায়, কী মারাত্মক ভুল সে করেছে। যন্ত্রণায়, ভয়ে ছটফট করতে করতে রিসিভার রাখতে যাবে, ওপারে হাঃ হাঃ হাঃ হাসির শব্দ তাকে ভীত করে তোলে। বিমূঢ় হয়ে ঠাণ্ডা রিসিভার কানে পেতে রাখে সোনালি।

খান মুনতাসীর বলেন, আমি তোমাকে সাক্ষাৎকার দেবো। তার আগে পনেরো দিনে তুমি নিজে আমার সম্পর্কে বেশ খানিকটা পড়াশোনা করে নাও।

দে-বেন-! সোনালির প্রশ্নটা আর্তনাদের মতো শোনায়।

ঠিকই ধরেছো মেয়ে, আমার বয়স হয়েছে তো, বড্ড মৌলিক প্রশ্ন, একেবারে খেলাচ্ছলে শিরদাঁড়ায় হাত দিয়ে ফেলেছো, তা তোমার ধৈর্য কেমন?

অ-নেক, অ-নেক।

ওভাবে বলো না, সন্দেহ লাগে, নিজের ধৈর্যের প্রতি আরেকটু কম আস্থা থাকা ভালো-- আমি কিন্তু তোমাকে ঘোরাবো, একদিনে সাক্ষাৎকার দেবো না।

আমি ঘুরবো।

ঠিক আছে পনেরো দিন।

সোনালি খান মুনতাসীরের লেখা আদ্যোপান্ত ঘেঁটেছে। তাঁর কবিতা, কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ, তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি… নানা কিছু ঘেঁটে সে কৌশিককে সাথে নিয়ে একটি খসড়ামতন ইন্টারভিউ তৈরি করেছে।

কৌশিক বলে, যে প্যাঁচানো লোক, মুখস্থ প্রশ্নে চলবেনা, তাঁর কথার সাথে পারম্পর্য রেখে তোমাকে তাৎক্ষণিকভাবেও কিছু প্রশ্ন করতে হবে।

আর এইটাতেই সোনালির জ্বর চলে আসতে থাকে। ছোটবেলা থেকেই কিছু নিভৃত সাহিত্যচর্চার অভ্যাস আছে তার। কিন্তু তা এতোই নিজস্ব বিষয়, মা পর্যন্ত তার এই গোপন প্রতিভার খবর জানতে পারেনি। সে ছেলেবেলা থেকে আশ্চর্য এক নিমগ্নতার মধ্যে বড় হয়েছে। কখনই ফ্যান্টাসি কিংবা হাস্যরসাত্মক কাহিনী সোনালিকে টানেনি। তাকে প্রবলভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে, এখন পর্যন্ত- রূপকথা। তুষার কন্যার কাহিনী পড়ে এখনও তার চোখে জল এসে যায়। আশ্চর্য! এতো সুখের গল্প! জল আসে কেন? সোনালি হাজার ঘেঁটেও অর্থ পায় না। তবে অনুভব করে, যা স্পর্শাতীত, যা স্বপ্নের মতো, তার প্রতি এক দুর্মর হাহাকার আছে তার। সে মা’র সাথে স্কুলে গেছে, স্কুল থেকে এসেছে, বিকেলে ছাদে বসে দেখেছে মস্ত আকাশ। সে সমস্ত ইন্দ্রীয় দিয়ে প্রতিমুহূর্তে অনুভব করেছে রোদ্দুর আর ঋতুবদলের রঙ...। এই করে করে সে ইন্টারমিডিয়েটে এসে সবে জেনেছে- পুরুষ নারীর একত্র সহবাসের ফলেই নারীর গর্ভে সন্তান আসে। তা-ও বলেছে তার এক ক্লাসমেট। শুনে তো সে লজ্জ্বায় বিমূঢ়- এতো অস্বস্তি হচ্ছিলো, বাসায় এসে সে বেশ কয়েকদিন বাবা-মা’র মুখের দিকে তাকাতে পারেনি।

