সম্পর্কের ইচ্ছেশক্তি

আহমদ সায়েম



যেসব কাজের সাথে আমরা প্রতিদিন মুখোমুখি হই তা কারো না কারো সাথে শেয়ার করতে চাই, এই শেয়ার করতে গিয়ে মূল গল্পটা ছাড়া একজন ভিক্ষুক বা বাদামওয়ালার দৃশ্যটা বাদ দিতে হয়। গল্প শুনতে গিয়ে কেউ তো মেনে নিবে না — তখন একটা কাকের শব্দ শোনা গিয়েছিল বা লুকিয়ে চুম্বনের দৃশ্যটা মনে পড়ে গিয়েছিল তখন। হ্যাঁ, তাই লিখতে গিয়ে আমরা সেই দৃশ্যগুলো মুছে দিয়েই শুরু করছি। আরেকটা কথা বলে রাখি, যেসব শব্দ এখানে ব্যবহার করা হয়েছে তা বহুল ব্যবহৃত।

তো, যা বলছিলাম — চলার পথের সব দৃশ্য খাতায় টানা যায় না। যা-ও পারা যায় তা ছেঁটেছোটে কোনোরকমে। এই ছোট করাও ইচ্ছেকৃত নয়, ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তা সম্ভব হয় না। লিখতে গিয়ে হয়তো বলার চেয়ে অনেক বেশি লেখা যায়, আবার এর বিপরীতও হয়, যা আর কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না। একবার এক বন্ধুকে ফোন করে বললাম, আগামীকাল আমরা (দশ-বারোজন বন্ধু সহ) দূরে কোথাও ঘুরে আসি? তার প্রশ্রয়ে সবাইকে বলে দেয়া হয়েছে আগামীকাল ভোরেই আমরা রওয়ানা হচ্ছি। সকল বলাবলি বা গোছানো শেষ করে ফের যখন তার সাথে যোগাযোগ করি ফেবু’র ইনবক্সে তখন সে অন্য সুরে কথা টানছে! তাড়াতাড়ি করে তারে ফোন দেই কিন্তু আর ধরতে পারি না, সে ফোনের কোনো বটমই স্পর্শ করছে না। কয়েকবার চেষ্টা করি তারে ফোনে ধরতে, কিন্তু সে আর ফোন ধরে না। অথচ তার জন্যই বের হবার এত অ্যারেঞ্জমেন্ট। সে যাচ্ছে বলেই সব বন্ধু এক হচ্ছে যাওয়ার জন্য, সেও তা জানে তারপরেও তা করল। এখানে বন্ধুর বিষয়ে পাঠকের কাছে নালিশ দিচ্ছি বলে মনে হতে পারে, তেমন কিছু নয়, বলতে পারেন বিষয়টা নিয়ে নিজের সাথেই বোঝাপড়া। কারো সাথে শেয়ার করলে অনেক হাল্কা লাগে নিজেকে, এবং একই বিষয় থেকে নানান দুয়ার খুলে চিন্তার বা নতুনরূপে ভাবার।

তো সবাইকে নিজের মতো করে ম্যানেজ করলাম কিন্তু এই বিষয় নিয়ে তার সাথে আর আলাপ করিনি। দু-একদিন পর তার বাসায় যাই কিন্তু ঐ বের না হবার কারণগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করিনি, সেও আমাকে এভাবেই জানে যে এই বিষয় নিয়ে আমি আর আলাপ করব না তার সাথে বা অন্য কারো সাথে। কোনো কাজে বিরক্ত হলে তা নিজের মাঝে রাখতেই বেশি পছন্দ আমার, আর মানুষজনের সলিউশন দিয়ে কথা বলাটা মেনে নিতে পারি না বিধায় জীবনের অনেক বিষয়আশয় আমার ডিটেইল জানা হয়নি। আর এই পর্যন্ত যা অভিজ্ঞতা হয়েছে — ঘটনার শেষ দেখা মানে — সম্পর্ককে শেষ করে দেয়া, জীবনটা আসলে কবিতার মতো যার শুরুও আছে শেষও আছে অথবা কোনো শুরুই নেই শেষ আর হবে কোথায়! জীবনের প্রতিটা ছিদ্র থেকে এঞ্জয় করা শিখতে হবে, তা না-হলে দৌড়গুলোই দেখা যাবে শুধু। কোনোকিছু শেষ করে দেয়া বা শেষ দেখা কোনো যোগ্যতায় পড়ে না মনে হয়, বরং সম্পর্ক ধরে রাখাটাই হচ্ছে নিজের আইডেন্টিটি।

