গন্তব্য

ফরিদ কবির

গন্তব্য

রাস্তা আসে
চক্রাকারে ঘোরে বাড়ির চারপাশে
নিচু স্বরে ডেকে ডেকে যায়
দরোজা খুললেই দেখি
শরীর বিছিয়ে দিয়ে শুয়ে আছে
আদিগন্ত বহু রাস্তা
বাড়ির অপর পাশ থেকেও শুনতে পাই
রাস্তার গোঙানি
যাই বা না যাই
রাস্তা আমাকেও ঘিরে থাকে সারাক্ষণ

প্রতিদিন আমিও পা ফেলি
মিশে যাই অজস্র রাস্তায়
পথের সাধ্য কি
কাউকে গন্তব্যে নিয়ে যায়!

রাস্তায়-রাস্তায় মিশে নিজেকেও রাস্তা মনে হয়...

আমি আর রাস্তা দুজনে মিলেই
খুঁজে ফিরি গন্তব্যকে
সেও হয়তোবা খোঁজে আমাদেরকেই...

……………………………………….



সাপ-লুডু


সাপ-লুডু বেশ বিপজ্জনক!
খেলতে গেলেই দেখি, সাপগুলি জ্যান্ত হয়ে যায়
ছোবলের ভয়ে আমি লুডুর এ-ঘর থেকে অন্য ঘরে
ক্রমাগত ছুটতে থাকি!

ওপরে যাওয়ার জন্য মইগুলি খুঁজি
একটু আগেও পড়ে ছিলো, যত্রতত্র

কিন্তু তোমাদের মধ্যে কেউ একজন
সিঁড়িগুলি সরিয়ে ফেলেছো

আমি যে ধরবো, নেই তেমন একটা হাতও
অথচ পাশেই ছিলে তুমি
অথবা তোমার মতো অন্য কেউ!

সাপগুলি আস্তে আস্তে ঘিরে ফেলেছে চারপাশ থেকে
আর, আমি ছোবল খাওয়ার জন্য তৈরি হতে থাকি...


...............





আয়না


আমি দেখি?
নাকি আয়নাই আমাকে দেখায়?
নিজেকেই দেখছি হয়তো
যদিও সামনে যাকে দেখি- দেখতে আমারই মতো
কিন্তু আমি নই

কেননা, আমি তো মৃত
বিধ্বস্ত আমার মুখ, ভয় দুই চোখের পাতায়

আয়না রহস্যময়, ভার্চুয়াল আরেক দুনিয়া
সেখানে আমার বিম্ব বরাবর ঝকঝকে, জীবন্ত
বরং কিছুটা স্মার্ট

যেমন আজ সে বাইরে এসেই
আমাকে পাঠিয়ে দিলো আয়নার ভেতরে

আয়নার ওপাশে ভয়ানক অন্ধকার
অথচ এপাশ থেকে সব সময় উজ্জ্বল দেখায়!
.....................





শরীর

বন্দি নয়, তোর হাত নিজে এসে আশ্রয় নিয়েছে
এই করতলে
তোর কাছে নিরাপদ নয় কোনো কিছু
তোর হাত, হাতের আঙুল

সামান্য যে গাছ, সেও অরক্ষিত রাখে না পাতাকে
তুলে ধরে যতোটা সম্ভব শূন্যে, স্পর্শের বাইরে
যে কারণে পাতা থাকে নিতান্ত সবুজ

স্পর্শাতীত কিছু নেই তোর
যে রকম হাতের ইশারা বুঝে তোর হাত
ঢুকে পড়ে আমার মুঠোয়
কথা হয় আঙুলে আঙুলে

শরীরও যথেষ্ট জ্ঞানী তোর
ভাষা বোঝে আরেক দেহের...
……………………….




যদি ভাবে কেউ

যদি ভাবে কেউ এই রাত্রি যাবে সকালে
এই চন্দ্র শাদা মার্বেল সেজে গড়াবে নীল চাদরে
কালো রাত্রি গিলে খাবে সেই লাল রৌদ্র
সেটা ঠিক নয়
কার নিঃশ্বাস হবে নিঃশেষ
কার দরোজায় কার নিষেধের তালা ঝুলবে
কেউ জানে কি?

এই নৌকো এই পারাপার আজ বন্ধ
এই বর্ষণ ফিরে যাবে সেই মহাশূন্যে
চিতাবাঘও তার শেষ আশ্রয় ছিঁড়ে বেরোবে
দূর নগরী পরিভ্রমণে!
(অসম্ভব বলে সত্যি কোন কথা নেই)

এতো ভুল দিন কে যে রাত-দিন বোনে মগজে
কে যে করে কার লোনা জল পান ভুল স্বপ্নে
কেউ জানে কি
কেউ জা নে না

কারও ছায়া তার ঘরে ঘুমুবে- সে ঘুরবে
নাকি ছায়া তার টো টো ঘুরবে
শুধু দেহটা ঘরে ঘুমুবে নিশ্চিন্তে!
(অসম্ভব বলে সত্যি কোন কিছু নেই)।





পরিস্থিতি-৬

টোকা দিলে শব্দ হয় শূন্যে
বিভ্রম কাটেনি, এই ভয়ে চুপচাপ বসে থাকি
পকেটে অগ্নির বাক্স খুঁজতে গিয়েই এতো বিপত্তি বেঁধেছে

বারবার উঠে আসে তোমার আঙুল
তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে
চুম্বন-মুহূর্তে আমি সতর্ক থাকি না
তোমার একটি চোখ আমার পেটের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলো

এখন শরীরভর্তি চোখ
পেটে, পিঠে, হাতের তালুতে
ফলে আমি বাইরে বেরোলে তুমি সব দেখতে পাও

কিন্তু তুমি বেরোলেই আমি কিছু দেখতে পাই না
তুমিও তো আমার একটা চোখ খেয়ে ফেলেছিলে!
……………………………….




বাড়ি

একটি বাড়ির দিকে উঁকি দিলো আরেকটি বাড়ি
ভেতরে মানুষ নেই, সিগারেট ঠোঁটে
বসে আছে জানালার কাঁচ
বুক-শেলফ হেঁটে গেলো পয়মন্ত চেয়ারের দিকে
দুলছে চেয়ার

বিছানায় শুয়ে আছে বালিশের প্রেত
জানালার পাট চোখ তুলে
দেখে নিলো চন্দ্রের আলোকে
মৌমাছির মতো টেবিলের ওপর উড়ছে ঘুম
ডায়েরির পাতা

কার্নিশে কার্নিশ ছুঁয়ে শাদা বাড়িটিকে
চুমু খেলো দোতলা বাড়িটা

বাড়িতে কেউ কি আছে? সারা রাত জেগে
খুব ভোরে ঘুমিয়ে পড়লো আলনায় ঝুলে থাকা
মুণ্ডুহীন শার্ট
পা কোথায়? হাতের আঙুল?
বাতাসে ডানার গন্ধ, আর
বাড়ির ভেতরে ফিসফিস
হাত-পা আঙুল খুলে আলনায় ঝোলে মুণ্ডুহীন শার্ট
একবার শুধু বুক-শেলফ
হেঁটে গেলো পয়মন্ত চেয়ারের দিকে
দুলছে চেয়ার
মৌমাছির মতো
টেবিলের ওপর উড়ছে ঘুম, ডায়েরির পাতা

একটি বাড়ির দিকে হেঁটে এলো আরেকটি বাড়ি...

…………………………