কয়েকটি চিঠি এবং ইচ্ছেডানার বার্তা

প্রবুদ্ধ ঘোষ



#
ইচ্ছেডানার রঙে ভোর হয়ে এলে ক্লান্তি মুছে ফেলে চিঠিরা। ঘুম ঝেড়ে টানটান হয় ডাকপিওনের অপেক্ষায়। তখন মরচের গন্ধ চিঠির আবেশ জুড়ে। অন্ধকারে অনেকক্ষণ পড়ে আছে। জেলের সেলে যেমন অনেক উঁচুতে থাকা জানলা দিয়ে একচিলতে রোদ আসে, তেমনি ডাকবাক্সের ওই সরু চ্যাপ্টা ফাঁক গলে একচিলতে মায়াবী রঙ। অক্ষরেরা ছটফট ক’রে। শব্দের মধ্যে মধ্যে যে ফাঁক, তারা অপেক্ষা আদানপ্রদান ক’রে। এমনকি, যে শব্দ ওই চিঠির পাতায় জন্ম নেয়নি তারাও ঘন হয়ে আসে। অসমাপ্ত, কেটে দেওয়া শব্দের ভ্রূণেরা ওখানেই খেলে বেড়ায়। আর, চিঠিরও তো ইচ্ছে হয় ভীষণ, পৌঁছে যেতে। চিঠিরও ইচ্ছে হয় পৌঁছে দিতে স্বগতঃসংলাপ।

#
বহু শ্রাবণ আগে এক ১৬ বছরের কিশোর ভেবেছিল শহরের সবথেকে নামী পাক্ষিকে কবিতা বেরোবে তার। সাদা ফুলস্কেপ কাগজে একটি কবিতা লিখে খামে ভরেছিল। নাম ছিল, “আগুন, আমায় জ্বলতে শিখিও”; কী যেন সব ছেঁড়াখোঁড়া আবেগ- ‘এক মুহূর্ত গাঢ় কথা/ এক মুহূর্ত বিস্ফোরণের/ এলোমেলো তিনটি শব্দ,/ আবেগপ্রবণ সে চুম্বনের’। মেঘলা দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রায় আধঘণ্টা হেঁটে পৌঁছেছিল লাল ডাকবাক্সের সামনে। কিশোরটি সাদা খামে মোড়া কবিতাটি ফেলেছিল ডাকবাক্সে। সে জানত না বা ভুলে গেছিল কিংবা লাজুক অনবধানে খেয়ালই করেনি যে, কোনও ডাকটিকিট লাগানো হয়নি খামে। প্রেরক-প্রাপকের নাম লেখাই যথেষ্ট নয়, নির্দিষ্ট মূল্যের ডাকটিকিটই পারে চিঠিকে ইচ্ছেস্থানে পৌঁছে দিতে। সে চিঠি পৌঁছয়নি কখনো সেই পাক্ষিক পত্রিকার দফতরে। হয়তো ডাকঘরে বিনা-ডাকটিকিটের চিঠি হয়ে পড়েছিল বা ছিঁড়ে গেছিল বা খোলাই হয়নি সেই ডাকবাক্স কখনো।
কিশোরটি তখন মাধ্যমিক পাশ ক’রে ক্লাস ইলেভেন। বয়েজ স্কুল থেকে কো-এড হয়েছে ক্লাসরুম। তবু, বাধো বাধো তো ছিলই। অন্য স্কুল থেকে আসা মেয়েরা কেউ হাসিঠাট্টায় কেউ সঙ্গী পেয়ে কেউ বা প্রবল পাঠাভ্যাসে দু’টি পিরিয়ডের মাঝের সময় কাটাচ্ছে। ছেলেটির ইচ্ছে হত খুব ওই মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে। জয় গোঁসাই পড়তে পড়তেই ছেলেটিরও মনে হয়েছে “ওই মেয়েটির কাছে/ সন্ধ্যাতারা আছে”। ইচ্ছে ছিল যত, কথা হত তার চেয়ে কম। কথা যত হত, ভাবপ্রকাশ হত তারও কম। পুরনো পুজোসংখ্যা, কিছু বই লেনদেন হত দু’জনের। সে বছরের পুজসংখ্যা আদানপ্রদানের সময় ছেলেটি একটি চিঠি রেখে দিয়েছিল পুজোসংখ্যার ভেতর। “... তখন থেকেই আমি রাতজাগা শিখছিলাম। তখন থেকেই ঠোঁটের কোণে ভাঙা আগুন...” যাতে, বই খুললেই চোখে পড়ে সে চিঠি। শুরু হয় নতুন কথোপকথন। বই ফেরত এসেছিল। বইয়ের ভাঁজে চিঠিটাও। কিন্তু, সাহস যুগিয়ে ছেলেটি চিঠির প্রত্যুত্তর চাইতে পারেনি। মেয়েটিও পাঠাভ্যাসের অবসরে সময় পায়নি বোধহয় কিছু বলার। সে চিঠিরও কি ইচ্ছে হয়নি নতুন অক্ষর জানার? নতুন শব্দের ঝোঁকে তারও কি জমানো ছিল কিছু অভিমান?