সে কখনও মঞ্চে কথা বলতে পারে না, যুক্তির পেছনে জোরালো পালটা যুক্তি দিতে জানে না। এই মেয়েকে রেশমগুটির ভাঁজ থেকে বের করার স্বপ্নেই মা ভার্সিটিতে ঢোকাতেই চেয়েছেন- সোনালি বাইরের পৃথিবীটা চিনুক। একটু চালাক চতুর হোক। ফলে সেই সম্পাদক আত্মীয়ের প্রস্তাবে পরিবারের কেউ বাধা দেয়নি। যদিও সোনালির বিষয়ে তাদের ছিলো সীমাহীন অনাস্থা, তবুও শেষ পর্যন্ত সোনালির আগ্রহ দেখে তারা বরং আশান্বিত হতেই চেয়েছেন।

এখানে আসার পর কাজের ব্যাপারে ওর মধ্যে জেদ তৈরি করে দিয়েছে কৌশিক। অনার্স ফাইনাল ছেলে-- এতো কাজ জানে! এতো পড়াশোনা! যেন সে দশ হাতের দুর্গা। সোনালি খুঁটে খুঁটে শিখতে চেয়েছে-- কীভাবে কম্পোজ হয়, প্রুফ দেখা হয়, ট্রেসিং বেরোয়। এরকম আনাড়ি মেয়ে খান মুনতাসীরকে ইন্টারভিউয়ে রাজি করাতে পেরেছে-- এতেই তার অফিসের মধ্যে হট্টগোল লেগে যায়।

পনেরো দিন পেরনোর পর থেকে টানা ফোন ঘুরিয়ে যাচ্ছে সোনালি… আজ সাতদিন, ওপাশে কোনো শব্দ নেই।

হতাশ হয়ে বাদ, রিকশা চেপে ফের সে পল্লবীতে কৌশিককে তাঁর বাসায় নিয়ে যায়- গিয়ে দেখে, তিনি দেশের বাইরে স্ত্রীর সাথে দেখা করতে গেছেন। ভদ্রমহিলা অন্যদেশে চাকরি সূত্রে আছে।

ধপাস রাস্তায় বসে পড়ে সোনালি।

কৌশিক তাকে টেনে ওঠায়, এতো হতাশ হচ্ছো কেন? ক’দিন পর তিনি তো আসবেনই।


ক্লাসের পড়ায় ডুবে যায় সোনালি।

মাঝে মধ্যে অফিসে যায়। ঘন্টাখানেক পড়ে থাকে- কাজ বুঝতে চেষ্টা করে। সে ক্রমশঃ তার সেই দুর্দান্ত চ্যালেঞ্জের বিষয়ে থিতিয়ে আসতে থাকে।

ভার্সিটি চত্বর ধরে একা একা হেঁটে সে পুরনো রোদ্দুরের নতুন বিন্যাস দেখে- কালচে পাতাগুলো কী অপূর্ব ছত্রাক মায়ায় ধবল আকাশটাকে চিত্রা হরিণীর মতো করে রেখেছে- ঘাড় তুলে সে ঠায় দাঁড়িয়ে দেখে আর দেখে।

এরপর সেই আকাশ নিয়ে, ফিসফিসে বাতাস নিয়ে ঘরে এসে দুপুরের ওম টেনে নিতেই সোনালিকে অসাড় করে দিয়ে ফোন আসে-- কী ব্যাপার? ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছো?

মাইগড! আপনি? মানে, আমি...।

তুমি কাল দুপুরে আসো, অত আটঘাট বেঁধে আসতে হবে না। আমি ঘরোয়াভাবে কথা বলে যাবো, তুমি ক্যাসেটে রেকর্ড করে নিও।

পরদিন অফিসে গিয়ে দেখে কৌশিক তৈরি হয়ে আছে। তুমুল উত্তেজনায় সারাপথ দু’জন অস্থির থাকে-- বহুকাল ভদ্রলোক পত্রপত্রিকার বাইরে-- সোনালি একটা দুর্দান্ত কাজ করেছে, কৌশিক বারবার এই কথাটাই বলে।