পরিবারের নানান কাজ নিয়ে বের হতে হয় এমনই কিছু কাজ নিয়ে বের হই। বাজারের লম্বা লিস্ট নিয়ে একটা দোকানে দিয়ে মালের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি দোকানের সামনেই। দোকান থেকে দশ-পনের গজ দূরে দেখি একটা আট-দশ বছরের ছোট ছেলে তার মায়ের সাথে লড়াই করছে যে তারে ভিক্ষার ঝুলি থেকে কিছু টাকা দিতে; সে আইসক্রিমওয়ালার কাছ থেকে একটা আইসক্রিম খাবে, কিন্তু মা কোনোভাবেই টাকা দিচ্ছে না। তাদের ঝগড়ার এক পর্যায়ে একজন পথচারী এগিয়ে এসে তাকে আইসক্রিম ক্রয়ের জন্য টাকাটা দিয়ে দেন। ছেলেটা আইসক্রিম হাতে নিয়ে মহা খুশি। খুশিতে নাচে আর খায়। এবার মা তার পিছু নেয় এই আইসক্রিম থেকে একটু খাওয়ার জন্য। এবার ছেলের কথা হচ্ছে, “তুমি আমারে দিছ আইসক্রিমের টাকা? আমারে একজন দিছে, এখন তোমারে দিমু ক্যান? যাও তোমারে দিমু না” ... এই দৃশ্যটা এখানে টানার কারণ হচ্ছে আমাদের ছোট-ছোট ক্ষমতাগুলোকে আমরা খুব বাজেভাবে ব্যাবহার করি। মনে করি এবার বুঝিয়ে দেবো আমার সাথে তিনি যা করেছিলেন বা আমি যে কী জিনিশ উনাকে তা বোঝানো উচিত; অথবা এমন শিক্ষা দেবো সারাজীবন আমাকে মনে রাখবে। এই বাচ্চাটা তার মায়ের সাথে যা করল মানে আইসক্রিমটা সে তার মাকে দিলো না। যে-কোনো বাচ্চাই তা-ই করত, এইটা বাচ্চাদেরই মানায় কিন্তু একজন আমাকে নয়। আমরা এই বাচ্চার চরিত্র থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি। সারাজীবনেও বের হতে পারি না, কিন্তু কেন?

আমরা আমাদের সমাজে সূর্যের আলোর মতো বিছিয়ে দিয়েছি ছোট-ছোট ক্ষমতার শক্তি। ডান হাতটা আর শুনতে পায় না বা’হাতের কান্না। ছোটভাই আর বোনের সাথে সেই-যে খেলনাবাটি নিয়ে ঝগড়ায় মাত করেছিলাম ঘরের দেয়াল, আমি — ভাই আর বোনের মধ্যে সবার বড়, সেই ক্ষমতায় ছিনিয়ে নিয়েছিলাম সবচেয়ে সুন্দর কলমটা; আজ অনেক বড় হয়েছি কিন্তু ঘরের দেয়াল ঠিকই ভিজে যায় আমার কঠিন শব্দে এবং পছন্দের কোনোকিছুই হারিয়ে যেতে দিইনি, এখন অব্দি। ইচ্ছে করলেই আমরা কোনো সম্পর্কই তৈরি করতে পারি না, হয়ও না; অথচ ভাঙনের সুরগুলো আমাদের যেন দখলেই থাকে, নতুন রঙ আর পরিচিতি নিয়ে ঘুরলেও হারানো সম্পর্কগুলো অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে যায়। আইসক্রিম খেয়ে শেষ করলেই তারে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, অথচ তা যদি একজনকে সাথে নিয়ে খাওয়া যেত অনেক দিন পরেও তিনি বলতে পারতেন সে আমাকে সাথে নিয়ে বসেছিল এবং খাইয়েছিলও।
সম্পর্কও তা-ই — শেষ করে দিলে আর তো দেখা হওয়ার কথা না, দেখা হলেও অন্যদিকে ঘুরে যাওয়ার একটা প্রবণতা কাজ করে কিন্তু থেকে-যাওয়া সম্পর্কের মাঝে অনেক রকমের ভাবনার সাথে পরিচয় ঘটে, অন্তত ঝগড়া করার জন্যও তো কিছু পুরাতন সম্পর্কের প্রয়োজন পড়ে যায়। নতুন সম্পর্কের মাঝে শুধু ভালোবাসাই থাকে কিন্তু নেশা ধরার মতো ভালোবাসা পেতে হলে তারে পুড়তে দিতে হয়, পুড়িয়ে নিতে হয়; সকল ইচ্ছের বাইরে এসে দাঁড়াতে হয় ভালোবাসার জন্য।