অপেক্ষা,বিশ্বাস বাবু ফিরবেন

তমাল রায়

সত্যি বলতে কি অস্পষ্ট একটা গোঙানি,আর ভীরু চোখে তাকানো,মাথা নীচু করে তো বেশীক্ষণ থাকা যায় না,তাই মাথা তুলতেই হয়। মনে পড়ে যায় কতগুলো বীভৎস কদাকার,ছায়ামূর্তি দাঁত,নখ বার করে এগিয়ে আসছে...রাস্তার আলোটা কম,তেমন রাতও নয় সে সময়...চমকে ওঠে,তলপেটের কাছটা বুনু ওরফে বনানীর, ব্যথায় চিন চিন করে...
মা বলছিলেন,
: আকাশটা কতদিন পর আবার তেমন নীল,তাকিয়ে দেখ!
বড় বোন মিলু ফোন করেছিল,তার বরের খুব কাজের চাপ তবু আসছে,তিন চার দিনের বেশী থাকতে পারবে না।

গলির মোড়ের কাছে,ইলেকট্রিক সাপ্লাই এর লোক গুলো কাজ করে গেছিল,ইয়া পেল্লাই গর্ত। পড়ে গেছিলেন মিত্তির জেঠিমা। এখনও প্লাস্টার। গালি দিয়েছেন পার্টির ছেলেদের অনেক। কাজ হয়নি কিছুই। আজ সকাল থেকে বলা নেই কওয়া নেই,রাস্তা সারাই...প্যাচ ওয়ার্ক। লাঠি নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়ারে মিত্তির জেঠি পিচ ঢালা দেখছেন...পাশের বাড়ির উঠোন থেকে শিউলি কুড়িয়ে যাচ্ছিলো খেঁদু। জেঠি দুটো ফুল চাইলো। খেঁদু এমনিতে দেয়না। আজ কেন জানি দিলো,দুটোর জায়গায় পাঁচটা গুণে গুণে...

নতুন ফ্ল্যাট বাড়ি গজিয়েছে এ পাড়ায় অনেকগুলো,পাল্লা দিয়ে বেড়েছে,মশার তান্ডব। সুমিতদের তেমন কিছু নেই,একটা পোড়ো ঝুপসি বাড়ির একতলার দশ বাই বারো ঘর। দেওয়ালে তারা মা ওড়েন তাই কাঁচি ঝোলানো হুক থেকে। মা তারা তাকিয়ে সুমিতের দিকে। সুমিত তাকিয়ে বাবা রমিতের ছবির দিকে। যদি বাবা হাসে একটু তার দিকে চেয়ে...। আগে তো পারত না,এই দু একদিন আগেই,ফুটপাথের দোকান থেকে,যা সম্ভব,তাতে কি...একটাই অনেক,হাতে কেবল একটা ক্যাপ ফাটার বন্দুক চাই,ব্যস...রমিত চলে গেছে ডেঙ্গুতে...দুমাসও হয়নি...সুমিতের খিদে পায়না,অনেকদিন! বাইরে আলো লাগাচ্ছে,সন্ধ্যে থেকে আলোয় ভরে যাবে পুরো তল্লাট...সুমিত একবার মার দিকে চাইলো,ফের অঙ্কের বই খুলে বসলো।

এডকেমিস্ট না রামকৃষ্ণ কি একটা কোম্পানির হয়ে টাকা তুলত শালিনী। বাড়ি ফেরেনি। তার আগের ক'দিন কেবল বাড়িতে হই হট্টগোল। টাকা চাইছে,যার টাকা সে চাইবেই। বুড়ো বাপ অশোকেন্দু বলেছিল,চল বাড়িটা বেচেই দিয়ে দিই। মেয়ে রাজি হয়নি,দেখি না কি হয়। লেভেল ক্রসিং এর কাছে পড়েছিল বডি,পরদিন খবর পান অশোকেন্দু। আজ জানলার রডে বক্স বাঁধছিলো ছেলেরা। বললে শুনবে না। কি আর করা,জানলা বন্ধ করতে গিয়েও করলেন না।
বিন্ধ্যবাসিনী তলার ওই একলা বাড়িটায় বাহাত্তুরে কুমুদিনী বোস আপাতত অপেক্ষায়,ছেলে অহন নিশ্চিত এবার আসবে,আসবেই...বারো বছর আগে যখন ডেট্রয়েট যায়,সেটাও ছিল এই শরৎ...বলে গেছিল মাঝের সময়ে আর আসা হবেনা,অনেক খরচ! কিন্তু এক বছর বাদে ঠিক আসবে,আর মার চশমা করে দেবে। কুমুদিনী চোখে এখন আর দেখেনা। কিন্তু ভারী পায়ের শব্দ শুনলে চমকে ওঠেন,অহন এলি???

আপাতত কাশ আর শিউলি। যথারীতি নীল আকাশ। সাদা মেঘ টুকরো। আর কিছু অপেক্ষা... ঢাক,কাঁসর,ঘন্টা আর বুনু,মিলু,মিত্তির জেঠি,রমিত,অশোকেন্দু,আর কুমুদিনী বোসের হয়ত দেখা হয়ে যাবে...ওই যে উৎসব।
আর,ঐহিক অনলাইন এসে গেল দুই বাংলার ২৬২ লেখকের সাহিত্য সম্ভার নিয়ে...এই উৎসবে,অনেকটা অন্ধকার,তবু যদি আলো...
বাঙালির জীবনে অনেকটা অন্ধকার,তবু আলোর সন্ধান...
তবু, শুভেচ্ছা ভালো থাকার, ভালোবাসার ।

আপাতত উৎসব। আপাতত অপেক্ষা বিশ্বাস বাবুর ফেরার...