বিশাল ড্রয়িংরুম। শাদা পাঞ্জাবি পরিহিত ধবধবে শাদা চুলের খান মুনতাসীরকে চৌকস গদিআঁটা সোফায় বসে পাইপ টানতে দেখে সোনালি অভিভূত হয়ে পড়ে।

কিছুক্ষণ সহসা কোনো কথা তৈরি হয় না।

সারাবাড়ি খালি। দেয়ালে নানা ছবি। কোবায় প্রস্তরমূর্তি আর সুন্দর মিহি গন্ধ বাতাস জুড়ে। খান মুনতাসীরকে স্বপ্নের মানুষ মনে হয় সোনালির। তিনি বলেন, আজ সাক্ষাৎকার দেবো না। একদম মুড নেই- সোনালি, তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো, একদম মুড নেই, আমি তোমাকে ঘোরাবো না, কাল ঠিক তৈরি হয়ে থাকবো। সোনালি কেমন নিভে যায়। কৌশিক বলে, ঠিক আছে, ঠিক আছে-- আমরা কিছুক্ষণ এমনিতেই কথা বলতে পারি।

আমিও তা-ই চাইছি, বহুদিন কথা বলি না। কেমন আড়ষ্টতা এসে গেছে। আজ আমরা কিছুট সহজ হয়ে নিতে পারি।

এরপর পাইপে টান দিয়ে দীর্ঘ নীরবতা টেনে তিনি সোনালিকে বলেন, তোমাকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। তোমার সরলতা… এ যুগে অকল্পনীয়, ফোনে মনে হচ্ছিলো কানের পাশ দিয়ে মিহি সুন্দর বাতাস বইছে। তুমি আমার মেয়ের বয়সী, এরকম সরলতা নিয়ে এতো ডেসপারেট কাজ করবে কী করে তা-ই ভাবছি।

আমি পারবো।

অত জোর দিয়ে বলো না-- যাহোক আত্মবিশ্বাস থাকা ভালো, আচ্ছা তোমাকে কেউ বলেনি-- তোমার চোখ খুব দুর্দান্ত? সোনালি রক্তিম হয়ে ওঠে।

কৌশিক হাওয়া পাল্টাতে জল খেতে চায়।

আবুল… আবুল… তিনি ডাকতে থাকলে কৌশিক নিজেই উঠে ডাইনিং স্পেসে জগের কাছে যায়।

বুঝলে, আমি খুব নিঃসঙ্গ, আমি তোমাকে কথা বলার পর থেকেই অনুভব করছি...। বুঝেছো সোনালি, তোমাকেই।

আড়ষ্ট সোনালি স্তব্ধ স্বরে বলে, ধন্যবাদ।

না সোনালি, এ ভদ্রতার বিষয় নয়, তুমি বুঝতে চেষ্টা করো-- আমি প্লেটোনিক অর্থ কিছু মিন করিনি… এই তো কৌশিক এসে গেছো-- সোনালি কিন্তু কবিতার মতো মেয়ে, সব সময় ওকে ছায়া দিয়ে রেখো না-- ডালপালা মেলে দাঁড়াতে দিও...। ওর সাথে আমার সম্পর্কটা আমার কাছে দীর্ঘকালের মনে হলো।

এক আশ্চর্য ঘোরের মধ্যে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর কৌশিক যখম রিকশা ডাকতে কিছুটা দূরে-- সোনালি উবু হয়ে বসে পড়ে, যেভাবে কুয়াশায় শীত লাগে, রোদ্দুরে তাপ, সেইভাবেই কিছু বুঝে, না বুঝেও সোনালির মনে হয় তার সারা গায়ে কে যেন নোংরা ছিটিয়ে দিয়েছে। সে হাজার ঘেঁটেও এই বোধের অর্থ খুঁজে পায় না। কেবল অনুভব করে ভেতর থেকে ঠেলে কান্না উঠছে। এবং তার হিসেবের বাইরে বিষয়টি তাকে এতো যন্ত্রণাকাতর করে তোলে-- শূন্য রাস্তায় হু হু করে কাঁদতে থাকে সে।