#
চিঠি পৌঁছে দেবার জন্যে দ্রুত হাঁটছে র। বড় গুরুত্বপূর্ণ এই চিঠি। ছোট্ট কাগজে অতি সংক্ষেপে লেখা কিছু নির্দেশ ও করণীয়। সু.রা কিছু জরুরি বার্তা পাঠাচ্ছেন চা.ম-কে। বেশ কিছু মাস ধরেই মত ও পথ নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত এই দুই বর্ষীয়ান। কারণ যে প্রবল উদ্যোগে ও স্বতঃস্ফূর্ততায় মানুষের দুই দশকের পুঞ্জিত ক্ষোভ বেরিয়ে আসছিল সশস্ত্র গণআন্দোলনে, তা কিছু স্তিমিত হয়ে এসেছে। একদিকে রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দমন অন্যদিকে বিদ্রোহ-কৌশলের কিছু ভুলত্রুটি। যে ইচ্ছের বীজ পোঁতা হয়েছিল প্রত্যন্ত এক গ্রামে তা কখন যেন সমষ্টির ইচ্ছের বীজ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন সেই ইচ্ছেডানায় ভর করে স্বপ্নের নতুন দিশা খুঁজে পাচ্ছে মুক্তিকামী মানুষ। তাই, এই সময়েই ভুলগুলো শুধরে নেওয়া দরকার। তত্ত্ব আর বাস্তবের ফারাক, জনগণের ইচ্ছে আর পার্টির চাহিদার ফারাক কমিয়ে আনা যায় আরও। কীভাবে? সু.রা সেটাই ভেবে বের করার চেষ্টা করেছেন। সমাজবিজ্ঞানী তাঁরা, উত্তাল দশক জুড়ে দ্রোহনিরীক্ষা চালিয়েছেন; সাফল্যের দিকে যেতে যেতেও হঠাৎ কিছু আঘাত আসতে শুরু করেছে। চা.ম জানেন, বোঝেন কিন্তু ব্যক্তিগত কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে অস্থির হয়ে থাকেন। সু.রা-র মতো ঠাণ্ডা মাথা অথচ আবেগপ্রবণ প্রাজ্ঞের থেকে পথের হদিশ পেতে তিনিও উদ্বিগ্ন।
কিন্তু, র ধরা পড়ে যায় আচমকা। অথবা, প্রতিটি অসমাপ্ত দ্রোহেই যা হয়; কোনও এক বিশ্বাসঘাতকতা ধরিয়ে দেয় বার্তাবাহীকে। যে ইচ্ছের বীজ কত বড় গাছ হয়ে পালটে দিতে পারত দেশ, সেই ইচ্ছেবীজ পিষে গুঁড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিল রাষ্ট্র। অথবা ভেবে নেওয়া যেতে পারে যে, র পেরেছিল হয়তো চিঠিটার বার্তা আগলে রাখতে। অগণিত মানুষের আকাঙ্খা, বরানগরের কয়েকশো যুবকের সবাক লাশের ইচ্ছেরা, প্রবল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে অর্ধমৃত হয়েও না-মরে যাওয়া আলোরা বেঁচে তো থাকবেই। তাদের বস্তুলব্ধ চেতনাতেই রাত্রিচক্র ঘুরে চলেছে। শুকনো ইতিহাস বলছে, র পারেনি সু.রা আর চা.ম-র মতামত মিলিয়ে দিতে, চিঠিটা পৌঁছে দিতে। কিন্তু, ইতিহাসের ভেতরে ইতিহাসের অজানা পথ জানে দ্রোহবার্তা, দ্বন্দ্ব হারিয়ে যায়নি। চিঠিটা হারিয়ে গেলেও সেই বার্তা উলগুলান হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, বিছন হয়ে স্বপ্নের বাস্তবতা হয়ে গেছে আজ।

