জাপান

রানা মুখোপাধ্যায়

ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা (১৮৯৯ - ১৯৭২)

ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা তাঁর সূক্ষ্ম, গীতিময় গদ্যের জন্য সুপরিচিত। তিনি এক নতুন সাহিত্যধারার সূচনা করেন যা ‘নিউ সেনসেশন্স’ বা ‘নিউ পারসেপশন্স’ নামে অভিহিত। এই ধারা জাপানের পুরনো সাহিত্যধারার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে। একই সাথে এই তত্ত্ব কম্যুনিস্ট ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ ‘প্রলেতারিয়ান সাহিত্য’ থেকেও সমদূরত্ব বজায় রেখে চলত। কাওয়াবাতা প্রণীত সাহিত্যধারা মূলত কিউবিজম, এক্সপ্রেশনিজম, দাদাইজম ইত্যাদি আধুনিকতাবাদী মতবাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ‘আর্ট ফর আর্ট’স সেক’ আন্দোলনে পরিণত হয়।
তাঁর ‘মর্নিং নেলস’ গল্পটিতেও এক অতি সূক্ষ্ম আলো-আঁধারের খেলা দৃষ্ট হয়। মানুষের জীবনের বিভিন্ন ধাপ, বিভিন্ন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ইত্যাদিতে যে একাধিক স্তর আছে তা অতি সুচারু দক্ষতায় রূপকের মাধ্যমে এখানে ধরা পড়ে।

**********

সকালবেলার নখ কাটা

একটা ভাঙাচোরা বাড়ির তিনতলায় একটা গরিব মেয়ে ভাড়া থাকত। সে তার প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ের জন্য অপেক্ষা করছিল কিন্তু প্রত্যেক রাতেই আলাদা আলাদা লোক তার ঘরে আসত। সেই সমস্ত লোকেরা প্রতি রাতেই জিজ্ঞেস করত, এটা কি। তোমার ঘরে একটা মশারিও নেই।
তার উত্তরে মেয়েটা বলত, আমি তার জন্য খুব দুঃখিত। কিন্তু চিন্তা করবেন না আমি সারারাত জেগে মশা তাড়াব। এর জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন।
খুব বিচলিতভাবে মেয়েটি একটি মশা তাড়াবার সবুজ ধূপ জ্বালিয়ে ঘরের বাতিটি নিভিয়ে দিত। আর সে তাকিয়ে থাকত ধূপের ছোট্ট আগুনটার দিকে। তখন তার ছোটবেলার কথা মনে পড়ত। সে সব সময় ওই লোকগুলিকে হাওয়া করত। সে পাখা দিয়ে বাতাস করবার স্বপ্ন দেখত।
ইতিমধ্যে হেমন্ত এসে গেছে।
একজন বৃদ্ধ এলেন সেদিন সেই তিনতলার ঘরে। একেবারে একটা বিরল ঘটনা।
তুমি মশারি খাটাবে না।
আমি মাফ চাইছি। কিন্তু চিন্তা করবেন না আমি সারারাত জেগে মশা তাড়াব। এর জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন।
একটু অপেক্ষা কর বলেই বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।
মেয়েটি বৃদ্ধকে জোর করে আটকাবার চেষ্টা করল, আমি সকাল পর্যন্ত মশা তাড়াব। আমি একটুও ঘুমব না।
আমি এখুনি ফিরে আসছি।
সিঁড়ি বেয়ে বৃদ্ধ নেমে গেলেন। বাতিটার আগুন দিয়ে মেয়েটি মশার ধূপটা ধরাল। উজ্জ্বল আলোকিত ঘরে বসে মেয়েটি দেখল তার আর ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে না।
ঘণ্টা খানেকের মধ্যে বৃদ্ধ ফিরে এলেন। মেয়েটা আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
আমার খুব ভাল লেগেছে যে তোমার ঘরের ছাতে অন্তত মশারি খাটাবার পেরেক রয়েছে। সেই ভাঙাচোরা ঘরটাতে বৃদ্ধ লোকটি মশারি খাটিয়ে দিলেন। মেয়েটি মশারির ভিতর ঢুকে পড়ল। মশারির নীচের অংশটা ঠিকভাবে ছড়িয়ে দিতে দিতে তার হৃদয়ে একটা অনুভূতির সঞ্চার হল।
আমি জানতাম আপনি ফিরে আসবেন। তাই বাতি না নিভিয়েই আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমি কিছুক্ষণ আলোর মধ্যে এই মশারির দিকে তাকিয়ে দেখতে চাই। এবার মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়ল। এই ঘুমের জন্যই সে অপেক্ষা করছিল বহুদিন। এত ঘুম ঘুমিয়েছিল সে যে, বুঝতেই পারেনি কখন বৃদ্ধ লোকটি চলে গেছে।
আরে এই... ওঠো।
মেয়েটি তার প্রেমিকের গলার আওয়াজে জেগে উঠল।
এবার আমরা বিয়ে করতে পারি অবশেষে এবং কালই। মশারিটাও দারুণ হয়েছে। মশারিটার দিকে তাকিয়েই আমার মন ভাল হয়ে যাচ্ছে। কথা বলতে বলতেই সে মশারিটা হুক থেকে খুলল। তারপর মশারির নীচে থেকে মেয়েটিকে টেনে বের করে তাকে মশারির উপর বসাল। বলল, মশারির উপর বোসো। মশারিটাকে ঠিক একটা সাদা পদ্মের মতো লাগছে। ঠিক তোমারই মতো মশারিটা ঘরটাকে পবিত্র করে দিয়েছে।
লিনেনের ছোঁয়ায় মেয়েটির নিজেকে নতুন বউ বলে মনে হল।
ঘর জোড়া সাদা মশারির উপর বসে আমি আমার পায়ের নখ কাটছি এই কথা বলে তার বহুদিনের না কাটা নখ সে কাটতে বসল।