#
কলকাতার উদ্বিগ্ন কোণ জুড়ে আগুনের খবর। জ্বলে যাচ্ছে সাদা রঙের বাড়ি। উত্তেজনার ধিকিধিকি আঁচে হাওয়া দিয়েছে সোহরাওয়ার্দির ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন্‌ ডে’। সে বিষাক্ত হাওয়ায় নোয়াখালিতে দোকান থেকে টেনে বের করে কোপানো হয়েছে সুধীন্দ্রকে। ফরিদগঞ্জে অজয়দের ঠাকুরঘর ভেঙ্গে ফেলে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। কোনও এক বিপন্ন প্রৌঢ়ের রক্তমাখা চিঠি বিহারের ছাপরায় পৌঁছে গেছে তার আত্মীয়দের কাছে। অন্ধ ধর্মের ক্রোধ ছড়াতে সময় লাগেনা। তাই, কেরামতদের বস্তি ঘিরে ধরে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইসরাত পালাতে পেরেছে বটে, তবে শরীরে কাপড় ছিল না কোনও। কলকাতায় কলাবাগান বস্তির পাশে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ভেতরে হালাল করা হয়েছে দু’টো পরিবারকে। বদলা নিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে গোপাল মুখুজ্জ্যে। হেদুয়া আর শোভাবাজার অঞ্চলে লুঙ্গি পরা রিক্সাচালককে ট্রামলাইনের ওপরে জবাই করা হয়েছে। দ্বেষী হিন্দুর উগ্র চিঠি পৌঁছে যাচ্ছে গোপালের কাছে। .৪৫ বোরের পিস্তল নিয়ে, খোলা তলোয়ার হাতে তিলককাটা অনুগামীদের নিয়ে গোপাল বেরোচ্ছে গণহত্যায়। সোহরাওয়ার্দির পরিকল্পিত গণহত্যার বদলায় গোপালের পরিকল্পিত গণহত্যা। সেই গণহত্যাগুলো পৌছে যাচ্ছে মোরাদাবাদে, মুম্বাইতে, গুজরাতে, মুজফ্‌ফরনগরে... সন্ধ্যে হয়ে এলে মানুষ নিজের কাছে, শান্তির কাছে যত না ফিরছে ধর্মের কাছে ফিরছে বেশি। বার্তা থেকে বার্তায় নতুন নতুন বিদ্বেষ আর গণহত্যা।
অথবা, চিঠিগুলো লেখা হয়নি। লেখা হলেও, বার্তা পৌঁছয়নি। সোহরাওয়ার্দির গণহত্যার আহ্বান নাকচ হয়ে গেছে। ১৭ই অগাস্ট লিচুবাগান বস্তির শ্রমিকরা মেটিয়ানুরুজের মুসলিমদের দাওয়াত রক্ষা করতে গেছেন। কেরামত এসেছে নোয়াখালিতে, অজয়ের বাড়িতে , পুজোর অতিথি হয়ে। রাজাবাজারে চপার হাতে বেরনো ফেজটুপি-বাহিনীর সাথে একসাথে বাদুড়বাগানের পিছনের চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছে রড হাতে বেরনো ‘হর হর মহাদেব’ বোলনেওয়ালেরা। সবাইকে আজ খাওয়াচ্ছে ট্রাম-শ্রমিক ইসমাইল। ইসমাইল দু’টো ছোট্ট চিরকুট পাঠিয়েছিলেন এ-পক্ষকে আর ও-পক্ষকে। তারপরে দু’পক্ষকে সামনে রেখে কী যেন সব সহজসরল কথা... দুপুরে আজ একসাথে খাওয়া সব্বার, রাজাবাজার ট্রাম-ডিপোর উল্টোদিকে ভিক্টোরিয়া স্কুলের পাশে। দু’টো আস্ত পাঁঠা কেনা হয়েছে- নাম দেওয়া হয়েছে গোপাল আর সোহরাওয়ার্দি। পাঁঠাদু’টোকে বলি দিয়ে, মাংস খেয়ে দুপুরের মোচ্ছব সবার।

#
বৌধ রুখে দাঁড়াতে শিখে গেছে। বৃদ্ধ লছমন এখন পড়তে পারেন খবরের কাগজ। সেখান থেকেই জানতে পেরেছেন ঠাকুর আর চৌধারিরা পোষা সেনা পাঠাবে কয়েকদিনের মধ্যেই। লছমনের ছেলে বৌধ সদর শহরে আইন পড়েছে। সে শিখে গেছে শিক্ষার অধিকার প্রত্যেকের। খাদ্যের দাবি মৌলিক। এমনকি, সংবিধান অনুযায়ী, উঁচুজাতের-নিচুজাতের মন্দির ভাগাভাগি হয়না। ‘ঈশ্বর’ প্রত্যেকের। আর, সে শিখে গেছে জমির অধিকার।
শম্বুক বাঁচতে পারেননি। বৌধের পূর্বপুরুষ। বৌধ রুখে দাঁড়াবার এই ক্ষমতা পেয়েছে শম্বুকের থেকে। শম্বুক আসেন তার স্বপ্নে। শম্বুকের রূপ দেখেছে সে, সাধারণ উস্কোখুস্কো চুলের এক মানুষ; কিন্তু অসম্ভব উজ্জ্বল চোখ। গায়ের রঙ মাজা মাজা, কায়িক পরিশ্রমের যথাযথ নির্মেদ চেহারা। বুদ্ধিবৃত্তির ছাপ মুখে, মেধার ছোঁয়া স্মিত হাসিতে। শম্বুকের সঙ্গে কথোপকথন হয় তার। বেদ বিষয়ক, শ্রুতিনির্ভর কথা। বেদ অধ্যয়নে শম্বুকের নিষ্ঠা; দিনান্তের পরিশ্রম আর বর্ণজ অপমানের শেষে সন্ধ্যেয় একটুকরো আগুনের পাশে বসে বেদপাঠ। শম্বুকের থেকে বুঝে বৌধও এখন বেদকে সাহিত্য হিসেবে পড়তে শিখেছে। অনুশাসন নয়, ব্রাহ্মণের স্বার্থব্যাখ্যা নয় এমনকি রাজানুগ্রহের স্তাবকতাও নয়। শম্বুক ঠিক এভাবেই পড়তে শিখেছিলেন, শুনতে শিখেছিলেন। স্থানীয় ব্রাহ্মণরা বেদ অপব্যাখ্যা করলে, অমান্য করতেন শম্বুক। ব্রাহ্মণ্যবাদের বেদ-পরবর্তী বর্ণবিভাগ আর শ্রেণিবিভাজন স্বীকার করতেন না। শুধু স্মিত হেসে ঘাড় নেড়ে ‘না’ বোঝাতেন। তারপরেই স্থানীয় ব্রাহ্মণেরা লম্বা পত্রে পাঠাল রাজাকে। শূদ্র শম্বুকের বেদাধ্যয়নে ব্রহ্মতেজ নাকি কমে যাচ্ছে! ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণ পোক্ত সেতুতে বাহিনী নিয়ে এল রঘুপতি রাজা রাম। উজ্জ্বল শিখার মতো শূদ্র শম্বুকের সামনে ব্রাহ্মণ-বশীভূত রাজা রাম। বেদপাঠের ও ব্যাখ্যার অধিকার শুধু ব্রাহ্মণের- তীব্র স্বরে বলল রাম। সেই স্মিত হাসিতে প্রতিবাদ করলেন শম্বুক। মেঘের খবরে আর ধূলো ওড়ার সংবাদে শম্বুক জানতেন রাম আসবে তাকে খুঁজতে। তাই, সন্তান পরন্তপ আর বেদজকে সরিয়ে দিয়েছিলেন আগেই। গোপন বার্তা পাঠিয়েছিলেন বহু দূর গ্রামের এক আত্মীয় গুহকের কাছে, যাতে পরন্তপ ও বেদজর ঠাঁই মেলে সেখানে। শম্বুকের বেদ অধ্যয়নের, বেদ ব্যাখ্যার উত্তরসূরী যে তারাই। তারাই এরপর বয়ে নিয়ে যাবে কাহিনী, শম্বুকের প্রতিবাদ ও রাজার অমানবিকতার কথা। শম্বুক রুখে দাঁড়ালেন ব্রাহ্মণদের অযৌক্তিক ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে, রামের অন্যায় আদেশের বিরুদ্ধে। বেদ উচ্চারণ ক’রে ক’রে যখন প্রকৃতি আর মানুষের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করছেন শম্বুক, তখনই উপস্থিত ব্রাহ্মণদের আদেশে আড়াআড়ি দ্রুতবেগে চালিত হল রামের তলোয়ার। আগুন জ্বলে উঠেছে শম্বুকের ঘরে। শম্বুকের পরিবার ঝলসে গেছে।
বৌধের স্বপ্নে এই দৃশ্য চলকে ওঠে আর বাস্তবে দেখে সে তার বাথানিটোলা পুড়ে যাচ্ছে। জমির অধিকারের প্রশ্নে, সমানাধিকারের প্রশ্নে সমস্বর লছমন, দুখি ধোবিনদের গ্রাম ধ্বংস করে দিয়েছিল রণবীর সেনা।। নাজমা খাতুনের মাথা গুঁরিয়ে দিয়েছিল শটগানের গুলিতে, তিন বছরের সালমা-র ঘাড়ের শিরা কেটে দিয়েছিল। শূদ্রদের গ্রাম বাথানিটোলায় শূদ্রদের গণহত্যা করতে ক্ষত্রিয় রণবীর সেনা এসেছিল। বেঁচে যাওয়া রাধিকা দেবী জানেন অন্য কোনও এক গ্রামে দলিত শিশুর গায়ে ফুটন্ত ডাল ঢেলে দিয়েছে উঁচুজাতের পুরুত; শিশুটির অপরাধ মন্দিরে ‘অনুপ্রবেশ’। বৌধ শিখেছে রুখে দাঁড়াতে। সে চিঠি লিখেছে সরকারি দফতরে। প্রশাসনিক ভবনে। কিন্তু সেই প্রশাসন আর সরকার রণবীর সেনা, ঠাকুর-চৌধারিদের ভোটপোষ্য। বৌধ শম্বুকের উত্তরসূরি, শূদ্র-মেথর। তার সদরে গিয়ে উচ্চশিক্ষা, জলপানি পেয়ে আইন অধ্যয়ন এবং সরকার-প্রশাসনে অভিযোগ জানানোয় ক্ষিপ্ত গুপ্তেশ্বর সিং এবং অজয় সিং। তাই ফের তারা আসবে আগুন লাগাতে আর খুন করতে। বৌধ এখন চিঠি পাঠাচ্ছে কমরেডদের। কমরেডদের সঙ্গে সহযোদ্ধার মর্যাদা ভাগ করে নেওয়া যায়, এক গ্লাসে চুমুক দিয়ে চা এক থালায় লিট্টি খাওয়া যায়। বৌধ শম্বুকের উত্তরাধিকার। পরন্তপ আর বেদজর মতো সেও কিশোর আর মাধাইকে গোপনে পাঠিয়ে দিয়েছে লাল-বাহিনীর সশস্ত্র কমরেডদের বার্তা পৌঁছে দিতে। প্রতিরোধের বার্তা ছড়িয়ে যাচ্ছে... লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছে বৌধ, কানহাইরা... কোনও এক ইচ্ছেডানায় ভর করে।

#
ইচ্ছেডানার রঙে ভোর হয়ে এলে ক্লান্তি মুছে ফেলে চিঠিরা। ঘুম ঝেড়ে টানটান হয় ডাকপিওনের অপেক্ষায়। চিঠিরা অনেকক্ষণ জমে আছে। প্রিয় সে হাতে পৌঁছে যাবে ঠিক। সেই স্কুলকিশোর পুরনো পুজোসংখ্যার ফাঁকে খুঁজে পেয়েছে ১৫ লাইনের চিঠি। ডাকবাক্সে ফেলে রাখা স্ট্যাম্প-না-থাকা চিঠি ফিরে এসেছে তার হাতে; এবার ওজন বুঝে স্ট্যাম্প লাগিয়ে পাঠাতে হবে ফের পাক্ষিক পত্রিকাটির দফতরে। সেই নিধনস্থল থেকে ‘মা নিষাদ’ উচ্চারণ করতে করতে শম্বুক আসছেন; গুজরাতের কোনও এক দলিত গ্রামে নয়া-রামরাজত্বের প্রতিরোধ করতে শেখাচ্ছেন গায়ত্রী ছন্দে, বৃহতী ছন্দে তাঁরা দল বেঁধে এগিয়ে আসছেন। সোহরাওয়ার্দি আর গোপাল পাঁঠার আহ্বান প্রায়ই শোনা যায় কলকাতায়; তখন ইসমাইলের দেওয়া লালপতাকা আর মশাল নিয়ে বেরিয়ে আসে অনেক লোক। ইচ্ছেডানায় বার্তা ছড়িয়ে যায়...